স্বাধীনতাবিরোধীরা ভবিষ্যতে যাতে ক্ষমতায় আসতে না পারে সেজন্য দেশবাসীকে সজাগ থাকার আহ্বান শেখ হাসিনার
তিস্তার ন্যায্য হিস্যা আমরা আদায় করবো : প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা
রবিবার, ৮ এপ্রিল ২০১২, ২৫ চৈত্র ১৪১৮
প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির সঙ্গে সুর মেলাচ্ছেন উচ্চ মার্গের কিছু লোক। এসব লোক ভোট পায় না, দল গঠন করে তা টেকাতেও পারে না। জনগণের কাছে তাদের কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। অথচ তারা আবার বড় গলায় কথাও বলে। স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি ভবিষ্যতে আর যাতে ক্ষমতায় আসতে না পারে সেজন্য দেশবাসীকে সজাগ থাকার আহ্বান জানান তিনি।
গতকাল শনিবার গণভবনে লালমনিরহাট জেলা আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রারম্ভিক বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী তত্ত্বাবধায়ক সরকার দাবি আবারো নাকচ করে দিয়ে বলেন, বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছর যেন দেশের রাজনীতিতে দুর্যোগ নেমেছিল। রাজনীতিবিদদের পাশাপাশি প্রতিটি শ্রেণী-পেশার মানুষ নির্যাতিত হয়েছেন। 'বিএনপি নেত্রী ওই দুই বছরের কথা কীভাবে ভুলে গেলেন? তত্ত্বাবধায়ক সরকার উনাকে (খালেদা জিয়া) জেল খাটিয়েছে। উনার পুত্রদের উত্তম-মধ্যম দিয়ে মুচলেকা নিয়ে বিদেশে পাঠিয়ে দিয়েছে। আবারও তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসে উনাকে জেলে পাঠাবে না তার নিশ্চয়তা কোথায়? তাছাড়া বিরোধী দলীয় নেত্রী এক সময় তত্ত্বাবধায়ক প্রসঙ্গে বলেছিলেন, 'পাগল আর শিশু ছাড়া কেউ নিরপেক্ষ নয়।'
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এজন্য আমাদের বক্তব্য পরিষ্কার। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত সব নির্বাচনই অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে। কোনো ধরনের অঘটন ঘটেনি। দেশের মানুষও শান্তিপূর্ণ এবং স্বাধীনভাবে নিশ্চিন্তে ও নির্বিঘ্নে ভোট দিয়েছে। জনগণ যাকে খুশি ভোট দেবে, এই মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার আমরা তিন বছরে নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছি।
'বিএনপিকে উড়ে এসে জুড়ে বসার দল' বলে আখ্যায়িত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উড়ে এসে জুড়ে বসা দলগুলো ক্ষমতায় আসে লুটপাট, দুর্নীতি ও বিদেশে টাকা পাচার করতে। দেশ ও মানুষের কল্যাণের কথা তারা কখনো চিন্তাই করে না। ক্ষমতায় এসে লুটপাট করে নিজেদের সম্পদ বাড়ানো আর বিদেশে টাকা পাচার করাই বিএনপির কাজ। মানুষের পকেট কাটা আর ভোট চুরিই বিএনপি নেত্রীর মূল নীতি। দেশের জন্য কাজ করার সময় তাদের থাকে না। এ কারণে বিএনপি যাতে আগামীতে ক্ষমতায় আসতে না পারে সে দিকে সকলকে লক্ষ্য রাখতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমারের বিরুদ্ধে সমুদ্র জয় দেশের বিশাল অর্জন। আমরা সমুদ্রসীমার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছি। ভারতের সঙ্গে গঙ্গা চুক্তিতেই রয়েছে ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আমাদের থাকবে। তিস্তা চুক্তি নিয়েও আলোচনা চলছে। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, তিস্তার পানির ন্যায্য অধিকারও আমরা আদায় করবো ইনশাল্লাহ। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে দেশ ও জনগণের জন্য কাজ করে। আর বিএনপি ক্ষমতায় এসে জনগণকে বঞ্চিত করে নিজেরা সম্পদ বানায় আর বিদেশে পাচার করে। এটাই তাদের নীতি। তারা দুর্নীতি-লুটপাট করবে, এতিমের টাকা মেরে খাবে- এর জন্য মামলা ও বিচার হবে না- এটা তো হতে পারে না। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ভারতের সঙ্গে সীমান্তসহ বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে সরকারের উদ্যোগ তুলে ধরে বলেন, ক্ষমতায় থাকতে ভারতপ্রীতি আর বিরোধী দলে গেলে ভারত বিরোধিতা- এটাই হচ্ছে বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়ার নীতি। ক্ষমতায় থাকতে তিনি সব ভুলে যান, বিরোধী দলে গেলে মনে পড়ে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকতেও তিনবিঘা করিডোরের অধিবাসীদের খোঁজ-খবর নিয়েছে। এবার ক্ষমতায় এসে ভারতের সঙ্গে কথা বলে তিনবিঘা করিডোর ২৪ ঘন্টা খোলা রাখার ব্যবস্থা করেছি। তিনবিঘা করিডোর এখন মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এটাও সরকারের আরেকটা বিশাল অর্জন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা যা কিছুই অর্জন করি, বিরোধী দল ও তাদের নেত্রী জনগণকে বিভ্রান্ত করতে সেটা নিয়ে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দেয়। এটাই তাদের চরিত্র। বিরোধী দলীয় নেত্রী কোনো সমস্যার সমাধানও চান না। তিনি বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নই আমাদের লক্ষ্য। ভারতের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়ছে। গার্মেন্টসহ প্রায় সব কটি পণ্যের ভারতে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। এতে ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ এদেশের মাটি ও মানুষের দল। পঁচাত্তরের পর আওয়ামী লীগ দীর্ঘ দিন ক্ষমতায় ছিলো না। স্বাধীনতা বিরোধীরা ক্ষমতায় ছিলো। এই যে উড়ে এসে জুড়ে বসা, তাদের ক্ষমতায় থাকা মানে সম্পদ ভোগ-দখল, নিজেদের আখের গোছানো। সাধারণ মানুষের কথা ভাবার সময় তাদের নেই। তিনি বলেন, বিশ্বের সব দেশে সব সময়ই যারা স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করে, দেশকে স্বাধীন করে, আন্দোলন-সংগ্রাম, জেল, জুলুম, অত্যাচার-নির্যাতন ভোগ করে তারা ক্ষমতায় থাকলে দেশ উন্নত হয়। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ায় স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তি ধারাবাহিকভাবে ক্ষমতায় ছিলো এজন্য সেখানে উন্নতি ঘটেছে।
প্রধানমন্ত্রী একাত্তরের মানবতাবিরোধীদের বিচার প্রসঙ্গে বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হয়েছে। এটা বিরোধী দলের নেত্রীর পছন্দ হচ্ছে না। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধে বিরোধী দল সরকার পতনের হুমকি-ধামকি দিচ্ছে; কিন্তু হুমকি দিয়ে কোনো কাজ হবে না। যু্্দ্ধাপরাধীদের বিচার করা জাতির প্রতি আমাদের দায়িত্ব। এ বিচার আমরা করবোই। আমরা বিচার শুরু করেছি, শেষ করবো।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় থেকে জনগণের জন্য কিছুই করেনি। শুধু লুটপাট করে সম্পদ বাড়ানো আর বিদেশে টাকা পাচার করায় ব্যস্ত ছিলো তারা। দেশের জন্য কাজ করার সময় তাদের ছিলো না। আসলে ক্ষমতায় গিয়ে শুধু উনি (খালেদা জিয়া) আর উনার ছেলেরা খাবে, আর কেউ খাবে না- এটাই ছিল নীতি। তিনি কত টাকা খেয়েছেন আর কত টাকা বিদেশে পাচার করেছেন সেটা প্রমাণ হয়েছে। এফবিআই এসে তার সাক্ষ্য দিয়ে গেছে। হংকং ও সিঙ্গাপুরে তার পুত্রদের পাচারকৃত অর্থ বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী হয়েও তিনি দুর্নীতির কালো টাকা জরিমানা দিয়ে সাদা করেছেন। এর থেকে লজ্জার আর কী হতে পারে। তিনি বলেন, আমরা প্রধানমন্ত্রী হয়ে লুটপাট করে কালো টাকা সাদা করে সম্পদ বানাতে আসিনি।
'ক্ষমতায় এসে বর্তমান সরকারের সব কাজ বাতিল করে দেয়া হবে' মর্মে বিরোধী দলীয় নেত্রীর দেয়া বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন রেখে বলেন, বিরোধী দলের নেত্রী কী বাতিল করবেন? আমরা বিনা মূল্যে বই দিয়েছি, বিদ্যুত্ কেন্দ স্থাপন করেছি, তিন হাজারেরও বেশী মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদন বাড়িয়েছি- এসবই কী বন্ধ করে দেবেন? যত রাস্তা-ঘাট, পুল-কালভার্ট-ব্রিজ নির্মাণ করেছি তাও কী ভেঙ্গে দেবেন? জাতীয় শিক্ষা নীতি দিয়েছি, সেটা কী বাতিল করে দেবেন? আমরা সমুদ্র সীমা জয় করলাম। তিনি কী আপিল করে এটাকেও বাতিল করে দেবেন? তিন বিঘা করিডোর ২৪ ঘন্টা খোলা আছে, সেটাও কী উনি বন্ধ করে দেবেন?
আওয়ামী লীগের শিকড় দেশের মানুষের হূদয়ে প্রথিত উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী দলীয় নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে বলেন, ঐক্যবদ্ধ থেকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও নীতিতে বলিয়ান হয়ে জনগণের জন্য কাজ করুন। আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করতে আইয়ুব-ইয়াহিয়া, জিয়া-এরশাদ-খালেদা জিয়ারা কম চেষ্টা করেনি; কিন্তু পারেনি। ক্ষমতা দেয়ার ও নেয়ার মালিক আল্লাহ। গ্রেনেড মেরে, গুলি ছুঁড়ে অনেকবারই আমাকের মেরে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে; কিন্তু তারা সফল হতে পারেননি। আমরা জনগণকে দেয়া ওয়াদা পূরণ করবোই। আমরা আর ভিক্ষা ও সাহায্য নিয়ে চলতে চাই না। নিজেরা আত্মনির্ভরশীল হতে চাই। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশকে আমরা উন্নত, সমৃদ্ধ ও মর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলবোই ইনশাল্লাহ।
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকের শুরুতেই লালমনিরহাট জেলা সভাপতি এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মোতাহের হোসেন বক্তব্য রাখেন। এরপর জেলার সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের প্রশাসক মতিউর রহমান জেলার সাংগঠনিক রিপোর্ট তুলে ধরেন। পরে রুদ্ধদ্বার বৈঠক শুরু হয়। এ সময় জেলার তৃণমূল নেতারা সাংগঠনিকসহ তাদের নানা সুবিধা-অসুবিধার কথা প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন। সভায় উপস্থিত ছিলেন কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী, পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, শেখ ফজলুল করিম সেলিম এমপি, সতীশ চন্দ্র রায়, মাহাবুব-উল-আলম হানিফ, গৃহায়ণ প্রতিমন্ত্রী আবদুল মান্নান খান, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এমপি, বিএম মোজাম্মেল হক এমপি, মৃণাল কান্তি দাস, এনামুল হক শামীম প্রমুখ।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ
জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু
