শেখ হাসিনাকে হত্যার আরেকটি ব্যর্থ চেষ্টা ২১ আগস্ট

656

Published on আগস্ট 22, 2019
  • Details Image

আবদুল মান্নানঃ

১৫ই আগস্ট জাতীয় শোক দিবস পালন করল জাতি। ৪৪ বছর আগে এই দিনে সেনাবাহিনীর একদল ঘাতক এবং আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে ঘাপটি মেরে থাকা কিছু বিশ্বাসঘাতক এক গভীর ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তাঁর ধানমণ্ডির নিজ বাসভবনে সপরিবারে হত্যা করে। এই নির্মম হত্যাকাণ্ডে বঙ্গবন্ধুসহ পরিবারের ১৭ জন সদস্য নিহত হন, যা সমসাময়িক রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা।

এই হত্যাকাণ্ডের মূল উদ্দেশ্য ছিল শুধু একজন ব্যক্তি বা একটি পরিবারকে হত্যা করা নয়, এই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলা নামের দেশটা যাঁর নেতৃত্বে স্বাধীন হয়েছে, সেই দেশ ও তার জন্মদাতাকে হত্যা করা। ধারণা করা হয়েছিল, যদি রাষ্ট্রের স্রষ্টাকে হত্যা করা যায় তাহলে তাঁর সৃষ্টিকেও হত্যা করা সহজ হবে। যাঁরা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তাঁদের কেউই পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ হোক তা চাননি। তাঁদের প্রায় সবাই পাকিস্তানি ভাবধারায় বিশ্বাসী ছিলেন। যাঁরাই এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তাঁরা প্রায় সবাই মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে এসে প্রবাসী সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং এঁদের কেউই যুদ্ধে অংশ নেননি। ধারণা করা হয়, পাকিস্তান সেনাবাহিনী এই যুদ্ধে তাদের পরাজয় অবধারিত জেনে এই ঘাতকবাহিনীকে পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের মাধ্যমে মুক্তিবাহিনীতে অনুপ্রবেশ ঘটায়। এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও বাংলাদেশের প্রথম সামরিক শাসক জেনারেল জিয়া গোড়া থেকেই জড়িত ছিলেন, যা ঘাতক কর্নেল আবদুর রশিদ ও ঘাতক ফারুক রহমান লন্ডনে সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের কাছে এক টিভি সাক্ষাৎকারে অকপটে স্বীকার করেছেন। অনেকে বলবেন, জিয়া তো একজন খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। খেতাবপ্রাপ্ত তা ঠিক, তবে তিনি অন্য মুক্তিযোদ্ধাদের চেয়ে নানা কারণে ব্যতিক্রম। তিনি ১৯৭১ সালের ২৫-২৬ মার্চের মধ্যরাত পর্যন্ত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন অনুগত সেনা অফিসার ছিলেন। যখন দেশের বিভিন্ন স্থানে ক্যাপ্টেন আবু ওসমান চৌধুরী, মেজর শফিউল্লাহ, মেজর খালেদ মোশাররফ বা ক্যাপ্টেন রফিক পাকিস্তানি সেনা কমান্ডের বিরুদ্ধে তাঁদের ইউনিট নিয়ে বিদ্রোহ করে সেনানিবাসের বাইরে চলে এসেছেন, তখন, ঠিক তেমন একটা সময়ে জিয়া তাঁর পাকিস্তানি ঊর্ধ্বতন অফিসারদের হুকুমে চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করা পাকিস্তানি সমরাস্ত্রবাহী জাহাজ ‘সোয়াত’ থেকে বাঙালি নিধনের জন্য আনা অস্ত্র খালাস করতে তৎপর ছিলেন। একটা কথা মনে রাখতে হবে, সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৬৯টির মধ্যে ১৬৭টি আসনে জয়ী হয়েছিল। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ইশতেহার ছিল মূলত বাঙালির মুক্তির সনদ ছয় দফা। ছয় দফা ছিল বস্তুত একটি স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সুস্পষ্ট নকশা। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় ছিল নিরঙ্কুশ সত্য, কিন্তু পূর্ব বাংলায় প্রাপ্ত ভোটের মোট ৭৩ শতাংশ পড়েছিল নৌকা তথা আওয়ামী লীগের পক্ষে। যদি ধরে নিই এই ৭৩ শতাংশই বাংলার স্বাধীনতা চেয়েছে, তাহলে ধরে নিতে হবে বাকি ২৭ শতাংশ স্বাধীনতার পক্ষে ছিল না।

সত্তরের ২৭ শতাংশকেই পরবর্তীকালে বাংলাদেশে আটকে পড়া পাকিস্তানি বলা যেতে পারে (কিছু ব্যতিক্রম নিশ্চয়ই আছে)। সমীকরণটা খুব সহজ মনে হতে পারে, কিন্তু তা মোটেও সহজ নয়। সে সময় অন্য যে কয়েকটি বড় রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল তার মধ্যে মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম আর পিডিএম অন্যতম। এদের পক্ষে স্বাধীন বাংলাদেশ সমর্থন করা সম্ভব ছিল না। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি, আর যখন ২১ আগস্টের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা ঘটে, তখন জনসংখ্যা প্রায় ১৫ কোটি। আনুপাতিক হারে এই বাংলাদেশে অবস্থানরত পাকিস্তানি জনসংখ্যাও ১৯৭০ সালের তুলনায় অনেক বেড়েছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর নানাভাবে তারা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পায় এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়িত হয় এবং যে কারণে ১৫ই আগস্ট হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল, সেই কারণটা বাস্তবায়ন করতে তারা অনেক দূর এগিয়ে যায়। বাংলাদেশ হয়ে ওঠে একটি মিনি পাকিস্তান। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর পাকিস্তানের শীর্ষ দালাল, যিনি একাত্তর সালে জাতিসংঘে বাংলাদেশের বিপক্ষে কথা বলতে গিয়েছিলেন, সেই শাহ আজিজকে ৩০ লাখ শহীদের রক্তবিধৌত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বানান জিয়া। একাত্তরের ঘাতক আবদুল আলিম ও মাওলানা মান্নানকে মন্ত্রিসভার সদস্য করা হয়। ঘাতকদের প্রধান পাকিস্তানি নাগরিক গোলাম আযমকে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়। পরবর্তীকালে জিয়ার স্ত্রী খালেদা তাঁকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দিয়ে পুরস্কৃত করেন। কর্নেল মুস্তাফিজুর রহমান আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসাবাদের দায়িত্বে ছিলেন। তাঁর জিজ্ঞাসাবাদের একটি নমুনা ছিল অভিযুক্তকে পা ওপরের দিকে আর মাথা নিচের দিকে দিয়ে সিলিংয়ের সঙ্গে ১০-১২ ঘণ্টা ঝুলিয়ে রাখা। একাত্তরে তিনি পশ্চিম সীমান্তে পাকিস্তানিদের পক্ষে যুদ্ধ করেন। সেই মুস্তাফিজুর রহমানকে জিয়া প্রথমে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বানান। জিয়া এখানেই থেমে থাকেননি, তিনি একাত্তরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্য হিসেবে যুদ্ধ করেছেন এবং পরবর্তীকালে যুদ্ধবন্দি হিসেবে ভারত হয়ে পাকিস্তানে ফেরত গেছেন এমন ১৭ জন সেনা কর্মকর্তাকে পুলিশ বাহিনীতে আত্তীকরণ করেন, যাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজন বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শকের পদ অলংকৃত করেন। ২১ আগস্ট যখন শেখ হাসিনাকে হত্যা করার জন্য গ্রেনেড হামলা করা হয় তখন পুলিশের মহাপরিদর্শক ছিলেন মো. শহুদুল হক, যিনি একাত্তরের পুরো ৯ মাস পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ২৯ ট্যাংক রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন হিসেবে মুক্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি শেখ হাসিনাকে হত্যা করার জন্য চট্টগ্রামে স্বয়ং পুলিশ তাঁকে বহনকারী ট্রাকে গুলি করে। এতে আওয়ামী লীগের ২৪ জন নেতাকর্মী নিহত হন। অল্পের জন্য রক্ষা পান শেখ হাসিনা। সে সময় চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার ছিলেন মির্জা রকিবুল হুদা, যিনি একাত্তরে আর্টিলারি রেজিমেন্টের একজন মেজর হিসেবে যশোর সেক্টরে পাকিস্তানের পক্ষে যুদ্ধ করেন। যুদ্ধ শেষে তিনিও একজন যুদ্ধবন্দি হিসেবে পাকিস্তানে ফেরত যান। পরে বঙ্গবন্ধুর বদান্যতায় বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। মোদাব্বের চৌধুরী একাত্তরে ঢাকা সেনানিবাসে সিওডিতে লেফটেন্যান্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরে তিনিও পুলিশের মহাপরিদর্শক হন। সেই মোদাব্বের চৌধুরীকে ২০০৬ সালে সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে বেগম জিয়ার নির্দেশে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ নির্বাচন কমিশনের সদস্য করেন।

বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে ২১ আগস্টে আওয়ামী লীগের জনসভা ছিল একটি সন্ত্রাসবিরোধী জনসভা। এই জনসভার জন্য মুক্তাঙ্গন ব্যবহারের অনুমতি চাওয়া হয়েছিল, যা পুলিশ কর্তৃপক্ষ থেকে পাওয়া যায়নি। পরে সভাস্থল বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে স্থানান্তর করা হয়। সাধারণত এই ধরনের সভার সময় দলের কিছু কর্মী পুলিশের সঙ্গে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেন। যেহেতু এই সভাস্থল কিছু উঁচু দালানের মাঝখানে অবস্থিত, উচিত ছিল দালানের ওপর পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা রাখা, যা সেদিন ছিল না। আসলে আওয়ামী লীগ যখন তাদের সভার প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত ছিল, তখন পর্দার অন্তরালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাঙালির শেষ আশ্রয়স্থল শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় সব নেতাকে চিরতরে শেষ করে দিতে এক সূক্ষ্ম পরিকল্পনা নির্মাণের প্রস্তুতি চলছিল, যার প্রধান কারিগরদের মধ্যে ছিল সেনা গোয়েন্দা সংস্থা, জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা (এনএসআই), পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। এই ভয়াবহ কর্মযজ্ঞ সম্পর্কে খালেদা জিয়া সম্পূর্ণ ওয়াকিফহাল ছিলেন। ষড়যন্ত্রকারীদের মধ্যে তারেক রহমান ছাড়াও ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত লুত্ফুজ্জামান বাবর, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হারিছ চৌধুরী, জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য আবদুস সালাম পিন্টু, মাওলানা তাজউদ্দিন প্রমুখ। কুখ্যাত হাওয়া ভবনে তাঁরা একাধিক বৈঠক করে চূড়ান্ত পরিকল্পনা তৈরি করেন। উদ্দেশ্য, যেকোনোভাবে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের খতম করতে পারলে বাংলাদেশকে বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বে মিনি পাকিস্তান বানানোর সামনে আর কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকবে না। এই স্বাধীন বাংলাদেশে পাকিস্তানি ভাবধারার শাসন চিরদিনের জন্য পাকাপোক্ত হয়ে যাবে। খালেদা জিয়ার পর তাঁর ছেলে তারেক রহমান, তারপর বংশপরম্পরায় চলতে থাকবে জিয়া পরিবারের শাসন। স্থাপিত হবে একবিংশ শতাব্দীর এক নয়া রাজতন্ত্র।

বঙ্গবন্ধুকন্যাকে হত্যা করার জন্য সেদিন ১৪টি গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়েছিল। সেদিন শেখ হাসিনার বেঁচে যাওয়াটা ছিল এক অলৌকিক ঘটনা, যা একমাত্র সৃষ্টিকর্তার রহমতের কারণে সম্ভব হয়েছিল। তাঁকে রক্ষা করতে মানববর্ম তৈরি করেছিলেন তাঁর দলীয় নেতাকর্মীরা, যা দেখা গিয়েছিল ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি চট্টগ্রামে। বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে সেদিন নিহত হয়েছিলেন ২৪ জন দলীয় নেতাকর্মী। আহত হয়েছিলেন প্রায় ৫০০। গুরুতর আহত অবস্থায় কয়েক দিন পর মৃত্যুবরণ করেন মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী আইভি রহমান। বঙ্গবন্ধুর ঘাতকরা ১৫ই আগস্ট একজন ব্যক্তিকে শুধু হত্যা করতে চায়নি, তারা বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রটিকে হত্যা করতে চেয়েছে। বাস্তবে তারা কিছুটা সফলও হয়েছিল; কারণ পরের ২১ বছর জিয়া-এরশাদ-খালেদা বাংলাদেশকে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের পূর্ববর্তী অবস্থায় নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন। একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল। জিয়া থেকে খালেদা জিয়া সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতাকে বিতাড়ন করেছিলেন। বাহাত্তরের সংবিধানে যে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, সেই রাজনীতিকে আবার ফিরে আসার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছিল। এই কাজটি অত্যন্ত সুচতুরভাবে করেছিলেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়া। তিনিই সেই ব্যক্তি, যিনি পঁচাত্তরের ঘাতকদের সাংবিধানিকভাবে হত্যার দায়মুক্তি দিয়ে বিদেশে বাংলাদেশের বিভিন্ন দূতাবাসে পদায়ন করেছিলেন। এরশাদ রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম সংবিধানে সংযোজন করে তা আরো এক ধাপ ওপরে নিয়ে গিয়েছিলেন। খুনি কর্নেল ফারুককে দেশে ফিরিয়ে এনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নিতে সুযোগ করে দিয়েছিলেন। খালেদা জিয়া একাত্তরের ঘাতকদের মন্ত্রিসভায় ঠাঁই দিয়ে বাংলাদেশকে পাকিস্তানীকরণের ষোলোকলা পূর্ণ করেছিলেন। তাঁর ছত্রচ্ছায়ায় পঁচাত্তরের ঘাতক কর্নেল রশিদ ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনী তামাশার বদৌলতে সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা হয়েছিলেন।

বাংলাদেশকে জিয়া-এরশাদ-খালেদার পাকিস্তানীকরণ কর্মসূচিতে ছন্দঃপতন ঘটে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের পর বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সরকার গঠনের মাধ্যমে। প্রথমে তিনি শুরু করেন বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচারপ্রক্রিয়া। সেই বিচারপ্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই ২০০১ সালের নির্বাচনে আবার খালেদা জিয়া ক্ষমতায় আসেন এবং বিচারকার্য বন্ধ করে দেন। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে পরাজিত করার জন্য একটি অশুভ আঁতাত কাজ করেছিল, যার মধ্যমণি ছিলেন শেখ হাসিনা কর্তৃক মনোনীত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি লতিফুর রহমান আর প্রধান নির্বাচন কমিশনার আবু সাঈদ। সংসদে আসনসংখ্যা কম পেলেও বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে ভোটের শতকরা হিসাবের ব্যবধান ছিল খুবই কম। এই মেয়াদে খালেদা জিয়া ও তাঁর ছেলে তারেক রহমান ছিলেন বেপরোয়া। তবে তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন, ২০০৭ সালের নির্বাচনে তাঁদের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাওয়ার আশঙ্কা বেশি। তাঁদের পরিকল্পিত জিয়া বংশের ক্ষমতা চিরস্থায়ী করতে হলে শেখ হাসিনা আর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের সরাতে হবে। পরিকল্পনা হলো ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার। তবে সেই যাত্রায়ও ভাগ্যক্রমে বঙ্গবন্ধুকন্যা বেঁচে যান এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনে এক ধস নামানো বিজয় অর্জন করে সরকার গঠন করেন। এই দফায় তিনি ১৫ই আগস্ট হত্যাকাণ্ডের বিচার সমাপ্ত করেন। একাত্তরের ঘাতকদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করান এবং বিচার শেষে রায় বাস্তবায়ন করেন।

বর্তমানে শেখ হাসিনা টানা তৃতীয়বারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। তিনি বাংলাদেশকে বিশ্বদরবারে এক ভিন্ন পরিচয়ে পরিচিত করেছেন। নিজে পরিচিত হয়েছেন একজন বিশ্বসেরা রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে। কিন্তু তাঁর সামনে শুধু একটা মসৃণ পথ, তা ভাবলে ভুল হবে। একজন তারেক রহমান পলাতক, আর কয়জন কারাগারে, মোশতাকের মৃত্যু হয়েছে অনেক আগে, তা ভেবে সব কিছু নিরাপদ ভাবলে মারাত্মক ভুল হবে। বঙ্গবন্ধু হত্যার সময় সব শত্রু ঘরেই ছিল। বঙ্গবন্ধু তা বুঝতে পারেননি বা বুঝতে চাননি। বঙ্গবন্ধুকন্যা একই ভুল করলে জাতিকে দিতে হবে এক দীর্ঘমেয়াদি খেসারত। যাঁরা বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসতেন তাঁরা বঙ্গবন্ধুকন্যাকেও ভালোবাসেন। তাঁরা আর কোনো ট্র্যাজেডি দেখতে চান না। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গত শনিবার এক সভায় বলেছিলেন, ষড়যন্ত্র এখনো চলমান। রবিবার দেশের একটি দৈনিক তাদের প্রধান সংবাদে লিখেছে, যাঁরা একসময় ফারুক-রশিদের ফ্রিডম পার্টির নেতা ছিলেন, এই দলের পক্ষে নির্বাচন করেছেন, তাঁদের অনেকেই এখন শুধু আওয়ামী লীগের নেতাই নন, কেউ কেউ সংসদ সদস্যও বটে। আলামত ভালো নয়।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে পাওয়া একটি গল্প দিয়ে লেখাটি শেষ করি। এক মহিলা একটি অজগর সাপ পুষতেন। রাতে তাকে নিয়ে এক বিছানায় ঘুমাতেও যেতেন। কিছুদিন ধরে সাপটি খাওয়াদাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। শখের সাপটি নিয়ে গেলেন এক ডাক্তারের কাছে। ডাক্তারের প্রশ্ন, সাপটি নিয়ে আপনি কি এক বিছানায় ঘুমান? উত্তর—হ্যাঁ। কিছুদিন ধরে ও আমার গায়ের সঙ্গে লেপ্টে থাকে। ডাক্তারের মন্তব্য, আপনার সাপটি অসুস্থ নয়। সে আন্দাজ করছে আপনাকে হজম করতে তার পেটে কতটুকু জায়গা লাগবে।

বঙ্গবন্ধুকন্যার দীর্ঘায়ু কামনা করি।

লেখক : বিশ্লেষক ও গবেষক

সৌজন্যেঃ কালের কণ্ঠ

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত