ফোর জি ও ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্নযাত্রাঃ ড. মিল্টন বিশ্বাস

2561

Published on ফেব্রুয়ারি 27, 2018
  • Details Image

গত ১৯ ফেব্রুয়ারি (২০১৮) ফোর-জি বা চতুর্থ প্রজন্মের মোবাইল নেটওয়ার্ক প্রচলনের মধ্য দিয়ে আমাদের ডিজিটাল যুগের আরো একধাপ অগ্রগতি সম্পন্ন হলো। এর আগের প্রজন্মের প্রযুক্তি ছিল টু-জি এবং থ্রি-জি। টু-জিতে কেবল ফোন কল করা এবং টেক্সট মেসেজ পাঠানো যেতো। থ্রি-জি প্রযুক্তিতে মোবাইল ফোন থেকে ইন্টারনেট ব্রাউজিং, ভিডিও কল করা এবং মিউজিক ও ভিডিও ডাউনলোড করার সুযোগ তৈরি হয়। থ্রি-জিতে যা যা করা সম্ভব, তার সবকিছু ফোর-জিতেও করা যাবে, তবে দ্রুতগতিতে এবং ভালোভাবে। অর্থাত্ সুবিধাগুলো পরিষ্কার—থ্রিজিতে ইন্টারনেট ডাউনলোড বা আপলোডে যে সময় লাগত, ফোর-জিতে সে সময় কম লাগবে। কেবল ইন্টারনেটই নয়, ভয়েস কলেও অগ্রগতি হবে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ফোর-জি হ্যান্ডসেটের চাহিদা মেটাতে সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। কারণ ফোর-জি হ্যান্ডসেট মাত্র ১০ শতাংশ গ্রাহকের হাতে রয়েছে। সেবা নির্বিঘ্ন করতে একইসঙ্গে অবকাঠামোগত উন্নয়নও দরকার। ফোর-জির দ্রুতগতি প্রান্তিক মানুষকে নানা কাজে উত্সাহী করবে। ফলে তাদের শহরমুখী হতে হবে না। ই-কমার্স, আউটসোর্সিংসহ ইন্টারনেটভিত্তিক ব্যবসার প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে তৃণমূল মানুষের ডিজিটাল সেবা নিশ্চিত হবে। বাংলাদেশ বিশ্বের কাছে তথ্য-প্রযুক্তিবান্ধব রাষ্ট্র হিসেবে গণ্য হবে।

বাংলাদেশের কৃষিভিত্তিক সমাজের সাংস্কৃতিক মানকে ডিজিটাল যুগের স্তরে উন্নীত করা একটি কঠিন কাজ। তার জন্য সঠিক নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনা দরকার ছিল। শেখ হাসিনা সেই কাজটি সুনিপুণ পরিকল্পনায় বাস্তবায়ন করে চলেছেন। মনে রাখতে হবে যে, এদেশে আমরা সর্বপ্রথম তাঁর মুখেই ডিজিটাল বাংলাদেশ ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির কথা শুনেছি। তাঁর নেতৃত্বেই সম্পন্ন হয়েছে ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপান্তরের ইতিহাস। ডিজিটাল বাংলাদেশ বলতে বোঝায় দেশের সকল নাগরিককে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারার সক্ষমতা তৈরি করা। উপরন্তু তার চারপাশে এমন একটি পরিবেশ গড়ে তোলা যাতে তার জীবনধারাটি যন্ত্র-প্রযুক্তি ও জ্ঞানভিত্তিক বাংলাদেশের অনন্য নিদর্শন হিসেবে প্রতিভাত হয়। শিক্ষাসহ সরকারি-বেসরকারি ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-কল-কারখানা ও সেবাকে ডিজিটাল করা হচ্ছে। এতে দেশের মানুষের জীবনধারা ডিজিটাল যুগে পদার্পণ করেছে।

২০২১ সালে বাংলাদেশ হবে মধ্যম আয়ের দেশ। এর মধ্য দিয়ে ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে প্রযুক্তি বিভেদমুক্ত দেশ গড়ে তোলা হবে। আর ২০৪১ সালে বাংলাদেশ হবে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম উন্নত দেশ। ডিজিটাল প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বর্তমান সরকার। এজন্য বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের উন্নয়নে দক্ষ জনবলের প্রয়োজন মেটাতে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। টেন্ডারবাজি ও দুর্নীতি কমাতে ইতোমধ্যে সরকারি অফিসে ই-টেন্ডার পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। সারাদেশে তৈরি করা হয়েছে এক লাখ ওয়াই-ফাই জোন।

মূলত দেশে থ্রি-জি সেবার জায়গায় ফোর-জি আনা হয়েছে। অবশ্য তার আগেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় ওয়েব পোর্টাল করেছি আমরা। সেখান থেকে যেকোনো তথ্যসেবা আমরা দিতে সক্ষম। আইটি সেক্টরে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি এবং আরও এগিয়ে যাবো। ৯ বছর আগে দেশে তথ্যপ্রযুক্তি শিল্প বলে কিছু ছিল না। তখন আইটি খাত থেকে রপ্তানি আয় ছিল ২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা এখন ২৫০ মিলিয়নে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশকে তথ্য ও প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ করে বেকারত্ব দূর করাকে অন্যতম এজেন্ডা হিসেবে নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এজন্য জোর দেওয়া হয়েছে দ্রুত আইটি পার্ক স্থাপনের ওপর, পাশাপাশি আইটি ইনস্টিটিউট, আইটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ওপর। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের নিরলস প্রচেষ্টায় আইটি খাত ইতোমধ্যে ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

ডিজিটাল বাংলাদেশের অন্যতম দৃষ্টান্ত হলো আর্থিক খাতে লেনদেনে এটিএম বুথ, মোবাইল ব্যাংকিং ও অনলাইনে পেমেন্টের ওপর ব্যাপক নির্ভরশীলতা। ব্যাংকে না গিয়ে ঘরে বসেই অসংখ্য গ্রাহক মোবাইলে পরিশোধ করছে ইউটিলিটি বিল। এটিএম বুথ ব্যবহার করে টাকা তুলে খরচ করছে। প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে কতটা সহজ করেছে তার উদাহরণ শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রামের কৃষক পরিবারে দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। প্রযুক্তি ব্যবহারের বিকল্প নেই। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের আওতায় ২৮টির বেশি ব্যাংক অনুমতি পেয়েছে। এ পদ্ধতির মাধ্যমে বিদেশ থেকে রেমিটেন্সও আসছে। অন্যদিকে ব্যাংকগুলোর মধ্যে আন্তঃলেনদেন সম্পূর্ণ করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ স্থাপন করেছে। এ সিস্টেমে এটিএম বুথ, পয়েন্ট অব সেলস (পিওএস), ইন্টারনেট, মোবাইল ব্যাংকিং করা হচ্ছে। এর মধ্যে সব ব্যাংকের মধ্যে একটি কমন প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি কার্ডের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ ও কেনাকাটা চালু রয়েছে। এ নেটওয়ার্কের আওতায় যুক্ত হয়েছে অর্ধশত ব্যাংক। এছাড়া স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে মাসে প্রায় ২১ লাখ চেক প্রসেসিং হচ্ছে। এম-কমার্সে সোয়া ৪ লাখ গ্রাহক ইউটিলিটি বিল দিচ্ছে এবং এ পদ্ধতির মাধ্যমে মোবাইল ব্যবহারকারীরা রেলওয়ের টিকিট, ক্রিকেট ম্যাচের টিকিট কিনতে পারছেন। এছাড়া পানি, গ্যাস এবং বিদ্যুত্ বিলও পরিশোধ করছেন।

ডিজিটাল বাংলাদেশের এই বাস্তব চিত্রে সংযুক্ত হলো ফোর-জি। এর প্রচলনের ফলে উচ্চ গতির কারণে ইন্টারনেট ব্যবহারে সময় বাঁচবে, ইন্টারনেটভিত্তিক সেবাগুলো পাওয়া যাবে বাধাহীনভাবে। দেশে প্রায় ৮ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী রয়েছে। প্রচলিত অনেক সেবাই হয়ে যাবে ইন্টারনেটভিত্তিক। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার অনুসারে অঙ্গীকার পূরণে সরকারের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা লক্ষ করা যাবে গ্রাম-গঞ্জ ঘুরে, ইউনিয়ন পরিষদের অফিসগুলো সচক্ষে দেখে। একটানা ৯ বছরে ব্যাংকিংসহ সকল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, সেবা প্রদান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি—প্রতিটি ক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির প্রয়োগ নিশ্চিত করা হয়েছে। সব বয়সী জনগণ এই প্রযুক্তিকে গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশের জন্য ‘ফোর-জি’র প্রচলন নিশ্চিতভাবে অধিকতর সাফল্য বয়ে আনবে।

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত