দুর্দিনের প্রধানমন্ত্রী এলেন, জয় করলেন, নীরবে চলে গেলেন
সরদার সিরাজুল ইসলাম
মঙ্গলবার, ১৭ এপ্রিল ২০১২, ৪ বৈশাখ ১৪১৯
বিংশ শতাব্দীতে বিরল এক মানুষের আবির্ভাব হয়েছিল, দূরে কোথায়ও নয়, এই ভূখণ্ডে, সে খবর আমরা ভুলতে বসেছি। সংগ্রামী এই মানুষটির নাম তাজউদ্দীন আহমদ। বঙ্গবন্ধু পাক কারাগারে, তাঁর অবর্তমানে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় তাজউদ্দীন। বঙ্গবন্ধু পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। তাজউদ্দীন আহমদের পরিবার কলকাতায় কিন্তু তিনি পরিবারের সঙ্গে থাকেননি। প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রীর দফতরেই ছিল তাঁর অফিস কাম রেসিডেন্স। পঁচিশের (মার্চ '৭১) রাতে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের যে চাবিটি তাজউদ্দীন আহমদের কাছে দিয়েছিলেন। দেশ হানাদারমুক্ত এবং সার্বভৌমত্ব নিরঙ্কুশ করে, সেই চাবিটি ১২ জানুয়ারি ('৭২) ফেরত দিয়ে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন তাতে নেতাকে ভালবাসায় এতটুকু খাদ 'এক্সরে আই' দিয়েও খুঁজে পাওয়া যাবে না।
বাঙালীর কৃতিত্বের কেন্দ্রবিন্দু জাতির জনক বঙ্গবন্ধু। তাঁর ঈর্ষণীয় সফলতার পেছনে ছিল নিবেদিতপ্রাণ অগণিত নেতাকর্মী জনতা। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নের চীফ ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন তাজউদ্দীন। মাও সেতুংয়ের যেমনি চৌ-এন-লাই, গান্ধীর নেহরু, তেমনি বঙ্গবন্ধুর তাজউদ্দীন।
সত্যকে স্পষ্ট করে বলা ভাল। বঙ্গবন্ধুকে যদি একাই এক শ' বলা হয় তবুও অস্বীকার করা যাবে না যে পজিটিভ নেগেটিভ ছাড়া যেমন বিদ্যুত বাতি জ্বলে না তেমনি তাজউদ্দীনকে ছাড়া বাতি জ্বলত কিনা জানিনে। আরও স্পষ্ট করে বলা যায় শত্রুরা সফল হয়েছিল বঙ্গবন্ধু-তাজউদ্দীনকে বিচ্ছিন্ন করতে যার ফলে তাজউদ্দীন মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের (২৬/১০/৭৪) ১০ মাসের মধ্যে ঘটল বিশ্বের নৃশংসতম বিয়োগান্তক ঘটনাটি ১৫ আগস্ট '৭৫। বঙ্গবন্ধুর বাকশাল নিয়ে তিনি সবচাইতে সমালোচিত যাতে তাজউদ্দীন প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সম্পৃক্ত ছিলেন দৃশ্যত এমন কোন তথ্য নেই। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর প্রতি আনুগত্যে অবিচল, মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগী লোকটি সেই বাকশালের সমালোচনার বিরুদ্ধে স্বেচ্ছায় ভাগীদার হয়েছিলেন। বাকশাল বা দলীয় কর্মকা- থেকে বঞ্চিত হওয়া সত্ত্বেও ১২ আগস্ট '৭৫-এর রাতে একটি টেলিফোন পেয়ে গেঞ্জি গায়ে ছুটে গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে-সতর্ক করে দিয়েছিলেন পরদিন সকালে গণভবনে উঠতে। (সূত্র : জোহরা তাজউদ্দীনের প্রবন্ধ ১৫ আগস্ট '৭৫) সেদিন বঙ্গবন্ধু কেন যে সতর্ক হলেন না, সেকি ভিনদেশের সাহায্য নিয়ে বেঁচে থেকে বাঙালীকে জিম্মি না করার জন্য কিনা কে জানে।
প্রতিশোধপরায়ণতা বিশেষ করে রাজনীতির ক্ষেত্রে নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। কিন্তু ব্যতিক্রম এই তাজউদ্দীন। বঙ্গবন্ধু শাহাদৎ পরবর্তীতে সেই অস্বাভাবিক কাজটি করে বসলেন তাজউদ্দীন। নেতা যেমনি বিদেশী সাহায্য নিয়ে নিজের জীবন রক্ষা করেননি তেমনি আপোস না করে তাজউদ্দীন তার মুজিব ভাইয়ের শোকে দুঃখে আত্মাহুতির (শাহাদৎ) পথই বেছে নিলেন। কে বলে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ আত্মাহুতি হয়নি? জাতীয় ৪ নেতার আত্মাহুতি (জেলহত্যা ৩/১১/৭৫) কি চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে হবে, আত্ম বিশ্রিত বাঙালীকে? এই প্রজন্ম কি জানে, বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা প্রধানমন্ত্রী কে? (বঙ্গবন্ধু প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি)। প্রথম প্রধানমন্ত্রী কাপাসিয়ার দরদরিয়া গ্রামের তাজউদ্দীন। সোনার চামচ মুখে দিয়ে জন্মাননি (২০ জুলাই ১৯২৫)। কোরানে হাফেজ অথচ আপাদমস্তক বাঙালী এই প্রখর মেধাসম্পন্ন কর্মবীর মানুষটি ছিলেন ম্যাট্রিকে দ্বাদশ এবং আইএতে ৪র্থ স্থান অধিকারী। লেখাপড়ার ফাঁকে রাজনীতি-স্কুলে শিক্ষকতা-শিক্ষা জীবনে বিরতি, পুনরায় পড়াশোনা। এভাবে অনার্স করেছেন ২৮ বছর বয়সে (১৯৫৩) এবং ১৯৬৪ তে জেলে বসে পরীক্ষা দিয়ে আইন ডিগ্রী লাভ করেন। বঙ্গবন্ধু যেমনি ছেলেবেলা থেকেই বাঙালীর মুক্তি সংগ্রামের স্বেচ্ছাপ্রণোদিত অংশগ্রহণ তেমনি তাজউদ্দীনও। তবে দুর্ভাগ্য, এরা কেউ আত্মকথা লিখে যেতে পারেননি। যার ফলে জাতি বঞ্চিত রইল ঘটনার পেছনের সত্যকে জানা থেকে। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ, বক্তৃতা কর্মচিহ্ন যা পাওয়া যায় তা দিয়ে ব্যক্তি মুজিবকে (যদিও অ-পরিমাপ্য-মহাসমুদ্র) খুঁজে বেড়ানো যায় কিন্তু প্রচারবিমুখ তাজউদ্দীন আহমদ এমনি নীরবে নেপথ্যে কাজ করেছেন যে, ব্যক্তি তাজউদ্দীনকে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। তাজউদ্দীন কন্যা সিমিন হোসেন রিমি আমাকে একবার বলেছিলেন যে প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের সময় তিনি তার তৎকালীন ঘনিষ্ঠ সহকর্মী ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলামকে বলেছিলেন যে এমনভাবে কাজ করে যাবেন নীরবে যাতে ইতিহাস খুঁজে না পায়। কথায় নয় কাজে তাঁর অস্তিত্ব বিরাজমান। তিনি ইতিহাসের পেছনে ঘোরেননি ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন, ইতিহাসই তাঁকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। কারণ তাঁর কর্মকা- ব্যাপক, এ ভূখ- তথা বিশ্বব্যাপী। পৃথিবীতে একটি সশস্ত্র জনযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়ে দেশ স্বাধীন করার সৌভাগ্যবান ব্যক্তিত্বের সংখ্যা খুবই কম। তাজউদ্দীন তাদেরই একজন।
সীমিত কলেবরে লিখতে হলে শুরু করতে হয় অসাম্প্রদায়িক চেতনার অধিকারী তাজউদ্দীন আহমদকে সে চিত্র বিধৃত রয়েছে ৩০/১/৪৮ইং তারিখের ডায়েরিতে (যা মনের কথা বলে)।
"Sad day (Friday)-Sad News.
Just at 8 PM Jalil told me that Gendhiji was shot. I could not be live. Mr. Shahjahan Corroborated. I was puzzled out for about 3 minutes.
I remained nervous.
At the first utterance of news a Peculiar harsh cry like voice come out of my voice.
For the First time I got shock from human death which I always take for a very usual thing to do. Never mourn for anybody's death; I remember the death of my elder brother in 1944. But I could not find any reason why I should be sorry for him. I remember the death of my own father. Only one year before-I was at Calcutta during, his death in spite of his will-Mourning was completely absent me-I only feel the burden of the family for the first time.
১৯৪৮ সালে মহাত্মা গান্ধীর মৃত্যুতে যিনি মুর্ছা গেলেন, ঘুমাতে পারেননি, তিনি ১৯৪৪ সালে তাঁর বড় ভাইয়ের মৃত্যু স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছিলেন। তবে পারিবারিক দায়িত্বের কথা প্রথম বারের মতো ভাবতে শুরু করেছিলেন। ২৩ বছর বয়সের তাজউদ্দীনের তৎকালীন চিন্তা চেতনাকে কে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন জানি না তবে এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, মানবতা ও শান্তির প্রতীক গান্ধীবাদ তাঁকে প্রভাবিত করেছিল এবং পারিবারিক গণ্ডি অতিক্রম করে মানুষের সেবা করাই যে মানব ধর্ম (মানুষের ... প্রধান করণীয়) সে সত্যকেই তিনি ধারণ করেছিলেন আমৃত্যু। তবে বাঙালীর মুক্তি সংগ্রামে পেশী শক্তির মোকাবেলায় তাকে অস্ত্র হাতে নিতে অহিংসবাদ কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেননি।
কোথায় তাজউদ্দীন নেই? যেখানে বঙ্গবন্ধু সেখানেই তাজউদ্দীন। আবার বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানেও স্বাক্ষর রেখেছিল বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নেয়ার, নেতা যা বলেছেন-ইশারা করেছেন সে কাজ নিখুঁতভাবে করার। ২০ বছরের যুবক ১৯৪৫ সালে দিল্লী কনভেশনশনে যোগদানকারী পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকায় তাজউদ্দীন পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কয়েকদিনের মধ্যে ১৯৪৭ সালের ৬ সেপ্টেম্বর গণতান্ত্রিক যুবলীগ প্রতিষ্ঠা, ছাত্রলীগ (৪/১/৪৮), আওয়ামী মুসলিম লীগ (২৩/৬/৪৯) সর্বত্র তাজউদ্দীন তার মুজিব ভাইয়ের সঙ্গে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, সাইকেল নিয়ে সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন। মাত্র ২৯ বছর বয়সে যুক্তফ্রন্টে প্রার্থী হিসেবে বিজয়। ৫৩-৫৭ ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগ সম্পাদক। ১৯৫৫ সালে আওয়ামী লীগ প্রাদেশিক কমিটির সমাজসেবা সাংস্কৃতিক এবং কিছুদিন সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। '৫৭ সালে আওয়ামী লীগ থেকে বেড়িয়ে গিয়ে মাওলানা ভাসানী প্রগতিশীল বলে কথিত দল ন্যাপ গঠন করলেও প্রগতিশীল তাজউদ্দীন কিন্তু আওয়ামী লীগেই রয়ে গেলেন। অথচ সে সময় মূল আওয়ামী লীগকে বলা হতো প্রতিক্রিয়াশীল। এক্ষেত্রেও তার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। আওয়ামী লীগ সম্পাদক বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক ছ'দফা ঘোষণা করেন ৬ই ফেব্রুয়ারি, ৬৬ লাহোরে, সঙ্গে ছিল তাজউদ্দীন, কামরুজ্জামান, মালেক উকিল, মিজান চৌধুরী প্রমুখ। ১৮-২০ মার্চ (৬৬) এর কাউন্সিল অধিবেশন বঙ্গবন্ধু সভাপতি নির্বাচিত হন। সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তাজউদ্দীন আহমদের নাম ঘোষণার সময় বঙ্গবন্ধু ১৪৪৩ জন ডেলিগেটকে বলেছিলেন, "আমার ভাই তাজউদ্দীন, সুখে দুঃখে আমার সংগ্রামের সাথী। আমার সাথী জেলে যায়, আমার সাথে নির্ভয়ে আন্দোলন করে জনগণের মুক্তির জন্য"
তাজউদ্দীন আহমদের সাধারণ সম্পাদক নিয়োগ প্রসঙ্গে কমরেড তোয়াহা মৃত্যুর কয়েকদিন পূর্বে পাক্ষিক তারকালোক পত্রিকায় (১৫-৩০ ডিসেম্বর '৮৭) দেয়া সাক্ষাতকারে বলেছিলেন, "তাজউদ্দীন আহম্মদ ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির লোক এবং তা শেখ মুজিব জেনে শুনেই তাকে তাঁর (মুজিব) সম্পাদক নিয়োগ করেছিলেন।
বস্তুত আওয়ামী লীগের স্বর্ণযুগ মুজিব-তাজউদ্দীন জুটি। ১৯৬৬ থেকে সংগ্রামের সেই উত্তাল দিনগুলোর কথা নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই। ছ'দফায় প্রচারে বঙ্গবন্ধু সময় পেয়েছিলেন মাত্র দু'মাস। প্রথম জনসভা চট্টগ্রামের লালদীঘি ২৫ ফেব্রুয়ারি (৬৬) এবং কাউন্সিল অধিবেশন নির্বাচনের শেষ দিন ২০ মার্চ (৬৬) ঢাকার জনসভা পল্টনে তখন সম্পাদক তাজউদ্দীন। এই দু'মাসে নির্যাতনের মাত্রা এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, বঙ্গবন্ধু সিলেটে জনসভায় কথিত আপত্তিকর বক্তব্যের জন্য, যশোরে জনসভায় বক্তৃতা (২১ এপ্রিল '৬৬) শেষে আটক করে সিলেট পাঠানো হয়। সিলেটে জনসভায় বক্তৃতার কারণে গ্রেফতার হন ময়মনসিংহ জনসভা শেষে। আবার সিলেটে জামিন পেলে পাঠানো হয় ময়মনসিংহ জেলে। আবার জামিনে মুক্তি নারায়ণগঞ্জে জনসভা শেষে (৮/৫/৬৬) ঢাকায় ফিরলে সে রাতেই আটক। ১৯৬৮ সালের ১ জানুয়ারি মুক্তি দিয়ে জেল গেট থেকে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে বন্দী রাখা হয় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি হিসেবে। প্রবল গণআন্দোলনে সে মামলায় জজকে পালাতে হয়। মামলা প্রত্যাহার (২২/২/৬৯) বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি, ছাড়াও আইয়ুব খানকে গদিই শুধু ছাড়তে হয়নি বরং পাকিস্তানের মৃত্যুর প্রথম ঘণ্টাটি বেজেছিল। এই সময় বঙ্গবন্ধুর বন্দীর পরপরই আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতাকর্মীকে আটক করা হয়েছিল। যার মধ্যে সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ আটক ৮/৫/১৯৬৬ এবং মুক্তি বঙ্গবন্ধু মুক্তির ১০ দিন আগে ১২.২.১৯৬৯।
এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা প্রয়োজন ছ'দফা ঘোষিত হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু এবং আওয়ামী লীগকে নির্মূল করার যাবতীয় প্রচেষ্টা চালিয়েছিল। তবে শুরুতে ছয় দফা নিয়ে পল্টন ময়দানে বাহাস করার জন্য তৎকালীন আইয়ুব পররাষ্ট্রমন্ত্রী উপমহাদেশের অসাধারণ বাগ্মী জুলফিকার আলী ভুট্টো চ্যালেঞ্জ ছুড়েছিলেন। সম্পাদক তাজউদ্দীন তা গ্রহণ করেছিলেন কিন্তু ভুট্টো শেষ পর্যন্ত পিছুটান দেন। জুলফিকার আলী ভুট্টো বলেছিলেন উদার মনের মানুষ মুজিবকে টেবিল টকে তিনি গ্রাহ্য করেন কেবলমাত্র এ কারণে যে তাঁর পেছনে ফাইল নিয়ে বসে থাকা স্বল্পভাষী লোকটির জন্য। তিনি আর কেউ নন তাজউদ্দীন আহমদ।
'৭০-এর নির্বাচনে সফলতা, পরবর্তী কৌশল, বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ আন্দোলনে-প্যারালাল সরকার পরিচালনায় ডি-ফ্যাকটো (উব-ভধপঃড়) প্রধানমন্ত্রী ভূমিকা পালন, মুজিব-ভুট্টো-ইয়াহিয়া (১৫-২৪শে '৭১) আলোচনায় কূটকৌশল বিশেষ করে প্রতিপক্ষের আমলা ব্যারিস্টারের কূটতর্ক ভেদ করার অন্যতম কৃতিত্ব তাজউদ্দীন আহমদের। পাকিস্তানীদের কাছে বঙ্গবন্ধুর চূড়ান্ত কথাটি তাজউদ্দীনই বলে এসেছিলেন ২৪ মার্চ (৭১)।
একাত্তরের মার্চ মাসের সরকারী দফতরসমূহের নথিপত্র ঘাটলে পাওয়া যাবে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে তবে সেই নির্দেশ যার স্বাক্ষরে সরকারী অফিস চলেছিল তিনি তাজউদ্দীন আহমদ।
বাঙালীর কুর্সিয়াল দিন ২৫ মার্চ এর রাত। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তার কি কথা হয়েছিল সে বক্তব্য তাজউদ্দীন নিজ জবানীতে রেখে যেতে পারেননি। কিন্তু পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী ঘটনাসমূহ বিশ্লেষণ করলে নতুন কিছু বলার প্রয়োজন রাখে না। প্রথমত ৬ ও ১৭ মার্চ (৭১) বঙ্গবন্ধু তাজউদ্দীন আহমদকে তৎকালীন ঢাকার ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনার কৈলাস চন্দ্র (কেসি) সেনগুপ্তের কাছে পাঠিয়েছিলেন সাহায্যের আশ্বাস পেতে। দ্বিতীয়ত স্বল্পতম সময়ে (১৫ দিনের মধ্যে) মুজিব নগর সরকার গঠন এবং স্বীয় ভূখ-ে শপথ গ্রহণ (১৭.৪.৭১)। তৃতীয়ত ১০ এপ্রিলের Proclamation of Indendence দলিলটি প্রণয়ন ও উপস্থাপনা। (যাতে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে বঙ্গবন্ধু ২৬ মার্চ (৭) ঢাকায়, যথাযথভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তাজউদ্দীন আহম্মদের জীবনের সবচাইতে অগ্নিপরীক্ষা ছিল মুজিবনগর সরকার গঠন। গুরু অনুপস্থিত। শত্রুর কারাগারে বন্দী বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচনের সময় যে প্রশ্ন সামনে ছিল তা হচ্ছে পাকিস্তানীরা নির্যাতন করে যদি তাকে দিয়ে কোন বিবৃতি আদায় করে ফেলে তা হলে কি হবে? কিন্তু তাজউদ্দীনের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল বঙ্গবন্ধু জীবন দেবেন কিন্তু পাকবাহিনীর কাছে নত হবে না। বঙ্গবন্ধুকে ছাড়া তাজউদ্দীনের এই সিদ্ধান্ত বিচক্ষণতার এক নজির হিসেবে বিশ্ব ইতিহাসে ভাস্কর। ধীরস্থির প্রবল ধৈর্য সহ্য দিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ সরকার চালানো, বিশ্ব জনমত সৃষ্টি, বিদেশে দূত প্রেরণ, মোস্তাকদের ষড়ষন্ত্র, ভারতের 'হাই হ্যানডেড নেস' সত্ত্বেও সে পরীক্ষায় তাজউদ্দীনের স্কোর ছিল সর্বোচ্চ। স্বল্প পরিসরে সে দীর্ঘ আলোচনায় যাওয়ার সুযোগ নেই তবে ইতিহাসের প্রয়োজনে তাজউদ্দীন এর তৎকালীন সহকর্মী ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলামের সুদীর্ঘ স্মৃতিচারণ স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র ১৫ শ' খ- পৃষ্ঠা ৭৭-১৬৩তে লিপিবদ্ধ রয়েছে। স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে ১১.৪.৭১ প্রচারিত বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের ভাষণটি (দলিল খ- ৬ পৃ. ৮) ছিল সেই সঙ্কটে দিকনির্দেশনা। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ছিল ব্যতিক্রমধর্মী। সংগঠক, নেতা-কর্মী-জনতা ছিল নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে বিশ্বাসী। এদের সংগঠিত করে গেরিলা যুদ্ধ ও সফলতার মূল নেতৃত্ব দিয়ে তাজউদ্দীন বিশ্ব ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছেন। তাজউদ্দীনের শেষ জীবনের জেলখানার (২২/৮/৭৫-৩/১১/৭৫) ডায়েরিটি নাকি কোরবান আলী নিয়ে গেছে। তাই জাতি বঞ্চিত রইল তাঁর নিজের কথা জানার আরও অনেক কিছুর মতো।
দুষ্ট লোকেরা বলেন, তাজউদ্দীন ভারতের সঙ্গে চুক্তি করেছিল। কিন্তু কেউ সে চুক্তি দেখাতে পারে না। চুক্তি ছাড়াই সহযোগিতা পাওয়ার কৌশল তাজউদ্দীনের জানা ছিল। সে বুদ্ধি নেতা দিয়েছিলেন। ভারত যখন চুক্তি করার কথা বলেছিল তখন তা এড়ানো সম্ভব ছিল এই বলে যে দেশ স্বাধীন হোক নেতা মুক্তি পাক, তিনি যা করার তাই করবেন। জেনারেল ওসমানী পাক আত্মসমর্পণ (১৬/১২/৭১) অনুষ্ঠানে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানালে ত্বরিত সিদ্ধান্ত নিয়ে একে খন্দকারকে পাঠিয়ে ইজ্জত বাঁচিয়েছিলেন। ভারত আমাদের সহযোগিতা করেছিল যৌথ কমান্ডে এবং আত্মসমর্পণ দলিলে জেনারেল অরোরার স্বাক্ষরে নিচে পদবী "ÒGeneral Officer Commonding in Chief, India & Bangladesh forces in the Eastern Theatre" ভারতের স্বীকৃতি আদায় ও মুক্ত স্বদেশে তাজউদ্দীন আহমদ প্রথম যশোরে বক্তব্য রাখেন ডিসেম্বর '৭১-এর ৬ তারিখে। ঢাকায় আসেন ২২ ডিসেম্বর, '৭১। বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তন ১০ জানুয়ারি '৭২। ঢাকায় ২০ দিন প্রধানমন্ত্রিত্বের সময় কালটি ছিল সবচাইতে সঙ্কটময়। নবগঠিত রাষ্ট্র, প্রশাসন, পুনর্গঠন, মুক্তিবাহিনীর উল্লাস, আইনশৃঙ্খলা, ভারতীয় বাহিনী এর সবকিছু মোকাবেলা সম্ভব হয়েছিল কেবলমাত্র তাজউদ্দীনের জন্য যা একটিমাত্র উদাহরণ টেনে প্রকাশ করা যেতে পারে। এটি হচ্ছে জানুয়ারি মাসের (৭২) পয়েলা তারিখেই সরকারী কর্মচারীদের বেতন দেয়া সম্ভব হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর কাছে চাবিটি ফেরত দেয়ার পরে (১২/১/৭২) বঙ্গবন্ধু তাজউদ্দীনকে দিলেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। শুন্য হাতে শুরু। আজ যেখানে রাজস্ব আয় বছরে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা, বিদেশী ঋণ '৭৫ পরবর্তীতে কমপক্ষে বছরে ২০০ কোটি ডলার সেখানে তাজউদ্দীন আহমদের রাজস্ব বাজেট ছিল '৭২-৭৩ সালে ২২৩ কোটি, '৭৩-৭৪ সালে ৩৯৩ কোটি টাকা আর বিদেশী ঋণ (শর্তহীন) ৪ বছরে মাত্র ২১৮ কোটি ডলার অর্থাৎ বছরে গড়ে মাত্র ৫৪ কোটি ডলার। এই দিয়ে ভঙ্গস্তুপ থেকে দেশকে স্বাভাবিক পর্যায়ে পৌঁছানো। তার বাজেট আমলারা বানাত না, নিজেই বানাতেন। দাড়ি কমা পর্যন্ত। রাজস্ব বোর্ডের তৎকালীন একজন কর্মকর্তার ভাষায় তার কাছে শেখার ছিল অনেক কিছু শিক্ষকের মতো। এমন অর্থমন্ত্রী আর হবে না। এটি নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, এই দেশে আমলারা ফাঁকি দিতে বা বেকুপ বানাতে পারেনি যে মন্ত্রীকে তিনি তাজউদ্দীন। সবচাইতে বেশি সময়ের অর্থমন্ত্রী বিএনপির প্রয়াত সাইফুর রহমানও তার প্রশংসায় ছিলেন পঞ্চমুখ। তাঁর দর্শন (যা বঙ্গবন্ধুর চাইতে আলাদা ছিল না) ছিল বিদেশী নির্ভরতা পরিহার করা এবং দেশকে স্বয়ংসম্পন্ন করা। এটি তার ভাষায় 'গোলের ঘা দেখিয়ে কতকাল খাবো,' (ভিক্ষুকেরা পায়ের ঘায়ের চিকিৎসা না করে তা দেখিয়ে ভিক্ষা করে)। বঙ্গবন্ধু, তাজউদ্দীনদের মেরে আমরা ভিক্ষুকই রয়ে গেলাম।
'বাংলাদেশের মূল সংবিধান বিশ্বের সেরা সংবিধান' সপ্রশংস এই জিজ্ঞাসার জবাবে সংবিধান প্রণয়ন কমিটির চেয়ারম্যান ড. কামাল হোসেন আমাকে বলেছিলেন বঙ্গবন্ধু গাইড লাইন দিয়েছিলেন আর সংবিধানের প্রতিটি লাইনে পরশ রয়েছে আমাদের মহান শিক্ষক শহীদ তাজউদ্দীন আহমদের। উল্লেখ্য, প্রায় সবার ধারণা (আওয়ামী বুদ্ধিজীবীসহ) সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার ভারতের সংবিধান থেকে নেয়া। এটি সত্য নয়। ১৯৪৯ সালের ২৬ নবেম্বর গৃহীত ভারতের সংবিধান "সার্বভৌম গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র এর ৩/১/৭৭ থেকে পরিবর্তিত নাম "সার্বভৌম সমাজতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ, সাধারণতন্ত্র (সংবিধান দ্বি-চত্বারিংশ সংশোধন আইন ১৯৭৬)। আমাদের অর্জন বাহাত্তরে আর ভারতের সাতাত্তরে অর্থাৎ ওরা আমাদের থেকে ধার করেছে ৫ বছর পরে।
১৯৭০ সালের নির্বাচন প্রাক্কালে তাজউদ্দীন আহমদ জননেতা তোফায়েল আহম্মদকে বলেছিলেন 'এত বড় নেতা বঙ্গবন্ধু, গোটা বাঙালী জাতির ভবিষ্যত নির্ভর করছে তার ওপর' তিনি মাঝে মধ্যে নানা বিষয়ে আলাপ করেন, পরামর্শ দেন। যা ভাল বুঝি বলি। কিন্তু আমি থাকি উদ্বেগের মধ্যে, যদি কোন ভুল পরামর্শ দিয়ে বসি, যদি নেতাকে বিভ্রান্ত করি, নেতারও ক্ষতি হবে, দেশ ও জাতিরও ক্ষতি হবে। এই উৎকণ্ঠা আশঙ্কার মধ্যে থাকি। (সূত্র সেই সময়-আমির হোসেন, সাপ্তাহিক এই সময় ২৮/৬/৮৯)।
তাজউদ্দীন বঙ্গবন্ধুকে ভুল পরামর্শ দেননি বরং ত্যাগের ইতিহাস রেখে গেলেন অনন্য দৃষ্টান্ত। ইতিহাস তার সাক্ষী।
বঙ্গবন্ধুর শাহাদৎ-এর পরে রাষ্ট্রপতি হওয়ার সাংবিধানিক অধিকার ছিল উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুলের। তাকে হত্যা করলেই তো খুনীদের চলতো। মনসুর আলী ছিলেন প্রধানমন্ত্রী, কামরুজ্জামানও মন্ত্রী কিন্তু তাজউদ্দীন রাষ্ট্র/ দলীয় পদে না থাকা সত্ত্বেও তাকে কেন হত্যা করা হলো? এ প্রশ্নের জবাবেই পাওয়া যাবে মানুষ তাজউদ্দীনের অঙ্গীকার মাটি ও মানুষের এবং জাতির জনকের প্রতি।
আসলে শত্রুরা প্রথমে মিলিট্যান্ট যুবশক্তিতে বিভক্তি ঘটিয়ে (জাসদ সৃষ্টি) বঙ্গবন্ধুকে দুর্বল করার চেষ্টায় আংশিক সফল হলো। এম আখতার মুকুলের ভাষায় 'বঙ্গবন্ধুর শানিত তরবারী' তাজউদ্দীনকে বঙ্গবন্ধুর কোমর থেকে বিচ্ছিন্ন করে চূড়ান্ত আঘাত হানে এবং সফল হয়।
জাতীয় বীর মহান তাজউদ্দীনরা এভাবেই আসেন। দায়বদ্ধতা পালন করে নীরবে চলে যান।
কিন্তু আমরা স্বাধীনতার স্থপতি জনককে ঢাক ঢোল পিটিয়ে এবং জাতীয় চার নেতাকে জেলখানায় হত্যা করেছি। খুনীদের জামাই-আদর করেছি, বিচারে রাষ্ট্রীয় প্রতিবন্ধতা, বিচারকদের বিব্রতবোধ এর ফলে ব্যর্থ রাষ্ট্রের খাতায় নাম লেখিয়েছি। শেষ পর্যন্ত বিচার করে দায়ভার মুক্ত হতে সক্ষম হয়েছে এই রাষ্ট্র।
