আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল বাংলাদেশের বিজয়

721

Published on জানুয়ারি 11, 2020
  • Details Image

- প্রফেসর ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে আমরা প্রায় ২০০ বছর পর মুক্তি লাভ করি ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে। এর সুদীর্ঘ ২৩ বছর পর বাংলার মানুষ মুক্তির চেতনায় জাগ্রত হয়ে, জীবন বাজি রেখে পাকিস্তানিদের অত্যাচার-নিপীড়ন আর সীমাহীন বঞ্চনার শৃঙ্খল ভেঙে হানাদার বাহিনীর হাত থেকে ছিনিয়ে এনেছিল আজকের এই স্বাধীন বাংলাদেশ। বাংলাদেশ একটা স্বপ্নের নাম যা বাস্তবে পরিণত করতে পথ দেখিয়েছিলেন আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আজ আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু আমাদের সঙ্গে নেই; কিন্তু তার কন্যা তারই আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে বাংলাদেশকে উন্নয়নের চরম শিখরে পৌঁছাতে যেন বদ্ধ পরিকর। তার এই ভিশনকে বাস্তবে রূপ দেবার লক্ষ্যে এগিয়ে এসেছেন তারই পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়। তিনি বাংলাদেশকে গড়ে তুলেছেন ডিজিটাল বাংলাদেশ হিসেবে। আজ যে ডিজিটাল বাংলাদেশকে আমরা দেখছি তা বিনির্মাণের কারিগর বঙ্গবন্ধুর এই দৌহিত্র।

আজ আমরা একটি স্বাধীন সার্বভৌম জাতি, যা হয়তো কখনই সম্ভব হতো না যদি না আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে ১৭ মিনিটের সেই অমোঘ বাণী বজ্রনির্ঘোষ কণ্ঠে ঘোষণা না দিতেন। আর সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করার দায়িত্ব নিয়েছেন তারই সুযোগ্য কন্যা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন অনেক উন্নতি সাধন করেছে। এমন সব সাফল্যের সম্মুখীন হচ্ছে যা হয়তো আর কয়েক বছর আগেও সম্ভব ছিল না।

সর্বপ্রথম বলতে হয় মোবাইল ফোনের বিষয়ে। এখন নিত্য নতুন মডেলের মোবাইল ফোন সহজলভ্য হয়ে গিয়েছে পূর্বের তুলনায়। তেমনি প্রতি মিনিটের ফোন বিলও অস্বাভাবিক মাত্রায় কমে গিয়েছে। যার ফলে সব শ্রেণির মানুষের জন্য মোবাইল ফোন ব্যবহার করা অনেক সহজ হয়েছে। এখন খুব সহজেই যোগাযোগ করা যায়। এরপর এলো ইন্টারনেট। ইন্টারনেট এখন এতটাই সহজলভ্য হয়ে গেছে, যে কেউ মোবাইল থেকেও ইন্টারনেটে কাজ করতে পারে অনেক কম খরচে। বিটিআরসির তথ্যমতে বর্তমানে বাংলাদেশে জুন, ২০১৯ পর্যন্ত ইন্টারনেট গ্রাহকের সংখ্যা ৮ কোটি ২০ লাখ ২৪ হাজার। এর বেশির ভাগ গ্রাহক মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী। ওয়াইমাক্স ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৮১ হাজার। শুধু তাই নয়, পিএসটিএন এবং আইএসপি গ্রাহক সংখ্যা ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার। এরপর ইন্টারনেট সার্ভিসে এলো যুগান্তকারী পরিবর্তন। প্রথমে এলো ৩এ ইন্টারনেট সার্ভিস (অক্টোবর,২০১৩), তারপর এলো ৪এ ইন্টারনেট (১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮)। ৫এ ইন্টারনেট সুবিধাও আমরা পেতে যাচ্ছি ২০২০ সালে। ধাপে ধাপে ইন্টারনেট খাতে এভাবেই উন্নতি সাধিত হয়ে আসছে। এছাড়াও বাংলাদেশ ‘ডট বাংলা’ ডোমেইন চালু করার অনুমোদন পায় ৫ অক্টোবর ২০১৬ সালে। এরসঙ্গেই বাংলাদেশের দ্বিতীয় সাবমারিন ক্যাবল সি-মি-উই -৫-এর ল্যান্ডিং স্টেশন তৈরি হয়। সবচেয়ে বড়ো অর্জন ‘বঙ্গবন্ধু -১’ স্যাটেলাইট উেক্ষপণ। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ ৫৭তম স্যাটেলাইট উেক্ষপণকারী দেশ হিসেবে বিশ্বে পরিচিতি লাভ করে। সবচেয়ে বেশি আমরা উপকৃত হয়েছি তথ্য প্রযুক্তিতে। এখন খুব সহজেই দেশ-বিদেশের খবর আমরা মুহূর্তেই পেয়ে যাচ্ছি মুঠোফোনে। পুরো বিশ্বটাই যেন এখন হাতের মুঠোয়। মানুষ অফিসের কাজে ঘরে বসেও দেশ-বিদেশে থাকা মানুষের সঙ্গে টেলি কনফারেন্সে অংশ নিতে পারে। এমনকি চাকরির জন্য ইন্টারভিউও ভিডিও কলের মাধ্যমে দেওয়া সম্ভব। এতসব কিছু আগে কিন্তু ভাবাই যেত না। এটা তো গেল যোগাযোগ মাধ্যমের বিষয়। এবার আসা যাক ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ইন্টারনেট আমাদের কেমন সহযোগিতা করছে। এখন ঘরে বসেই মানুষ দেশ-বিদেশের নানাবিধ পণ্যের ব্যাপারে ধারণা নিতে পারে। সেই অনুযায়ী পণ্য আমদানি রপ্তানিও করতে পারে। এখন মানুষ খুব কম বিনিয়োগে অনলাইনে নানাবিধ ব্যবসা করছে। বই থেকে শুরু করে প্রসাধনী সামগ্রী, জামাকাপড়, এমনকি কাঁচা বাজারটিও খুব সহজেই অনলাইনে করা যায়। এছাড়া বিভিন্ন স্টার্ট আপ কোম্পানি গড়ে উঠেছে যা মানুষের দৈনন্দিন বিভিন্ন প্রয়োজনের খেয়াল রাখছে। এসব স্টার্ট আপ কোম্পানিগুলোর মাঝে উবার, সহজ এবং পাঠাও অন্যতম। এইসব কোম্পানি মানুষকে সহজেই একটি মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে রাইড শেয়ারিং সার্ভিসের ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। যার ফলে বহু বেকার যুবক রাইড শেয়ার করে আত্মনির্ভর হতে পারছে, আর সেই সঙ্গে সাধারণ জনগণ সহজে কাজের সময় রাইড সার্ভিস সেবা গ্রহণ করে খুব সহজেই গন্তব্যে যেতে পারছে। তাও বেশ কম খরচেই। রূপচর্চা করতে বাড়ির বাইরে যাবার আর প্রয়োজন নেই। এখন অ্যাপের মাধ্যমে ঘরেই বিউটিশিয়ান ডেকে রূপ পরিচর্যার কাজ করা যায়। এরকম নানাবিধও ভাবে মানুষের জীবনযাত্রার মান সহজ হয়ে গিয়েছে এবং তা সম্ভব হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুনিপুণ পরিকল্পনার কারণেই।

লেখাপড়ার ক্ষেত্রেও এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। এখন বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই শিক্ষা প্রদান করা হয় আধুনিক ডিজিটাল পদ্ধতিতে। এখন শিক্ষকরা খুব সহজেই অনলাইন থেকে শিক্ষণীয় অনেক তথ্য অডিও এবং ভিডিও আকারে পেয়ে থাকেন যার মাধ্যমে শ্রেণিকক্ষে খুব সহজেই শিক্ষার্থীদের শিক্ষা প্রদান করতে পারেন। শিক্ষার্থীগণও অনলাইনে তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে তা তাদের শিক্ষার ক্ষেত্রে কাজে লাগাতে পারেন। যাদের বাড়ির বাইরে গিয়ে শিক্ষা নেওয়া সম্ভব নয়, তারাও ঘরে বসে অনলাইনে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেন। এমন অনেক অনলাইন মাধ্যম আছে যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বাড়িতে বসেই স্বল্প খরচে লেখাপড়াও করতে পারছেন এবং শিক্ষা গ্রহণ করতে পারছেন। শিক্ষার্থীরা দেশ-বিদেশে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইমেইলে নিজের লেখা পাঠাচ্ছেন উচ্চ শিক্ষার লক্ষ্যে যা প্রমাণ করে বাংলাদেশ কতটা এগিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।

চিকিত্সাক্ষেত্রেও এসেছে আমূল পরিবর্তন। দেশের হাসপাতালগুলোতে এখন অত্যাধুনিক ডিজিটাল সরঞ্জামাদির মাধ্যমে রোগ নির্ণয় এবং চিকিত্সা করা হয়। এখন জটিল থেকে জটিলতর রোগের চিকিত্সাও বাংলাদেশে করা যাচ্ছে। আমাদের অনেক খরচা করে দেশের বাইরে এখন খুব একটা যেতে হচ্ছে না। চিকিত্সকগণ এই আমূল ডিজিটাল পরিবর্তনে অনেক সুবিধা লাভ করছেন, এমনকি দেশ-বিদেশের বিভিন্ন চিকিত্সক এবং চিকিত্সা পদ্ধতির সাথে তারা পরিচিত হচ্ছেন।

এখন অনেক অফিসে এবং বাসাতে সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নিবিড় পর্যবেক্ষণ করা হয়। মানুষ ডিজিটাল সরঞ্জামাদির সাহায্য নিচ্ছে। যার ফলে অপরাধীদের বিচারের আওতায়ও আনা সম্ভব হচ্ছে। অপরাধীদের শনাক্ত করা এবং দ্রুত বিচারের আওতায় আনাও এখন আগের থেকে সহজ হয়ে যাচ্ছে। এছাড়াও বৈজ্ঞানিক গবেষণায়ও এখন এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। এখন তথ্যের ভান্ডার ইন্টারনেট থেকে দেশ-বিদেশের নানা তথ্য সহজেই মানুষ পাচ্ছে, যা বৈজ্ঞানিক গবেষণায় কাজেও লাগছে। পুরো বিশ্বটাই যেন এক হয়ে যাচ্ছে।

অর্থনৈতিক লেনদেন খাতেও এসেছে অভাবনীয় পরিবর্তন। দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা এখন অনলাইনভিত্তিক হয়ে গেছে। এখন ঘরে বসে সহজেই অনলাইনে আর্থিক লেনদেন করা সম্ভব হচ্ছে এক অ্যাকাউন্ট থেকে অন্য অ্যাকাউন্টে। ২৪ ঘণ্টা এটিএম বুথের মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তোলা সম্ভব। তাই যে কোনো প্রয়োজনে এখন টাকা তুলতে আর ঘন ঘন ব্যাংকে দৌড়াতে হয় না। তেমনি যখন-তখন যে কোনো প্রয়োজনে টাকা তুলে নেওয়া সম্ভব। এ ছাড়াও ডেবিট কার্ড এবং ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে অনলাইন পেমেন্ট করা সম্ভব। এমনকি শপিং মলে কেনাকাটা করতে গিয়ে নগদ টাকার চিন্তা করার দরকার হয় না বললেই চলে।

এছাড়াও জন্ম-মৃত্যুর নিবন্ধন, পল্লী বিদ্যুতের বিল, মোবাইল ফোন, গ্যাস বিল পরিশোধ, বিভিন্ন সরকারি ও পাবলিক পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশন ও ফলাফল সংগ্রহ, চাকরির আবেদন ও তথ্য সংগ্রহ, ভিসা আবেদন, ছবি ও ভিডিও চিত্র সংগ্রহ, জরুরি কাগজের ফটোকপি, লেমিনেটিং—এসবই ডিজিটাল বাংলাদেশের এক ঝলক মাত্র।

শুধু তা-ই নয়, বাংলাদেশের গড়ে উঠছে ২৮টি হাইটেক এবং আইটি পার্ক, যা বহু মানুষের বেকারত্ব ঘোচাতে সক্ষম হবে। এখানে বাংলাদেশেই তৈরি করা সফটওয়্যার দ্বারা কলকারখানা, অফিস-আদালত চালিত হবে। দেশের মেধা দেশেই থাকবে। অর্থনৈতিক উন্নতি সাধিত করা এই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে উন্নয়নের ধারা এখন থেকেই পরিলক্ষিত হচ্ছে।

আমরা এখন আছি চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে, যেখানে আমরা ভার্চুয়াল রিয়ালিটি, আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এবং রোবটিকস নিয়ে ভাবছি। দেশে স্থাপন করা হয়েছে পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্র, মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র, সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভিশন অনুযায়ী ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ উন্নত বিশ্বের নেতৃত্ব দেবে। বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশকে উন্নতির চরম শিখরে নেবার স্বপ্ন পূরণ হবার দিন খুব বেশি দূরে নয়; কারণ এই স্বপ্ন অনেকটাই সার্থক হতে চলেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী পদক্ষেপের মাধ্যমে। তথ্যপ্রযুক্তিতে উন্নত আধুনিক ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়াই হবে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলার বাস্তব রূপায়ণ। আর তাহলেই অর্জিত হবে লাখো শহিদের আত্মত্যাগের প্রকৃত বিজয়।

লেখকঃ সদস্য, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন
সৌজন্যেঃ দৈনিক ইত্তেফাক
প্রকাসজঃ ৯ জানুয়ারি ২০২০

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত