প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক

1760

Published on মার্চ 28, 2020
  • Details Image

অজয় দাশগুপ্ত

স্বাধীনতার পঞ্চাশতম দিবসে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধের বিরান দৃশ্য বুকের ভেতর এক ধরনের হাহাকার অনুভব করি। ১৯৭১ সালের এ দিনে ঢাকার সর্বত্র ছিল পাকিস্তানি বর্বর হানাদার বাহিনীর নির্বিচার গণহত্যা। রাজপথ জনশূন্য। ২৫ মার্চ রাতেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। সন্ধ্যার পরপরই আমরা কয়েকজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হাতিরপুল বাজারে পৌঁছালে দেখি শত শত মানুষ গাছের গুড়ি, ইট ও অন্যান্য ভারি বস্তু দিয়ে ব্যারিকেড তৈরি করছে। সবাই বলছে, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ক্যান্টনমেন্ট থেকে বের হয়ে আসবে, এমন খবর জানিয়ে বঙ্গবন্ধু সকলকে প্রতিরোধ গড়ে তোলার নির্দেশ দিয়েছেন। আমরা একদল ছুটে যাই খ্যাতিমান শিল্পী কামরুল হাসানের বাসায়। তিনি বললেন, কারওয়ান বাজারের কাছে একটি কালভার্ট আছে (এখন যেখানে সোনারগাঁও হোটেল, তার পাশে)। সেটা ভেঙ্গে দিতে পারলে আর্মি ক্যান্টনমেন্ট থেকে শহরে প্রবেশ করতে পারবে না। এভাবে একজন চিত্রশিল্পী হয়ে ওঠেন মুক্তিযুদ্ধের কমান্ডার।

আমরা শত শত মানুষ ছুটে যাই হাতিরপুল থেকে কারওয়ান বাজারের দিক। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অস্ত্র ছিল একজনের, একটি শাবল। আমি একটি গাছের ডাল ভেঙে নিই। ততক্ষণে আর্মি নেমে গেছে ট্যাঙ্ক, মেশিনগান, কামান, রাইফেল নিয়ে। আমাদের সামরিক অভিযান ব্যর্থ হয়। কিন্তু যে মনোবল পাই সেটাই দেশমাতৃকাকে স্বাধীন করার অনন্য সাহস তৈরি করে দিতে পারে। বাংলাদেশের সর্বত্রই এমনটি ঘটেছে। ২৬ মার্চ বিকেলের দিকে আকাশবাণী বেতার থেকে বাজানো হয় আমার সোনার বাংলা...। এরপরই ঘোষণা, ‘পূর্ব বাংলায় গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে।’ চারদিকে গোলাগুলির প্রচণ্ড শব্দের মধ্যে এ ঘোষণা আমাদের জন্য ছিল পথ নির্দেশনা।

স্বাধীনতার পঞ্চাশতম বছরে আমাদের জন্য নতুন যুদ্ধ করোনার হাত থেকে নিষ্কৃতি লাভ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২৫ মার্চ জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে বলেছেন, এবারে নতুন এক যুদ্ধ করোনাকে পরাভূত করা। তিনি কৃচ্ছতাসাধনের কথা বলেছেন। মনুষ্যত্বের পরীক্ষা দিতে বলেছেন। রফতানমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের বেতন ভাতা পরিশোধের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল ঘোষণা দিয়েছেন। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কষ্ট লাঘবের জন্য খাদ্য সরবরাহ ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি জোরদারের ঘোষণা দিয়েছেন।

আমাদের শিল্প-বাণিজ্যের বিভিন্ন চেম্বার নেতারা ইতিমধ্যে সরকারের কাছে আর্থিক সুবিধার দাবি জানাতে শুরু করেছে। এর যুক্তিও আছে। প্রধানমন্ত্রী তা জানেন। তবে প্যাকেজ ঘোষণার জন্য তিনি যে পদ্ধতি অনুসরণ করলেন, সেটা অভিনব। রফতানিমুখী শিল্প খাতের জন্য যে অর্থ সরকার প্রদান করবে তা কীভাবে ব্যয় হবে, সেটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এ প্রসঙ্গে ২০০৮ সালের মন্দার সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান তিনটি মোটরগাড়ি উৎপাদকদের দাবিনামা নিয়ে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের কয়েকজন সদস্যর অভিমত এখানে বলা যেতে পারে। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বারাক ওবামা নির্বাচিত হয়েছেন। শপথ নেবেন পরের বছরের ২০ জানুয়ারি। কিন্তু অর্থনীতিতে প্রকট মন্দা। ফোর্ড, জেনারেল মোটর ও ডেট্রয়েট কোম্পানি থেকে এ শিল্পকে রক্ষার জন্য বেইল আউট প্যাকেজ হিসেবে ২৫০০ কোটি ডলার অর্থ দাবি করা হয়েছে। এ নিয়ে তদবির করার জন্য ১৮ নভেম্বর তিনটি কোম্পানির প্রধান নির্বাহীরা নিজ নিজ কর্মস্থল থেকে ওয়াশিংটনে এসেছেন ব্যক্তিগত জেট বিমানে। আর এ নিয়েই সমালোচনা মুখর আইন প্রণেতারা। তারা বলেন, জনগণের ট্যাক্সে যে সরকারি তহবিল গড়ে ওঠে, সেটা থেকে ভিক্ষা চাইতে এসেছেন বিলাসবহুল বিমানে চেপে। এটা মানা যায় না। কোম্পানিগুলো থেকে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়, নিয়ম মেনেই এ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। বসদের নিরাপত্তার দিকটিও ভাবতে হবে। কিন্তু আইন প্রণেতারা বলেন, মন্দার কারণে কর্মীদের ছাঁটাই করছেন। অনেকে বলছেন যে বেতন দিতে পারছেন না। কিন্তু আপনাদের নিজেদের সুবিধাতে বিন্দুমাত্র কাটছাঁট নেই। এটা অন্যায়। আপনারা যে ধরনের বিমানে এসেছেন তার একটি ট্রিপের জন্য খরচ হয় ২০ হাজার ডলার। অন্যদিকে, পাবলিক বিমানে এমনকি প্রথম শ্রেণিতে এলেও ব্যয় পড়ত ৮৩৭ ডলার।

এক যুগ আগের যুক্তরাষ্ট্রের এ অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশ কিন্তু শিক্ষা নিতে পারে।

তবে একটি তিক্ত অভিজ্ঞতা বলি ১৯৯৮ সালের। আওয়ামী লীগ ২১ বছর পর ক্ষমতায় এসেছে। শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছেন মাত্র দু’বছর। এর মধ্যেই প্রবল বন্যা আঘাত হানে ১৯৯৮ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরে। তিনি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু করেন সেই প্রথমবার। বিনা মূল্যে দরিদ্রদের চাল দেওয়ার যে কর্মসূচি নিয়েছিলেন তা সফল হয়েছিল। বিবিসির এক সাংবাদিক বলেছিলেন, বন্যা, খাদ্যাভাব ও রোগব্যাধিতে অন্তত এক কোটি লোকের মৃত্যু ঘটতে পারে। সে আশঙ্কা সঠিক প্রমাণিত হয়নি। সম্পদের অপ্রতুলতার পরও মানুষকে বাঁচানো সম্ভব হয়েছিল আন্তরিক প্রয়াসে। বন্যার পর প্রথম বোরো মৌসুমে এক কোটি ৫ লাখ টন চাল উৎপাদন সম্ভব হয়েছিল কৃষকদের সরকার থেকে ঋণ ও অন্যান্য সুবিধা প্রদানের কারণে।

বন্যার সময়ে শিল্প খাত যে অচল না হয়ে পড়ে সে জন্য সরকার থেকে নানা ধরনের সুবিধা দেওয়া হয়েছিল। ঢাকা মহানগরসহ দেশের বেশিরভাগ স্থান ছিল পানির নিচে। তৈরি পোশাক শিল্পের অনেক কারখানার কর্মীরা পানি সাঁতরে কারখানায় গিয়েছে সকালে এবং কাজ শেষে ফিরেছে একইভাবে রাতে, সে ছবি সংবাদপত্রে ছাপা হচ্ছিল। পোশাক শিল্পের মালিকদের সংগঠন থেকে সরকারের কাছে যে বেইল আউট প্যাকেজ দাবি করা হয় তাতে ব্যাংক ঋণ আদায় স্থগিত, সুদ মওকুফ, টিএন্ডটি টেলিফোন বিল (তখন মোবাইলের তেমন চল ছিল না), গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানির বিল মওকুফসহ অনেক দাবি ছিল। সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের নেতারা যখন এ দাবিনামা তুলে ধরেন, সেখানে আমি উপস্থিত ছিলাম। তাদের প্রশ্ন করি, শত শত কারখানায় পানি সাঁতরে এসে যে নারী শ্রমিকরা কাজ করেছে দিনের পর দিন, তাদের জন্য আপনারা কী সুবিধা দিয়েছেন এবং সরকারের কাছেই বা কী দাবি জানাচ্ছেন?

বলা বাহুল্য, সদুত্তর মেলেনি। প্রধানমন্ত্রীর করোনা-প্রণোদনা প্যাকেজে রফতানিমুখী শিল্প সংক্রান্ত ঘোষণাটি এ কারণেই আমাকে মুগ্ধ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ২ লক্ষ কোটি ডলারের জরুরি প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। কানাডার প্যাকেজ ৮২ হাজার কোটি ডলার। আমাদের চলতি বছরের জাতীয় বাজেট পাঁচ লাখ কোটি টাকা। শুল্ক-কর ও ব্যাংক ঋণ এবং সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে এ অর্থ আদায় হওয়ার কথা। কিন্তু অর্থনীতিতে মন্দার কারণে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে না। অথচ ব্যয় বাড়ছে স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, শিল্পসহ নানা খাতে প্রণোদনা বাবদ। এ অর্থ আসবে কীভাবে, এখনও স্পষ্ট ধারণা নেই। কৃচ্ছতাসাধন করলেই বা কতটা সুফল মিলবে? তবে যত কঠিন হোক, এ পথে চলতেই হবে। জনগণের কাছ থেকে ট্যাক্স আদায় করে সে অর্থ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান ও ধনবানদের হাতে তুলে দিলে তা যেন যথাযথ ব্যয় হয় তার নিশ্চয়তা অবশ্যই থাকা চাই।

আমাদের সরকারি খাতে দুর্নীতির বিস্তর অভিযোগ আছে। কম দামের জিনিশ অনেক বেশি দাম দেখিয়ে কেনা অনেকটা যেন স্বাভাবিক নিয়ম। অন্যদিকে, ধনবানদের একটি অংশ বিস্তর ট্যাক্স ফাঁকি দেয়। অনেকে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে নানা অজুহাতে ফেরত দেয় না। একজন সাবেক অর্থমন্ত্রী খেদের সঙ্গে বলেছিলেন, ঋণ খেলাপি-বিল খেলাপিদের বিলাসী জীবন তো বদলায় না। প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল ব্যবহার বিষয়ে একটি কার্যকর নির্দেশনা দিয়েছেন। আশা করি এর ধারাবাহিকতায় আরও ঘোষণা সরকারি ও বেসরকারি খাত থেকে আসবে।

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিক।

সৌজন্যেঃ দৈনিক ইত্তেফাক (মার্চ ২০২০)

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত