বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী এখন জনগণের সম্পদ: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার কাছে বঙ্গবন্ধু অসমাপ্ত আত্মজীবনী হস্তান্তর
বুধবার | ২০ জুন ২০১২ | ৬ আষাঢ় ১৪১৯
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রচিত 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী' বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধুর লেখা ও ডায়েরি এতদিন ছিল তাদের পারিবারিক সম্পদ। বই আকারে প্রকাশের পর এটি এখন জনগণের সম্পদে পরিণত হলো। মঙ্গলবার গণভবনে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে বইটির বাংলা সংস্করণের পাশাপাশি ইংরেজি সংস্করণ দি আনফিনিশড মেময়ারস এরও মোড়ক উন্মোচন করেন। এর আগে বইটির প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল) ও প্রকাশনা কমিটির পক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে বইটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার ছোট বোন শেখ রেহানার হাতে তুলে দেওয়া হলে সেখানে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর দুই মেয়েই বারবার অশ্রুসজল হয়ে পড়েন।
আবেগাপ্লুত শেখ হাসিনা বলেন, বইটি পড়ে মানুষ বাংলাদেশের ইতিহাস জানতে পারবে। যারাই এটি পড়বেন, তারা একই সঙ্গে পাকিস্তানের আগে-পরের অবস্থাসহ দেশের স্বাধীনতার জন্য বঙ্গবন্ধুর অবদান ও তার অসামান্য ত্যাগের ইতিহাসও জানতে পারবেন। বইটি প্রকাশের ক্ষেত্রে দীর্ঘ ও কষ্টকর অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি জানান, এটি প্রকাশের জন্য জীবনের বিভিন্ন সময়ে বঙ্গবন্ধুর লেখা ডায়েরি ও লেখা সংগ্রহ করতে গিয়ে নিদারুণ কষ্ট করতে হয়েছে তাদের। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালে অনেক নষ্ট হয়েছে। সে সময় পাকিস্তানি বাহিনী কিছু জব্দও করে নিয়ে গিয়েছিল, যেগুলো পরে আর খুঁজেও পাওয়া যায়নি। কেবল তার মা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব যেগুলো যত্নসহকারে তুলে রেখেছিলেন, সেগুলো পাওয়া গেছে। কিছু লেখা বাংলার বাণীতে টাইপ করতে দেওয়া হলেও পঁচাত্তরের বিয়োগান্ত ঘটনার পর সেগুলোর অনেক খুঁজে পাওয়া যায়নি। ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার পর তাদের এক আত্মীয় বঙ্গবন্ধুর কিছু দুর্লভ লেখা দিয়ে গিয়েছিলেন।
শেখ হাসিনা বলেন, যেগুলো পাওয়া গেছে, সেগুলোরও অনেক পাতাই নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। কিছু পাতা ছিল উঁইপোকায় কাটা। অনেক লেখার পাঠোদ্ধার করাই যাচ্ছিল না। এরপরও যেগুলো বোঝা গেছে, সেগুলো নিয়েই তিনি নিজে ও অন্যদের দিয়ে কম্পোজ করিয়ে বই প্রকাশের উপযোগী করে তোলা হয়েছে। ওয়ান-ইলেভেনের পর কারাগারে থাকা অবস্থায়ও বইটির কাজ করেছেন বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
শেখ হাসিনা জানান, বইটি প্রকাশের উদ্যোগ শুরুর পর তিনি যখন এটি প্রকাশনা কমিটির হাতে তুলে দিচ্ছিলেন সেদিনও তার ভীষণ কষ্ট হয়েছে। মনে হচ্ছিল, এতগুলো দিন এর জন্য অনেক কষ্ট করেছেন, দীর্ঘ সময় দিয়েছেন। তাই সেগুলো হাতছাড়া করতে গিয়েই যেন বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। শিগগিরই বইটির আনুষ্ঠানিক প্রকাশনা উৎসব করা হবে বলে জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বইটি প্রকাশের বেলায় বঙ্গবন্ধুর নিজের হাতে লেখাকে সম্পূর্ণ অবিকৃত রাখা হয়েছে। তিনি যার সম্পর্কে যেভাবে লিখে গেছেন, সেভাবেই রাখা হয়েছে। যদিও অনেকের সম্পর্কে অনেক রকম সন্দেহ ছিল, তারপরও সেখানে কোনো রকম হাত দেওয়া হয়নি। কেননা ইতিহাস ইতিহাসই।
স্মৃতিচারণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুর লেখাগুলো পড়তে গিয়েও বারবার থমকে যেতে হয়েছে। চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। কেননা বঙ্গবন্ধু জীবিত থাকতে যখন সেগুলো পড়তে গিয়েছিলেন, তখন বঙ্গবন্ধুই বাধা দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, আমি মারা যাওয়ার পরই এগুলো পড়িস। পরে এগুলো পড়তে গিয়ে সেসব কথাই বারবার মনে পড়েছে।
বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ রেহানা বলেন, আজ অনেকেই অনেক সত্য-মিথ্যা লেখেন। তবে বঙ্গবন্ধুর বইটি পড়ে স্বাধীনতা ও মুক্তিসংগ্রামের সঠিক ও সত্যিকারের ইতিহাসই জানা যাবে। বড় বোন শেখ হাসিনার মতো তিনিও জানান, এই বইয়ের লেখা সংগ্রহ করতে গিয়ে তাদের অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। আত্মীয়স্বজন ও পরিচিত অনেকের কাছেই ধরনা দিতে হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর নিজের লেখা পাঠের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে শেখ রেহানা বলেন, অনেক সময় এগুলো পড়তে গিয়ে কিছুটা ইতস্তত বোধ করতে হয়েছে। মনে হয়েছে, অনেকটা বেয়াদবি হয়ে যাচ্ছে কি-না। কেননা একজন মানুষের ডায়েরি অনেকটাই ব্যক্তিগত। তবে বড় বোনের উৎসাহে আবার পড়েছেন। আবার লেখাটি বই আকারে প্রকাশের বেলায় অনেক সতর্কতাও অবলম্বন করতে হয়েছে। কেননা একটি শব্দ বদলে গেলে এর অর্থ সম্পূর্ণ উল্টে যেতে পারে।
অনুষ্ঠানে প্রকাশনা কমিটির পক্ষে অধ্যাপক সালাহউদ্দিন আহমেদ, শামসুজ্জামান খান, সাংবাদিক বেবী মওদুদ এমপি ও অধ্যাপক ফখরুল আলম এবং ইউপিএলের স্বত্বাধিকারী মহিউদ্দিন আহমদসহ প্রকাশনার সঙ্গে জড়িত অন্যরা উপস্থিত ছিলেন। এ সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি, মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ, বিশেষ সহকারী (গণমাধ্যম) মাহবুবুল হক শাকিল, ছাত্রলীগের সভাপতি এইচএম বদিউজ্জামান সোহাগ, সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটন উপস্থিত ছিলেন।
