Elektronik Sigara ঐতিহাসিক মুজিবনগর সরকার-মোহাম্মদ শাহজাহান

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু

ঐতিহাসিক মুজিবনগর সরকার-মোহাম্মদ শাহজাহান

মঙ্গলবার, ১৭ এপ্রিল ২০১২, ৪ বৈশাখ ১৪১৯

২৬ মার্চ, ১৬ ডিসেম্বর, ৭ মার্চের মতো ১৭ এপ্রিলও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে এক অনন্য দিন। এ দিনেই কুষ্টিয়ার মেহেরপুরের আম্রকাননে শপথ গ্রহণ করে বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে গঠিত হয় প্রবাসী সরকার। সৈয়দ নজরুল ইসলাম ছিলেন উপ-রাষ্ট্রপতি। রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতির কারণে তাঁর দায়িত্ব বর্তায় উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের ওপর।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. আতিউর রহমান যথার্থই বলেছেন, 'একাত্তরের ৯ মাসে বঙ্গবন্ধু শারীরিকভাবে আমাদের মাঝে না থাকলেও তিনি ছিলেন বাঙালির নিঃশ্বাসে-প্রশ্বাসে।' বঙ্গবন্ধুই ছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণা। তাঁর নামেই স্বাধীনতাযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে। '৭১-এর ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের আম্রকাননে আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধ পরিচালনার জন্য যে প্রবাসী সরকার গঠিত হয় সেই সরকারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। সবাই জানতেন, বঙ্গবন্ধু তখন পাকিস্তানি কারাগারে বন্দি। তিনি জীবিত না মৃত, এটাও তখন অজানা। এর পরও শেখ মুজিবের মতো জননন্দিত, সুযোগ্য এবং দেশ ও আন্তর্জাতিক বিশ্বের কাছে গ্রহণযোগ্য অন্য কোনো দ্বিতীয় নেতা সে সময় আওয়ামী লীগে বা বাংলাদেশে ছিল না। স্বাধীনতা-উত্তরকালে প্রায় সব সরকারের মন্ত্রী, স্বৈরশাসকদের খুবই কাছের মানুষ, সুবিধাবাদী রাজনীতিক আওয়ামী লীগবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত বর্তমানে বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ তাঁর নিজের গ্রন্থে এ প্রসঙ্গে লিখেছেন, কেন সেদিন শেখ মুজিবকে স্বাধীনতাযুদ্ধ পরিচালনাকারী সরকারের রাষ্ট্রপ্রধান করা হয়। মওদুদ আহমদ লিখেছেন, 'আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ জানতেন যে একমাত্র শেখ মুজিবের নামে সংগ্রাম পরিচালনা করলেই জনগণের সমর্থন অর্জন করা সম্ভব। এটা ছিল বাস্তবিক অর্থে বিস্ময়কর যে শেখ মুজিব পাকিস্তানি বাহিনীকে প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হলেও এবং নিজে গ্রেফতার বরণ করলেও তাঁর জনপ্রিয়তা এবং ভাবমূর্তি ছিল অটুট। এভাবে এমন একজনের নামে ৯ মাসব্যাপী সংগ্রাম পরিচালনা করা হয়_ যিনি স্বয়ং সংগ্রামে উপস্থিত ছিলেন না এবং কোনোদিন নিজ বাসভূমিতে ফিরে আসবেন এমন নিশ্চয়তা ছিল না। মুজিবের জীবনে এটাই ছিল সর্বোচ্চ সাফল্য।'
আজকে যারা বঙ্গবন্ধুকে অস্বীকার করে তৎকালীন মেজর (পরে জেনারেল) জিয়াকে স্বাধীনতার কৃতিত্ব দিচ্ছেন, মুজিববিদ্বেষী মওদুদের উপরোক্ত মন্তব্য দেখে কিছুটা হলেও তাদের লজ্জিত হওয়ার কথা। '৭১-এর ২৫ মার্চ রাতের ভয়াবহ হামলার পর ১৭ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে সরকার গঠন করার সিংহভাগ কৃতিত্বই ছিল তাজউদ্দীন আহমদের। দেশি-বিদেশি অসংখ্য সাংবাদিক ও বহু নেতাকর্মীর উপস্থিতিতে বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপ-রাষ্ট্রপতি, তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী, এম মনসুর আলী, খোন্দকার মোশতাক আহমদ ও এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে মন্ত্রী পরিষদের সদস্য, কর্নেল (অব.) এম এ জি ওসমানীকে প্রধান সেনাপতি করে প্রবাসী সরকার ঘোষণা করা হয়। এর আগে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ ও পূর্ব পাকিস্তান পরিষদের নির্বাচিত এমএনএ ও এমপিএরা স্বাধীনতাযুদ্ধ পরিচালনার জন্য সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ১৭ এপ্রিল অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুলকে গার্ড অব অনার প্রদান করেন প্রধান সেনাপতি ওসমানী ও মাহবুব আহমদের নেতৃত্বে একদল তরুণ সৈনিক মুক্তিযোদ্ধা। অথচ গত চার দশক ধরে স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃতকারী একদল বিকৃতমনা মানুষ প্রধান সেনাপতি ওসমানীকেই সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক বলে অপপ্রচার করে যাচ্ছে। শপথ গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এক সংবাদ সম্মেলনে যুদ্ধ পরিচালনাকারী সরকারের রাজধানীর নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নামে 'মুজিবনগর' নামকরণ করেন। শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে চিফ হুইপ অধ্যাপক ইউসুফ আলী স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। স্বাধীনতার সেই ঐতিহাসিক ঘোষণাপত্র রচনা করেন ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম। পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের অন্যতম হুইপ ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম, মুজিবনগর সরকার গঠন এবং শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের আয়োজনের ব্যাপারেও তাজউদ্দীন আহমদ ও অন্যদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে সুুস্পষ্টভাবে বলা হয়, 'পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের বিশ্বাসঘাতকতা ও অন্য অনুরূপ ঘটনাবলির পরিপ্রেক্ষিতে, বাংলার সাড়ে ৭ কোটি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বাংলার মানুষের ন্যায়সংগত স্বাধিকারের জন্য ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বাংলার স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং বাংলার স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান।' ঐতিহাসিক সেই ঘোষণাপত্রে আরো লেখা হয়, 'আমরা, যারা বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রতিনিধি এবং বাংলাদেশের জনগণ আমাদের ওপর যে গুরুদায়িত্ব ন্যস্ত করেছে তাদের ইচ্ছার প্রতিফলনে আমরা একটি গণপরিষদ গঠন করলাম এবং আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এবং বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে সাম্য, মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তার জন্য, বাংলাদেশকে সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী এবং বঙ্গবন্ধু কর্তৃক ঘোষিত স্বাধীন বাংলাদেশের স্বীকৃতি ঘোষণা করছি এবং যে পর্যন্ত না একটি সংবিধান প্রণয়ন করা হয় সে পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রেসিডেন্ট এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকবেন এবং প্রেসিডেন্ট, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সশস্ত্র বাহিনীসমূহের সর্বাধিনায়ক থাকবেন এবং তিনি রাষ্ট্রের সমুদয় নির্বাহী ও রাষ্ট্রীয় অন্যান্য ক্ষমতাসহ ক্ষমতা প্রদানের ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন।... আমরা আরো ঘোষণা করছি যে, স্বাধীনতার এই ঘোষণা ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ হতে কার্যকর হবে।'
স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে আরো বলা হয়, 'রাষ্ট্রপতির অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি তাঁর সমুদয় দায়িত্ব পালন করবেন।' উল্লেখ্য, পাকিস্তানি বাহিনীর পৈশাচিক হামলার কয়েক ঘণ্টা পরই '৭১-এর ২৭ মার্চ ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামকে নিয়ে তাজউদ্দীন আহমদ ঢাকা ত্যাগ করেন। ৪ এপ্রিল তাজউদ্দীন আহমদ দিলি্লতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে ভারত সরকারের সাহায্য-সহযোগিতা কামনা করেন। কয়েক দিনের মাথায় দ্বিতীয়বার ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর ১০ এপ্রিল তাজউদ্দীন আহমদ ভারতের একটি বেতারকেন্দ্র থেকে নবজাত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভাষণ দেন। বেতারে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনের ভাষণের পর বাংলাদেশের স্বাধীনতার কথা বিশ্ববাসী জানতে পারল। শেখ মুজিবের নামে সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে পরিচালিত মুজিবনগর সরকার কার্যত একটি পূর্ণাঙ্গ সরকার হিসেবেই যুদ্ধ পরিচালনা করে। এ সরকারের অধীনেই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র মুক্তিযুদ্ধে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মুজিবনগর সরকার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রধান সেনাপতি ওসমানী, উপ-প্রধান সেনাপতি এ কে খোন্দকার, চিফ অব স্টাফ আবদুর রবের পরিচালনায় সমগ্র বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করে লাখ লাখ মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে যুদ্ধ পরিচালনা করেন। এখনো যারা বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দীনদের অবদান বাদ দিয়ে ১১ জনের অন্যতম একজন সেক্টর কমান্ডার ২৫ মার্চ রাত পর্যন্ত পাকিস্তানের অনুগত জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতাযুদ্ধের সব কৃতিত্ব প্রদানের ব্যর্থ প্রয়াস চালাচ্ছে_ তাদের প্রতি শুধু করুণাই করতে হয়। কিন্তু তারা জানে না_ 'অন্ধ হলেই প্রলয় বন্ধ হয় না।' মহাকালের অমোঘ নিয়মে ইতিহাস বিকৃতকারীরা একদিন নিশ্চিতভাবেই ইতিহাসের অাঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবে এবং স্বাধীনতাযুদ্ধে মুজিবনগর সরকারের নেতাদের অবদানের কথা বাংলার মানুষ চিরকাল শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে।
লেখক : সাপ্তাহিক বাংলাবার্তা সম্পাদক

অনলাইন রেডিও

You are here আর্কাইভ