স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দেশ পুনর্গঠন

74স্বাধীনতার পর একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন আওয়ামীলীগ সরকার নানাবিধ বাধাবিপত্তির সম্মুখীন হয়। পাক বাহিনীর হামলায় যাতায়াত ব্যাবস্থা এবং শিল্প কারখানাগুলো পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়, স্কুল, কলেজ, খাদ্য গুদাম গুলো সম্পূর্ণরূপে পুড়ে যায়।

এছাড়াও ছিল শহীদ পরিবারগুলোর পুনর্বাসন এবং এক কোটি শরণার্থী যারা ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল, তাদের ফিরিয়ে আনা এবং তাদের পুনর্বাসন সংক্রান্ত সমস্যা। দেশের অর্থনীতি পুরোপুরিভাবে ভেঙে পড়েছিল, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নেমে এসেছিল শূণ্যের কোঠায়। এমনকি খাদ্য গুদামগুলিও পুরোপুরি খালি হয়ে গিয়েছিল। দুর্ভিক্ষ ছিল অবশ্যম্ভাবী। ১৯৭২ সালের খরা, ১৯৭৩ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়, আরব-ইসরাইল যুদ্ধের ফলে বিশ্বব্যাপী মন্দা এবং ১৯৭৪ সালের বন্যা সার্বিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। নবগঠিত রাষ্ট্র বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে একটি বড় হুমকি ছিল স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তিসমুহের নানাবিধ ষড়যন্ত্র।
পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসের ১০ তারিখ দেশে ফেরেন বঙ্গবন্ধু। এরপর থেকেই তিনি দেশ পুনর্গঠনের কাজে সম্পূর্ণরূপে আত্মনিয়োগ করেন। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের সাফল্যগুলো ছিল নিম্নরূপঃ
১। স্বল্পসময়ের মধ্যেই দেশের যোগাযোগ ব্যাবস্থার প্রভূত উন্নতি সাধন; চট্টগ্রাম এবং চালনা বন্দর থেকে মাইন অপসারণ।
২। ভারতে আশ্রয় নেয়া এক কোটি শরণার্থীর পুনর্বাসন।
৩। শহীদ পরিবারগুলোকে অর্থনৈতিক সহায়তা প্রদান।
৪। ৩ লক্ষ বীরাঙ্গনার পুনর্বাসনের ব্যাবস্থা করা।
৫। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশ পাঠানো।
৬। স্বাধীনতার ৩ মাসের মধ্যে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে ফেরত পাঠানো।
৭। স্বাধীনতার ১০ মাসের মধ্যে পৃথিবীর অন্যতম সেরা একটি সংবিধান প্রণয়ন করা।
৮। সংসদীয় ব্যবস্থার প্রবর্তন।
৯। ১৯৭৩ সালে সাধারন নির্বাচন অনুষ্ঠান (৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৩টি আসনে জয়লাভ করে আওয়ামী লীগ) ।
১০। প্রতিরক্ষা বাহিনীর পুনর্গঠন।
১১। দেশে একটি বিজ্ঞানমুখী ও আধুনিক শিক্ষানীতি প্রণয়নের জন্য কুদরত-ই-খুদা কমিশন গঠন।
১২। বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ পাশ (১৯৭৩)।
১৩। ৪০ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ।
১৪। বিশ্বের ১৪০টি দেশের কাছ থেকে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতিপ্রাপ্তি।
১৫। ভারতের সাথে গঙ্গার পানি বণ্টণ চুক্তি স্বাক্ষর ইত্যাদি।

১৯৭৪ সালে যখন দেশে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি মাথা চাড়া দিয়ে উঠে, তখন স্বাধীনতার পক্ষের সকল শক্তিকে একই ছাতার নিচে আনার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন বঙ্গবন্ধু। এরই প্রেক্ষিতে ১৯৭৫ সালের ২৪শে জানুয়ারি গঠিত হয় বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ। জাতির জনক ঘোষণা দেন দ্বিতীয় বিপ্লবের যার মাধ্যমে তিনি দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা এবং এই সাথে জাতীয় ঐক্য পুনর্নিমানের স্বপ্ন দেখেছিলেন। এর ফলে দেশের আইন-শৃঙ্খলার প্রভূত উন্নতি হয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম কমে আসে, দেশে ফিরে আসে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা।

যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের সুযোগ্য নেতৃত্বে এগিয়ে যাচ্ছিল বাংলাদেশ, এমন সময় ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট ঘটে যায় ইতিহাসের বর্বরতম হত্যাকাণ্ড। সপরিবারে হত্যা করা হয় বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির সহায়তায় কিছু বিপথগামী সেনা কর্মকর্তা এবং প্রতিক্রিয়াশীল আর্ন্তজাতিক শক্তির এদেশীয় দোসররা মিলে ঘটায় বাঙালি জাতির ইতিহাসের নৃশংসতম এই হত্যাকাণ্ড।

Share this