২১ আগস্ট ১৫ আগস্টেরই ধারাবাহিকতা - সুভাষ সিংহ রায়

5288

Published on আগস্ট 19, 2019
  • Details Image

২১ আগস্ট ১৫ আগস্টের ধারাবাহিকতা। ১৫ আগস্টের বিচার করা যাবে না, এভাবে আইন করা হয়েছিল। এ রকম নিকৃষ্ট ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে আর একটিও ঘটেনি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সংবাদ শুনে সাবেক জার্মান চ্যান্সেলর উইলি ব্রান্ডেট (Willy Brandt) মন্তব্য করেছিলেন, ‘শেখ মুজিবকে হত্যার পর বাঙালি জাতিকে আর বিশ্বাস করা যায় না।’ আবার ২১ আগস্টের আইভি রহমানসহ ২৪ জনকে হত্যা করার পর নিজামী-খালেদা সরকার বলেছিল, ‘শেখ হাসিনা ভ্যানিটি ব্যাগে করে গ্রেনেড নিয়ে গিয়েছিল।’ এমনকি থানায় মামলা পর্যন্ত নিতে নিষেধ করা হয়েছিল। জামায়াত-বিএনপি সরকারের মদদপুষ্ট হায়েনারা শেখ হাসিনাকে হত্যা করার জন্য একের পর এক গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল। খালেদা-নিজামী সরকারের উপমন্ত্রী পিন্টু এই হত্যাকাণ্ডের মূল হোতাদের একজন। কিন্তু এখনো আড়ালে রয়ে গেছে অন্য খলনায়করা। এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত খুনিদের খুঁজে বের করতে হবে। ২৫০ জন পুলিশ সদস্য সেদিন এই জনসভায় নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিল। কিভাবে হত্যাকারীরা পালিয়ে গেল? একজন পুলিশ সদস্য আহত হলো না। রহস্যটা কী? এখনো সেই পুলিশ সদস্যদের কেউ কেউ চাকরিতে আছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করলে অনেক কিছু বেরিয়ে আসবে। কোন নরপিশাচরা সেদিন আলামতগুলো নষ্ট করেছে তাদের খুঁজে বের করা খুব কঠিন কাজ হবে না। কোন পুলিশ সদস্যরা সেদিন হামলাকারীদের ওপর গুলি না ছুড়ে আহতদের ওপর গুলি কিংবা টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করেছে। ইচ্ছা থাকলে এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত পুলিশ সদস্যদের খুঁজে বের করা যায়। পাঠকদের স্মরণে আছে নিশ্চয়, সেই সময় খালেদা জিয়া, মান্নান ভূঁইয়া, খন্দকার মোশাররফরা জজ মিয়া নাটকের কত ফিরিস্তিই না দিয়েছেন। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের প্রশ্নোত্তর পর্বে বাংলাদেশের ২১ আগস্টের নারকীয় গ্রেনেড হামলা নিয়ে আলোচনা হয় এবং নিন্দা প্রস্তাব হয়। অথচ বাংলাদেশে জাতীয় সংসদে এ নিয়ে কোনো আলোচনা করতে দেওয়া হয়নি। গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন এই ২১ আগস্টের হত্যাকাণ্ড নিয়ে কি না করেছে! হামলা ও হত্যার আলামত নষ্ট করার পর তদন্তের নামে সুধা সদনে গেছে। এটা স্পষ্ট যে হত্যাকারীরা তত্কালীন সরকারের নিয়োজিত এজেন্ট ছিল। গোটা দেশের বিবেকবান মানুষ এই হত্যার নিন্দা জানিয়েছিলেন। বিএনপি ঘরানার বুদ্ধিজীবী বলে পরিচিত অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদও ধিক্কার জানিয়ে ২০০৪ সালের ২৪ আগস্ট দৈনিক প্রথম আলোর এক উপসম্পাদকীয় নিবন্ধে বলেন, ‘এই দুষ্টচক্রের ইতররা কারা, সে সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করতে চাই না। তবে এটুকু বলব, তারা দেশের শত্রু। তারা রাষ্ট্রের শত্রু। তারা জাতীয় স্বার্থের শত্রু। তাদের সমূলে বিনাশ করা জাতীয় স্বার্থে অবশ্যই প্রয়োজনীয়।’ এত কিছুর পর বিএনপি-জামায়াত জোটের মন্ত্রীরা এটা নিয়ে মশকরা করেছিলেন। পৃথিবীর ইতিহাস বলে, খুনি যত শক্তিশালী হোক আর যত আলামত নষ্ট করুক না কেন, হত্যাকারীরা রেহাই পায় না। অবাক করা বিষয়, বিগত ১২ বছরেও ওই মামলার কোনো সুরাহা হয়নি। ২১ আগস্টের হত্যাযজ্ঞ সারা পৃথিবীর প্রায় সব প্রচারমাধ্যম শীর্ষ সংবাদ হিসেবে তুলে ধরেছে, আর বাংলাদেশ টেলিভিশন সেদিন তিন নম্বর সংবাদ হিসেবে তা প্রচার করে।

২.

শেখ হাসিনা বহুবার মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু মৃত্যুভয়ে তিনি পিছিয়ে যাননি। আওয়ামী লীগ সরকার পরিচালনায় রয়েছে, তাই এখনই সময় এ হত্যাকাণ্ডের পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করা। আওয়ামী লীগের একটি নিজস্ব ইন্টেলিজেন্সি সংস্থা থাকা দরকার। আর সব সময় মনে রাখা দরকার, এই সরকারের সময়ে যেকোনো ধরনের নাশকতার ঘটনা ঘটতে পারে। এর জন্য প্রস্তুতি থাকা একান্ত প্রয়োজন। আওয়ামী লীগের প্রত্যেক কর্মীকে মনে রাখতে হবে, শেখ হাসিনার জীবন সবার আগে। ১১ জানুয়ারির পর প্রমাণিত হয়েছে শেখ হাসিনা ছাড়া আওয়ামী লীগ কতটা গতিহীন ও ছন্দবিহীন। এত দিনে এটুকু প্রমাণিত হয়েছে, শেখ হাসিনার জীবন কর্মবহুল ও বৈচিত্র্যে ভরপুর। এখন এটি শুধু একটি নামই নয়, একটি প্রতিষ্ঠান। Work is worship যাঁর জীবনের মূলমন্ত্র; কর্ম-জ্ঞান ও ভক্তির অপূর্ব সমন্বয়ে গঠিত এক অসাধারণ জীবন তাঁর। জননেত্রী শেখ হাসিনা এ দেশের জনগণের কাছে মুক্তিযুদ্ধের একটি রূপক। সুখে থাকার, স্বাচ্ছন্দ্য উপভোগ করার আকর্ষণ মানুষের জন্য খুবই স্বাভাবিক। সাধারণের জন্য এটাই কাঙ্ক্ষিত। ত্যাগের কথা শাস্ত্রে আছে, মনীষীদের জীবনীগ্রন্থে আছে, চলমান জীবনাচরণে থাকাটা অস্বাভাবিক। শেখ হাসিনার চরম শত্রুও বলবেন, শেখ হাসিনা সব ক্ষেত্রেই ব্যতিক্রম।

শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসার মাত্র পাঁচ দিন আগে ১৯৮১ সালের ১১ মে বিশ্বখ্যাত ‘নিউজ উইক’ পত্রিকা বক্স আইটেম হিসেবে শেখ হাসিনার সাক্ষাত্কার প্রকাশ করে। শেখ হাসিনা স্পষ্ট বলেছিলেন, ‘তিনি নিহত হওয়ার আশঙ্কায় শঙ্কিত নন; এমনকি যে সরকারের মোকাবিলা করবেন তার শক্তিকে তিনি বাধা বলে গণ্য করবেন না। জীবনে ঝুঁকি নিতেই হয়। মৃত্যুকে ভয় করলে জীবন মহত্ত্ব থেকে বঞ্চিত হয়।’

গত ১৬ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগ আয়োজিত স্মরণসভায় স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করে অনেক চেষ্টা হয়েছে তাঁর নাম মুছে ফেলার। খুনিরা নীতিহীন, আদর্শহীন, দিকনির্দেশনাহীন একটি বাংলাদেশ গড়তে চেয়েছিল। খুনিরা শুধু বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেনি, তারা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত সংবিধান ও আদর্শকে হত্যা করতে চেয়েছিল।’ আমরা সবাই ভালো করেই বুঝতে পারি, যে হত্যা ও ক্যুর রাজনীতি বঙ্গবন্ধুর ঘাতকরা ও তাদের মদদদাতারা শুরু করেছিল, তা এখনো অব্যাহত আছে। তাদের এখন একমাত্র টার্গেট শেখ হাসিনা। হত্যাকারীদের অনুসারীরা এখনো আমাদের আশপাশে আছে। প্রশাসন যন্ত্রের মধ্যে ঘাপটি মেরে আছে। আওয়ামী লীগকে বুদ্ধিমত্তা ও কৌশল দিয়ে তা প্রতিহত করতে হবে। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার সঙ্গে সেই সময়কার জামায়াত-বিএনপি জোট সরকারের প্রশাসন যন্ত্র থেকে শুরু করে তাদের রাজনৈতিক সদস্যরা সরাসরি জড়িত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি অংশ এই ঘাতকদের হামলায় সহায়তা ও প্রটেকশন দিয়েছে। সেদিনকার জনসভায় দায়িত্ব পালনরত পুলিশ সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করলে খুব সহজেই এ ঘটনার মূল হোতাদের আবিষ্কার করা যাবে। সেদিন আওয়ামী লীগকে একেবারে নেতৃত্বহীন করতে চেয়েছিল। সৃষ্টিকর্তার অপার মহিমায় সে যাত্রায় রক্ষা পাওয়া গেছে। তার পরও আইভি রহমানসহ বহু রাজনৈতিক কর্মীর জীবন প্রদীপ নিভে গেল। এখনো অসংখ্য মানুষ গ্রেনেডের স্প্লিন্টার শরীরে নিয়ে জীবন কাটাচ্ছে। বঙ্গবন্ধুকন্যার কান কোনো দিন ভালো হওয়ার নয়। হয়তো সঙ্গে সঙ্গে বিদেশে যেখানে উন্নত প্রযুক্তি আছে সেখানে নিতে পারলে অপেক্ষাকৃত ভালো চিকিত্সা সম্ভব ছিল। কিছুটা হলেও ভালো অবস্থায় নিয়ে যাওয়া যেত। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকন্যার জেদ ছিল, তিনি সব আহতের চিকিত্সার ব্যবস্থা না করে কিছুতেই বিদেশ যাবেন না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর শরীরে অসংখ্য স্প্লিন্টার, প্রতি মুহূর্তের যন্ত্রণা তাঁকে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। তাই পুলিশ বাহিনীর যারা এই জঘন্য হামলার সঙ্গে যুক্ত ছিল তাদের তিনি খুঁজে বের করতে পারবেন। এখনো এই ঘাতকরা শেখ হাসিনার দিকে তাক করে আছে। তাদের সমূলে উত্পাটনের এখনই সময়। শেখ হাসিনার ওপর হামলার অর্থ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনার শেষ আশ্রয়ের ওপর আক্রমণ। পক্ষ-বিপক্ষ সব মহলই স্বীকার করবে, শেখ হাসিনা বাঙালির স্বাধীনতা ও জাতীয়তাবাদের এখন শব্দব্রহ্ম। লোকায়ত বাংলার ইহজাগতিকতার বীজমন্ত্র। কেউ এটা বুঝে তাঁর পক্ষে থাকে; আবার কেউ বা এটা জেনেই বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। তাই ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলাকে গুরুত্ব দিয়ে বিশ্লেষণ করতে হবে। বলার অপেক্ষা রাখে না, ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা ১৫ আগস্টের ধারাবাহিকতা।

লেখক : সাংবাদিক

সৌজন্যেঃ কালের কণ্ঠ

প্রকাশঃ ২১ আগস্ট ২০১৬

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত