দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশের সাফল্য ঈর্ষণীয়

736

Published on জানুয়ারি 11, 2020
  • Details Image

- ড. মির্জা গোলাম সারোয়ার পিপিএম

উন্নয়নশীল দেশের প্রধান অন্তরায় হলো দারিদ্র্য। বাংলাদেশ আর্থসামাজিক উন্নয়নে বিশ্বের মডেল হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। দারিদ্র্য বিমোচন আর্থসামাজিক অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। দেশে শিশুমৃত্যুর হার কমেছে হাজারে ৩৮ জন, গর্ভকালীন মৃত্যুর হার দ্রুত কমছে, রপ্তানি বেড়েছে অনেক গুণ, কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। ২০০৮ সাল থেকে বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা চলমান থাকার পরও গড়ে জিডিপি ৭ ভাগের বেশি চলমান, যা পৃথিবীর অনেক দেশই পারেনি। চীন, ভারত, ব্রাজিল এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশ বাদ দিলে অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার গত দেড় দশক ধরে বেশি। দারিদ্র্য বিমোচন আজ সারা পৃথিবীর জন্য একটি বড়ো ইস্যু। ২০১৫ সালের এমডিজির লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে প্রতি বছর দারিদ্র্যের হার ১ দশমিক ২ শতাংশ করে আনার বিপরীতে ১ দশমিক ৭৪ শতাংশ হারে হ্রাস পাচ্ছে। এমডিজির লক্ষ্য অনুসারে দারিদ্র্য ব্যবধান ৮-এর বিপরীতে ৬ দশমিক ৫ অর্জন করেছে।

দারিদ্র্য বিমোচন তথা দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী জনগণের সংখ্যা ২০১২ সালেই ৫৬ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে ২৯ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত রেখে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করাই সরকারের মূল লক্ষ্য। বাংলাদেশের দারিদ্র্য হ্রাস পাওয়া মানব উন্নয়ন সূচকেও লক্ষণীয় অগ্রগতি হয়েছে। বৈশ্বিক মানব উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশ এক ধাপ এগিয়েছে। সূচক অনুযায়ী বিশ্বের ১৮৭টি দেশের মধ্যে মানব উন্নয়নে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪২তম। এই প্রতিবেদন অনুযায়ী তালিকভুক্ত ১০৬টি দেশের মধ্যে জাতিসংঘের বহুমাত্রিক দারিদ্র্যসূচকে বাংলাদেশের মান ২০১১ সালে শূন্য দশমিক ২৩৭-এ উন্নীত হয়েছে, যা ২০০৭-এ ছিল শূন্য দশমিক ২৯২। ১৯৭৩ সাল থেকে ২০১৫ পর্যন্ত ছয়টি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা এবং একটি দ্বিবার্ষিক পরিকল্পনার মাধ্যমে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার অন্যতম লক্ষ্য ছিল দারিদ্র্য বিমোচন।

গত এক দশকে দারিদ্র্য বিমোচনে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ। ভারত, পাকিস্তান ও ভুটানের চেয়েও বাংলাদেশের অর্জন অনেক ভালো। এ সাফল্যের ভূয়সী প্রশংসা করে বিশ্বব্যাংক বলেছে, বাংলাদেশে ‘অতিদরিদ্র’ মানুষের সংখ্যা মোট জনগণের ১২ দশমিক ৯ শতাংশের নেমে এসেছে। যা পাঁচ বছর আগে ছিল সাড়ে ১৮ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৮ শতাংশ হতে পারে বলেও পূর্বাভাস দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০০ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত অতিদরিদ্র কমার ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি হয়েছে, তার তুলনায় ২০০৫ থেকে ২০১০ সময়ে সে গতি শ্লথ হয়ে গেছে। তাই অতিদরিদ্র কমাতে হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরো বেগবান করতে হবে বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১০-১১ সময়ে বাংলাদেশে অতিদারিদ্র্যের হার ছিল ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০১১-১২ অর্থবছরে ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০১২-১৩ অর্থবছরে ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ। গত বছরে তা নেমে এসেছে ১২ দশমিক ৯ ভাগে।

একসময় বাংলাদেশের উন্নয়ন ব্যয় পুরোটাই ছিল বৈদেশিক সাহায্য বা ঋণনির্ভর। সেই বাংলাদেশ আজ বিশ্বব্যাংককে বাদ দিয়ে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সেতু নির্মাণ করতে চলেছে সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন, বিশ্বব্যাংক প্রধান অর্থনীতিবিদ, ড. কৌশিক বসু থেকে শুরু করে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, ফোর্বস ম্যাগাজিন সবাইকেই বাংলাদেশের জয়যাত্রার কথা অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন।

সত্তরের দশকে বাংলাদেশ পুরোটাই ছিল সাহায্যনির্ভর এক দেশ। আশির দশকে এই সাহায্য নির্ভরতা অব্যাহত থাকে। আশির দশকের শুরুতে ৮১-৮২ অর্থবছরে বাংলাদেশের নেওয়া বৈদেশিক ঋণ ছিল মোট জিডিপির প্রায় সাড়ে ৬ শতাংশের মতো। রেমিট্যান্স ছিল ২ শতাংশ। আশির দশকের শেষে ৮৯-৯০-তেও এই অবস্থা কমবেশি চলতে থাকে। স্বাধীনতার চার দশক পর সাহায্যনির্ভর দেশ ধীরে ধীরে দেশজ উত্পাদন ও বাণিজ্যনির্ভর হয়ে ওঠা শুরু করে। এখন এদেশের বৈদেশিক সাহায্য জিডিপির ২ শতাংশেরও কম রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক আয় যথাক্রমে ১০ ও ২০ শতাংশ, যা একটি দেশের (সুস্থ ও স্বাস্থ্যবান) নির্ভরযোগ্য অর্থনীতির বহিঃপ্রকাশ। আর এসব স্বপ্নিল অর্জন সম্ভব হয়েছে এদেশের পরিশ্রমী কৃষক, শ্রমিক ও প্রবাসীদের কল্যাণে।

স্বাধীনতার পরবর্তী আড়াই দশকে বাংলাদেশের গড় জিডিপির বৃদ্ধি সাড়ে ৪, পরের ১০ বছরে কমবেশি গড়ে ৫ এবং পরবর্তী দশকে গড় প্রবৃদ্ধি ৬ থেকে সাড়ে ৬। ২০০৭-১০ বিশ্বব্যাপী চলমান বিশ্বমন্দায় মাত্র চারটি দেশের অর্থনীতি অবিচল দাঁড়িয়ে ছিল, বাংলাদেশ যার একটি; তার অন্যতম ভিত ছিল রেমিট্যান্স। আশির দশকে বাংলাদেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসরত লোক ছিল ৬১.৯ শতাংশ। সর্বশেষ পরিচালিত ২০১০ সালের জরিপে এটি কমিয়ে দাঁড়িয়েছে ৩১.৫ শতাংশ। অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান অনুসারে বাংলাদেশে এই মুহূর্তে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করা মানুষের সংখ্যা ২০ শতাংশের কম। চলমান দশকে নিম্ন আয় মানুষের আয়, শ্রমিকদের মজুরি বেড়েছে কয়েক গুণ। আর এজন্য ধনী-দরিদ্রের আয় বৈষম্য কমেছে প্রশ্নাতীতভাবেই।

সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগের ফলে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর হার ২৩ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। (বেসরকারি সংস্থা দুঃস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্রের (ডিএসকে) ‘সিড়ি’ প্রকল্পের আওতায় একটি গৃহস্থালি জরিপে উঠে এসেছে এই চিত্র। ২৮ আগস্ট ২০১৬ তারিখে জরিপ প্রতিবেদন উপস্থাপন করে অর্থনীতিবিদ বিনায়ক সেন বলেন, শহরে দারিদ্র্যের হার ১৯৯১ সালে ৪৩ শতাংশ ছিল। ২০১৬ সালে তা ১৪ শতাংশে পৌঁছেছে। আর এখন অতি দরিদ্র রয়েছে মাত্র ৫ শতাংশ, যা ১৯৯১ সালে ছিল ২৩ শতাংশ। জাতিসংঘের হিসাবে এই, অঙ্কটি ৩ শতাংশে নেমে এলে শহরে অতিদারিদ্র্য শূন্যের কোঠায় বলে ধরে নেওয়া হবে জানিয়ে তিনি বলেন, বলা যায় এই হার শূন্যের কোঠার কাছাকাছি। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২১ সালের মধ্যে এই অতিদারিদ্র্যের অবসান ঘটানো সম্ভব।

মূলত মানবতাবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে ধনাঢ্য ব্যক্তিগণ দরিদ্রদের কল্যাণে কাজ করতে পারে। সামাজিক দায়িত্ববোধের বশবর্তী হয়ে অনেক মানুষ দরিদ্রদের সহায়তা করে। এছাড়া মানব প্রেম মানুষকে দারিদ্র্য দূরীকরণে এগিয়ে আসতে উত্সাহ জুগিয়ে থাকে। সম্পদ ও সুযোগের সুষম বণ্টন হলে সমাজে দারিদ্র্য হ্রাস পাবে। ধর্মীয় মূল্যবোধ দারিদ্র্য দূরীকরণেও সহায়ক।

লেখকঃ সাবেক পুলিশ ও র‍্যাব কর্মকর্তা

সৌজন্যেঃ দৈনিক ইত্তেফাক

প্রকাশঃ ৯ জানুয়ারি ২০২০

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত