বাজেট বাস্তবায়নে সকলের সহযোগিতা কামনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
প্রস্তাবিত বাজেট উন্নয়নমুখী ও যুগোপযোগী : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
বৃহস্পতিবার, ২৮ জুন ২০১২, ১৪ আষাঢ় ১৪১৯
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, রূপকল্প-২০২১ ও ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার লক্ষ্য পূরণে প্রস্তাবিত বাজেট উন্নয়নমুখী ও যুগোপযোগী। প্রধানমন্ত্রী গতকাল সংসদে আগামী অর্থ বছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর দেয়া তাঁর সমাপনী ভাষণে এ কথা বলেন। তিনি বলেন, 'বাজেট শুধু সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়- এটি সার্বিক উন্নয়নেরও একটি রূপরেখা।' অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত গত ৭ জুন সংসদে ১ লাখ ৯১ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকার ২০১২-১৩ সালের বাজেট ঘোষণা করেন। শেখ হাসিনা বলেন, প্রতিটি রাজনৈতিক দলের একটি লক্ষ্য থাকে দেশকে কিভাবে উন্নত করা যায়। 'আমরা দারিদ্র বিমোচন, মানুষের মৌলিক অধিকার, কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিই। প্রতিটি বাজেটে তারই প্রতিফলন ঘটাচ্ছি।'সংসদ নেতা বলেন, 'নির্বাচনী ইশতেহারে আমরা যা ঘোষণা দিয়েছি তার চেয়ে বেশি বাস্তবায়ন করেছি।'
বিশ্ব অর্থনীতির মন্দার কারণে অনেক দেশ তাদের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পারেনি। ৬ দশমিক ৭ ভাগ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ৯ ভাগ প্রবৃদ্ধি থেকে ৫.৯ এ নেমে এসেছে কিন্তু বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। আগামীতে ৭ দশমিক ২ ভাগ প্রবৃদ্ধির যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে তাও অর্জিত হবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।'অনেকে বাজেটকে উচ্চাভিলাষী বলছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'জনগণকে নিয়ে আমাদের উচ্চাভিলাষ আছে।'
ঘাটতি বাজেট প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বমন্দা না থাকার পরও বিএনপির সময়ে ঘাটতি বাজেট ছিল। এমনকি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সুশীল সমাজের লোকেরা দেশ পরিচালনা করার সময় দুই বছরেও বাজেট ঘাটতি ছিল ৫ দশমিক ২ ভাগ।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজেটে ঘাটতি ৮ দশমিক ২ ভাগ উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'তাদের মত দেশেও যদি ঘাটতি বাজেট হতে পারে তাহলে আমাদের বাজেট নিয়ে এত কিছু বলার কি আছে।'
শেখ হাসিনা বলেন, বর্তমান সরকার মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করে যাচ্ছে। গত সাড়ে তিন বছরে মূল্যস্ফীতি ৯ ভাগে নামিয়ে আনা হয়েছে। ১০ শতাংশ দারিদ্র হ্রাস পেয়েছে এবং গ্রামাঞ্চলের ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। জনগণের আয় ও ক্রয় ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। মাথাপিছু আয় ৮৪৮ ডলারে উন্নীত হয়েছে।
ভাড়া ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে সমালোচনার জবাবে তিনি বলেন, "অনেকে বলেন, বিদ্যুৎ নেই। গত কয়েকদিন ধরে বক্তৃতা, আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠেছে। তারা বলছেন, রেন্টাল-কুইক রেন্টাল করায় নাকি মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু এছাড়া আর কি করার উপায় ছিলো? কিছু লোক আছেন, তাদের কোনো কিছুই ভালো লাগে না। সরকারে সফলতা 'ট্যারা চোখে' দেখেন। আমাদের কোনো কাজ ভালো লাগে না।"
প্রধানমন্ত্রী বিদ্যুতের কুইক রেন্টাল পদ্ধতির সমালোচনা প্রসঙ্গে বলেন, এই কুইক রেন্টাল শিল্প কল-কারখানায় উৎপাদন বৃদ্ধি করেছে। অন্যথায় উৎপাদন ব্যাহত হতো। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার বিদ্যুৎ পরিস্থিতিকে যে পর্যায়ে রেখে গিয়েছিল দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদনে না গেলে এক ভয়াবহ বিপর্যয় হতো।
তিনি বলেন, ১৯৯৬ সালে আমরা ১৬শ' মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাই। মেয়াদ শেষে ২০০১ সালে ৪ হাজার ৩শ' মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রেখে যাই। বিএনপি'র পাঁচ বছর ও পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছরে এক মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো হয়নি বরং কমেছে।
শেখ হাসিনা বলেন, বর্তমান সরকারের সাড়ে তিন বছরে ৩ হাজার ৮শ' মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে। এই সময়ে ২৫ লাখ নতুন গ্রাহককে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হয়েছে। এর ফলে ১ কোটি ৩০ লাখ গ্রাহক বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে। ৫৩ শতাংশ মানুষ এখন বিদ্যুৎ সুবিধা পাচ্ছে।
তিনি বলেন, "তিন বছরে ১৯ লাখ ফ্রিজ আর এক লাখ মাইক্রোভেন ব্যবহার বেড়েছে। এতে প্রতি বছর ৪৪০ মে.ওয়াট বিদ্যুৎ খরচ বেড়েছে। মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ঘটছে বলেই ইলেকট্রনিক জিনিসের ব্যবহার করছে। ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে। ল্যাপটপ ব্যবহার করছে মানুষ।"
তিনি বলেন, ইতোমধ্যে মানুষের আয় ও ক্রয় ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। আধুনিক জীবনযাপন ও তথ্য প্রযুক্তির বিকাশের ফলে ডেস্কটপ, ল্যাপটপ, ফ্রিজ, টেলিভিশন, মোবাইল ফোনের ব্যাপক বৃদ্ধি, ইজি বাইক ও আইপিএস চার্জ করতে প্রচুর বিদ্যুৎ খরচ হয়। এতে বিদ্যুতের চাহিদা আগের চেয়ে ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে প্রায় ৭৮ লাখ লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, ক্রমবর্ধমান এই বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুততম সময়ে মেটানোর লক্ষ্যে স্বল্প ও মধ্য মেয়াদী কর্মসূচির অংশ হিসেবে রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদী বড় বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।
তিনি বলেন, আরো ২৫টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণাধীন রয়েছে। এগুলো থেকে ৩ হাজার ৯৫৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। ২৯টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের টেন্ডার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এগুলো নির্মাণ কাজ শেষ হলে ৫ হাজার ১৫৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রীডে যুক্ত হবে। এছাড়া ১১শ' মেগাওয়াট কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, সরকার শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনই নয়, পাশাপাশি এর সুষ্ঠু বিতরণ ব্যবস্থাও কার্যকর করেছে। সিস্টেম লস ১২ দশমিক ৫ শতাংশ হ্রাস করে অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় এ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের জন্য গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম কিছুটা বেড়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের ফলে আমরা এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে পা দিয়েছি। রাস্তাঘাটসহ অবকাঠামোগত উন্নয়নে হাত দেয়া হয়েছে। সড়ক-মহাসড়কের সংস্কারমূলক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ১৪শ' কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, বিএনপিসহ অতীতের সরকারগুলো কোন সংস্কারমূলক কার্যক্রম হাতে নেয়নি। তারা জনগণের দিকে না তাকিয়ে শুধু নিজেদের আখের গুছিয়েছে। জনগণের টাকা লুটপাট করে তা বিদেশে পাচার করেছে।
বাজেট বাস্তবায়নে সকলের সহযোগিতা কামনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশ আরো একধাপ এগিয়ে যাবে। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার ২০২১ সালের মধ্যে দেশকে একটি ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত উন্নত, সমৃদ্ধ মধ্যম আয়ের সোনার বাংলায় পরিণত করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। এজন্য এবারের বাজেটে এডিপি'র আকার প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কর আদায়ে সংসদের পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমরা অঙ্গীকার করেছিলাম আত্মনির্ভরশীল হবো, অন্যের কাছে হাত পাতবো না, রাজস্ব আদায় করে নিজের পায়ে দাঁড়াবো।
তিনি বলেন, বর্তমানে রাষ্ট্রপতি ছাড়া প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী এবং সংসদ সদস্যদের করের আওতায় আনা হয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, বিভিন্ন বিতর্কের নিষ্পত্তি করতে আমরা আলোচনার পথ বেছে নেই।
মোবাইল ফোনের ওপর বাজেটে যে কর প্রস্তাব করা হয়েছে তা প্রত্যাহার করার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের টার্নওভার বাৎসরিক ৭০ লাখ টাকা তাদের ক্ষেত্রে বর্তমান সুবিধা বহাল রাখার, গার্মেন্ট শিল্পের উৎস কর শূন্য দশমিক ৮ ভাগে নামিয়ে আনা, ব্যক্তিগত কর সীমা ২ লাখ টাকার মধ্যে রাখাসহ যাদের একাউন্টে ১ লাখ টাকা তাদের টিআইএন বাধ্যতামূলক না করার এবং ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের বিকাশ ঘটাতে এই শিল্পে যাদের ৪০ লাখ টাকার ব্যবসা রয়েছে তাদের আয় করমুক্ত করারও আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর বাজেট বক্তৃতা শুরুর আগে চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চলে প্রবলবর্ষণে প্রাণহানীতে শোক প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, দুর্গত এলাকায় ত্রাণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেনাবাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি মোকাবেলায় কাজ করছে।
