পদ্মা সেতু প্রকল্প বিষয়ে গণমাধ্যমের উদ্দেশ্যে মাননীয় অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য
ঢাকা, ১ জুলাই, ২০১২
প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রোনিক মিডিয়ার প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ,
গতকাল বিশ্বব্যাংক একটি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ঘোষণা করে যে, তারা পদ্মা সেতুর জন্য বাংলাদেশের সাথে যে ঋণচুক্তি দস-খত করেছিল সেটি বাতিল করা হয়েছে। তাদের বিজ্ঞপ্তিতে একটি অভিযোগ করা হয়েছে যে, একটি দুর্নীতি সংশ্লিষ্ট ষড়যন্ত্র প্রতিরোধে বাংলাদেশ যথাযথ ব্যবস্থা নেয় নি। তারা এই বিজ্ঞপ্তিতে দাবী করেছে যে, তারা ৩টি বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের সম্মতি চায় এবং তারা সেটা পায় নি। আমি গতকাল এক সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বিশ্বব্যাংকের এ ধরনের বিজ্ঞপ্তি প্রদানের যৌক্তিকতা সম্বন্ধে সন্দেহ প্রকাশ করেছি এবং সেজন্য তাদের বিজ্ঞপ্তিটি অগ্রহণযোগ্য মনে করেছি। আমি আরও বলেছি যে, "পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ তারা তুলে ধরেছে এবং সে সম্বন্ধে আমরা কোন পদক্ষেপ নেয় নি" এই কথাটিও সঠিক নয়। এই বিষয়েই কিছু বক্তব্য রাখার জন্য আমি আজকে আপনাদের আহ্বান করেছি।
২। আমি আরও বলেছি যে, যেহেতু জাতীয় সংসদের অধিবেশন চলছে সেহেতু আগামীকাল জাতীয় সংসদে বিস্তারিত বক্তব্য রাখবো। জাতীয় সংসদের অধিবেশন আজকে হলে আমি আজকেই বক্তব্য দিতাম। কিন' বিশ্বব্যাংকের বিজ্ঞপ্তির ফলে সংবাদ মাধ্যমে নানা ধরনের আধা-তথ্য অথবা অভিমত ব্যক্ত করা হচ্ছে বলে আমার মনে হলো যে, বিষয়টিকে খানিকটা প্রাঞ্জল করার দায়িত্ব আমার রয়েছে। সেজন্য আজকে আপনাদের আমন্ত্রণ করেছি এবং সংক্ষিপ্ত লিখিত বক্তব্য পেশ করছি।
৩। বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের অন্যতম বন্ধুপ্রতীম সংস্থা। স্বাধীনতার পর থেকে অদ্যাবধি ২৫১টি প্রকল্পের বিপরীতে ১৬৮০ কোটি মার্কিন ডলার তারা অর্থায়ন করেছে এবং এখন পর্যন- ১৪৫০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ অপরিশোধিত রয়েছে। বর্তমানে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ৩৫টি প্রকল্প বাংলাদেশে চলমান রয়েছে যাতে মোট ৪৯৫ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ রয়েছে।
৪। প্রাথমিকভাবে বিশ্বব্যাংক সড়ক ও যোগাযোগ ক্ষেত্রে অর্থায়ন করলেও পরবর্তীতে (২০০৭-০৮ সাল থেকে) তারা এই সেক্টরে বিগত সরকারের সময়ে দুর্নীতির কারণে অর্থায়নে বিরত থাকে। বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর ২০১০ সালে বিশ্বব্যাংক আবার সড়ক ও যোগাযোগ ক্ষেত্রে বিশেষ করে পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়নে আগ্রহ প্রকাশ করে। বিশ্বব্যাংক ২৯০ কোটি মার্কিন ডলারের প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রধান সহ-অর্থায়নকারী হিসেবে ১২০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণচুক্তি ২০১১ সালের ২৮ এপ্রিলে সম্পাদন করে। কিন্তু প্রকল্পে কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তিতে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন সাময়িকভাবে স'গিত রাখে।
৫। আমি ইতোমধ্যে বলেছি যে, এই বিষয়ে গত নয় মাস ধরে বিশ্বব্যাংকের সাথে আমাদের আলোচনা এবং চিঠিপত্র আদান-প্রদান হচ্ছে এবং বিশ্বব্যাংকের সন্দেহ নিরসনের জন্য আমরা অসাধারণ সব পদক্ষেপ নিয়েছি। বিশ্বব্যাংকের আগ্রহের কথা আমি আমার বাজেট বিষয়ক সমাপনী বক্তব্যে বিশদভাবে তুলে ধরেছি। সেই আগ্রহে ভাটা পড়ে যখন বিশ্বব্যাংক আমাদের নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের প্রাকযোগ্যতা নিয়ে একটি চীনা প্রতিষ্ঠানের জন্য জারিজুরি করতে থাকে। এই চীনা প্রতিষ্ঠানের জারিজুরি সমস্তই এই প্রতিষ্ঠানের বাঙালি সহকারীর জালিয়াতি বলে ধরা পড়ে। তা ধরা পড়লে বিশ্বব্যাংক ৫টি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের প্রাকযোগ্যতা অনুমোদন করে দেয়। কিন্তু সেতুর কাজ অগ্রায়নে বিলম্ব প্রক্রিয়া অবলম্বন করে বলে আমাদের মনে হয়। এবং তার পরে থেকেই শুরু হয় আমাদের গত নয় মাসের দুর্দিন।
৬। আমি আগেই সংবাদ মাধ্যমকে বলেছি যে, বিশ্বব্যাংকের প্রথম লিখিত দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়ার পরে আমরা সে সম্বন্ধে আমাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করি। আমার বাজেট বক্তব্যে আমি জানিয়েছি যে, বিশ্বব্যাংক আমাদের দেশে ৭টি দুর্নীতির বিষয়ে তদন- করে তাদের সুপারিশ তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং আমাদের কাছে প্রেরণ করে। এই প্রতিটি ক্ষেত্রেই কোন সময় প্রকল্প বাস-বায়নের কাজ বন্ধ করে রাখা হয় নি। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে আমি অক্টোবর মাসে প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং তদন্ত- প্রক্রিয়া আলাদা করার জন্য বিশ্বব্যাংককে পরামর্শ দিই। তারা সেটি গ্রহণ করেন নি।
৭। আমরা এবিষয়ে আরো আলোচনা করেছি, আরো পদক্ষেপ নিয়েছি। যেমন- সেতু প্রকল্পের নেতৃত্বে পরিবর্তন নিয়ে এসেছি। বিশ্বব্যাংক মনে হয় সেসব বিষয় আমলে নেন নি। পরিবর্তে তারা তখন নির্মাণ ঠিকাদারদের বিষয়টি অতিরিক্ত তদন- করতে সুপারিশ করেন এবং তাদের দৃষ্টি নির্মাণ পরামর্শক ঠিকাদারের দিকে নিবদ্ধ করেন। তারা গত এপ্রিল মাসে আমাদের এবিষয়ে তাদের অভিমত ব্যক্ত করেন এবং কানাডীয় কর্তৃপক্ষের কার্যাবলী বিবেচনা করে তদন্ত জোরদার করতে বলেন। আসলে কিন্তু এই বিষয়ে আমাদের দুর্নীতি দমন কমিশন গত বছরের আগস্ট মাস থেকেই তদন্ত শুরু করে। তারা নির্মাণ ঠিকাদার সম্বন্ধে তদন্ত প্রতিবেদনও বিশ্বব্যাংককে এই বছর ফেব্রুয়ারিতে প্রেরণ করেন। বিশ্বব্যাংক সেক্ষেত্রেও তাদের অধিকতর তদন্ত করতে সুপারিশ করেন। এই বিষয়াবলী দুর্নীতি দমন কমিশনের আওতায় বলে আমরা এ ব্যাপারে মাথা গলাই নি। শুধু মাঝে মাঝে আমরা তদন্তের অগ্রগতি সম্বন্ধে তথ্য চাই। আমরা জানতে পারি যে, বিশ্বব্যাংক এইসব বিষয়ে যে নালিশ করেছেন সে সম্বন্ধে অতিরিক্ত কোন সাক্ষী-সাবুদ দেন নি এবং দুর্নীতি দমন কমিশন তাদের নিজস্ব উপায়ে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছেন।
৮। এই সময়ে আমাদের আমন্ত্রণে বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিনিধিদল ঢাকায় অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে এবং স্বতন্ত্রভাবে দুর্নীতি দমন কমিশনের সঙ্গে আলোচনা করেন। তাদের সঙ্গে ৪ জুনে আমাদের বিস্তারিত আলোচনা হয় এবং আমরা আবারও বলি যে, তদন্ত প্রক্রিয়া এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া আলাদা করা হোক। বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় যেহেতু উন্নয়ন সহযোগীদের অনাপত্তি ছাড়া কখনও কোন দরপত্র গ্রহণ করা হয় না সেজন্য আমরা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় এবং বিশেষ করে ক্রয় কার্যক্রমে তাদেরকে অধিকতর ভূমিকা দিতে প্রস্তাব করি। বিশ্বব্যাংক ৫ জুনে আমাদের লিখিতভাবে তাদের অবস্থানটি জানান এবং কতিপয় বিষয়ে আমাদের সম্মতি চান। আমরা ১২ জুনে এই বিষয়ে আমাদের মতামত এবং আমাদের পদক্ষেপ বিশ্বব্যাংককে জানিয়ে দিই এবং চূড়ান্ত আলোচনার জন্য তাদের আহ্বান করি। অতঃপর বিশ্বব্যাংক এই বিষয়ে ঢাকায় আলোচনার নিমিত্তে আর একটি দলকে ২৩ জুনে প্রেরণ করে। এই দলের সঙ্গে আমাদের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের আবারও স্বতন্ত্র বৈঠক হয়। বিশ্বব্যাংক এই সময়ে আমাদের কাছে তিনটি বিষয় নিয়ে সমঝোতা চান। তারা বিশ্বব্যাংক এবং বাংলাদেশের মধ্যে একটি Memorandum of Understanding (MoU) দাবি করেন। তারা আরো দাবি করেন যে, দুর্নীতি দমন কমিশনের কাজের বিষয়ে বিদেশী উপদেষ্টাদের সঙ্গে একটি Terms of Reference (ToR)-এ দুর্নীতি দমন কমিশনকে সম্মতি দিতে হবে।
৯। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতার খাতিরে এবং পদ্মা সেতুতে সম্পূর্ণভাবে দুর্নীতি বিতাড়নের লক্ষ্যে আমরা অনেক বিষয়ে তাদের দাবি-দাওয়া মেনে নিই। কিন্তু আমাদের উদ্দেশ্যে ছিল যে, এমনভাবে বিষয়টির সমাধান হবে যাতে (১) সম্ভাব্য দুর্নীতির জন্য আমরা অসম্মানজনক কোন Memorandum of Understanding (MoU) সম্পাদন করবো না, এবং (২) দুর্নীতি দমন কমিশনের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য তারা কোন বিদেশি প্যানেলের সঙ্গে Terms of Reference (ToR) গ্রহণ করবে না। পরিবর্তে আমরা চাই যে, বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে চিঠিপত্রের মাধ্যমে আমরা প্রকল্প বাস্তবায়নের এবং তদন্ত পরিচালনার বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছাবো। এবং সেই উদ্দেশ্যে আমরা আমাদের বিধি-বিধান এবং রীতিনীতি যথেষ্ট শিথিল করে বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন শর্তকে আমাদের মত করে গ্রহণ করি।
১০। তারপরে বিশ্বব্যাংক কেন এই ঋণচুক্তি বাতিল করে অসম্মানজনক একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করলো তা বাস্তবেই অনাকাঙ্ক্ষিত এবং রহস্যজনক। এই বিষয়টি বিশ্বব্যাংকের পুনর্বিবেচনা করা উচিত বলে আমি মনে করি। আমাদের নির্বাহী পরিচালক এই বিষয় নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। আমরা তাদের পুনর্বিবেচনার জন্য অপেক্ষা করবো। এই জন্য এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তের খাতিরে আমরা বিশ্বব্যাংকের চিঠিপত্র প্রকাশ করতে বিরত থাকলাম। কিন্তু নানা রকম অহেতুক এবং অযাচিত মন্তব্য যাতে না হয় সে জন্য আমরা দুর্নীতির বিষয়ে যেসব চিঠিপত্র লিখেছি সেগুলো সবই আপনাদের হাতে তুলে দিলাম। আমাদের বিভিন্ন পদক্ষেপ সম্বন্ধে আমরা অন্যান্য অর্থায়নকারীদের অবহিত রেখেছি এবং আশা করছি যে, তারা বিশ্বব্যাংকের এই পদক্ষেপটি বিশ্লেষণ করে দেখবেন।
১১। আপনারা আমার বক্তব্য এবং এই চিঠিপত্র থেকে দেখবেন যে, আমরা সর্বোতভাবে দুর্নীতি যাতে সংঘটিত না হতে পারে সেই প্রচেষ্টা চালিয়েছি। তাই বিশ্বব্যাংকের প্রেসনোটের দাবি একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং সঠিকও নয়। আমরা কিন্তু এখনও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা বহাল রেখেছি এবং আমরা চাই সুষ্ঠুভাবে বিষয়টির সমাধান হোক।
১২। আগামীকাল জাতীয় সংসদে আমি আরও বিস্তারিত বক্তব্য রাখবো এবং সেটি আপনাদের সবাইকে আমি সরবরাহ করবো।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ
জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু
