বিএনপি ক্ষমতায় এলে আমাদের গণমুখী কর্মসূচি বন্ধ করে দেয় : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
জোট আমলে টাঙ্গাইলে ছিল সন্ত্রাস আর এখন সমৃদ্ধি :প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
রোববার | ১ জুলাই ২০১২ | ১৭ আষাঢ় ১৪১৯
প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে সরকার গঠন করেছিল বলেই টাঙ্গাইলবাসী রেলগাড়ি দেখছেন। নির্মিত হয়েছে বঙ্গবন্ধু সেতু। রেল যোগাযোগ সুবিধার পাশাপাশি তারা সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে গ্যাসও পাচ্ছেন। রাজধানীর সঙ্গে আশপাশের জেলাগুলোর যোগাযোগ সহজ করতে কমিউটার ট্রেন চালু করার আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, টাঙ্গাইলের সঙ্গে ঢাকার কমিউটার ট্রেন চালু হলে এ এলাকার বাসিন্দারা দিনে গিয়ে কাজ শেষ করে দিনেই ফিরে আসতে পারবেন।
গতকাল শনিবার টাঙ্গাইলে বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্ব স্টেশন সংলগ্ন মাঠে আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, অতীতে যারাই ক্ষমতায় এসেছে তাদের আমলে রেল ছিল অবহেলিত। আওয়ামী লীগ রেলকে আরো গতিশীল করেছে। তিনি বলেন, টাঙ্গাইল-ঢাকা সড়ক চার লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। টাঙ্গাইলকে সাংস্কৃতিক শহরে পরিণত করা হবে। তাঁতশিল্পের উন্নয়নে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে সারের জন্য কৃষককে প্রাণ দিতে হয়। খুন, রাহাজানির স্ফীতিতে জনজীবনে আতংক সৃষ্টি হয়। সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ লালন-পালনকারী বিএনপি শুধু দেশের সম্পদ লুটপাট করে বিদেশে পাচার করে। বিএনপি ক্ষমতা থাকা মানেই সন্ত্রাস, দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত থাকে গোটা দেশ। তিনি বলেন, বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার দেশকে জঙ্গি রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল। আওয়ামী লীগের জনস্বার্থে যেসব কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়, জোট ক্ষমতায় এসে তা বাতিল করে দেয়। '৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণ কাজ শুরু করেছিল। বিএনপি বঙ্গবন্ধু সেতুর রেললাইন সংযোগ করেনি। আমরাই সেতুতে রেললাইন সংযুক্ত করেছি। আমরাই ক্ষমতায় এসে যে সকল গণমুখী কাজ শুরু করি বিএনপি ক্ষমতায় এসে তা বন্ধ করে দেয়। দেশের জনগণ বিএনপির গণবিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগকে নৌকায় ভোট দিয়ে জনগণের সেবা করার সুযোগ দিয়েছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার মানেই দেশের মানুষের উন্নয়ন ও ভাগ্যের পরিবর্তন। আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় গেলে দেশের মানুষ ভাল থাকবে।
এর আগে সেখানে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্ব রেল স্টেশন থেকে ভুঞাপুর-তারাকান্দি নব-নির্মিত রেললাইন উদ্বোধন করেন। এর ফলে বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্বঅংশের সঙ্গে যুক্ত হলো তারাকান্দি ও জামালপুর। আর এর মধ্যদিয়ে ময়মনসিংহ অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে নতুন অধ্যায় সূচিত হলো। উদ্বোধনকৃত ৪০ দশমিক ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ রেললাইনের নির্মাণ কাজ ১৯৯৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পূর্বের মেয়াদে শুরু হয়েছিল। পরবর্তী সময় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার এর কাজ বন্ধ করে দেয়।
বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্ব রেল স্টেশন সংলগ্ন জনসভায় টাঙ্গাইল ও সিরাজগঞ্জ থেকে দুর্গম চরাঞ্চলে নৌকাযোগে জনসভায় যোগদান করে। যমুনা নদীতে ছিল বিশাল নৌকার মিছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১০টা ২০ মিনিটে বঙ্গবন্ধু সেতু ক্যান্টনমেন্টে হেলিপ্যাডে অবতরণ করেন। সেখান থেকে সরাসরি বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্ব রেল স্টেশন সংলগ্ন জনসভার মঞ্চে উঠেই জনতার উদ্দেশে হাত নেড়ে তাদের শুভেচ্ছা জানান। জনতার মুহুর্মুহু শ্লোগানে জনসভাস্থল মুখরিত হয়ে ওঠে। প্রধানমন্ত্রীকে এ সময় বেশ উত্ফুল্ল দেখা যাচ্ছিল। এই জনসভায় টাঙ্গাইল, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলার দুর্গম চরাঞ্চলের মানুষ নৌকার বহন নিয়ে জনসভাস্থলে উপস্থিত হয়। জনসভা শেষে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্ব রেল স্টেশনের ভুঞাপুর-তারাকান্দির নব-নির্মিত লাইনের উদ্বোধন করেন এবং ট্রেনযোগে তারাকান্দির উদ্দেশ্যে রওনা হন।
প্রধানমন্ত্রী বর্তমান সরকারের গৃহীত অসমাপ্ত উন্নয়ন কাজ সমাপ্ত করতে এবং সুখী ও সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গড়তে তার দলকে পুনরায় সুযোগ দিতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, গত সাড়ে তিন বছরে দেশের সার্বিক দারিদ্র্য ১০ শতাংশ কমেছে। শেখ হাসিনা বলেন, তার সরকার সারাদেশে রেলওয়ে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের লক্ষ্যে পৃথক রেলপথ মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করেছে। তিনি বলেন, ধলেশ্বরী নদীর ওপর সেতু নির্মাণ কাজ ২০১৩ সালের মধ্যে সম্পন্ন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার সরকার জনগণের বিপুল সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসার পর দেশের উন্নয়নে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। তিনি বলেন, 'মুদ্রাস্ফীতি এখন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। জনগণের আয় বেড়েছে এবং তাদের ক্রয়ক্ষমতাও বৃদ্ধি পেয়েছে।' তিনি বলেন, কৃষকদের সহায়তায় কৃষিক্ষেত্রে ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে। শেখ হাসিনা বলেন, বিধবা, স্কুল শিক্ষার্থীদের দরিদ্র পিতা-মাতা, মুক্তিযোদ্ধা এবং অন্যান্য স্বল্পআয় ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়নে অর্থ সহায়তা দেয়া অব্যাহত রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পথে। তিনি বলেন, টাঙ্গাইলের কারিগরি টেক্সটাইল ইনস্টিটিউটের নির্মাণ কাজ এ বছর শেষ হবে। বর্তমান সরকারের আমলে এ জেলায় গৃহীত উন্নয়ন কর্মসূচির উল্লে¬খ করে শেখ হাসিনা বলেন, এখানে ৯৮টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সংস্কার এবং টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের আধুনিকায়ন করা হয়েছে। তাছাড়া টাঙ্গাইলে একটি মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে এ সরকারের। মধুপুর বন রক্ষায় তার সরকারের উদ্যোগের উল্লেখ করে তিনি বলেন, মানুষ এখন গাছ কাটার পরিবর্তে বরং সামাজিক বনায়নের আওতায় গাছের চারা রোপণ করছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে টাঙ্গাইল সন্ত্রাসীদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছিল। আর এ সরকারের আমলে এ জেলাকে সমৃদ্ধ অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলার জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি এই রেলপথ উদ্বোধনের পর ট্রেনযোগে বঙ্গবন্ধু সেতুর (পূর্ব) পাশের স্টেশন থেকে তারাকান্দি স্টেশন পর্যন্ত যান। যাত্রাকালে তিনি টাঙ্গাইলের ভুয়াপুর ও হেমনগরে দুটি স্টেশন উদ্বোধন করেন।
কালিহাতি উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মোজাহারুল ইসলাম তালুকদারের সভাপতিত্বে জনসভায় আরো বক্তব্য রাখেন রাখেন কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী, পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক ও টাঙ্গাইল জেলা পরিষদ প্রশাসক ফজলুর রহমান খান প্রমুখ। বেগম মতিয়া চৌধুরী বলেন, আমরা শিক্ষার উন্নয়নে ছাত্র-ছাত্রীদের যথাসময়ে পাঠ্যবই পৌঁছে দিয়েছি। নারী শিক্ষার উন্নয়নে আমরা বিভিন্নমুখী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছি। প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্বপ্রান্ত থেকে নব-নির্মিত রেল সংযোগে ট্রেনে তারাকান্দি যাবার পথে টাঙ্গাইল-হেমনগর রেল স্টেশনে পথসভায় বক্তৃতা করেন। এ জনসভায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসা মানেই দেশের উন্নয়ন। জনগণের কল্যাণে কাজ করাই আওয়ামী লীগের লক্ষ্য। বিএনপি ক্ষমতায় আসলে দেশ জঙ্গি রাষ্ট্রে পরিণত করে। বিকালে জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় প্রধানমন্ত্রী বক্তৃতা করেন।
গতকাল শনিবার বিকাল ৪টায় সরিষাবাড়ী পৌরসভার শিমলা বাজার এলাকার গণময়দানে বিশাল জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপির নীতিই হচ্ছে ভিক্ষা করে খাওয়া, দেশকে পরনির্ভরশীল করা। আর আওয়ামী লীগের নীতি হচ্ছে মর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশকে গড়ে তোলা।
প্রধানমন্ত্রী জামালপুরের উন্নয়ন সম্পর্কে বলেন, আমরা ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ, মেলান্দহ, চর রাজিবপুর সড়কে রাস্তা-ব্রিজ, কালভার্ট নির্মাণ করছি। সরিষাবাড়ী উপজেলার ভূমি অফিস, বয়ড়া বাজার ব্রাহ্মণজানি হাট সংযোগ সড়কে ঝিনাই নদীর ওপর ব্রিজ নির্মাণ করেছি, বাহাদুরাবাদ ঘাট ও সরিষাবাড়ীর পিংনা ইউনিয়ন যমুনার কবল থেকে রক্ষা করার জন্য বাঁধ নির্মাণ করছি। আজ আমরা যে রেললাইনটি উদ্বোধন করলাম এখন থেকে আপনারা সরাসরি ঢাকা-চট্টগ্রাম-নর্থবেঙ্গলসহ যে কোন জায়গায় অল্প সময় ও অল্প খরচে যাতায়াত করতে পারবেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখানে এশিয়ার ২য় সর্ববৃহত্ যমুনা সারকারখানা আছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হলে স্বাভাবিকভাবেই দেশের উন্নতি হবে। তিনি সরিষাবাড়ীবাসীর উদ্দেশে বলেন, আমি আপনাদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। গত নির্বাচনে আপনারা আমার প্রার্থীকে নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করেছেন। প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, সরিষাবাড়ীর মানুষ একসময় বিএনপির সন্ত্রাসীদের দ্বারা নির্যাতিত হতো, তার অবসান হয় ২০০১ সালের নির্বাচনের পর।
সরিষাবাড়ী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ্ব আব্দুল মালেকের সভাপতিত্বে জনসভায় বক্তব্য রাখেন এলজিইডি মন্ত্রী আশরাফুল ইসলাম, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, ভূমিমন্ত্রী রেজাউল করিম হীরা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, খাদ্য মন্ত্রী আঃ রাজ্জাক ভোলা, আওয়ামী লীগের চিফ হুইফ মির্জা আজম, স্থানীয় এম.পি. ডাঃ মুরাদ হাসান প্রমুখ।
মোহাম্মদ নাসিম বলেন, শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসলে কৃষক সময়মতো ন্যায্যমূল্যে সার, বীজ ও বিদ্যুত্ পায়। আর খালেদা জিয়া ক্ষমতায় আসলে কৃষককে গুলি খেয়ে মরতে হয়।
