আগামী একশ বছরে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছেঃ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

6945

Published on সেপ্টেম্বর 2, 2018
  • Details Image

২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নত দেশে পরিণত করার পরিকল্পনাই শুধু নয়, আগামী একশ বছরে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, ‘উন্নয়ন কাজ চলছে, চলবে। কতদূর কাজ করলাম, কতটা করতে হবে, সেটা দেখা হবে। একশ বছর পর বাংলাদেশকে আমরা কোথায় দেখতে চাই, ডেল্টা প্ল্যান ২১০০-এর মাধ্যমে সেই পরিকল্পনাও আমরা করেছি।’

রোববার (২ সেপ্টেম্বর) বিকেলে গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে সদ্যসমাপ্ত চতুর্থ বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন তিনি।

আগামী জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ইশতেহারে কী থাকবে— এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আগামী নির্বাচন হবে জোটবদ্ধ। নির্বাচনী ইশতেহারে তাই জোটের দলগুলোর মতামত প্রাধান্য পাবে। আমরা এর আগে আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারকে বলেছিলাম দিন বদলের সনদ। সেটা শেষ হওয়ার নয়। আমাদের দিনবদলের চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘ডেল্টা প্ল্যান ২১০০-এর আওতায় একশ বছরের পরিকল্পনা আমরা করেছি। ২১০০ সালে বাংলাদেশকে কীভাবে দেখতে চাই, বদ্বীপকে বাঁচিয়ে রাখা, জলবায়ু পরিবর্তনসহ অন্যান্য অভিঘাত থেকে বাঁচানোর জন্যই এই পরিকল্পনা। আগামী মঙ্গলবার (৪ সেপ্টেম্বর) আমাদের জাতীয় নির্বাহী পরিষদের (এনইসি) বৈঠক আছে। সেখানেও এটা নিয়ে আলোচনা করা হবে।’

আওয়ামী লীগ সরকার ছাড়া অন্য কোনো সরকার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা হাতে নিতে পারে না উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘২০১০ সাল থেকে আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পনা শুরু হয়েছে। ২০২১ সাল পর্যন্ত করণীয় অনেক দূর এগিয়েছে। ২০২১ সাল থেকে ২০৪১ সাল পর্যন্ত আমাদের কী করণীয়, সেটা প্রণয়নে আমরা কাজ শুরু করে দিয়েছি। জাতির পিতা বলে গেছেন, বাঙালিকে কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না। তার স্বপ্ন বাস্তবায়নই আমাদের ইচ্ছা। আর কিছু চাওয়ার নেই।’

নির্বাচন নাও হতে পারে’ গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের এমন শঙ্কার প্রতিক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘তাদের কাছে আমার প্রশ্ন তারা আদৌও নির্বাচন চান কি না? বাংলাদেশের একটা শ্রেণি বসে থাকে অন্যরা ক্ষমতা পেলে তারা একটা পতাকা পায়, তাদের কদর বাড়ে।’

গত শনিবার (১ সেপ্টেম্বর) জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক অনুষ্ঠানে ড. কামাল বলেন, দেশের পরিস্থিতি এমন হচ্ছে যে নির্বাচন নাও হতে পারে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য নির্বাচন হওয়া প্রয়োজন। আর নির্বাচন হলে যেন ভোট চুরি না হয় সেদিকে নজর রাখতে হবে। যারা নির্বাচনকে অন্যদিকে প্রভাবিত করে সুশাসনের পরিবর্তে কুশাসন সৃষ্টি করতে চায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।’

গত নির্বাচনে অর্ধেক আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্রশ্ন থাকে এতগুলো এমপি আনকনটেস্টেড। একটা বড় দল নির্বাচনে এলো না। তাহলে তো এমন হবেই। খুলনায় সালাম মোর্শেদকে নোমিনেশন দিলাম প্রার্থী পাওয়া গেল না। সে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছে। তাকে কী বলবেন অবৈধ? বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টিও তো সংবিধানেও আছে।’

ড. কামাল হোসেনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ড. কামালও তো একইভাবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু তার সিট ছেড়ে দিয়েছিলেন বলে ক্ষমতায় আসতে পেরেছিলেন। বাংলাদেশে তো দল দুইটা। আওয়ামী লীগ এবং অ্যান্টি আওয়ামী লীগ। এটা ভালো যে তারা জোট করেছে, সেটা থাক। ড. কামালের পকেটে সবসময় টিকেট থাকে। যাতে কিছু একটা হলেই বিমানে উঠে বিদেশ পাড়ি দিতে পারে।’

নতুন রাজনৈতিক মোর্চা যুক্তফ্রন্টের অন্যতম প্রবীণ নেতা বিকল্পধারা বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘খালেদা জিয়াও তাকে সম্মান দেননি। বঙ্গভবন থেকে বের করে রেল লাইন দিয়ে দৌড় দেওয়ালেন। কাদের সিদ্দিকীও আমাদের সঙ্গে ছিলেন। কিন্তু কে যেন বুদ্ধি দিলো, রিজাইন করে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে দাঁড়ালেন। ভাবলেন ভোট পেয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী হবেন এমন স্বপ্ন দেখেছিলেন। পরে নৌকা ছেড়ে দিয়ে তিনি হেরে গেলেন।’

‘মান্না আমাদের পার্টি করতে এসেছিলেন। স্বস্তি বোধ করেননি। সারাজীবন আওয়ামী লীগের বিপক্ষে লিখেছেন। আমি বললাম এত ভালো লেখেন, আপনার লেখার হাত ভালো। এতদিন বিপক্ষে লিখেছেন এবার পক্ষে লেখেন। তিনি লিখতেই পারেন না। লিখতে বললেই মান্না জুড়ে দেন কান্না।’

‘তাদের নেতৃত্বে জোট হয়েছে থাক, অন্তত কনটেস্ট হবে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু দেশকে স্বাধীন করে দিয়ে গেলেন তাকে হত্যা করা হলো এ দেশে সব সম্ভব। দিনের আলোয় গ্রেনেড হামলা করা হয়েছে, গুলি করা হয়েছে, ৭৬ কেজি বোমা। বিমানের নাটবল্টুও খুলে গেছিল। তারপরও বেঁচে আছি।’

‘৭৫ এ আমার বাবাকে হত্যা করা হয়েছে। ১০ বছরের ছেলে রাসেলকেও হত্যা করা হয়েছে। কেন হত্যা করা হলো যাতে বঙ্গবন্ধুর বংশের রক্ত যাতে না থাকে। অনেক ষড়যন্ত্র হয়েছে, কিন্তু কোনো ষড়যন্ত্র সফল হয়নি।’

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ করা না করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘খালেদা জিয়াকে ছাড়া বিএনপি নির্বাচনে যাবে না বলে জানিয়েছে। আমরা চাই সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন হোক। কিন্তু কেউ যদি নির্বাচনে না আসে এটি তাদের দলের সিদ্ধান্ত। নির্বাচন হবে, এখন এই নির্বাচনে কে এলো কিংবা এলো না এটি দেখার বিষয় না। বিএনপিকে বাধা দেওয়ার কিছু নেই, দাওয়াত দেওয়ারও কিছু নেই।’

সাংবাদিক মামুনুর খান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে জানতে চান, ১ সেপ্টেম্বর নয়া পল্টনে সমাবেশ করেছে বিএনপি। তারা খালেদা জিয়াকে ছাড়া নির্বাচনে যাবে না ঘোষণা দিয়েছে। এছাড়া বিমসটেক সম্মেলনে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কি না?

এর উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘খালেদা জিয়াকে তো আমরা গ্রেফতার করিনি। তার পছন্দের লোক যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারে ছিল তখন তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তাকে তো রাজনৈতিকভাবে গ্রেফতার করা হয়নি। তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং সেই মামলা গত ১০ বছর ধরে চলেছে। তিনি জেলে গেছেন এতিমের টাকা চুরি করে খেয়ে। আমরা যদি হস্তক্ষেপ করতাম তাহলে তো ১০ বছর এই মামলা চলত না।’

‘এখন তাকে যদি বের হতে হয় তাহলে তো কোর্টের মাধ্যমে বের হতে হবে। কিংবা তিনি চাইলে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চাইতে পারেন। এটাই তো নিয়ম।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘গণমাধ্যমের খবরে তারাই তো অগ্রাধিকার পায়। আমি আজও কয়েকটি টেলিভিশনের খবর দেখেছি। সেখানে দেখি আমি ৩/৪ নম্বরে। তারা পার্লামেন্টে নেই, তারা বৈধ বিরোধী দলও না। তবুও আমি চার-পাঁচে এসে ঠেকি।’

‘অনেক মানুষ আছে তারা চুরি করলেও ভালো, ডাকাতি করলেও ভালো, খুন করলেও ভালো। আমাদের সমাজে এরকম মানুষের অভাব নেই। যত দোষ আমাদের। আমাদের পান থেকে চুন খসতে পারবে না। কিছু একটা হলেও খাও খাও করে ধরবে। আমাদের অপরাধ হচ্ছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ভাষা আন্দোলন থেকে যাত্রা শুরু করে দেশ স্বাধীন করে দিয়ে গেছে। মাত্র ৯ মাসের মধ্যে দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে। ভিয়েতনামের যেটা লেগেছে ৩০ বছর।’

‘বিএনপি’র এত হোমরা-চোমরা ব্যারিস্টার তারা কেন প্রমাণ করতে পারল না খালেদা নির্দোষ। খালেদা জিয়ার ছেলে মারা যাওয়ার পর আমি যখন দেখা করতে গেলাম তখন মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল তখন আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি তাদের সঙ্গে আমি আর আলোচনায় বসব না। যে যা বলুক তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা হবে না। আমারও আত্মসম্মান বোধ আছে। সে আমি ক্ষমতায় থাকি বা না থাকি। তারা নির্বাচনে এলে আসবে, জোর করার কিছু নেই।’

রোহিঙ্গা সংকটের ‘আসল সত্য’ প্রকাশের ঘোষণা দিয়ে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর গত জুলাই মাসে একটি বই প্রকাশ করে, যেখানে তিনটি ভুয়া ছবি ব্যবহার করে রোহিঙ্গাদের নিয়ে মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে।

এর মধ্যে ১৯৭১ সালে ঢাকায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হত্যাযজ্ঞের পর দুই বাংলাদেশির লাশ উদ্ধারের একটি ছবি ব্যবহার করে সেনাবাহিনীর বইয়ে ক্যাপশনে বলা হয়েছে- সেটা রাখাইনে রোহিঙ্গাদের হাতে নিহত স্থানীয় বৌদ্ধদের ছবি।

আন্তর্জাতিক চাপের মুখে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে গত ডিসেম্বরে বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি করলেও গত দশ মাসে প্রত্যাবাসন শুরু করা যায়নি। এর দায়ও বাংলাদেশের ওপর চাপানোর চেষ্টা করেছেন মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি।

মিয়ানমার বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী সাত দেশের জোট বিমসটেকের সদস্য হলেও দেশটির নেত্রী সু চি এবার বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনে যাননি। তার বদলে মিয়ানমারের প্রতিনিধিত্ব করেন দেশটির প্রেসিডেন্ট উইন মিন্ট।

ছবিতে মিয়ানমারের অপপ্রচার সম্পর্কে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের দেশেও এই ঘটনা ঘটেছে। বিএনপি জামায়াতের কাছে শিখল কি না সেটাই প্রশ্ন। ২০১৩-১৫ বিএনপি অপপ্রচার চালিয়েছিল। মিয়ানমার জঘন্য কাজ করেছে। নিজেরা নিজেদের সম্মান নষ্ট করেছে।’

তিনি বলেন, ‘নির্বাচন প্রসঙ্গে ভারতের সঙ্গে কথা বলেছি। বিএনপি সংসদ ভেঙে দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। আমরা অনুশীলন করে দেখেছি কোনোটা কাজে লাগে না। যারা ক্ষমতায় বসে তারা আর সরতে চায় না। কেয়ারটেকার তাদের রূপ আমরা দেখলাম। অনির্বাচিত সরকার এ দেশে থাকতে পারবে না।’

এর আগে, সংবাদ সম্মেলনে বিমসটেক চতুর্থ শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আঞ্চলিক জোট বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টিসেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশনের (বিমসটেক) চতুর্থ এই শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে ৩০ আগস্ট নেপাল যান তিনি। শীর্ষ সম্মেলনের উদ্বোধনী সেশন ও শুক্রবার (৩১ আগস্ট) সকালে সমাপনী অধিবেশনসহ সম্মেলনের বিভিন্ন ইভেন্টে অংশ নেন। সম্মেলনে তিনি উদ্বোধনী বক্তব্যও রাখেন।

বিমসটেকের চতুর্থ এই শীর্ষ সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, ভুটানের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা দাসো শেরিং ওয়াংচুক, শ্রীলংকান প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনা, থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী প্রিয়ুথ চ্যান-ও-চার ও মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট উইন মিন্ট বিমসটেক সম্মেলনে যোগ দেন। সম্মেলনের বিভিন্ন অধিবেশনে যোগ দেওয়া ছাড়াও সাইডলাইনে অন্যান্য দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে সাইডলাইনে বৈঠক করেন শেখ হাসিনা।

শুক্রবার একটি যৌথ ঘোষণার মধ্য দিয়ে এবারের বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলন শেষ হয়। ১৯৯৭ সালের ৬ জুন ব্যাংকক ঘোষণার মধ্য দিয়ে এই উপআঞ্চলিক সংস্থাটি গঠিত হয়। এর সদস্য দেশগুলোর মধ্যে পাঁচটি দক্ষিণ এশিয়ার— বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, নেপাল ও শ্রীলংকা। অন্য দু’টি দেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড।

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত