আমার স্বপ্নের বাংলাদেশ স্বাধীন হবেই

669

Published on মার্চ 27, 2019
  • Details Image

তোফায়েল আহমেদঃ

একাত্তরের ২৬ মার্চ ছিল শুক্রবার। ২৫ মার্চ রাত ১১টায় আমি আর মণি ভাই বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে বিদায় নেই। রাত ১২টায় মুহুর্মুহু গোলাবর্ষণের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী পূর্বপরিকল্পিত ‘অপারেশন সার্চলাইট’ অনুযায়ী জিরো আওয়ারে শুরু করে বাঙালি নিধনে গণহত্যা, যা অখণ্ড পাকিস্তানের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয়। চারদিকে প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ ছাপিয়ে আমার কানে তখন বাজছে বিদায় বেলায় বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ, ‘তোমাদের যে দায়িত্ব আমি দিয়েছি, সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করো। আমার জন্য ভেবো না।’

মার্চের ২৬ তারিখ প্রথম প্রহরেই সারাদেশসহ ঢাকায় অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারি করা হয়। এ অবস্থায় রাতে খবর পেলাম বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সকালে ইয়াহিয়া খান তার ভাষণে সারা দেশে রাজনৈতিক তত্পরতা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে বঙ্গবন্ধুকে উদ্দেশ করে বলেছেন, ‘সপ্তাহ খানেক আগেই আমার উচিত ছিল শেখ মুজিবুর রহমান ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা...। ...দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে সে আক্রমণ করেছে, এই অপরাধ বিনা শাস্তিতে যেতে দেওয়া হবে না।’ ২৭ মার্চ যখন ২ ঘণ্টার জন্য কারফিউ প্রত্যাহার করা হয়, তখন আমি আর মণি ভাই গুলিস্তান দিয়ে নবাবপুর রোড ধরে সদরঘাট গিয়ে কেরানিগঞ্জের উদ্দেশে যাত্রা করি। যাওয়ার সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে দফায় দফায় প্রচারিত এম এ হান্নান সাহেবের ভাষণ শুনি, ‘কে বলে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয়েছে? তিনি আমাদের মধ্যেই আছেন।’ সকালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে হান্নান সাহেব এবং অন্য নেতারা বিরামহীনভাবে ঘোষণা দিতে থাকেন, ‘বাংলাদেশ আজ স্বাধীন। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে প্রিয় মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করতে আমাদের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন।’ এরপর সন্ধ্যায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমানের কণ্ঠে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচারিত হয়।

টানা ২৪ দিন চলা সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন আর বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক কৌশলের কাছে পরাস্ত হয়ে অবশেষে গণহত্যার দিকে এগিয়ে যায় পাকিস্তানি সামরিক জান্তা। স্বাধীনতা ঘোষণা সম্পর্কে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক বাহিনীর প্রধান লে. জেনারেল নিয়াজীর জনসংযোগ কর্মকর্তা মেজর সিদ্দিক সালিক তার ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ গ্রন্থে লিখেছেন, “যখন প্রথম গুলিটি বর্ষিত হলো, ঠিক সেই মুহূর্তে পাকিস্তান রেডিওর সরকারি তরঙ্গের কাছাকাছি একটি তরঙ্গ থেকে ক্ষীণস্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। ওই কণ্ঠের বাণী মনে হলো পূর্বেই রেকর্ড করে রাখা হয়েছিল। তাতে শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানকে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন।” স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কে তিনি আরো লিখেছেন, “ঘোষণায় বলা হয়, ‘এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা। আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। বাংলাদেশের মানুষ যে যেখানে আছেন, আপনাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে দখলদার সেনাবাহিনীর মোকাবিলা করার জন্য আমি আহ্বান জানাচ্ছি। পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংলাদেশের মাটি থেকে উত্খাত করা এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আপনাদের সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে’।”

স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার পরিস্থিতির শুরুটা হয়েছিল মূলত ৬ দফা দেওয়ার মধ্য দিয়েই। বঙ্গবন্ধু নিজেই বলতেন, ‘সাঁকো দিলাম, স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতায় উন্নীত হওয়ার জন্য।’ ৬ দফাকে প্রতিহত করার জন্য পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বহু ষড়যন্ত্র করেছে; কিন্তু ৬ দফার প্রতি বঙ্গবন্ধুর দৃঢ় স্থির-প্রতিজ্ঞাবোধ তাঁকে জনমনে জনগণমন অধিনায়কের আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। আর আমরা যারা ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম তারা উনসত্তরের জানুয়ারির ৪ তারিখে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে ৬ দফাকে দাঁড়ি, কমা, সেমিকোলনসমেত ১১ দফায় অন্তর্ভুক্ত করে সারা বাংলার গ্রামে-গঞ্জে-শহরে-বন্দরে-কলে-কারখানায় ছড়িয়ে দিয়েছিলাম।

সত্তরের নির্বাচন ছিল বঙ্গবন্ধুর সমগ্র জীবনের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। নির্বাচনী ম্যান্ডেট নিতে, গণরায় নিতে প্রতিটি সভায় তিনি বলতেন, ‘এ নির্বাচন বাঙালির মুক্তি সনদ ৬ দফা ও ১১ দফার পক্ষে গণভোট। আপনাদের অধিকার আদায়ের জন্য আমি যদি আমার জীবনের যৌবন পাকিস্তানের কারাগারে কাটাতে পারি, ফাঁসির মঞ্চে যেতে পারি, তবে কি আমি আপনাদের কাছে আমার ৬ দফার পক্ষে একটি ভোট চাইতে পারি না।’ এরপর যথাসময়ে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলার মানুষ তাদের রায় জানিয়ে দিল। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করল।

একাত্তরের ৩ জানুয়ারি, ঐতিহাসিক রেসকোর্সে অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে নব-নির্বাচিত সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠান। শপথ গ্রহণ করাবেন স্বয়ং বঙ্গবন্ধু। সেদিন বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, ‘৬ দফা ও ১১ দফা আজ আমার নয়, আমার দলেরও নয়। এ আজ বাংলার জনগণের সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে। কেউ যদি এর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে তবে বাংলার মানুষ তাঁকে জ্যান্ত সমাধিস্থ করবে। এমনকি আমি যদি করি আমাকেও।’ জেনারেল ইয়াহিয়া একাত্তরের ১১ জানুয়ারি ঢাকা এসে ১২ ও ১৩ জানুয়ারি দুই দিন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দুইদফা আলোচনায় মিলিত হন। ঢাকা ত্যাগের প্রাক্কালে তেজগাঁ বিমানবন্দরে জেনারেল ইয়াহিয়া খান সাংবাদিকদের বলেন, ‘দেশের ভাবী প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিব তাঁর সঙ্গে আলোচনা সম্পর্কে যেসব কথা বলেছেন তা পুরোপুরি সঠিক।’ ঢাকা থেকে ফিরে ইয়াহিয়া খান লারকানায় ভুট্টোর বাসভবনে যান এবং সেখানে জেনারেলদের সঙ্গে এক গোপন বৈঠকে মিলিত হন। মূলত লারকানা বৈঠকেই নির্বাচনী ফলাফল বানচালের নীলনকশা প্রণীত হয়।

এরপর ১৩ ফেব্রুয়ারি এক সরকারি ঘোষণায় জানানো হয়, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঢাকায় প্রাদেশিক পরিষদ ভবনে পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র রচনার জন্য ৩ মার্চ বুধবার ৯টায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করেছেন। এদিকে ১৪ ও ১৫ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সভায় বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন। ওয়ার্কিং কমিটি আলোচনা অনুমোদন করে এবং বঙ্গবন্ধুকে ‘জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও অধিকার আদায়ের জন্য যেকোনো পন্থা গ্রহণের পূর্ণ অধিকার প্রদান করে।’ ১৭ ফেব্রুয়ারি ভুট্টো তার পার্টি অফিসে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের যে অধিবেশন শুরু হচ্ছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে পিপল্স পার্টির জন্য তাতে যোগদান করা একেবারেই অর্থহীন।’ জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগদান করতে অস্বীকার জ্ঞাপন করলে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বিষয়াদি নিয়ে আলোচনার জন্য ভুট্টোকে আমন্ত্রণ জানান। ১৯ ফেব্রুয়ারি ভুট্টো ও ইয়াহিয়া খানের মধ্যে ৫ ঘণ্টাব্যাপী আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। ১৭ জানুয়ারির লারকানা বৈঠক এবং ১৯ ফেব্রুয়ারির রাওয়ালপিন্ডি বৈঠকেই গণহত্যার নীলনকশা ‘অপারেশন সার্চলাইট’ চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। পিন্ডি থেকে করাচি ফিরে ভুট্টো স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ‘জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগদান না করার সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কোনো ইচ্ছা তার নেই।’ ক্রমেই এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, সামরিক চক্র সত্তরের নির্বাচনে বাঙালির গণরায় বানচাল করার জন্য ভুট্টোর সঙ্গে একত্রে খলনায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছে।

২২ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান মন্ত্রিসভা বাতিল করেন এবং পিন্ডিতে গভর্নর ও সামরিক প্রশাসকদের নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন। উক্ত বৈঠকে লারকানা ও রাওয়ালপিন্ডি বৈঠকের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ব্যবস্থাদি চূড়ান্ত করা হয়। ২৬ ফেব্রুয়ারি করাচি প্রেসিডেন্ট হাউসে পুনরায় ভুট্টো-ইয়াহিয়া শলা-পরামর্শ শুরু হয়। ২৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকা শিল্প ও বণিক সমিতির সংবর্ধনা সভায় প্রদত্ত ভাষণে বঙ্গবন্ধু জাতীয় পরিষদের পশ্চিম পাকিস্তানি সদস্যদের শাসনতন্ত্র প্রণয়নের জন্য পরিষদ অধিবেশনে যোগদানের আহ্বান জানান। একইদিন লাহোরে এক জনসভায় ভুট্টো হুমকি দেন, ‘তার দলের কোনো সদস্য যদি পরিষদ অধিবেশনে যোগদান করে তাহলে দলের সদস্যরা তাকে নিশ্চিহ্ন করে দেবে।’ ১ মার্চ জেনারেল ইয়াহিয়া খান এক বেতার ভাষণে ৩ মার্চ তারিখে ঢাকায় আহূত জাতীয় পরিষদের অধিবেশন একতরফাভাবে স্থগিত করেন।

জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণায় বিক্ষুব্ধ মানুষ হোটেল পূর্বাণীর সামনে এসে সমবেত হয়ে স্লোগানে স্লোগানে চারদিক প্রকম্পিত করে তোলে। বঙ্গবন্ধু হোটেলের সামনে এসে সবাইকে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাবার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘অধিবেশন বন্ধ করার ঘোষণায় সারা দেশের জনগণ ক্ষুব্ধ। আমি মর্মাহত। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া তার ওয়াদা ভঙ্গ করেছেন। আমি সংগ্রাম করে এ পর্যন্ত এসেছি। সংগ্রাম করেই মুক্তি আনব। আপনারা ঐক্যবদ্ধ থাকুন।’

সমগ্র জাতিসহ গোটা বিশ্ব তাকিয়ে ছিল বঙ্গবন্ধুর দিকে। বঙ্গবন্ধু ৬ দফা না দিলে, ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব ও অন্যান্য’ মামলা হতো না; এই মামলা না হলে ১১ দফার ভিত্তিতে ঊনসত্তরের গণআন্দোলন-গণঅভ্যুত্থান হতো না; ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান না হলে ‘এক মাথা এক ভোট’-এর ভিত্তিতে সত্তরের নির্বাচন হতো না; আর সত্তরের নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে কিছুই হতো না, কিছুই সম্ভব ছিল না।

বাংলার মানুষের অধিকার বিসর্জন দিয়ে বঙ্গবন্ধু কখনোই ভাবেননি তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হবেন। ৭ মার্চের ঐতিহাসিক বক্তৃতায় সেকথা তিনি স্পষ্ট করেই বলেছিলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না; আমরা এদেশের মানুষের অধিকার চাই।’ একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর, মাত্র ৯ মাসে ৩০ লক্ষাধিক প্রাণ আর ৪ লক্ষাধিক মা-বোনের সুমহান আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা অর্জন করি প্রিয় মাতৃভূমির স্বাধীনতা। দেশ স্বাধীনের পর দেশবাসীসহ সমগ্র বিশ্ববাসীর দোয়া ও আশীর্বাদে পাকিস্তানের জিন্দানখানা থেকে মুক্ত হয়ে বাহাত্তরের ১০ জানুয়ারি স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশে বীরের বেশে প্রত্যাবর্তন করেন এবং আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম সেদিন পরিপূর্ণতা লাভ করে।

মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসীদের নিয়ে, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রেখে বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে সম্মুখপানে, অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে, সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে।

লেখক : আওয়ামী লীগ নেতা, সংসদ সদস্য, সভাপতি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি

প্রকাশঃ দৈনিক ইত্তেফাক

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত