নাইকো দুর্নীতি পর্যালোচনাঃ সালেক সুফি

 

কানাডিয়ান কোম্পানি নাইকোর সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের ও পেট্রোবাংলার চুক্তি অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করে ঐতিহাসিক রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। ২০০৩ সালে ফেনী ও ছাতকের গ্যাসক্ষেত্র পুন:নির্মাণসহ ছাতকের পূর্ব কাঠামোর উন্নয়ন সংক্রান্ত চুক্তি করে বিএনপি-জামাত জোট সরকার।

রায়ে একই সাথে নাইকো কানাডা ও নাইকো বাংলাদেশের সব সম্পদ রাষ্ট্রীয় হেফাজতে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত এবং টেংরাটিলা গ্যাস ক্ষেত্রে বিস্ফোরণের ঘটনায় অন্যান্য মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নাইকোকে কোনো ধরনের পেমেন্ট করা যাবে না বলেও রায় দেন আদালত। আদালতে রিটটি উত্থাপন করেন কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ এর উপদেষ্টা ড. শামসুল আলম। ২০০৩ সালে বিএনপি জামাত সরকার ফেনী এবং ছাতকের গ্যাস ক্ষেত্রগুলির উন্নয়নের জন্য পেট্রোবাংলা ও বাপেক্স এর অযাচিত প্রস্তাবের উপর ভিত্তি করে দুটি চুক্তি করে। ফেনী গ্যাসক্ষেত্রকে আরো উন্নত করে করে জিটিসিএল দ্বারা পরিচালিত জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ শুরু করে পরবর্তীতে নাইকো। কিন্তু টেংরাটিলায় দুইটি বিস্ফোরণের পর পরস্পরবিরোধী বিরোধের কারণে ফেনীতে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। নাইকোর বিরুদ্ধে আইনগত অবহেলার বৈধ দাবি করে পেট্রোবাংলা। পেট্রোবাংলার গ্যাস বিক্রির জন্য নাইকোর অর্থ প্রদান স্থগিত করাও হয়েছিল। পরে বিষয়টি সালিসি পর্যায় গেলে পেট্রোবাংলা হেরে যায় এবং সুদসহ নাইকোকে অর্থ পরিশোধের জন্য বলা হয়। এদিকে, নাইকোর বিরুদ্ধে সম্পদের বিষয়ে কেলেঙ্কারির অভিযোগটি কানাডাতে নিষ্পত্তি হয়েছিল। কিন্তু পরে লেনদেনের মাধ্যমে চুক্তিটি গ্রহণের বিষয় স্বীকার করে নাইকো।

পিছনে ফিরে দেখা

১৯৯০ দশকের শেষের দিকে আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদকালে পেট্রোবাংলার মালিকানাধীন তিনটি গ্যাসক্ষেত্র ফেনী, কামতা এবং ছাতকের পুনর্বাসনের জন্য তৎকালীন বিদুৎ, জ্বালানি ও খনিজ মন্ত্রণালয়কে অযাচিত প্রস্তাব দেয় নাইকো। উৎপাদন অংশীদারত্ব চুক্তি-পিএসসি’র মাধ্যমে গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়নের কাজ পাওয়ার জন্য নাইকো বিডিং এ অংশ নেয়া থেকে বিরত থাকে। ঢাকার অদুরে কামতা গ্যাসক্ষেত্রটির পুনর্বাসন না হলেও ফেনী গ্যাস ক্ষেত্রটির উন্নয়নের দায়িত্ব পায় বিজিএফসিএলের মালিকানাধীন বিজিএসএল, আর ছাতকের গ্যাস ক্ষেত্রটির মালিকানায় ছিল এসজিএফএল। তবে শুরু থেকেই এর বিরোধিতা করে আসছিল পেট্রোবাংলা। ফেনী এবং ছাতকসহ টেংরাটিলার মতো প্রান্তিক গ্যাস ক্ষেত্রগুলিকেও বিবেচনায় আনতে পারেননি অভিজ্ঞ পেট্রোলিয়াম প্রকৌশলী এবং জলাধার বিশেষজ্ঞরা। ঘন ঘন বিতর্কের কারণে সরকার সুইস সরকারের চ্যানেল পদ্ধতির মাধ্যমে দর কষাকষি এবং প্রতিযোগিতামূলক মূল্যায়নের জন্য দরপত্র দাতাদের কাছ থেকে দরপত্র আহ্বানের একটি কৌশল গ্রহণ করে। নাইকোর প্রস্তাব সম্পর্কে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার কোনো সিদ্ধান্তও গ্রহণ করেনি তখন। ২০০৩ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামাত জোট সরকারের প্রথম দুই বছরেও এবিষয়ে কার্যত কোন পদক্ষেপ ছিল না। জ্বালানী ক্ষেত্রের স্বার্থান্বেষী একটি সিন্ডিকেট অহেতুক এ বিষয়ে আলোচনা করতে থাকে। ওই একই সময়ে বাপেক্স নাইকোর সঙ্গে অংশীদারিত্বেও ভিত্তিতে উৎপাদন এবং অনুসন্ধ্যানের কাজ করার জন্য পদক্ষেপ নিয়েছিল। সে সময় গ্যাস ফিল্ডগুলো আসল মালিক ও পরিচালনাকারীেেদর কাছ থেকে নিয়ে নেয়া হয়েছিল। সে সময় প্রচন্ড চাপ সত্ত্বেও বাপেক্স ও পেট্রোবাংলা ছাতক পূর্ব (টেংরাটিলা) কে সীমিত ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করতে রাজি হয়নি কারণ সেখানে কোনও অনুসন্ধান করা হয়নি। যায়হোক, বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের আইনী প্রতিষ্ঠান অদ্ভুদ এক আইনী পরামর্শ দেয় সে সময়। বলা হয় ছাতকের মতই ছাতত পূর্ব গ্যাস ক্ষেত্রের স্ট্রাকচার। সরকার পেট্্েরাবাংলা এবং বাপেক্স দুটি ভিন্ন চক্তি সই কওে নাইকোর সঙ্গে ফেনী এবং ছাতক গ্যাস ক্ষেত্রের জন্য পুনরায় উন্নয়নের জন্য। ফেনীতে কিছু নতুন কূপ খনন করে নাইকো সাফল্যের সাথে ফেনী থেকে উৎপাদনের চেষ্টা করে। কিন্তু তাদের অকার্যকর ড্রিলিং অপারেশন টেংরাটিলায় দুটি বড় দুর্ঘটনা ঘটায়। দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটে বিএনপি-জামায়াতের বিদ্যুৎ, জ্বালাানী ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী এ কে এম মোশারফ হোসেন যখন নাইকোর কাছ থেকে কোটি টাকার গাড়ি উৎকোচ নেয়ার অভিযোগে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়। মোশাররফ হোসেনের পদত্যাগের পর পরই প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জ্বালানী উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেয় মাহমুদুর রহমান। তদন্ত কমিটি দ্বিতীয়বার তলব করলে নাইকো তাদেও ব্যর্থতার কেন সদুত্তর দিতে ব্যর্থ হয়।তাদের বিরুদ্ধে দাবি উত্থাপিত হয়েছিল এবং ইতোমধ্যে নাইকোতে বিক্রিত গ্যাসের পেমেন্ট বন্ধ ছিল।

গ্যাস উত্তোলন ও সরবরাহের জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের সঙ্গে নাইকোর যৌথ উদ্যোগ চুক্তি অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করায় নাইকোর সব সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া কোর্ট। ওই চুক্তি দুটি করা হয় দুর্নীতির মাধ্যমে, যা শুরু থেকেই বাতিলযোগ্য। চুক্তি দুটির আওতায় নাইকো কানাডা ও নাইকো বাংলাদেশের সব সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে ফেরত যাবে।
হাইকোর্টের ঐতিহাসিক রায়টি কেলেঙ্কারিতে আরও অনুসন্ধানের পথ খুলে দিয়েছে। আদালতের রায় অনুযাায়ী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবশ্যই আইনের আওতায় আনতে হবে এবং ন্যায়বিচার অবশ্যই করা উচিত। একই সাথে গ্যাস ও জ্বালানি খাতের দুর্নীতির অন্য সব বিষয়গুলোর দিকেও নজর দেয়া উচিত।

TOP