শ্রেষ্ঠ এক বিকেলের গল্প

1151

Published on মার্চ 8, 2020
  • Details Image

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ। সেই একটি দিন, একটি অপরাহ্ন। জনসমুদ্রে গণজোয়ার তোলা এক ইতিহাস। তিনি এলেন। মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে উচ্চারণ করলেন মানুষেরই মনের কথা। ‘ঘরে ঘরে দুর্গ’ গড়ে তোলার সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা নিয়ে ঘরে ফিরে গেল মানুষ। কবি নির্মলেন্দু গুণের কবিতায় সেদিনের চমৎকার এক বর্ণনা আছে। একটি কবিতা লেখা হবে তার জন্য অপেক্ষার উত্তেজনা নিয়ে/ লক্ষ লক্ষ উন্মত্ত অধীর ব্যাকুল বিদ্রোহী শ্রোতা বসে আছে/ ভোর থেকে জনসমুদ্রের উদ্যান সৈকতে: ‘কখন আসবে কবি?’/... হে অনাগত শিশু, হে আগামী দিনের কবি,/ শিশু পার্কের রঙিন দোলনায় দোল খেতে খেতে তুমি/ একদিন সব জানতে পারবে,-/ আমি তোমাদের কথা ভেবে/ লিখে রেখে যাচ্ছি সেই শ্রেষ্ঠ বিকেলের গল্প।/ সেদিন এই উদ্যানের রূপ ছিল ভিন্নতর;’।

অসাধারণ ছন্দময় এক কাব্যিক ভাষণ। ইতিহাসে এ ধরনের ভাষণের উদাহরণ মেলা ভার। তাঁর শব্দচয়ন, ইতিহাসের বর্ণনা, মানুষের মনে স্থায়ীভাবে গেঁথে যাওয়ার মতো অননুকরণীয় বাচনভঙ্গিই তাঁকে ‘পোয়েট অব পলিটিকস’ বা রাজনীতির কবি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তিনি বললেন, ‘কি অন্যায় করেছিলাম? নির্বাচনের পরে বাংলাদেশের মানুষ সম্পূর্ণভাবে আমাকে, আওয়ামী লীগকে ভোট দেন। আমাদের ন্যাশনাল এসেম্বলি বসবে, আমরা সেখানে শাসনতন্ত্র তৈয়ার করব এবং এদেশকে আমরা গড়ে তুলবো, এদেশের মানুষ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক মুক্তি পাবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় আজ দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, ২৩ বৎসরের করুণ ইতিহাস বাংলার অত্যাচারের, বাংলার মানুষের রক্তের ইতিহাস। ২৩ বৎসরের ইতিহাস, মুমূর্ষু নর-নারীর আর্তনাদের ইতিহাস।

বাংলার ইতিহাস এদেশের মানুষের রক্ত দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করার ইতিহাস। ১৯৫২ সালে রক্ত দিয়েছি, ১৯৫৪ সালে নির্বাচনে জয়লাভ করেও আমরা গদিতে বসতে পারি নাই। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান মার্শাল ল’ জারি করে দশ বৎসর পর্যন্ত আমাদের গোলাম করে রেখেছিল। ১৯৬৬ সালে ৬ দফার আন্দোলনে, ৭ জুনে আমাদের ছেলেদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ... পঁচিশ তারিখে এসেম্বলি কল করেছে। রক্তের দাগ শুকায় নাই। আমি দশ তারিখে বলে দিয়েছি যে, ঐ শহীদের রক্তের উপর দিয়ে, পাড়া দিয়ে আরটিসিতে মুজিবুর রহমান যোগদান করতে পারে না। এসেম্বলি কল করেছেন আমার দাবি মানতে হবে প্রথম। সামরিক আইন মার্শাল ল’ উইথড্র করতে হবে। সমস্ত সামরিক বাহিনীর লোকদের ব্যারাকে ফেরত নিতে হবে। যেভাবে হত্যা করা হয়েছে তার তদন্ত করতে হবে। আর জনগণের প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। তারপরে বিবেচনা করে দেখব আমরা এসেম্বলিতে বসতে পারব কি পারব না। এর পূর্বে এসেম্বলিতে বসতে আমরা পারি না। আমি, আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না। আমরা এদেশের মানুষের অধিকার চাই।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কণ্ঠের এই ভাষণ বাঙালী জাতিকে উজ্জীবিত করেছিল। ১৮ মিনিট স্থায়ী এই ভাষণে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালীদের স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানান। দিলেন নির্দেশনা। কী পাচ্ছি আমরা এই ঐতিহাসিক ভাষণে? তাঁর এই ভাষণে আমরা পাচ্ছি সামরিক নির্দেশনা। তিনি বললেন, ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সব কিছু, আমি যদি হুকুম দেবার না পারি তোমরা বন্ধ করে দেবে। ...আমরা ভাতে মারব। আমরা পানিতে মারব।’ সেইসঙ্গে জনযুদ্ধের কুশলী আহ্বান জানালেন এভাবে, ‘প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায়, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোল এবং তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাক। মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব- এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ।’ বঙ্গবন্ধু একজন রাজনৈতিক নেতা, সমরবিদ নন। কিন্তু তাঁর বক্তব্যে এই সামরিক কৌশলের বিষয়টি অবলীলায় উঠে এলো কী করে? আজকের দিনের সমরবিদদের জন্য এটা গবেষণার বিষয় হতে পারে। ইতিহাসের বরপুত্র তিনি। চরম সংকটের দিনে জাতি নির্দেশনা পেয়েছিল ইতিহাসের সেই বরপুত্রের কাছ থেকে। তাঁর জাদুকরি সম্মোহনী শক্তিই বাঙালী জাতিকে উদ্বুদ্ধ করেছিল গুলির সামনে বুক পেতে দিতে। তিনি অভয় দিয়েছিলেন বলেই ভয় পায়নি জাতি।

বঙ্গবন্ধুর ভাষণের নির্দেশনার তাৎপর্য ছিল প্রধানত দেশব্যাপী যাতে বাঙালীরা সঠিক নেতৃত্বের অধীনে সুসংগঠিত হয় এবং সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করে। যুদ্ধোন্মুখ সাধারণ মানুষ এবং অস্ত্রধারী বাঙালী সেনা, ইপিআর, পুলিশ ও অন্যদের শত্রু যেন অতর্কিত হামলা করে পর্যুদস্ত করতে না পারে। এর প্রতিফলন মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে আমরা দেখেছি। ২৬ মার্চের আগে কিছু বাঙালী সেনা ইউনিট বিদ্রোহ করে পাকিস্তানী পক্ষ ত্যাগ করেছিল। এসব সেনা ইউনিটসহ পুলিশ, ইপিআর এবং সারা দেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধের প্রথমদিকে একটা শক্ত প্রতিরোধযুদ্ধ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিল।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণকে ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ইউনেস্কো। এ ভাষণকে স্বীকৃতি দিয়ে ‘মেমরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারে’ (এমওডব্লিউ) তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এমওডব্লিউ-তে এটাই প্রথম কোন বাংলাদেশী দলিল, যা আনুষ্ঠানিক ও স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত হবে। এছাড়া বিশ্বের ১২টি ভাষায় ভাষণটি অনুবাদ করা হয়েছে ঐতিহাসিক এই ভাষণটি।

আজ সেই ঐতিহাসিক ৭ মার্চ। বলতে গেলে ১৯৭১ সালের এই দিনেই স্বাধীন হয়ে গিয়েছিল বাঙালী জাতি।

লেখকঃ অস্ট্রিয়া প্রবাসী, সর্ব ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগের সভাপতি, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী’

 

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত