১৭ এপ্রিল মুজিবনগর দিবস : জাতীয় শপথ দিবস ঘোষণা করা হউক : রফিকুল আলম
১৭৫৭ সালে বাঙালি জাতির স্বাধীনতার লাল সূর্য পলাশীর প্রান্তরে ব্রিটিশ আক্রমণকারীদের হাতে অপমানজনক পরাজয় বরণ করে অস্তমিত হয়েছিল। আর তখন থেকেই এ সাহসী জাতি স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম শুরু করেছিল। তাদের এই সুদীর্ঘ সংগ্রামের ফসল চূড়ান্তভাবে বাস্তবায়িত হয়েছিল ১৭ এপ্রিল ১৯৭১ সালের এই দিনে মেহেরপুর জেলার মুজিবনগরে। বাঙালি জাতি তাদের স্বাধীনতার লাল-সবুজ নিশান পুনরায় উত্তোলন করেছিল গ্রীষ্মের এই দিনে মেহেরপুর জেলার মুজিবনগর উপজেলার বাগোয়ান ইউনিয়ন পরিষদের নিভৃত পল্লী বৈদ্যনাথতলায়।
মহান নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ঘোষণার মধ্যে ১৯৭১ সালে ২৫ মার্চ গভীর রাতে একটি জাতি এবং সার্বভৌম একটি দেশ পুনর্জন্ম লাভ করেছিল। বাঙালি জাতির হাজার বছরের লালিত স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিয়েছিল এই মুজিবনগরে। খুব ছোট পরিসরে পুরো ঘটনাবলি ব্যক্ত করা খুবই কঠিন। ইতিহাসের পাতায় অনেক দেশের স্বাধীনতার গল্প পড়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে; কিন্তু নিজের সামনে একটা দেশের জন্ম দেখার অনুভূতি আমি ভাষায় বর্ণনা করতে পারব না। তখন আমি দশম শ্রেণীর ছাত্র ছিলাম। যাহোক আমরা ইতিহাসের দিকে চোখ ফিরায়।
অনেক জীবন এবং এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ পেয়েছিল তার আসল বাস্তবতা। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বাঙালি জাতির আন্দোলনের কারণ সম্পর্কে সেই ১৮৮৫ সাল থেকে শুরু করে ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন পর্যন্ত অনেক ঘটনায় উল্লেখ করেছেন। বাংলাদেশিদের স্বপ্ন চূড়ান্তভাবে বাস্তবায়িত হয়েছিল ১৯৭১ সালে ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর আম বাগানে, যেখানে বাংলাদেশের প্রথম সরকার শপথ নিয়েছিল। সেখানে সেই মহতী অনুষ্ঠান প্রত্যক্ষ করেছিলেন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক, সাংবাদিক, পর্যবেক্ষক এবং বিশিষ্ট বাজনীতিবিদরা। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র নামে একটি রেডিও সেন্টার স্থাপন করে প্রথম সরকারের শপথ অনুষ্ঠান সারাদেশে সম্প্রচার করা হয়েছিল এবং মুজিবনগর সেদিন পেয়েছিল ঐতিহাসিক মর্যাদা।
মুসলিম এলাকায় মুসলিম রাষ্ট্র গঠন করা হবে এ শর্তের মাধ্যমে ১৯০৫ সালেই বপন হয়েছিল বাংলাদেশের বীজ। যার অঙ্কুরোদগম হয়েছিল ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তথাকথিত মুসলিম মতবাদ। পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী আমাদের শাসনের নামে শোষণ, নিপীড়ন, বঞ্চিত করেছিল সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিশাল অসমতা সৃষ্টি করে।
ফলে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার নেতৃবৃন্দ একে ফজলুল হক, মওলানা আবদুল হক খান ভাসানী, সোহরাওয়ার্দী এবং শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫৪ সালে ১১ দফা দাবি দিয়েছিলেন। দাবির মধ্যে অন্যতম ছিল_ বাংলা ভাষা, ভূমিহীনদের মধ্যে ভূমি বণ্টন, শিক্ষা জাতীয়করণ, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণসহ পুনর্বাসন, ২১ ফেব্রুয়ারিতে শহীদ দিবস পালন সভা অনুষ্ঠানের অনুমতি প্রভৃতি। বাঙালি জাতির এ নৈতিক সাহসিকতা দেখে তখনই ভয় পেয়েছিল পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী।
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে ১৬৯ আসনের মধ্যে ১৬৭টিতে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীদের জয়যুক্ত করেছিল সাধারণ জনগণ। কিন্তু ক্ষমতালোভী পাকিস্তানি শাসকরা নিয়মানুযায়ী ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন। ১৯৭১-এর ২৫ মার্চের সেই কালো রাতে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানিদের হাতে গ্রেফতার হওয়ার কিছু আগে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তখন বর্বর হানাদাররা নিরস্ত্র ঘুমন্ত মানুষের ওপর অতর্কিতে গোলাবর্ষণ করছিল। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার পর আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব জনগণের পূর্ণ বিশ্বাস ও সমর্থন পেয়েছিল। তাদের ডাকে জনগণ গোপন আশ্রয় নিয়েছিল এবং দেশকে মুক্ত করার জন্য স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।
১০ এপ্রিল ১৯৭১ এক ঘোষণার মাধ্যমে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয়েছিল, যা মুজিবনগর থেকে ইস্যু করা হয়েছিল। উল্লেখ্য, এ ঘোষণা বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পূর্বের ঘোষণাকে দৃঢ়করণ করে। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশের প্রথম প্রবাসী সরকারের রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ।
সে সময় পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী মেহেরপুরকে করতলে নিলেও পেঁৗছতে পারেনি বৈদ্যনাথতলায়। তদানীন্তন মেহেরপুর মহাকুমার বাগোয়ান ইউনিয়নের নিভৃত পল্লী বৈদ্যনাথতলা। স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন পুরো সময়টুকু এ জায়গাটি ছিল নির্বিঘ্ন। ব্রিটিশ শাসনামলে পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার অন্তর্গত মেহেরপুর ছিল মহাকুমা শহর। সে সুবাদে কলকাতার সঙ্গে এই বৈদ্যনাথতলার সরাসরি সড়ক যোগাযোগের ব্যবস্থা ছিল।
সরকার গঠনের পর মুজিবনগরকে অন্তর্বর্তীকালীন রাজধানী ঘোষণা করা হয়েছিল। পাশাপাশি স্বাধীতার ফরমান জারি করে মুক্তিযুদ্ধ শুরু করা হয়েছিল। এই সময় ও শপথ গ্রহণের স্থানকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে বৈদ্যনাথতলা নাম পরিবর্তন করে নাম রাখা হয় মুজিবনগর। তখন থেকে ১৭ এপ্রিলকে বলা হয় মুজিবনগর দিবস এবং তখন থেকেই এ দিনটি মুজিবনগর দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। মুজিবনগর সরকার দেশকে ৬টি জোনাল কাউন্সিলে ভাগ করেছিল, যা জনগণের সমস্যার দেখভাল করত। সে সময় মুজিবনগর হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশের প্রেরণার উৎস এবং জাতির ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখতে যথাসম্ভব যা কিছু করার ছিল তাই করেছিল।
মুজিবনগরে বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠন আমাদের মুক্তি সংগ্রামে এবং ইতিহাসে এক মাইলফলক, যা বিশ্বকে সাহায্য করেছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করতে। পরবর্তীতে চূড়ান্তভাবে স্বীকৃত পেয়েছিল একটি নতুন স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে। মুজিবনগরে অস্থায়ীভাবে স্থাপিত হয়েছিল সেক্রেটারিয়েট, যার ক্যাম্প অফিস স্থাপন করা হয়েছিল কলকাতার ৮নং থিয়েটার রোডে।
প্রতি বছর এই নির্ধারিত দিনে মুজিবনগর আম বাগানে কিছু উচ্চপদস্থ নেতা ও রাজকর্মচারীরা আসেন এবং সুখী, সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গড়ার শপথ নেন। কিন্তু আমরা আজও বুঝতে পারি না এ বিশেষ দিনটিকে কেন জাতীয় শপথ দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয় না? বর্তমান সরকার অনেক কাজ করছে তার ভেতর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার অন্যতম। অথচ যে দিনটির জন্য এত কিছু সে দিনটি আজও পেল না রাষ্ট্রীয় মর্যাদা। অর্থাৎ জাতীয় শপথ দিবস হিসেবে স্বীকৃতি জোটেনি।
পরিশেষে এ জেলার একজন নাগরিক হিসেবে আমি বলতে পারি, বাংলাদেশ পৃথিবীতে এবং বিশ্ব মানচিত্রে একটি গর্বিত ও সম্মানিত জাতি হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। কিন্তু ১৭ এপ্রিল আজও তার মর্যাদা পূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায়নি। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বর্তমানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন। এ সরকারের কাছে জনগণের দাবি, ১৭ এপ্রিলকে রাষ্ট্রীয়ভাবে 'জাতীয় শপথ দিবস' ঘোষণা করা হউক। যেহেতু ১৭ এপ্রিলের ইতিহাস কোন দল বা গোষ্ঠীর একার ইতিহাস নয়, তাই যে দল জনগণের রায় নিয়ে ভোটে নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করবে তারা ক্ষমতার মসনদে বসার আগে এ মুজিবনগরে এসে শপথ নিতে হবে। আর বছরে অন্তত ৪টি মন্ত্রিপরিষদের সভা মুজিবনগরে অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলে জনগণ ও আগামী প্রজন্ম বুঝবে ১৭ এপ্রিল কী আর মুজিবনগরই বা কী। তাছাড়া মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ জনগণ বাংলাদেশ টেলিভিশনে জাতীয় সংবাদ প্রচারিত হওয়ার আগে জাতীয় স্মৃতিসৌধের পাশাপাশি মুজিবনগরে অবস্থিত স্মৃতিসৌধটিও দেখতে চায়। বাংলাদেশ সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা মুজিবনগর দিবসে ১৭ এপ্রিলকে জাতীয় শপথ দিবস হিসেবে ঘোষণা দেবেন, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
[লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট, সভাপতি মেহেরপুর রিপোর্টার্স ইউনিটি]
