কোভিড-১৯ মোকাবিলায় প্রয়োজন বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক সহযোগিতা

107

Published on মে 13, 2020
  • Details Image

ড. প্রণব কুমার পান্ডেঃ

বিশ্বজুড়ে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইলেকট্রনিক, প্রিন্ট এবং সোশ্যাল মিডিয়ার মূল ফোকাস হচ্ছে কোভিড-১৯ এর ধ্বংসযজ্ঞ। এটি এমন এক ধরণের সঙ্কট যা পৃথিবীর বেশীরভাগ দেশের মানুষ গত ১০০ বছরে প্রত্যক্ষ করেনি। কোভিড-১৯ মোকাবেলায় বিশ্বের বেশিরভাগ মানুষ হোম কোয়ারেন্টাইনের নামে গৃহবন্দি হয়ে আছে।

ফলে, বৈশ্বিক নাগরিকদের জীবনযাত্রায় এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন কারণ সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করার জন্য প্রত্যেকে ঘরে থাকতে বাধ্য হচ্ছে কোন ধনজনের সামাজিকতায় অংশগ্রহণ না করে।

কোভিড-১৯ এতটাই বিধ্বংসী যে এখন পর্যন্ত এর কোন নির্দিষ্ট চিকিৎসা ও ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হয় নি যদিও পৃথিবীর প্রায় সকল দেশের বিজ্ঞানীরা প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ভ্যাকসিন ও চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কারের জন্য। ফলে, ডাবলু এইচ ও এবং সরকারের নির্দেশনা মেনে চলা ছাড়া আমাদের আর কোন বিকল্প নেই। কোভিড-১৯ এর মারাত্মক বিপর্যয় প্রত্যেক দেশের অর্থনীতির উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলছে বিধায় সরকার প্রধানরা মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকি কমানোর সাথে সাথে কিভাবে এই প্রভাব মোকাবেলা করা যায় সে বিষয়ে বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে চিন্তা ভাবনা করছেন।

পৃথিবীব্যাপী কোভিড-১৯ মহামারী নিয়ন্ত্রণের জন্য বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে আলোচিত হচ্ছে কারণ একটি দেশের সরকারের পক্ষে এই মহামারী নিয়ন্ত্রণ করে অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবেলা করা প্রায় অসম্ভব একটি বিষয়। ফলে আন্তর্জাতিক মহলে একটি বিষয় আলোচিত হচ্ছে যে এই সংকট মোকাবিলায় উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা এবং অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে উঠে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য দাতা সংস্থাগুলো আদৌও প্রস্তুত রয়েছে কি? এই শতাব্দীর সবচেয়ে কঠিন সময়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হলে গত অর্ধ শতাব্দীর অনেক অর্জন ম্লান হয়ে যেতে পারে।

স্বল্প আয়ের দেশগুলোর সরকারগুলো কোভিড-১৯ এর সাথে লড়াই করতে হিমশিম খাচ্ছে। ফলে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেওয়ায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যয় নির্বাহের ভারসাম্য নিশ্চিত করতে পারছে না। সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা প্রায় সম্ভব হয়ে যাচ্ছে কারণ বিশাল সংখ্যার জনগোষ্ঠী যারা বস্তিতে বাস করে এবং বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক ক্ষেত্রে কর্মরত আছে তারা জীবিকার সন্ধানে রাস্তায় নামতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে জীবনের চেয়ে জীবিকা তাদের কাছে বেশী গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর সামাজিক দূরত্ব পুরোপুরি নিশ্চিত করতে না পারার কারণে কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ ভয়াবহ আকার ধারণ করছে বাংলাদেশে।

এমনকি উন্নত দেশের সরকাররা তাদের উন্নত স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সেবা ব্যবস্থা থাকা স্বত্বেও কোভিড-১৯ মোকাবেলায় হিমশিম খাচ্ছে। প্রয়োজনের তুলনায় সেখানেও ভেনটিলেশনের সংখ্যা অনেক অপ্রতুল কারণ রোগীর সংখ্যা অনেক বেশী। উন্নত দেশগুলোর অবস্থা দেখে সহজেই অনুমান করা যায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর পরিস্থিতি কারণ এখানে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা একেবারেই ভেঙ্গে পড়েছে। ফলে এই মূহুর্তে সবচেয়ে জরুরী বৈশ্বিকক ও আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করা । উন্নত দেশগুলোতে যেখানে কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রিত হয়েছে এবং অবস্থার উন্নতি হচ্ছে সেই দেশগুলোর উচিত উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত দেশগুলোকে প্রশিক্ষিত চিকিৎসক এবং চিকিৎসা সরঞ্জামাদি দিয়ে সহায়তা করা।

এছাড়াও ধনী দেশগুলো দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোকে অর্থনৈতিক সহায়তা প্রদান করা উচিত কারণ সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতের স্বার্থে জনগণকে ঘরে বসিয়ে রেখে সহায়তা প্রদান করার সামর্থ্য অনেক দেশের নেই। ফলে এই বৈশ্বিক মহামারী থেকে উদ্ধার পাবার জন্য প্রয়োজন একে অপরকে সহায়তা করা।

কোভিড-১৯ এর বিপর্যয় সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা যে কোন দেশের সরকারের পক্ষেই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়ংকর মহামারীকে মোকাবিলা করার জন্য এক দেশের সরকারের সাথে অন্য দেশের সরকারের সহযোগিতাকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন। গত চার মাসে কোভিড-১৯ এর বিপর্যয়ের দিকে দৃষ্টিপাত করলে সহজেই বলা যেতে পারে যে এই রোগের সংক্রমণ রোধ করা পৃথিবীর বিভিন্ন পরাশক্তিদের জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে, এই ভাইরাসের সংক্রমণ রোধ করতে হলে সকলকে এক সাথে কাজ করতে হবে।

যদিও চীনেই প্রথম প্রথম কোভিড-১৯ রোগী সনাক্ত হয়েছিল, তার মানে এই নয় যে এই মরণঘাতী রোগের চিকিৎসা সমাধান বের করার দায়িত্ব শুধুমাত্র বেইজিংয়ের। সুতরাং, মহামারীটির বিস্তার রোধে সমস্ত বিশ্বকে এক সঙ্গে কাজ করতে হবে। আমাদের মনে রাখা উচিত যে এ জাতীয় মহামারী থেকে উদ্ধার পাবার জন্য প্রয়োজন অন্যের প্রতি সহানুভূতি এবং মমত্ববোধ প্রদর্শন করা।

আর এ জন্য উন্নত বিশ্ব এই মহামারী থেকে বিশ্বের মানুষকে বাঁচানোর জন্য কোভিড -১৯ এর সঠিক ভ্যাকসিন তৈরির জন্য কঠোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং কিভাবে একে অন্যকে সহযোগিতা করা যায় তার কৌশল খুঁজে বের করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এই সহযোগিতা বিভিন্ন ধরণের হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, একটি দেশের ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে সহায়তার জন্য অন্য দেশ চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রেরণ করতে পারে। আবার ভাইরাসের লক্ষণগুলো সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধিতে আরও বেশি বিনিয়োগ করতে পারে। এমনকি ভাইরাসের ভ্যাকসিন তৈরিতে এক দেশ অন্য দেশকে সহায়তা প্রদান করতে পারে। এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে একে অপরকে সহায়তা করা।

এটা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই যে কোভিড-১৯ মানবজাতির স্বাস্থ্য এবং বিশ্বব্যাপী শান্তি এবং অগ্রগতির জন্য একটি বড় হুমকি। ফলে এই সংক্রান্ত সকল বিপদ ও বাধাগুলো সম্মিলিতভাবে মোকাবেলার জন্য বৃহত্তর ঐক্য ও সহযোগিতা প্রয়োজন। এই মুহূর্তে সকলকে দোষারোপের রাজনীতি পরিহার করে এক সঙ্গে কাজ করতে হবে এই মাহমারি নিয়ন্ত্রণে। ডাবলু এইচ ও এর মহাপরিচালক টেড্রোস অ্যাডানম তাই যথার্থই বলেছেন যে : "আমাদের সকলকে ভাইরাসটির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মানবতার পক্ষে যোগদান করতে হবে এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করতে হবে। ভাইরাসটি আমাদের প্রত্যেকের জন্য হুমকিস্বরূপ, এবং আমাদের অবশ্যই ব্যক্তি হিসাবে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।"

বিশ্বজুড়ে নেতারা এভাবে পারস্পরিক সহযোগিতা করে আসছেন এই মহামারী মোকাবেলায়। ইতিমধ্যেই আমরা লক্ষ্য করেছি চীন সরকার বিভিন্ন দেশে সহযোগিতা প্রেরণ করেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মহামারী পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে চীনের প্রেসিডেন্ট এবং ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী উভয়েরই সমর্থন চেয়েছেন। এমনকি, ইউএসএ সরকারের প্রতিনিধি এই মহামারীতে বাংলাদেশ সরকারের পাশে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ সরকারও সাধ্যমত তাদের সহায়তা প্রদান করেছে। বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে এই জাতীয় আন্তরির্ভরতা এটিই ইঙ্গিত করে যে কোনও রাষ্ট্রই একা এই মহামারীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে সক্ষম নয়।

এই ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ে বেশিরভাগ দেশ অর্থনৈতিক সহায়তার চেয়েও অন্য দেশের সরকারের কাছ থেকে চিকিৎ্সা সহায়তা চেয়েছে বেশী করে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, বাংলাদেশ সরকার চীনসহ অন্যান্য দেশের সরকারের নিকট থেকে বিভিন্ন ধরণের চিকিৎসা সরঞ্জাম যেমন পিপিই, মাস্ক এবং স্যানিটাইজার পেয়েছে। আমাদের সরকার চীন, ভারত, মালদ্বীপসহ অন্যান্য দেশে বিভিন্ন ধরণের চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রেরণ করেছে।

দক্ষিণ এশিয়ার এই মহামারীটি তীব্রতা অভূতপূর্বভাবে সকল দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে একই ছাতার নিতে আনতে সক্ষম হয়েছে। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) -এর আট সদস্য দেশের নেতারা কোভিড-১৯-এর চ্যালেঞ্জ সম্মিলিতভাবে মোকাবিলা করার উপায় নিয়ে আলোচনা করতে একটি ভিডিও সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন। নেতারা সদস্য দেশগুলো অর্থিক অনুদানের সহায়তায় কোভিড-১৯ জরুরি তহবিল গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশই ইতিমধ্যে এই তহবিলের গঠনে অবদান রেখেছে। উক্ত আলোচনায় সরকার প্রধানরা কোভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামাদি ও প্রতিকারমূলক সামগ্রী, জীবাণুনাশক এবং সাবানের উপর শুল্ক হার উত্তোলনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই ধরনের উদ্যোগ একে অপরকে মারাত্মক রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করবে।

বৈশ্বিক মহামারী চলাকালীন উভয় দেশই একে অপরকে চিকিৎসা সরঞ্জামাদি দিয়ে সহায়তা করায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আবার আলোচনায় এসেছে। "প্রতিবেশী প্রথম" নীতি অনুসরণ করে, ভারত সরকার বাংলাদেশ সরকারকে ১০,০০০০ হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন ট্যাবলেট এবং ৫০,০০০ সার্জিক্যাল গাভস পাঠিয়েছে। এই সরঞ্জামগুলো দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার (সার্ক) কোভিড -১৯ জরুরি তহবিলের অধীনে বাংলাদেশে প্রেরণ করা হয়েছে। ভারত সরকার এর আগে বাংলাদেশ সরকারকে হেড কভার এবং ফেস মাস্কের চালান সরবরাহ করেছিল।

কোভিড-১৯-এর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এখন সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক সহযোগিতার। এর প্রধান কারণ কোভিড-১৯ পরবর্তী অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবেলা। কোভিড-১৯ এর প্রভাব হয়ত একদিন শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু এটি অর্থনীতির উপর যে প্রভাব রেখে যাবে তা থেকে বেরিয়ে আসা যে কোন দেশের সরকারের জন্য হবে একটি দূরহ কাজ। ফলে, এই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে প্রয়োজন একে অপরকে সহায়তা । আর এই সহায়তার মাধ্যমেই সম্ভব কোভিড-১৯ এর ট্রমা থেকে বের হয়ে এসে অর্থনীতিকে পুণনির্মান করা।

লেখকঃ প্রফেসর, লোক প্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত