এলএনজি যেভাবে জ্বালানীর দৃশ্যপট পাল্টে দিবে

 

বাংলাদেশের জ্বালানী সংকটের মূলে রয়েছে জ্বালানী ঘাটতি। এই ঘাটতি পূরণের জন্য বর্তমান সরকার ২০১৮ সালের মধ্যে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে ৫০০ এমএমসিএফডি এলএনজি সরবরাহের লাইন সংস্কার করছে। জ্বালানী বিষয়ে জ্ঞান রাখেন এমন ব্যক্তি মাত্রই জানেন যে, কতটা প্রাকৃতিক গ্যাসের ঘাটতি ছিল গত এক দশক ধরে অথবা অর্থনীতির অগ্রযাত্রা কিভাবে থমকে গেছে গ্যাসের কারণে। উপকূলবর্তী এবং অফশোর এলকায় নতুন নতুন গ্যাস ক্ষেত্র আবিস্কার এবং উন্নয়নে সময়ক্ষেপণ করায় অর্থনীতির চাকাকে গতিশীল রাখতে এলএনজি আমদানির প্রয়োজনীয়তা তৈরী করেছে।

 

সমগ্র বাংলাদেশ, বিশেষ করে চট্টগ্রাম অঞ্চল, তীব্র গ্যাস সংকটে ভুগছে প্রায় এক দশক ধরে। ৬০০ এমএমসিএফডি এরও বেশি গ্যাস ঘাটতি রয়েছে সরকারী হিসেবে। চট্টগ্রামে ৪০০ এমএমসিএফডি গ্যাসের চাহিদার তুলনায় ২৫০ এমএমসিএফডি সরবরাহ করা হয়ে থাকে। মাত্র ২৫০-২৬০ এমএমসিএফডি গ্যাস জাতীয় গ্রিডে জমা হলে গ্যাসের ঘাটতি থাকে সব জায়গাতেই। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য মহেশখালিতে ভাসমান সংরক্ষণাগার এবং গ্যাস পুন:সংযোগের ইউনিটের কাজ ২০১৮ সালের এপ্রিলের মধ্যে শেষ হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। এরই মধ্যে মহেশখালি থেকে চট্টগ্রামে আরএলএনজি পরিবহনের জন্য ৩০ ইঞ্চি ব্যাসরেখার ৯০ কিলোমিটার আনোয়ারা গ্যাস সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করেছে জিটিসিএল। কেজিডিসিএল এর মাধ্যমে আনোয়ায় ১৫০০ এমএমসিএফডি ক্ষমতাসম্পন্ন প্রধান সিটি গেট স্টেশন ইতোমধ্যে গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন রিং পরিচালিত হচ্ছে। ২০১৮ সালের মার্চ মাসের মধ্যে চট্টগ্রামের আনোয়ারা সিইজি'র মিটারিং স্টেশনটির অসাধারণ কাজ সম্পন্ন করা উচিত যাতে করে সেখান থেকে প্রায় ৪০০ এমএমসিএফডি গ্যাস পাওয়া যায়। আনোয়ারা সিএজি এসএইচ থেকে শিকলবাহে কাফকো, সিইউএফএল এবং বিদ্যুৎ প্ল্যান্টের গ্যাস সরবরাহ সহজলভ্য হবে।

জিটিসিএল চট্টগ্রামের আনোয়ারা থেকে ফৌজদার হাট পর্যন্ত ২৮ কিলোমিটার ৪২ ইঞ্চি ব্যাসরেখার পাইপলাইন নির্মাণ করছে। এই পাইপ লাইন কর্ণফুলি নদীর মধ্যে দিয়ে জাতীয় গ্রিডে আরএলএনজি সংযুক্ত হবে। এই পাইপ লাইন যদি ২০১৮ সালের এপ্রিলের মধ্যে নির্মাণ শেষ হয় তবে জাতীয় গ্রিডে আরএলএনজি সংযুক্তির সুযোগ সৃষ্টি করবে। ফৌজদারহাট থেকে বাখরাবাদ পর্যন্ত ১৮০ কিলোমিটার ৩৬ ইঞ্চি ব্যাসরেখার গ্যাস সঞ্চালন লাইন বসানোর প্রকল্প হাতে নিয়েছে জিটিসিএল যা ২০১৯ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

স্থানীয় কোম্পানী সামিট গ্রুপ মহেশখালিতে ৫০০ এমএমসিএফডি সম্পন্ন ভাসমান সংরক্ষণাগার এবং গ্যাস পুন:সংযোগ ইউনিটের কাজ শেষ করবে ২০১৯ সালের মাঝামাঝিতে। এটা সম্পন্ন হলে কমপক্ষে ১০০০ এমএমসিএফডি আরএলএনজি উৎপাদন সম্ভব হবে ২০১৯ সালের শেষ নাগাদ। আরো কিছু ভাসমান সংরক্ষণাগার এবং গ্যাস পুন:সংযোগ ইউনিট এবং কিছু সমতলে অবস্থিত এলএনজি টার্মিনালের কাজ বাস্তবায়নের পথে রয়েছে। ২০১৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ৪০০০ এমএমসিএফডি আরএলএনজি ব্যবহারের চাহিদা থাকবে।

এলএনজি নতুন ধারণা:

বাংলাদশে জ্বালানরি মিশ্রণে আরএলএনএনজি’র ব্যবহার একটি নতুন ধারা তৈরী হবে। আরএলএনজি বাংলাদেশের বাজারে বাজারজাত করার আগে বর্তামানে গ্যাসের যে বাজার মূল্য রয়েছে বিশ্ববাজারের তুলনায় কম। প্রান্তিক গ্রাহক পর্যায়ে গ্যাসের যে দাম রয়েছে তা পুর্ননির্ধারণ করতে হবে সবার আগে। সৌভাগ্যক্রমে বিশ্ববাজারে এলএনজির সরবরাহ যথেষ্ট পরিমাণে রয়েছে এবং সুলভ মুল্যে এলএনজি আমদানি করার সুুযোগ হচ্ছে। এলএনজি আমদানির বিষয়ে কাতারের সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তি হয়েছে এবং দীর্ঘ মেয়াদে এলএনজি আমদানির জন্য অন্যদেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা বেশ এগিয়েছে। পেট্রোবাংলার কোম্পানী রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানী লিমিটেড বাজারে এলএনজি পরিবেশক নির্ধারণ করতে বেশ তৎপর রয়েছে। যেকোন ক্ষেত্রেই পেট্রোবাংলা একটি উপযুক্ত ব্যবহার কৌশল গ্রহণ করবে যা কেবলমাত্র মূল্য ব্যবহারের জন্য সরবরাহ করবে। শিল্প-কলকারখানায় ব্যবহার দক্ষ জ্বালানী সরবরাহ করা আবশ্যক। বাসা বাড়ির গৃহস্থলির কাজে এবং বাণিজ্যিক ভোক্তাদের বর্তমান সরবরাহটি ধাপে ধাপে এবং এলপিজি দ্বারা প্রতিস্থাপিত করা উচিত যাতে এটি সব ব্যবহারকারীকে সাশ্রয়ী মূল্যে সরবরাহ করা যায়। সার কারখানায় এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস ব্যবহার অবশ্যই পুর্নবিবেচনা করা উচিত। যানবাহনে সিএনজি’র পরিবর্তে অটোগ্যাস ব্যবহার বাড়াতে হবে।

ভাসমান সংরক্ষণাগার এবং গ্যাস পুন:সংযোগ ইউনিট বছরের ৩৬৫দিন কাজ করে না। বাংলাদেশের সমুদ্রের প্রকৃতির ধরণ অনুযায়ী এ ধরনের প্ল্যান্ট বছরে সর্বোচ্চ ২৪০-২৫০ দিন কার্যক্ষমতা রাখে। এখানে সাগরের তুলনায় সমতল ভূমিতে এলএনজি প্ল্যান্ট তৈরী করা শ্রেয়। যতদিন পর্যন্ত কমপক্ষে একটি ভূমি ভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল থাকবে ততক্ষণ বৃহৎ ব্যবহারকারীর নতুন সংযোগ নিয়ন্ত্রিত হতে হবে। চাহিদা এবং ব্যবস্থাপনা অবশ্যই পরিকল্পিত এবং বাস্তবায়িত হতে হবে। চাহিদা ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা মাফিক হতে হবে এবং এর প্রয়োগও হতে হবে।

TOP