সবজি চাষে স্বাবলম্বী হচ্ছে নারী

 

মেহেরপুর সদর উপজেলার আমঝুপি ইউনিয়নের একটি গ্রাম চাঁদবিল। এই গ্রামের স্বামী পরিত্যক্তা ছালেহা বেগম স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছেন সবজি চাষ করে।

ছালেহা জানান, ১০ বছর সংসার জীবনের পর তার স্বামী অন্যত্র বিয়ে করে বিদেশে চলে যান। উপায় না দেখে একমাত্র কন্যা সন্তানকে নিয়ে তিনি বাবার বাড়ি চলে আসেন। বাবার বাড়িতে থাকার জন্য তাকে একখ- জমি দেন বাবা। ওই জমিতেই একটি কুঁড়ে ঘর তৈরি করে ছালেহা বেগম বাকি জায়গায় সবজিসহ ফলের বাগান করেন। এখন সবজি ও ফলবাগান থেকে যা আয় হয় তা দিয়ে তার সংসার খুব সুন্দরভাবে চলে যায়।
ছালেহা আরো জানান, তার বাগানের সবজি বিষমুক্ত হওয়ায় এলাকায় ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ফলে তাকে বাজারে যেতে হয় না। বাড়ি থেকেই বিক্রি হয়ে যায়। খুচরা এবং পাইকারী দুইভাবেই বিক্রি হয় তার সবজি।
শুধু ছালেহা বেগমই নয়, সারাদেশেই এখন সবজি চাষে বিপ্লব ঘটিয়েছেন নারীরা। নারীরা এখন পরিবারের চাহিদা মেটাতে শুধু ঘরের আশপাশে বা ঘরের চালেই সবজি চাষ করেন না। তারা বাণিজ্যিক ভিত্তিতেও সবজি চাষে এগিয়ে এসেছেন। ফলে সবজির উৎপাদন যেমন বাড়ছে, তেমনি পরিবারে আয়ের পথেও সহযোগী হচ্ছেন তারা।
আমাদের দেশে ব্যাপক এলাকায় রয়েছে চরাঞ্চল। আছে পাহাড়ি অঞ্চল। বর্তমানে চরাঞ্চল ও পাহাড়ি এলাকায় যে সবজি উৎপাদন হয়, তার মূল ভূমিকায় অংশ নিচ্ছেন নারীরাই। দেশের বিভিন্ন নদ-নদীতে জেগে ওঠা চরে এখন সারা বছরই সবজির ফলন হয়। তাতে জমি তৈরি করা, বীজ বপণ, পরিচর্যা, সবজি উঠানো ইত্যাদি সব ক্ষেত্রেই নারীরা প্রধান ভূমিকায় থাকেন। পুরুষরা প্রয়োজনে সহযোগিতা করেন। পুরুষরা তাদের নিজস্ব পেশা বা কাজে যুক্ত থাকেন। এমনিভাবে পাহাড়ি অঞ্চলেও এখন যেভাবে ফল বাগান ও সবজি বাগান গড়ে উঠেছে, তাতে নারীদের প্রাধান্যই লক্ষ্য করা যায়। পাহাড়ি নারীরা এমনিতে খুব কর্মঠ। তাই তাদের শ্রমে সবজির উৎপাদনও হয় খুব ভাল।
এছাড়া সম্প্রতি দেখা গেছে, দেশের বিভিন্ন স্থানে নারীরা তাদের বাড়ির আশপাশের পতিত জায়গাকে বেছে নিয়েছেন সবজি চাষের জন্য। এতে পতিত জায়গার যেমন সদ্ব্যবহার হচ্ছে, তেমনি সবজির উৎপাদনও বাড়ছে। অনেকেই জমি লীজ নিয়েও সবজির আবাদ করছেন, যেখানে নারীদের ভূমিকাও অনেক।
এদিকে মানুষের মধ্যে সবজি খাওয়ার প্রবণতা দিনদিনই বাড়ছে। আগে সবজির প্রতি মানুষের তেমন আগ্রহ ছিল না। ফলে আগে ঘরের চালেই লাউ, কুমড়া ইত্যাদির উৎপাদন হতো। এখন বাণিজ্যিক ভিত্তিতেও লাউ-কুমড়ার মতো সবজিরও চাষ হয়।
মেহেরপুরের জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক চৈতন্য কুমার দাস জানান, গত কয়েক বছর ধরে এ অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে চালকুমড়ার চাষ হচ্ছে। এবার ২৯২ হেক্টর জমিতে কুমড়ার চাষ হয়েছে। কুমড়া চাষ লাভজনক বলেও জানান তিনি।
এই কুমড়া উৎপাদনেও নারীদের বেশ ভূমিকা রয়েছে। তারা কুমড়া চাষ ছাড়াও কুমড়ার বড়ি তৈরি করেন। আর এটাও করেন নারীরা। ফলে সবজি আবাদ ও বিক্রির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থেকে নারীরা স্বাবলম্বী হচ্ছেন।
আমরা প্রায়ই এখন পত্র-পত্রিকা বা বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে দেখি নারীরা কৃষি কাজ তথা সবজি উৎপাদনে বেশি করে সংশ্লিষ্ট হচ্ছেন। পত্রিকায় প্রায়ই দেখা যায়, সবজি ক্ষেতে নারীরা কাজ করছেন। তাদের এই কাজে অর্থ আয়ের ফলে পরিবারে তাদের গুরুত্বও বাড়ছে।
দেখা গেছে, নারীরা যে কাজই করেন না কেন, অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে করেন। সেটা শ্রমজীবী কিংবা অন্য কোন কাজেই হোক। সবজি আবাদেও তারা খুব মনোযোগী হয়ে থাকেন। এতে উৎপাদিত সবজি বিক্রি করে প্রাপ্ত অর্থ ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার জন্যও ব্যয় করেন। অনেকে বাড়তি আয়টা সঞ্চয়ও করেন।
নারীদের সবজি চাষে একাগ্রতা দেখে কৃষি বিভাগ থেকেও বেশ সহযোগিতা করা হয়ে থাকে। মেহেরপুর সদর উপজেলার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আশরাফুল আলম বলেন, আমরা সবসময়ই নারীদেরকে সবজি চাষ করার জন্য উদ্বুদ্ধ ও সহযোগিতা করে থাকি। তাদের অনেকেই এখন বাড়ির আঙ্গিনা ছাড়াও আশপাশের জমিতে সবজি চাষ করে বেশ সফল হয়েছেন।
এদিকে সবজি চাষে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) কৃষকদের সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। উন্নত মানের বীজও সরবরাহ করা হচ্ছে। কোন কোন এনজিও স্থানীয়ভিত্তিতে সবজি চাষের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করছে। এতে তারা নারীদেরকেই সম্পৃক্ত করছে। নারীরাও আগের মতো কোন রকমে বাড়ির আশপাশে শুধু বীজ বপণ করেই সবজি চাষে আর আগ্রহী নয়। তারা রীতিমত প্রশিক্ষণ নিয়ে সবজি চাষে জড়িত হচ্ছেন।
সবজি চাষে নারীদের ব্যাপকভাবে এগিয়ে আসাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বলে উল্লেখ করেছেন কৃষিবিদ ড. মো. আবদুর রশিদ। তিনি বলেন, আগে পরিবারের চাহিদা মেটানোর জন্যই কেবল সবজি উৎপাদন করা হতো। এখন বাণিজ্যিকভাবে তা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, আগেও নারীরাই এ ক্ষেত্রে বেশি ভূমিকা পালন করতেন। আর তাতে নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখছে।
এদিকে সবজি চাষে নারীদের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা থাকলেও তারা তাদের কষ্টার্জিত উৎপাদনের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না বলে মনে করেন সচেতন মানুষ। এ ব্যাপারে আইনজীবী খন্দকার মহিবুল হাসান আপেল বলেন, আমাদের দেশে এখন সর্বক্ষেত্রেই নারীরা এগিয়ে আসছেন। কৃষিতেও তাদের ভূমিকা বেড়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে তাদের উৎপাদিত ফসল বা সবজির ন্যায্যমূল্য তারা পাচ্ছেন না। মধ্যস্বত্বভোগীরাই এতে লাভবান হচ্ছেন বেশি। তাই সবজির ন্যায্যমূল্য যাতে তারা পান সে ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়া জরুরি।
অনেকেই মনে করেন নারীরা সবজি আবাদে যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে যাচ্ছেন তার যথাযথ মূল্যায়ন হওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে জাতীয় বা আঞ্চলিক পর্যায়ে সবজি আবাদে যারা বিশেষ ভূমিকা রাখবেন তাদেরকে প্রতি বছর পুরস্কার দেয়া যেতে পারে। বিশেষ করে যারা নিঃস্ব অবস্থা থেকে সবজি আবাদ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন তাদেরকে স্বীকৃতি দিতে হবে। এতে আরো অনেকেই সবজি চাষে এগিয়ে আসবেন।