দুঃসাহসিক অপারেশন জ্যাকপটের বীজ বপনঃ শরীফা বুলবুল

1612

Published on মার্চ 3, 2018
  • Details Image

‘অপারেশন জ্যাকপট’ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানি নৌবাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর সফলতম গেরিলা আক্রমণ। মুক্তিযুদ্ধের সাফল্যে একটি আলোচিত অভিযাত্রা। সীমাহীন দুঃসাহসিক এ অভিযাত্রায় পাকিস্তানি হানাদাররা হকচকিয়ে গিয়েছিল। তাদের ধারণারও অতীত ছিল এই অভিযান। আর এর বীজ বপন হয়েছিল এই মার্চেই।

১৯৭১ সাল। স্পেন, ফ্রান্স, রোম, জেনেভা হয়ে ভারত! মাতৃভূমির ডাকে পালিয়ে এসেছিলেন পাকিস্তান নৌবাহিনীতে কর্মরত ৮ জন বাঙালি। সেই সঙ্গে অকপটে পাল্টাতে শুরু করেছিল ইতিহাস। সেদিনের এই সাহসী মানুষগুলোর সমন্বয়ে গড়ে ওঠা মুক্তিবাহিনীর নৌ-সেক্টর পরবর্তীতে বদলে দিয়েছিল স্বাধীনতাযুদ্ধের অনেক হিসাব, ভেঙে দিয়েছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আস্থার মেরুদণ্ড, রুখে দিয়েছিল তাদের বিদেশি সাহায্যের পথ! সেক্টর-১০, নৌ-কমান্ডো বাহিনী, দেশপ্রেম, সাহস ও বীরত্বের মিলিত গল্পই কালক্রমে রূপ নিয়েছিল এক সুইসাইডাল বা আত্মঘাতী মিশনে, যার নাম- অপারেশন জ্যাকপট। যেটি কিনা শুধু হানাদার বাহিনীর মনোবলেই ফাটল ধরাতে সক্ষম হয়নি বরং সারাবিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রতি।

পূর্বকথা : ঘটনার প্রেক্ষাপট চিত্রায়িত হচ্ছিল সুদূর দক্ষিণ ফ্রান্সের উপক‚লীয় শহর তুলনে। সেখানে তুলন ডকইয়ার্ডে পাকিস্তানি সাবমেরিন পিএনএস ম্যাংরোতে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছিল ৪৫ জন ক্রুকে যাদের মধ্যে ১৩ জন ছিলেন বাঙালি। অপারেশন সার্চলাইটের ঘৃণ্য গণহত্যা ও নিপীড়নের কথা জানার পর তা স্তব্ধ করে দেয় সাবমেরিনার মো. আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরীকে। তিনি তখনই সিদ্ধান্ত নেন স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগ দেয়ার। পাশাপাশি অন্যান্য বাঙালি ক্রুদেরও এ ব্যাপারে রাজি করানোর। তিনি তার পাকিস্তানি সহকর্মীদের কিছুই জানাননি, কেননা তাদের দৃষ্টিতে এটি ¯্রফে বিদ্রোহ হিসেবে গণ্য হতো। সাবমেরিন তীরে ভেড়ার সময় ওয়াহেদ বাঙালি ক্রুদের নিজের পরিকল্পনা জানাতে থাকেন তবে প্রতিবারে একজন একজন করে যাতে কিনা কোনো আলাদা সাক্ষী না থাকে।

ওয়াহেদ ছিলেন জরুরি ও গোপন নথি রাখার সিন্দুকের নিরাপত্তার দায়িত্বে। তীরে সাবমেরিন ভেড়ার পরপরই তিনি সেখান থেকে ৪৫ জন ক্রু-এর পাসপোর্টই নিজের লকারে নিয়ে আসেন। তার মতে, তিনি যদি শুধু বাঙালি ১৩ জনের পাসপোর্টই নিয়ে আসতেন তবে তা সন্দেহের উদ্রেক করত। পরবর্তীতে ১৩ জনের মধ্যে ৮ জন দেশের টানে সাড়া দিয়ে তার সঙ্গে যোগ দেন। এখানে উল্লেখ্য যে, পাকিস্তান প্রতিরক্ষা অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, বাঙালি সাবমেরিনারদের পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে যাওয়ায় পাকিস্তান ইনটেলিজেন্স একজনকে খুন করে ও আটজন পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

২৯ মার্চ ১৯৭১-এ এক দক্ষিণ আফ্রিকান বন্ধুর পরামর্শে তারা সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় যেতে মনস্থ করেন। এটার সমূহ সম্ভাবনা ছিল যে ফ্রান্স পাকিস্তানের পক্ষে যাবে; কেননা পাকিস্তান সরকার ফ্রান্সের কাছ থেকেই সাবমেরিনটি কিনেছিল। অপরপক্ষে সুইজারল্যান্ড যুদ্ধের ব্যাপারে নিরপেক্ষ থাকায় তাদের পক্ষে সেখানে আশ্রয় নেয়া নিরাপদ হবে। আলমারি থেকে পাসপোর্টগুলো নিয়ে তারা একজন দুজন করে তুলন ছেড়ে চলে যান। কিন্তু ফ্রেঞ্চ সীমান্তে গিয়ে তারা জানতে পারেন, সুইজারল্যান্ডে প্রবেশ করতে হলে তাদের ভিসা প্রয়োজন। যাতে কোনো প্রকার সন্দেহ না করা হয় সেজন্য কর্তব্যরত নারীকে জানানো হয় যে তারা প্যারিস থেকে ভিসা নিয়ে আসবেন। এরপর তারা প্যারিসগামী ট্রেনে চড়ে স্পেনের লিওন এ নেমে যান, কেননা স্পেনে প্রবেশের জন্য কোনো ভিসার প্রয়োজন ছিল না।

লিওন হয়ে বার্সেলোনায় গিয়ে ভারতীয় দূতাবাসে যোগাযোগ করা হলে তাদের মাদ্রিদে পাঠানো হয়। দশ মিনিটের মধ্যে ভারতে তাদের রাজনৈতিক আশ্রয়ের কাগজপত্র তৈরি হয়ে যায় এবং সিদ্ধান্ত হয় তারা রোমে গিয়ে নিউইয়র্ক থেকে ছেড়ে আসা ভারতগামী বিমানে উঠবেন। তারা রোমে পৌঁছবার পর দেখেন শ্রমিক ধর্মঘটের জন্য বিমানটি দেরি করে আসবে। এদিকে ভারতীয় দূতাবাস থেকে গণমাধ্যমে তাদের পালিয়ে আসার খবরটি চলে গেলে পাকিস্তান দূতাবাস থেকে তাদের নিয়ে যেতে অনেকে ছুটে আসেন। তারা জবাব দেন, ২৬ মার্চ আমরা নতুনরূপে জন্ম নিয়েছি। আমরা আমাদের দেশের জন্য লড়তে যাচ্ছি। ইতালির সঙ্গে পাকিস্তানের ভালো সম্পর্ক থাকায় দশ ঘণ্টা রোমে ওই বিমানের অপেক্ষা করার ঝুঁকি না নিয়ে তারা জেনেভায় চলে আসেন এবং এক ঘণ্টার মধ্যে বোম্বেগামী বিমানে চড়ে বসেন। সেখানে পৌঁছানোর পর তাদের দিল্লিতে বিভিন্ন নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়। এই সিদ্ধান্তটিও নেয়া হয়ে গিয়েছিল যে, এই ৮ জন নৌ-কমান্ডো হিসেবে কাজ করতে যাচ্ছেন।

প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতি পর্ব : আগস্ট মাসে ১৪৮ জন নৌ-কমান্ডোকে চারটি দলে ভাগ করা হয় দুটি সমুদ্রবন্দর (চট্টগ্রাম ও মংলা) ও দুটি নদীবন্দর (চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জ) আক্রমণের উদ্দেশ্যে। পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে অস্ত্র ও রসদ আসার পথ ছিল দুটি- আকাশপথ আর জলপথ। আকাশপথ ইতোমধ্যেই ভারতীয় বাহিনী বন্ধ করে দেয়ায় নৌপথেই তারা প্রয়োজনীয় জিনিসের জোগান নিশ্চিত করছিল। তাদের প্রয়োজনীয় জোগান বন্ধ করতে এবং তাদের প্রতি বাড়িয়ে দেয়া বৈদেশিক সাহায্যের হাত রুখতেই এই বন্দরগুলো আক্রমণ করে ধ্বংস করার পরিকল্পনা করা হয়। এই অপারেশনের এও উদ্দেশ্য ছিল যে বিদেশি গণমাধ্যমকে পূর্ব পাকিস্তানের প্রকৃত অবস্থা জানানো এবং বিদেশি সহায়তাকারী রাষ্ট্রগুলোকে হুঁশিয়ারি দেয়া যে তাদের জাহাজ আর পূর্ব পাকিস্তানের বন্দরে নিরাপদ নয়- যাতে আর জাহাজ মারফত পাকিস্তানিদের বৈদেশিক সহায়তা না পাঠানো হয়।

ফ্রান্স থেকে পালিয়ে আসা ৮ জন হলেন : মো. আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী, মো. সৈয়দ মোশাররফ হোসেন, মো. রহমতউল্লাহ, মো. শেখ আমানউল্লাহ, মো. আবদুর রকিব মিয়া, মো. আহসানউল্লাহ, মো. বদিউল আলম ও মো. আবদুর রহমান আবেদ। এরপর তাদের সঙ্গে আরো কয়েকজন মিলে কুড়িজনের গেরিলা দল গঠন করে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। পরবর্তীতে তাদের সঙ্গে কর্নেল ওসমানীর দেখা হলে তিনি নৌ-সেক্টর গঠনের সিদ্ধান্ত নেন। এই সিদ্ধান্ত সাপেক্ষে ১৯৭১ সালের ২৩ মে নদীয়া জেলার পলাশীর স্মৃতিসৌধের পাশে ভাগীরথী নদীর তীরে গোপন প্রশিক্ষণ ক্যাম্প খোলা হয়, যার সাংকেতিক নাম দেয়া হয় সি-টু-পি। নৌ-সেক্টরের কোনো সেক্টর কমান্ডার ছিল না, তারা সরাসরি মুজিবনগর সরকারের অধীনে কাজ করতেন।

প্রায় তিনশ’র বেশি মানুষকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। দিনে ১৮ ঘণ্টা করে প্রায় ৩ মাস চলেছিল এই প্রশিক্ষণ। ব্যাপারটি এতটাই গোপনীয় ছিল যে, তাদের কী ধরনের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে তা যে এলাকায় অপারেশন চালানো হবে সেখানে নিয়োজিত মুক্তিবাহিনীর সেক্টর কমান্ডার ব্যতীত আর কেউ জানত না। প্রশিক্ষণ শুরুর আগেই যোদ্ধাদের বলে দেয়া হয়েছিল যে এটি হতে যাচ্ছে আত্মঘাতী মিশন অর্থাৎ যে কোনো মুহূর্তে প্রাণ দিতে হতে পারে। তাই শুরুতেই এই মর্মে স্বাক্ষর নেয়া হয় যে- ‘আমি দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন বিসর্জন দিতে সম্মত হয়েই এই প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছি, আর যুদ্ধে আমার মৃত্যু হলে কেউ দায়ী থাকবে না।

প্রশিক্ষণটির দুটো ভাগ ছিল- স্থলযুদ্ধ প্রশিক্ষণ ও জলযুদ্ধ প্রশিক্ষণ। স্থলযুদ্ধে গ্রেনেড নিক্ষেপ, স্টেনগান চালানো, এক্সপ্লোসিভ ব্যবহার, রিভলবার চালানো, আন-আর্মড কমব্যাট প্রভৃতির কলাকৌশল রপ্ত করতে হতো। আর তীব্র খর¯্রােতা ভাগীরথী নদীতে বুকে ৫-৬ কেজি ওজনের পাথর বেধে সাঁতার, চিৎ-সাঁতার, কোনো রকমে পানির উপরে নাক ভাসিয়ে একটানা অনেকক্ষণ সাঁতার কাটা, সাঁতার এবং ডুবসাঁতার দেয়া অবস্থায় লিমপেট মাইনের ব্যবহার, ¯্রােতের প্রতিক‚লে সাঁতার, জাহাজের কেবল ভাঙা ইত্যাদি কঠিন সব প্রশিক্ষণ দেয়া হতো জলযুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য। সকল যোদ্ধাকে একটানা ৪৮ ঘণ্টা পানিতে থাকার অভ্যাস করতে হতো। এভাবে টানা প্রায় তিনমাসের প্রশিক্ষণের পর আগস্টের প্রথম সপ্তাহে এ প্রশিক্ষণ শেষ হয়।

ত্রিপুরায় তাদের চূড়ান্ত নির্দেশ দেয়া হয়। আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরীর নেতৃত্বে ৬০ জনের চট্টগ্রামগামী দলকে সাহায্যকারী হিসেবে সেক্টর-১, প্রতিটি ২০ জনবিশিষ্ট চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জ এলাকাগামী দলকে সেক্টর-২ এবং ২৬০ জনের (৬০ জন নৌ এবং ২০০ জন সি.এন্ড.সি কমান্ডো) মংলাগামী দলকে সাহায্যের জন্য সেক্টর-৯ নিযুক্ত হয়েছিল। প্রত্যেক কমান্ডোকে একজোড়া সাঁতারের ফিন, একটি ছুরি, একটি লিমপেট মাইন, সাঁতারের পোশাক, শুকনো খাবার দেয়া হয়েছিল। প্রতি তিনজনের একজনকে একটি স্টেনগান ও গ্রেনেড দেয়া হয়েছিল। কারো কারো কাছে কম্পাস ছিল। দলনেতার কাছে ছিল ট্রানজিস্টর রেডিও। এগুলো নিয়ে ৩-৯ তারিখের মাঝে তারা হরিনা থেকে রওয়ানা হয়ে যান এবং ১২ তারিখের মধ্যে বাংলাদেশে নির্ধারিত সেফ হাউজগুলোতে পৌঁছে যান।

সৌজন্যেঃ ভোরের কাগজ

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত