জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ সৃষ্টির সুযোগ কাউকে দেওয়া হবে না: কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে শেখ হাসিনা
৫ ফেব্রুয়ারী ২০১২, ২৩ মাঘ ১৪১৮
শনিবার গণভবনে আওয়ামী লীগ কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ সৃষ্টির সুযোগ কাউকে দেওয়া হবে না। যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার ষড়যন্ত্র যে কোনো মূল্যে রুখে দেওয়া হবে। তাদের প্রতিহত করা হবে। তিনি স্বাধীনতাবিরোধী ও তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকার জন্য আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী আরও বলেন, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি দিলে আপত্তি নেই। কিন্তু অশান্তি সৃষ্টির ষড়যন্ত্র হলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনোভাবেই বিশৃঙ্খলা সহ্য করা হবে না। যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার ষড়যন্ত্র মেনে নেওয়া হবে না। এ দেশে অরাজকতার কোনো জায়গা নেই।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে এ বৈঠকে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু এমপিকে দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত আতাউর রহমান খান কায়সারের স্থলাভিষিক্ত হলেন। বৈঠকে ঐতিহাসিক ৭ মার্চ রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের 'শিখা চিরন্তন'-এর সামনে থেকে ধানমণ্ডির বঙ্গবন্ধু ভবন পর্যন্ত র্যালি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বৈঠকে ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, ১৭ মার্চ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন ও জাতীয় শিশু দিবস এবং ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে দলীয় কর্মসূচি চূড়ান্ত করা হয়েছে। এ বৈঠকে ফেব্রুয়ারি ও মার্চজুড়ে ঢাকাসহ দেশের সব জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সভা-সমাবেশের কর্মসূচি নেওয়া হয়। এ সময় ১৫ ফেব্রুয়ারি বিএনপির কারচুপির নির্বাচন দিবস এবং ৩০ মার্চ স্বৈরাচার বিএনপির পতন দিবস পালনের সিদ্ধান্ত হয়। সহযোগী সংগঠনগুলোর ব্যানারে এ দুটি দিবসে নানা কর্মসূচি হাতে নেওয়া হবে। কর্মসূচি চূড়ান্ত করতে আগামী সপ্তাহে দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সহযোগী সংগঠনগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বৈঠক করবেন। বৈঠকের শুরুতে সম্প্রতি প্রয়াত দলের বর্ষীয়ান জননেতা আবদুর রাজ্জাক, জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মা গায়ত্রী দেবীসহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মৃত্যুতে শোক প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। ১২ মার্চ বিএনপির 'চলো চলো ঢাকা চলো' কর্মসূচির দিনে মাঠ দখলে রাখার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বাংলা ভাষার দাবিতে ফেব্রুয়ারিতে রক্ত ঝরেছে। মার্চ মুক্তিযুদ্ধের মাস। এ দুই মাস মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির ধারাবাহিক রাজনৈতিক কর্মসূচি থাকবে। সভা-সমাবেশসহ নানা কর্মসূচির মাধ্যমে জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত করবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি।
আমাদের যে অর্জন হয়েছে তা ধরে রাখতে হবে : সৈয়দ আশরাফ
বৈঠকের শুরুতে দলের সাধারণ সম্পাদক এলজিআরডিমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম আর যাতে খালেদা জিয়া ক্ষমতায় আসতে না পারেন_ সে জন্য সতর্ক থাকতে নেতাকর্মীসহ দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এলে এদেশ আবারও সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, আত্মঘাতী বোমা হামলা ও তালেবানের দেশে পরিণত হবে। তাই বাংলাদেশ যাতে আর কোনো দিনই 'খালেদা জিয়ার বাংলাদেশ' হতে না পারে_ সে জন্য সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। দুর্নীতির জাতি হিসেবে আমরা আর পৃথিবীতে পরিচিত হতে চাই না। সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম দলের নেতাদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘আমাদের যে অর্জন হয়েছে তা ধরে রাখতে হবে। এজন্য আরো সতর্ক ও সচেতন থাকতে হবে।’ তিনি বলেন, শেয়ারবাজার পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের কিছু করার নেই। এর নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসইসি। অনেক সময় গুজব ও আস্থার সংকটে শেয়ারবাজারের দর ওঠানামা করতে পারে। এ দরের ওঠানামাও একটি স্বাভাবিক বিষয়। সব সময় যদি দর বাড়তেই থাকবে_ তাহলে সব বিনিয়োগ এখানেই হতো। সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরই শেয়ারবাজারের ভালো-মন্দ বোঝা যাবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সরকারের অর্জনকে দেশ ও জনগণের অর্জন হিসেবে উল্লেখ করে এটি জনগণের মাঝে তুলে ধরতেও নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান সৈয়দ আশরাফ।
সংসদে 'অ্যাক্সিডেন্ট ইজ অ্যাক্সিডেন্ট'_ নিজের এমন বক্তব্য মিডিয়ায় ভুলভাবে উদৃব্দত হয়েছে এমন দাবি করে সৈয়দ আশরাফ বলেন, কেবল প্রথম আলোয় তার বক্তব্য সঠিকভাবে এসেছে। তিনি সংসদে বলেছিলেন, দুর্ঘটনাকে দুর্ঘটনা হিসেবে ধরা হলে সেটা দুর্ঘটনায়ই হয়ে যায়। তবে সব দুর্ঘটনাই দুর্ঘটনা নয়। কোনো চালক যদি ইচ্ছাকৃতভাবে কারও ওপর গাড়ি তুলে দেয়, লাইসেন্স ছাড়া কিংবা মাদকাসক্ত অবস্থায় কিংবা উচ্চগতিতে গাড়ি চালিয়ে দুর্ঘটনা ঘটায়, সেটা দুর্ঘটনা হতে পারে না। সেটা অপরাধ।
বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে সন্ত্রাসী, জঙ্গি ও আত্মঘাতী বোমা-গ্রেনেড হামলার উল্লেখ করে তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার কুকীর্তি, দুই ছেলেকে রক্ষার অপচেষ্টা এবং বিডিআর হত্যাসহ তার স্বৈরশাসন ও অত্যাচার-নির্যাতনের কথা দেশের মানুষকে স্মরণ করিয়ে দিতে হবে। কেননা মানুষ দ্রুত অতীত ভুলে যায়।
তিনি বলেন, শেখ হাসিনার সময় দেশে কোনো বিচারালয় কিংবা কোথাও আত্মঘাতী বোমা হামলা হয়নি। খালেদা জিয়ার কোনো সভা-সমাবেশে গ্রেনেড হামলাও চালানো হয়নি। এটাই সরকারের বড় সাফল্য। আমরা ক্ষমতায় আসায় দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার সুযোগ হয়েছে। বাংলাদেশ এখন আর তালেবান কিংবা আল কায়েদার দেশ নয়।
লন্ডনে সাম্প্রতিক সময়ে নির্বাচিত মেয়রকে হত্যার উদ্দেশে জঙ্গি হামলার পরিকল্পনা বানচাল হওয়ার উল্লেখ করে তিনি বলেন, সে পরিস্থিতি দেশে নেই বলেই এখন আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার ওপর হামলার পরিকল্পনা হলে সেটা দেশে হবে না, লন্ডনে হবে।
জাতীয় ইস্যুতে সংলাপের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি বলেন, সংলাপ করতে মিডিয়া গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বাংলাদেশ আবারও যাতে পৃথিবীতে সন্ত্রাসী দেশ হিসেবে পরিচিত না হতে পারে_ সে ক্ষেত্রেও মিডিয়াকে এগিয়ে আসতে হবে। গণতন্ত্রে দুটি সহযোগী রয়েছে_ মিডিয়া ও জনগণ। এ প্রসঙ্গে কোনো সংবাদপত্রের নাম উল্লেখ না করে তিনি বলেন, কয়েক দিন আগে একটি পত্রিকায় জরিপ প্রকাশ হলো। এ জরিপ কারা করেছে, কীভাবে করেছে ও কাদের ওপর করা হয়েছে_ তার কোনো উল্লেখ ছিল না। এখন আমি যদি ঘরে বসে কোনো জরিপ করি তার মনগড়া ফলও আসবে_ যেটি আমি চাই।
সভায় ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ, ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন এবং ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। ৭ মার্চ গণর্যালি আয়োজন করার সিদ্ধান্ত হয়। সোহরাওয়ার্দি উদ্যান থেকে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর পর্যন্ত এ র্যালি অনুষ্ঠিত হবে।
