একুশে ফেব্রুয়ারী: প্রেক্ষাপট বাংলা ভাষা চর্চাকে বিকশিত ও উন্নত করা ঐতিহাসিক প্রয়োজন

985

Published on ফেব্রুয়ারি 21, 2018
  • Details Image

বাঙালির মেরুদন্ড মাতৃভাষা বাংলা এই সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য পাকিস্তানের জন্ম থেকেই বাঙালিরা ছিল সোচ্চার। ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন করাচীতে শুরু হলে পূর্ব বাংলার প্রতিনিধি ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ভাষার ওপর একটি সংশোধনী প্রস্তাবে বলেন, উর্দু এবং ইংরেজীর সঙ্গে বাংলাকেও গণপরিষদের অন্যতম ভাষা হিসেবে ব্যবহার করা হোক। সংশোধনী প্রস্তাবটির ওপর আলোচনায় ২৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান বলেন, ‘পাকিস্তানের অধিবাসীদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করা এবং একটি সাধারণ ভাষার দ্বারা ঐক্যসূত্র স্থাপনের প্রচেষ্টা হইতে মুসলমানদের বিচ্ছিন্ন করাই এই প্রস্তাবের উদ্দেশ্য।’ পূর্ব বাংলার প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিন বলেন, ‘পূর্ব বাংলার অধিকাংশ অধিবাসীরই এই মনোভাব যে, একমাত্র উর্দুকেই রাষ্ট্রভাষা রূপে গ্রহণ করা যাইতে পারে।’ (নওবেলাল, ৪ মার্চ, ১৯৪৮)।

মুসলিম লীগ দলীয় বাঙালি সদস্যদের বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার বিরোদ্ধে ভোট দেওয়ার খবর ঢাকায় এলে দারুণ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। মুসলিম লীগারদের উর্দুভাষা প্রীতির বিরুদ্ধে ঢাকায় ২৬ ফেব্রুয়ারি ছাত্র-ধর্মঘট পালিত হয়। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা রাজপথে বিক্ষোভ মিছিল শেষে বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এক প্রতিবাদ সভায় মিলিত হয়। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলন পরিচালনার উদ্দেশ্যে ২ মার্চ ফজলুল হক হলে কামরুদ্দিন আহমদ-এর সভাপতিত্বে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মীদের এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভায় ভাষা আন্দোলনকে বেগবান করার জন্য ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ নামে সর্বদলীয় সংগঠন দাঁড় করানো হয়। সংগ্রাম পরিষদের ডাকে ১১, ১৩ ও ১৪ মার্চ (১৯৪৮) সারা পূর্ব বাংলায় হরতাল পালিত হয়। প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিনের বর্ধমান হাউজস্থ (বর্তমানে বাংলা একাডেমী ) বাসভবনে ১৫ মার্চ মুসলিম লীগ সংসদীয় দলের বৈঠকে ছাত্ররা বিক্ষোভ প্রদর্শনকরে। ঐদিনই প্রধানমন্ত্রীর সাথে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আপস-রফা আলোচনা-বিতর্কের পর প্রধানমন্ত্রী নাজিমউদ্দিন ৭-দফা চুক্তি স্বাক্ষর করেন। দফাগুলি ছিল: (১) বন্দি-মুক্তি, (২) তদন্ত অনুষ্ঠান, (৩) ১৪৪ ধারা প্রত্যাহার, (৪) আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে গৃহীত ব্যবস্থা রহিতকরণ, (৫) বাংলাকে প্রাদেশিক সরকারি ভাষার মর্যাদা প্রদান, (৬) শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ প্রাদেশিক সংসদীয় সভায় বাংলার প্রচলন, (৭) সংবাদপত্রের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার। ছাত্রদের চাপে প্রধানমন্ত্রী ৭ম দফার পরে ৮ম দফায় নিজ হাতে লেখেন, ‘সংগ্রাম পরিষদের সাথে আলোচনার পর আমি এ ব্যাপারে নি:সন্দেহ হইয়াছি যে, এই আন্দোলন রাষ্ট্রের দুশমন দ্বারা অনুপ্রাণিত হয় নাই।’ এই চুক্তি ছিল বাঙালিদের এক বিশাল বিজয়ের প্রতীক।

১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকা এলে ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে এক নাগরিক সংবর্ধনায় বলেন, ‘একথা আপনাদের পরিস্কারভাবে বলে দেওয়া দরকার যে, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু, অন্য কোনো ভাষা নয়। এ ব্যাপারে যদি কেউ আপনাদের বিভ্রন্ত করার চেষ্টা করে তা’হলে বুঝতে হবে যে সে হচ্ছে রাষ্ট্রের শত্রু।’ (‘জাতির পিতা বলেছেন’ পুস্তিকা, প্রকাশনা ও চলচ্চিত্র বিভাগ, পাকিস্তান সরকার, ঢাকা, পৃষ্টা ৭২,, প্রথম সংস্করণ, আগস্ট ১৯৬৬ )।

জিন্নাহর বক্তব্যে ছাত্র-জনতা ভীষণ হতাশ হয়। ক্ষুব্ধ ছাত্ররা জিন্নাহর সম্মানে নির্মিত কয়েকটি তোরণ ভেঙ্গে দেয়, তাঁর ফটো পুড়িয়ে ফেলে। ২৪ মার্চ সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বিশেষ সমাবর্তন উৎসব অনুষ্ঠানে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ যখন পুণরায় ঘোষণা দিচ্ছিলেন ‘উর্দুই হবে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ সেই সময় অধিক সংখ্যক ছাত্র ‘না’ ‘না’ বলে প্রতিবাদ করলে জিন্নহ কিছুক্ষণ থমকে থাকেন। সেদিন সন্ধ্যায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক আলোচনায় জিন্নাহ বলেন, ৮-দফা চুক্তিতে ছাত্ররা জোরপূর্বক পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষর নিয়েছিল, তাই এই চুক্তি মানতে তিনি রাজি নন। এ নিয়ে সভায় তুমুল হৈ চৈ হয়।

ঢাকায় পাকিস্তান মুসলিম লীগের অধিবেশন উপলক্ষে ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি পল্টন ময়দানে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিনের সভাপতিত্বে এক জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভাপতির বক্তব্যে তিনি বলেন, পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। যে প্রধানমন্ত্রী নাজিমউদ্দিন ১৯৪৮ সালের ১৫ মার্চ বাংলাকে স্বীকৃতি দিয়ে এক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন, তাঁর মুখ থেকে এই ঘোষণা ছাত্র-জনতাকে স্তম্ভিত করে। খাজা নাজিমউদ্দিনের এই দম্ভোক্তির প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ৩০ জানুয়ারি (১৯৫২) স্বত:স্ফ’র্তভাবে ধর্মঘট পালন করে।
বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ৩১ জানুয়ারি (১৯৫২) বিকেলে আওয়ামী মুসলিম লীগ ও পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির উদ্যোগে ঢাকা বার লাইব্রেরীতে সর্বদলীয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। মাওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে উক্ত সভায় সর্বসম্মতভাবে ‘সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ’ গঠন করে নি¤েœ বর্ণিত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় : (ক) চুক্তি ভঙ্গ করে খাজা নাজিমউদ্দিনের দম্ভোক্তির নিন্দা, (খ) বাংলা ভাষা লেখার জন্য আরবি অক্ষর প্রচলনের অপচেষ্টায় ক্ষোভ প্রকাশ, (গ) ৪ ফেব্রুয়ারি ছাত্রদের সাধারণ ধর্মঘটের প্রতি সমর্থন দান, (ঘ) জননিরাপত্তা আইন প্রত্যাহার ও এই আইনের আওতায় বন্দি শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি দাবি।

মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ২১ ফেব্রুয়ারি (১৯৫২) সমগ্র দেশে সর্বাত্তক হরতালের ব্যাপক প্রস্তুতি দেখে সরকার ২০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ৬ টায় ঢাকা জেলাব্যাপী সভা, মিছিল, হরতাল ইত্যাদি নিষিদ্ধ করে ১৪৪ ধারা জারি করে। এই অবস্থায় সকল স্তরের বাঙালির মধ্যে বিক্ষোভের কারণে ঢাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছিল। এই পরিস্থিতিতে ভাষা আন্দোলন চরম পরিণতির দিকে অগ্রসর হতে থাকে।

২০ ফেব্রুয়ারি রাতে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের জরুরী সভায় অধিকাংশ সদস্য বলেন, ‘আমরা যদি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করি তাহলে দেশে ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করে সরকার জরুরী অবস্থার অজুহাতে সাধারণ নির্বাচন বন্ধ করে দিতে পারে। আমরা সরকারকে সে সুযোগ দিতে চাই না।’ (‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত পুস্তিকা)।
১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে ২১ ফেব্রুয়ারি সকালে ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে জমায়েত হতে থাকে। ঐতিহাসিক বেলতলা (পরবর্তীতে আমতলা, বর্তমান বটতলা) ছাত্রনেতা গাজীউল হকের সভাপতিত্বে ছাত্রসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করার জন্য কেন্দ্রীয় সংগ্রাম পরিষদের সিদ্ধান্ত জানিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক বক্তব্য দিলে ছাত্ররা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। তারপর ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কিন্তু যুবলীগের আবদুস সামাদ বলেন, ৪জন করে বের হলে একদিকে ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করা হবে, অপরদিকে বড় ধরনের অঘটন এড়ানো সম্ভব হবে। প্রস্তাবটি সবার মনোপূত হওয়ায় ৪জন করে স্লোগান দিয়ে বের হতেই পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে ট্রাক ভরে ভরে লালবাগ থানায় নিয়ে যেতে থাকে। তারপরও পরিষদ ভবন ঘেরাও-এর লক্ষ্যে ছাত্ররা লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস, গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গণে জমায়েত হয়। বিকেল ৩টায় অধিবেশন শুরুর আগে পুলিশ ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করলে আত্মরক্ষার জন্য ছাত্ররা পুলিশের ওপর ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে। মেডিকেল কলেজের সামনে আনুমানিক বেলা ৪টার সময় ছাত্রদের ওপর পুলিশ গুলি চালায়। এতে জব্বার ও রফিক শহীদ হন। এর পর পর আবুল বরকত গুলিবিদ্ধ হয়ে রাতে হাসপাতালে মারা যান।
ঐদিন ছাত্র-হত্যার সংবাদ আইন পরিষদের অধিবেশনে পৌছলে বিরোধী দলের সদস্যরা হত্যার প্রতিবাদে মুলতবি প্রস্তাব পাশ ও কৈফিয়ৎ চাইলে তা অগ্রাহ্য করে অধিবেশন চলতে থাকে। তখন মুসলিম লীগ দলীয় সংসদ সদস্য মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশসহ ৪জন সংসদ সদস্য অধিবেশন-কক্ষ ত্যাগ করেন। (ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস : কয়েকটি দলিল, ঢাকা, ১৯৮৯)।

সরকার গোপনে শহীদদের লাশগুলো মেডিকেল থেকে সরিয়ে নেয়। ২২ ফেব্রুয়ারি সকালে কয়েক লাখ লোক শহীদদের গায়েবী জানাজায় অংশ নেয়। বেলা ৩টায় আইন পরিষদের অধিবেশনে দিশেহারা মুসলিম লীগ সরকার পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ‘বাংলা’কে গ্রহণ করার সুপারিশ করে এক প্রস্তাব পাস করে। ২৩ ফেব্রুয়ারি (১৯৫২) পত্রিকায় ৫জন নিহত, ১২৫জন আহত, ৩০জন গ্রেফতারের খবর প্রকাশিত হয়। (দৈনিক মিল্লাত, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২)।

মাতৃভাষার অধিকার ও মর্যাদা স্থাপনে একটি জাতির প্রচেষ্টা এবং আত্মোৎসর্গ দুনিয়ার অন্য কোন জাতির ইতিহাসে নাই। বাংলাভাষার গৌরবময় সংগ্রামের ইতিহাস বিশ্ববাসীর নিকট চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্য কানাডা প্রবাসী রফিকুল ইসলাম ও আবদুস সালাম প্রথম চিন্তা করেন। তারা বিশ্বের মাতৃভাষাপ্রেমী সংস্থার মাধ্যমে জাতিসংঘের নিকট ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করার প্রস্তাব উপস্থাপনের উদ্যোগ নেন। প্রস্তাবটি পেয়ে জাতিসংঘ কর্তৃপক্ষ জানায় এটি বাংলাদেশ সরকার দ্বারা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাবিত হতে হবে। এই সংবাদ জানার পর তৎকালীন শেখ হাসিনার গণতান্ত্রিক সরকার তড়িৎগতিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। যার ফল হিসেবে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠান (ইউনেস্কো) ১৯৯৯ সালের ১৫ নভেম্বর প্যারিসে তার ৩০তম সাধারণ সভায় ২১ ফেব্রুয়ারিকে সর্বসম্মতিক্রমে মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তারপর থেকে পৃথিবীর ১৮৮টি দেশের ৬০০ কোটিরও অধিক মানুষ প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করছে। ইউনেস্কো কর্তৃক এই স্বীকৃতি বাংলা ভাষা আন্দোলনকে ও তার উৎস-প্রতিক ২১ ফেব্রুয়ারিকে বিশ্বজনতার বাক, বিবেক, লেখা, প্রকাশনের অলঙ্ঘনীয় অধিকারের স্মারক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। সেদিন ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ইউনেস্কো বলেছিল : ‘মাতৃভাষা প্রচলন ও বিকাশের সকল প্রচেষ্টা কেবল ভাষাগত বৈচিত্র্য ও বহুভাষী শিক্ষাকে উৎসাহিত করবে না, তাদের বিশ্বব্যাপী বিকাশেও ভ’মিকা পালন করবে এবং সংলাপ, সমঝোতা ও সহনশীলতার ভিত্তিতে সংহতিকে উৎসাহিত করবে।’
বাংলাভাষা আমাদের আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে সুযোগের সমতা ও মানবাধিকার অর্জন, আত্মবিশ্বাস নিয়ে দাঁড়ানোর জায়গা। সেই কারণেই ১৯৫২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ফরিদপুর জেলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও মহিউদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রভাষার দাবির সমর্থনে অনশন ধর্মঘট করেন। ১০ দিন অনশনের পর ছাত্র-জনতার চাপের মুখে ২৪ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধুকে জেল থেকে মুক্তি দেওয়া হয়।

আমাদের মাতৃভাষার মর্যাদার দাবি, স্বাধীকার সংগ্রাম ও আর্থ-সামাজিক অর্জনের ভিত্তি মহান একুশ। ১৯৫৩ সালের নভেম্বরে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত যুক্তফ্রন্ট ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের আগে তাদের প্রতিশ্রুত ২১-দফার ১ম দফায় ছিল বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা। অন্য কোন উপায় না দেখে বাঙালির ভাষার দাবি মেনে ১৯৫৬ ও ১৯৬২ সালে পাকিস্তানে প্রথম ও দ্বিতীয় সংবিধানে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। গৌরবোজ্জ্বল এই স্বীকৃতি আদায়ের পর ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ঐতিহাসিক ৬-দফা ঘোষণা করেন। তারপর ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুথান এবং ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনদেশে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর তারিখে সংবিধান সম্পর্কিত আইন গৃহীত হয়। সংবিধানের ৩ অনুচ্ছেদে বলা হয় : এই প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। ১৯৭১ সালে পাক-বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসর গোলাম আজম-নিজামীগং কর্তৃক ধ্বংসকৃত শহীদ মিনার বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ১৯৭২ সালে পুনর্নিমাণ, সর্বস্তরে বাংলাভাষা প্রচলন, ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক প্রথম বাংলায় ভাষণÑএই সবই প্রমাণ করে বাঙালির আত্মপরিচয়ের ভিত্তি বাংলাভাষার প্রশ্নে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন আপসহীন।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে তাঁর কন্যা শেখ হাসিনা সরকার প্রধান হিসেবে প্রতিবারই জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর সরকার বাংলাভাষাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি আদায়ের প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৮ উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘নিজেদের সংস্কৃতি, নিজেদের ভাষা, নিজেদের শিল্প-সাহিত্যকে যদি আমরা মর্যাদা দিতে না পারি, তার উৎকর্ষ সাধন করতে না পারি, তাহলে জাতি হিসেবে আমরা বিশ্বের দরবারে আরো উন্নত হতে পারব না।’ তিনি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশ হবে অসাম্প্রদায়িক, যে বাংলাদেশ হবে শান্তিপূর্ণ, যে বাংলাদেশে প্রতিটি ধর্মের মানুষ তাদের ধর্ম-কর্ম স্বাধীনভাবে পালন করবে, এমনকি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরাও তাদের ভাষার চর্চা করতে পারবে। তা ছাড়া আমরা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট গড়ে তুলেছি, যেখানে হারিয়ে যাওয়া মাতৃভাষা নিয়ে গবেষণা হবে।’
প্রধানমন্ত্রীকে আমরা অভিনন্দন জানাই।

সেইসাথে বলতে চাই, সালাম-বরকত-রফিক-জব্বারদের রক্তের বিনিময়ে বাংলা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পেয়েছিল, ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনের ঐ অঙ্গীকার থেকে দূরে সরে এসে বাংলা ভাষাকে লাঞ্ছিত করা যাবে না। ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যুদয়Ñএই সত্যটি আমাদের ভুলে গেলে চলবে না। বাংলাদেশে জঙ্গী-মৌলবাদের তৎপরতা আমাদের সংস্কৃতিকে বিপদগ্রস্থ করেছিল। বর্তমান সরকার কঠিন হস্তে এই জঙ্গী-সন্ত্রাসী চক্রকে নিমূল করে বাংলা ভাষা ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে রক্ষা করে চলছে।
ভাষা মানুষের বিচ্ছিন্নতা দূর করে, পরস্পরকে ঐক্যবদ্ধ করে। ভাষা শ্রেণী মানে না, ধর্ম মানে না, আঞ্চলিক বিভেদকে অগ্রাহ্য করে। কাজেই দেশ ও জাতির ঐতিহাসিক প্রয়োজনে বাংলা ভাষা চর্চাকে বিকশিত ও উন্নত করাই হবে আমাদের অন্যতম কর্তব্য।

লেখক: অস্ট্রিয়া প্রবাসী লেখক, মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিক

এম. নজরুল ইসলাম

 

সৌজন্যেঃ আমাদের সময় 

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত