আওয়ামী লীগ মেহনতি জনগণের দল, জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তনই এই দলের লক্ষ্য: টঙ্গীর জনসভায় শেখ হাসিনা
২ মে ২০১২, ১৯ বৈশাখ ১৪১৯
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্দোলনের নামে মানুষ পুড়িয়ে মারার মতো ধ্বংসাত্মক রাজনীতি করা থেকে বিরত থাকার জন্য বিরোধীদলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বিষ্ময় প্রকাশ করে বলেন, মুসলমানরা কিভাবে এ ধরনের জঘণ্য অপরাধ করতে পারে। তিনি গতকাল বিকেলে এক বিশাল শ্রমিক সমাবেশে বিরোধীদলের উদ্দেশ্যে বলেন, আমরা আপনাদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে বাধা দেবো না। কারণ আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি। কিন্তু তথাকথিত আন্দোলনের নামে দয়া করে মানুষ পুড়িয়ে মারবেন না। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, একজন মুসলমান কিভাবে আরেকজন মুসলমানকে পুড়িয়ে মারতে পারে। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক দেশ এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় দেশ পরিচালিত হচ্ছে। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, দেশের কষ্টার্জিত গণতন্ত্র বাধাগ্রস্ত হয়, এমন পদ্ধতি চলতে দেয়া হবে না। প্রধানমন্ত্রী কষ্টার্জিত গণতন্ত্রকে টেকসই করতে সংগঠনকে আরো শক্তিশালী করার জন্য দলীয় নেতা-কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, আমরা আর কাউকে জনগণের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে দেবো না। এইচএসসি পরীক্ষা চলাকালে হরতাল কর্মসূচি দেয়ার জন্য বিরোধীদলের প্রতি নিন্দা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষা জীবন ধ্বংস করার তাদের কোন অধিকার নেই। আমি বুঝতে পারছি না কি কারণে বিরোধীদলীয় নেত্রী পড়াশোনার প্রতি ক্ষুব্ধ। তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, এই কারণে যে বেগম জিয়া পরীক্ষায় কেবলমাত্র আরবি ও উর্দু পাস করায় এসএসসি ডিঙ্গাতে পারেননি? বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী 'নিখোঁজ' প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি তার জন্য নতুন কিছু নয়, তিনি (ইলিয়াস আলী) আগেও নিখোঁজ হয়েছিলেন তবে নিরাপদে ফিরে এসেছেন। শ্রমিকদের প্রতি উৎপাদন বৃদ্ধির আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর সরকার বাংলাদেশকে স্বনির্ভর দেশ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। যাতে দেশ বিশ্বে আত্মমর্যাদার আসনে দাঁড়াতে পারে। শ্রমিকদের বিভিন্ন সমস্যার সমাধানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, শ্রমিকদের কোন দাবি তুলতে হবে না কেননা সরকার তাদের যৌক্তিক দাবির ব্যাপারে যথেষ্ট সজাগ রয়েছে। তিনি বলেন, 'আমরা আপনাদের দাবির বিষয় জানি এবং আমরা তা একের পর এক পূরণ করে যাচ্ছি।' প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী লীগকে মেহনতি জনগণের দল হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং বলেন, জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তনই এই দলের লক্ষ্য। তিনি বলেন, 'আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন যাতে তারা শান্তিপূর্ণ জীবন যাপন করতে পারে।' শেখ হাসিনা বলেন, যখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে দেশের সার্বিক উন্নয়ন হওয়ায় জনগণ শান্তিতে থাকে এবং দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা লাভ করে। তিনি বলেন, অপরদিকে বিএনপি যখন ক্ষমতায় যায় দেশ সন্ত্রাসী ও জঙ্গিদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়। বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। তাদের শাসনকালে লাগামহীন দুর্নীতি এবং লুটপাট চলে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, খালেদা জিয়া তার কালো টাকা সাদা করেছেন যা তিনি দুর্নীতি থেকে এবং এতিমদের অর্থ আত্মসাৎ করে আয় করেছেন।
তিনি বলেন, 'এই অপরাধের জন্য আপনাকে দু'টি আদালতে জবাবদিহি করতে হবে একটি হলো জনগণের আদালত ও অপরটি হলো মহান আল্লাহ তায়ালার আদালত।'
শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় আসলে দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের মাধ্যমে দেশের সকল সাফল্য ধ্বংস করে দিয়ে দেশকে অনেক বছরের জন্য পিছিয়ে দেয়। বিএনপি-জামায়াত সরকারের সময়ে ১৭ জন শ্রমিকের হত্যাকাণ্ডের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাদের হাত রক্তে রঞ্জিত। তারা ১৭ জন কৃষককে গুলি করে হত্যা করেছে। প্রধানমন্ত্রী শ্রমিকদের কল্যাণে তাঁর সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের উল্লেখ করে বলেন, সরকার ২০০৯ সাল থেকে ওয়েজ কমিশন কার্যকর করেছে। এতে ২৪ সেক্টরে সর্বনিম্ন বেতন ঘোষণা করা হয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, সরকার শ্রমিক ও কৃষকদের ছেলেমেয়েদের মধ্যে বিনামূল্যে বই বিতরণ করেছে। দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের জন্য শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট তহবিল গঠন করা হয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, সরকার প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর বিগত সরকার অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে শ্রমিকদের কাছে কয়েকটি মিল ও কারখানা লিজ দিয়েছে। এর মধ্যে এখন অনেক মিল ও কারখানা ভাল চলছে।
তিনি বলেন, আমরা বন্ধ পিপলস জুট মিল এবং কউমি জুট মিল চালু করেছি। এতে শ্রমিকদের মুখে হাসি ফুটেছে।
প্রধানমন্ত্রী সমালোচনা করে বলেন, ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যা করার পর পরবর্তী সরকারগুলো শ্রমিকদের কল্যাণে কাজ করেনি। সেইসব সরকার শুধুমাত্র তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থে নিজেদের নিয়োজিত রেখেছিল।
শেখ হাসিনা বলেন, '৭৫ পরবর্তী সরকারগুলো সরকারি মিল ও কারখানাগুলো বন্ধ করে দিয়ে হাজার হাজার শ্রমিকদের বেকার করে বিকেন্দ্রীকরণের নামে নামমাত্র মূল্যে বিক্রয় করে দিয়েছে। এতে দেশকে আমদানি নির্ভর করা হয়েছে।
মহান মে দিবস উপলক্ষে জাতীয় শ্রমিক লীগ টঙ্গী টেলিফোন শিল্প সংস্থা মাঠে এই সমাবেশের আয়োজন করে।
শ্রমিক লীগ সভাপতি আব্দুল মতিন মাষ্টারের সভাপতিত্বে সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তৃতা করেনÑ কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী, আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান, এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ান ও এলজিআরডি ও সমবায় মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান এডভোকেট রহমত আলী। এছাড়া আওয়ামী লীগের শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হাবিবুর রহমান সিরাজ, জাহিদ আহসান রাসেল এমপি, মেহের আফরোজ চুমকি এমপি, গাজীপুর জেলা পরিষদ প্রশাসক আক্তারুজ্জামান, গাজীপুর জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আজমতউল্লাহ খান, স্বেচ্ছাসেবক লীগ সাধারণ সম্পাদক পঙ্কজ দেবনাথ ও শ্রমিক লীগ সাধারণ সম্পাদক রায় রমেশ চন্দ্র অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। সমাবেশে ঢাকা, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ ও ঘোড়াশালসহ পার্শ্ববতী এলাকার হাজার হাজার শ্রমিক রঙ-বেরঙের ব্যানার, ফেস্টুন ও পোস্টার নিয়ে সমাবেশে যোগ দেন।
