আজ আমাদের জন্যে একটি ঐতিহাসিক দিন, বিদেশীদের এই সম্মাননা দিতে পারা আমাদের জন্যও সম্মানের: শেখ হাসিনা
মঙ্গলবার, ২৭ মার্চ ২০১২, ১৩ চৈত্র ১৪১৮
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য, মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলিতে বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নিয়ে নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতা দিয়ে বাঙালির স্বাধীনতার সংগ্রামে প্রেরণা যোগানোর জন্য বিদেশি বন্ধুদের আজ রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মাননা জানানো হয়। রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বিদেশি বন্ধুদের হাতে সম্মাননা পদক তুলে দেন। মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে 'মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা' ও 'বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা' প্রদান অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিদেশি অতিথিদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, "আজ আমি অত্যন্ত আনন্দিত যে, আমরা জাতি হিসেবে কিছুটা দেরিতে হলেও আপনাদের সেই অমূল্য অবদানের স্বীকৃতি দিতে পারছি। আমি আমার নিজের এবং দেশবাসীর পক্ষ থেকে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সকল নাম জানা-অজানা বিদেশি বন্ধুর প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।"
তিনি বলেন, "বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে যেসব বিদেশী নাগরিক, প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সাহায্য-সহযোগিতা দিয়েছিলেন, তাদের কাছে আমাদের ঋণের শেষ নেই। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সেই দুঃসময়ের বন্ধুদের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা জানানোর জন্য আজকের এই আয়োজন, আজ আমাদের জন্যে একটি ঐতিহাসিক দিন, তাদের এই সম্মাননা দিতে পারা আমাদের জন্যও সম্মানের। শুধু তাদের নয়, আমরা নিজেদেরও সম্মাননা দিচ্ছি।'তিনি বলেন, 'এর আগে আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে ১৯৯৮ সালের ৭ মার্চ জাতীয় সংসদের উত্তর প্লাজায় দেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সন্মাননা দিয়েছিলো। এবার ক্ষমতায় এসে প্রথমে শ্রীমতি ইন্ধিরা গান্ধীকে স্বাধীনতা সন্মাননা দেওয়া হয়। এবার মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশকে সাহায্য করেছেন এমন ৫৬১ জনের নামের তালিকা আমরা করি। সেখান থেকে ৫৩৫ জনের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়েছে। আজকের অনুষ্ঠানে উপস্থিত রয়েছেন ৭৬ জন।'
প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'আমরা চেষ্টা করব আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সাহায্যকারী প্রতিটি বন্ধুকে সন্মাননা জানাতে।' তিনি বলেন, 'মুক্তিযুদ্ধের সময় পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুক, কেউ লিখে সাহায্য করেছেন, কেউ শরণার্থী শিবিরে এসে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। আবার অনেক বিদেশি আমাদের মুক্তি বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে সহযোগিতা করেছেন। আবার অনেকে প্রেরণা যুগিয়েছেন।' প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'মুক্তিযুদ্ধের সময় অনেক বিদেশি সাংবাদিক জীবন বাজি রেখে যুদ্ধের সংবাদ প্রকাশ করেছেন। এ কারণে অনেকে তাদের নিজ দেশে জেল খেটেছেন আবার অনেকের চাকরি গেছে। অনেকেই মুক্তিযুদ্ধে আহতদের সেবা করে সুস্থ করে তুলেছেন।' প্রধানমন্ত্রী নিজে ও দেশবাসীর পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন সন্মানিত বিদেশি বন্ধুদের প্রতি। সেই সঙ্গে তিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জাতীয় চার নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানান। তিনি আরো বলেন, 'মুক্তিযুদ্ধের সময় যিনিই বাংলাদেশের পক্ষে একটি কথা বলেছেন তাই কাজে লেগেছে। আমি মায়ের সঙ্গে বন্দি ছিলাম। আমাদের কাছে একটি রেডিও ছিল। রেডিওতে আমরা বিবিসি, আকাশবাণী শুনতাম। দেখেছি বিদেশিরা কিভাবে আমাদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।' 'মুক্তিযুদ্ধে যারা অবদান রেখেছেন তাদের সন্মাননা দিতে আমাদের কিছু সময় লেগেছে। কারণ, যারা দেশকে স্বাধীন করেছে, মুক্তিযুদ্ধ করেছে তারা স্বাধীনতার পর থেকে ধারাবাহিকভাবে ক্ষমতায় থাকতে পারেনি।' প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'সারা বিশ্বের যে যেখান থেকে মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশকে সাহায্য করেছেন তাদের পর্যায়ক্রমে সন্মাননা জানানো হবে।' তবে আমি বিশ্বাস করি, আজকের সম্মান প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতির ইতিহাসের কঠিনতম সময়ে আমাদের পাশে যারা অবিচল ছিলেন, তাদের সকলকেই সম্মান করা হচ্ছে", যোগ করেন তিনি।
"আমরা সমর্থন পেয়েছিলাম প্রতিবেশীর কাছ থেকে। সাহায্য পেয়েছিলাম কাছের এবং দূরের দেশ থেকেও। সাহায্য এসেছিল ব্যক্তি থেকে, সংগঠন থেকে। সেখানে কোন জাতি, ধর্ম, বর্ণ বা রাজনৈতিক ভেদাভেদ ছিল না। এই সমর্থন ছিল সার্বজনীন এবং বাছ-বিচারহীন। আমাদের জাতীয় পরিচয়, আমাদের একটি জাতীয় পতাকা এবং জাতীয় সংগীত অর্জনের এই সংগ্রামে আমরা আপনাদের কাছে চিরঋণী," বলেন তিনি। চার দশক পর বাংলাদেশ যখন 'গণতন্ত্র এবং উন্নয়নের সংগ্রামে' লিপ্ত তখনও বিদেশি বন্ধুদের কাছ থেকে একই ধরনের 'প্রেরণা এবং মনোবল' প্রত্যাশা করেন প্রধানমন্ত্রী।
যেসব দেশের ব্যক্তি ও সংগঠন সম্মাননা পেয়েছে সেসব দেশ হচ্ছে- ভারত, রাশিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ড, সাবেক যুগোস্লাভিয়া, ইতালি, জাপান, নেপাল, কিউবা, আর্জেন্টিনা, ভিয়েতনাম, জার্মানি, আয়ারল্যান্ড, ভেনিজুয়েলা, সুইজারল্যান্ড, ভুটান, সুইডেন, ডেনমার্ক, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, নেদারল্যান্ডস, দক্ষিণ কোরিয়া, পোল্যান্ড, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, অস্ট্রিয়া ও কানাডা।
তালিকার মধ্যে রয়েছেন- ভারতের সিদ্ধার্থ শংকর রায়, বিচারপতি সা'দাত আবুল মাসুদ, মহারানী বিভা কুমারী দেবী, সমর সেন, দেবদুলাল বন্দোপাধ্যায়, পণ্ডিত রবিশংকর, ওস্তাদ আলী আকবর খাঁ, ওয়াহিদা রেহমান, অভিনেতা সুনীল দত্ত, নার্গিস দত্ত, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, অন্নদাশংকর রায়, জগজীবন রাম, ভূপেন হাজারিকা, ফিল্ড মার্শাল এস এ এম মানেকশ, লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা, লে. জেনারেল জ্যাকব, দশরথ দেব বর্মণ, শিল্পী লতা মুঙ্গেশকর, ডি পি ধর, জেনারেল উবান, গোলক মজুমদার।
অন্যান্য দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন- রাশিয়ার আন্দ্রে গ্রোমিকো, আলেক্সি নিকোলায়েভিচ কোসিগিন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর অ্যাডওয়ার্ড মুর কেনেডি, রিচার্ড টেইলর, লিয়ার লেভিন, অ্যালেন গিন্সবার্গ, ব্রিটেনের স্যার অ্যাডওয়ার্ড রিচার্ড জর্জ হিথ, লর্ড হ্যারল্ড উইলসন, সায়মন ড্রিং, বিশ্বখ্যাত গায়ক জর্জ হ্যারিসন, জুলিয়ান ফ্রান্সিস, মার্ক টালি, যুগোস্লাভিয়ার মার্শাল জোসেফ ব্রুজ টিটো, নেপালের বি পি কৈরালা, অস্ট্রেলিয়ার উইলিয়াম এস এস ওডারল্যান্ড প্রমুখ।
বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে রয়েছে- তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির পলিট ব্যুরো, ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং করপোরেশেন (বিবিসি), ভারতের আকাশবাণী, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সহায়ক সমিতি, রেডক্রস, জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর), বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা অক্সফাম।
