যুদ্ধাপরাধীদের বিচার অবশ্যই সম্পন্ন করা হবে: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
বৃহস্পতিবার | ২৮ জুন ২০১২ | ১৪ আষাঢ় ১৪১৯
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন করার অঙ্গীকার ব্যক্ত এবং এ ব্যাপারে দেশবাসীর সহযোগিতা কামনা করেছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করেছে তাদের বিচার করার এক কঠিন কাজে আমরা হাত দিয়েছি। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস জাতিকে ৪১ বছরের কলঙ্ক থেকে মুক্ত করতে আমরা তাদের বিচার সম্পন্ন করতে সক্ষম হবো।' তিনি গতকাল রাজধানীতে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ডিজিটাল ব্যবস্থায় মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের ৪টি প্রকল্পের নাম ফলক উন্মোচনকালে এ কথা বলেন।
প্রকল্প ৪টির মধ্যে রয়েছে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের গজনভী সড়কে বহুতল বিশিষ্ট আবাসিক ও বাণিজ্যক ভবন, পোস্তাগোলায় 'বিজয় নিকেতন' আবাসিক প্রকল্প, চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে 'টাওয়ার-৭১' বাণিজ্যিক কমপ্লেক্স এবং একই এলাকায় বহুতল বিশিষ্ট বাণিজ্যিক কমপ্লেক্স 'জয় বাংলা'।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করেছিলেন এবং স্বাধীনতার পর মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা, নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের সঙ্গে জড়িত ১১ হাজার মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর সামরিক শাসক কারাগার থেকে ১৯৭১ সালের অপরাধীদের ছেড়ে দেয়। সে সময়ের সামরিক শাসক তাদেরকে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীর পদ দিয়ে পুনর্বাসিত করে।
শেখ হাসিনা বলেন, বর্তমান সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করায় আন্দোলন, আল্টিমেটাম ও অরাজকতার মতো বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এই বিচার প্রক্রিয়া ভণ্ডুলের ষড়যন্ত্র পাকানো হচ্ছে।
তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত এবং মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে কাজ করতে তাঁর সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অনুপ্রাণিত হয়ে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ায় এগিয়ে আসতে সকলের প্রতি আহ্বান জানান।
শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন হয়েছিল। এজন্য এ দলটি সব সময় স্বাধীনতার চেতনা সমুন্নত রাখা ও মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে কাজ করতে অঙ্গীকারাবদ্ধ।
তিনি বলেন, ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ ও ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমরা মহান স্বাধীনতা অর্জন করেছি। যে জাতি স্বাধীনতার জন্য এতো ত্যাগ স্বীকার করতে পারে, সে জাতি পিছিয়ে থাকতে পারে না।
প্রধানমন্ত্রী আগামী প্রজন্মের সামনে পাকিস্তানী দখলদার বাহিনী ও তাদের স্থানীয় দোসরদের নৃশংসতা তুলে ধরতে ১৯৭১ সালের গণকবরগুলো সংরক্ষণ করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন।
মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের উত্তরাধিকারীরা যাতে সরকার ঘোষিত সুযোগ-সুবিধা পায়, এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে তিনি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেন।
তিনি বলেন, স্বাধীনতার পরে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের অসহায় পরিবার ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট গঠন করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কল্যাণ ট্রাস্টের অধীনে পাকিস্তানীদের পরিত্যক্ত লাভজনক প্রতিষ্ঠানসমূহ ন্যস্ত করা হয়। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে অর্জিত লভ্যাংশ মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে ব্যয় করা হয়।
তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ষড়যন্ত্রকারীরা জাতির পিতাকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করে। এরপর ক্ষমতাসীন শাসকেরা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭৮ সালে ১১টি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ট্রাস্টের অধীনে ন্যস্ত করা হয়। এর ফলে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট লোকসানের মুখে পড়ে। বিভিন্ন ধরনের অব্যবস্থাপনা ও চক্রান্তের মাধ্যমে একের পর এক প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়।
তিনি বলেন, ট্রাস্টের বেহাল অবস্থা দেখে তার সরকার জাতির পিতার হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান পুনরুজ্জীবনের জন্য ৮১ কোটি টাকা ব্যয়ে উদ্ধার পরিকল্পনা গ্রহণ করে।
তিনি বলেন, বিগত তিন বছরে ট্রাস্ট অগ্রগতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আমরা ট্রাস্টের ১২৬ কোটি টাকা ঋণ মওকুফ করে দিয়েছি। ৭ কোটি টাকার ইউটিলিটি বিল পরিশোধ করেছি। ৪০ বছর পর নারায়ণগঞ্জে ৭০ কোটি টাকা মূল্যের জায়গা উদ্ধার হয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, ট্রাস্ট এখন নিজস্ব তহবিল দিয়ে চট্টগ্রামে একটি ওয়্যার হাউস নির্মাণের কাজ হাতে নিয়েছে। বর্তমানে গৃহীত ৪টি প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে উদ্ধার পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০১৪ সালের মধ্যে ট্রাস্টের প্রায় ৩শ' কোটি টাকা মূলধন জমা হবে।
শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর নেতৃত্বাধীন পূর্ববর্তী সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফনের প্রথা চালু করে। তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের উচ্চশিক্ষা এবং সরকারি চাকরিতে কোটা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছি এবং এবার মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-নাতনির জন্য কোটা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য উল্লেখযোগ্য হারে বাজেট বৃদ্ধি করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা সম্মানী ভাতাভোগীর সংখ্যা ১ লাখ থেকে বৃদ্ধি করে দেড় লাখ করা হয়েছে। মাসিক সম্মানী ভাতা ৯শ' থেকে বৃদ্ধি করে ২ হাজার টাকা করা হয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, ভূমিহীন ও অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ২২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ২ হাজার ৯১৫ ইউনিট বিশিষ্ট আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ২৫ হাজার ৮১৬ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যকে রেশনিং এর আওতায় আনা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরির বয়স সীমা ৫৭ থেকে ৫৯ করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৬৪ জেলায় মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ডাটাবেজ তৈরির কাজ চলছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত স্থানে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হচ্ছে।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মিজানুর রহমানের সভাপতিত্বে এ অনুষ্ঠানে একই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ক্যাপ্টেন (অব.) এবি তাজুল ইসলাম এবং ওই মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম এবং মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মেজর জেনারেল একে শিকদার বক্তৃতা করেন।
