ইউনিয়ন তথ্য ও সেবা কেন্দ্রের মাধ্যমে আর্থিক উন্নতি লাভ করছেন রাজশাহীর যুবকেরা

 

মাত্র তিন বছরেই জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছেন রাজশাহীর জিয়াউল হক। আর এটা সম্ভব হয়েছে ‘ইউনিয়ন তথ্য সেবা কেন্দ্র’ স্থাপনের মধ্য দিয়ে। তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সেবা প্রদানকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলেন তিনি। আর এখন এই কাজের মাধ্যমে তিনি প্রতি মাসেই সন্তোষজনক আয় করছেন।

জিয়াউল হক (৩৫) প্রায় তিন বছর আগে রাজশাহীর পবা উপজেলার হুজরিপাড়ায় ইউনিয়ন তথ্য সেবা কেন্দ্র স্থাপন করেন। তিনি বলেন, ‘আমি এই সেবা কেন্দ্রের মাধ্যমে প্রায় ৩৭ রকম প্রযুক্তি সেবা দিয়ে যাচ্ছি। ২০১১ সালে আমি এই কেন্দ্রটি চালু করেছিলাম। এই কেন্দ্রের মাধ্যমে এখন আমি ভালো আয় করছি। গত মে মামে আমি প্রায় ৮০ হাজার ও জুন মাসে ৮৫ হাজার টাকা আয় করেছি। এখানে সোনিয়া খাতুন নামে আরো একজন উদ্যোক্তা কাজ করছেন।’ তিনি জানান, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে তিনি ২১,১০৫টি সেবা দিয়ে প্রায় ৩ লাখ ৫১ হাজার টাকা আয় করেছেন।

ইউনিয়ন তথ্য সেবা চালুর শুরুতে যে আয় হচ্ছিল তাতে জিয়াউল খুব একটা ভরসা পাচ্ছিলেন না। প্রথমদিকে এই কাজে তার লোকসান হচ্ছিল। আরো লোকসান দিয়ে এ কাজ করবেন কিনা- এমন ভাবনা ও হতাশার মধ্যে কেটে গেল কয়েকটি মাস। কিন্তু ছয় মাসের মধ্যেই তিনি দেখলেন লোকজন বিভিন্ন জরুরি তথ্য সেবা নিতে তার কেন্দ্রে আসছেন।

এরপর জিয়াউলকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। ইউনিয়ন তথ্য সেবায় আয়-রোজগারের দিক দিয়ে তিনি বর্তমানে রাজশাহী জেলার সর্বোচ্চ স্থানে বিভাগীয় পর্যায়ে (৮ জেলার মধ্যে তুলনামূলকভাবে) দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্থানে রয়েছেন। এই তথ্য কেন্দ্রের মাধ্যমে মানুষকে প্রযুক্তিতে কৃষি, ভূমি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও আইন সহায়তা প্রদান ছাড়াও ছাত্র বেকার যুবক-যুবতীদের কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দেয়া হয়, যা কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে অনেকের সহায়ক হয়েছে।

জিয়াউল জানান, সম্প্রতি এই কেন্দ্র থেকে তার বড় ধরনের আয় আসছে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, কম্পোজিং, স্ক্যানিং, প্রিন্টিং সেবা, ফটোগ্রাফি, ফটোকপি, অনলাইন রেজিস্ট্রেশন, জন্ম নিবন্ধন এবং ইন্টারনেট ব্রাউজিং থেকে। তিনি বলেন, ইউনিয়ন পর্যায়ে তথ্য প্রযুক্তি সম্প্রসারণ তথা কম্পিউটার, ল্যাপটপ, লেজার ও কালার প্রিন্টার, প্রজেক্টর, মোডেম, ডিজিটাল ক্যামেরা, স্ক্যানার, আইপিএস, ইউপিএস ও ফটোস্ট্যাট মেশিন দিয়ে সেবা প্রদান করা কোনো কৌতুকের বিষয় নয়।

জিয়াউল হকের মতো ইউনিয়ন তথ্য সেবা কেন্দ্রের মাধ্যমে উপজেলা তথা জেলার অনেক উদ্যোক্তাই লাভজনক কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়েছেন। এর মাধ্যমে তারা নিয়মিত আয়-রোজগার করছেন এবং ইতোমধ্যে অনেকেই তাদের জীবনে আর্থিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছেন।

হরগ্রাম ইউনিয়নের উদ্যোক্তা রকিবুল হাসান রনি জানান, তিনি জুন মাসে তার তথ্য সেবা কেন্দ্রের মাধ্যমে ৪৭ হাজার ৪৮৮ টাকা আয় করেছেন। বর্তমানে বিরাজমান কিছু সমস্যার সমাধান হয়ে গেলে খুব স্বল্প সময়ের মধ্যেই আরো বেশি টাকা আয় করতে পারবেন বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন। রাজশাহী কলেজের স্নাতকোত্তর শ্রেণীর ছাত্র রনি তার সংক্ষিপ্ত কর্মজীবনের বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘আমি ইউনিয়ন তথ্য সেবা কেন্দ্রের মাধ্যমে স্ব-কর্মে নিয়োজিত থাকতে চাই এবং আশা করি এতে একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে সমাজে অবদান রাখতে পারবো।’

তিনি আরো জানান, ইউনিয়ন তথ্য সেবা কেন্দ্র থেকে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নেয়ার পর বেকার যুবকদের চাকরি বা কর্মসংস্থান হচ্ছে। এছাড়া ছাত্র-ছাত্রী, যুবক-যুবতী ও কর্মজীবী মানুষেরাও এখানে কম্পিউটার শিখছেন, যা তাদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করছে।

রাজশাহীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সাধারণ) ড. দেওয়ান শাহরিয়ার ফিরোজ জানান, ইউনিয়ন তথ্য সেবা কেন্দ্র থেকে উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন সেবা পাওয়া যাচ্ছে। যার মাধ্যমে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের মানুষের সময় ও টাকার সাশ্রয় হচ্ছে। জেলার ৯টি উপজেলার মোট ১৪২ জন উদ্যোক্তা, যাদের মধ্যে ৭১ জন মহিলা, তারা ইউনিয়ন তথ্য সেবা কেন্দ্রের মাধ্যমে স্বনির্ভর হয়ে উঠেছেন। তাদের মধ্যে কয়েক জন আবার কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে সরকারি চাকরিও পেয়েছেন।

তিনি আরো জানান, ইউনিয়ন তথ্য সেবা কেন্দ্র জনগণের সেবায় বিরাট ভূমিকা রাখছে। এছাড়া তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির প্রশিক্ষণ এবং চাকরি সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য প্রদানেও এ কেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. প্রদীপ কুমার পান্ডে বলেন, ইউনিয়ন তথ্য সেবা কেন্দ্রকে আরো কার্যকর করার জন্য জনসচেতনতা জরুরিভাবে প্রয়োজন। এক্ষেত্রে গণমাধ্যম ও জনপ্রতিনিধিদেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

-ডঃ আয়নাল হক (সূত্রঃ বাসস)

TOP