দক্ষতা নির্ভর কর্মমুখী শিক্ষায় তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ছে

 

দক্ষ মানবসম্পদের চেয়ে কোন সম্পদই বড় নয়। বাংলাদেশের ১৮-৩৫ বছর বয়সী এ বয়সসীমার জনসংখ্যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ, যা আনুমানিক ৫ কোটি। জনসংখ্যার প্রতিশ্রুতিশীল, উৎপাদনমুখী এই যুবগোষ্ঠীকে সুসংগঠিত, সুশৃঙ্খল এবং দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরের লক্ষ্যে, আওয়ামী লীগ সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। জনশক্তিকে সম্পদে পরিণত করার জন্য কর্মমুখী শিক্ষার সম্প্রসারণ ও মানোন্নয়নে ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের যুবকদের নিয়ে সবসময়ই আশাবাদী। তিনি বলেন, ‘আমাদের মোট জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশ যুবক যা পৃথিবীর অনেক দেশেরই নেই। এই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড সদ্ব্যবহারকল্পে সৃজনশীল ও উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে ব্যাপকভাবে সম্পৃক্তকরণের বিকল্প নেই।’ দেশের যুব সমাজকে ‘অগ্রজাত্রার চালিকা শক্তি; ‘দেশের প্রাণ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

সরকার প্রশিক্ষণ প্রদান, ঋণ সহায়তা ও পরামর্শ দিয়ে তাদেরকে মানবসম্পদে পরিণত করছে। সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের ফলে দেশে যুবজাগরণ ঘটেছে। বিশেষ করে আত্মকর্মসংস্থানের ক্ষেত্রের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। প্রশিক্ষণ পেয়ে যুবকেরা আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছে।

আওয়ামী লীগ সরকার কর্মমুখী শিক্ষাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে আসছে। সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বে দেশে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় মোট শিক্ষার্থীর হার ছিল মাত্র শতকরা ১ দশমিক ৮ ভাগ। সরকারের নানাবিধ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ফলে তা এখন শতকরা ১৪ ভাগের উপরে উন্নীত হয়েছে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় ২০২০ সালে মোট শিক্ষার্থীর শতকরা ২০ ভাগ, ২০৩০ সালে ৩০ ভাগ এবং ২০৪০ সালে ৫০ ভাগে উন্নীত করার নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে সরকার।

শ্রম বাজারের হালচাল

বাংলাদেশের শ্রম বাজারের যেদিকে যাচ্ছে তাতে করে সেবা খাতের জন্য বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ এবং দক্ষতা বেশি দরকার হবে। শ্রম বাজারের সম্প্রসারণের সাথে-সাথে আসছে দিনগুলোতে দক্ষতার বিষয়টি বেশি প্রাধান্য পাবে বলে খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন যে, দক্ষতা-নির্ভর এবং বিশেষায়িত জ্ঞান নিয়ে তরুণরা তৈরি হলে ভালো মানের কর্মসংস্থানের অভাব হবে না। বাংলাদেশের ভেতরে এবং দেশের বাইরে শ্রম বাজার একই ইংগিত দিচ্ছে। সরকার যে ধরনের অর্থনৈতিক কৌশল প্রণয়ন করছে তাতে সামনের দিনগুলোতে শিল্প এবং সেবা খাতের বিকাশ হবে। ফলে তরুণদের জন্য চাকরীর বাজার বড় হবে।
জাতীয় দক্ষতা উন্নয়নঃ কর্মপরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন

দেশের ও বিশ্ব শ্রমবাজারের গতিপ্রকৃতি বিবেচনায় রেখে তরুণদেরকে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সরকার জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতি ২০১১ প্রণয়ন করে। সরকারের মন্ত্রণালয় ও বিভাগ, বেসরকারি ও এনজিও পরিচালিত কারিগরি এবং বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ প্রদানকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করে এ নীতি বাস্তবায়নের জন্য ‘জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কাউন্সিল’ গঠন করা হয়। এ কাউন্সিলের তত্ত্বাবধানে ২০১৪ সাল থেকে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্মপরিকল্পনা (পর্যায় ১) বাস্তবায়ন শুরু হয়। এটি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের সাথে সরকারের ৯ টি মন্ত্রণালয় এবং ৮ টি অধিদপ্তর যুক্ত ছিল। এটির মেয়াদ ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে সমাপ্ত হয়। কর্মপরিকল্পনার দ্বিতীয় পর্যায় (২০১৭-২১) প্রণয়ন সম্পন্ন হয়েছে এবং বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়ে গেছে।
ন্যাশনাল টেকনিকাল এন্ড ভোকেশনাল কোয়ালিফিকেশন ফ্রেমওয়ার্ক (এনটিভিকিউএফ) প্রণয়ন

সরকার কারিগরি শিক্ষার মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নেওয়ার জন্য ৬ লেভেলের ‘ন্যাশনাল টেকনিকাল এন্ড ভোকেশনাল কোয়ালিফিকেশন ফ্রেমওয়ার্ক’ প্রণয়ন করেছে। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড একটি রোডম্যাপ ধরে এই ফ্রেমওয়ার্ক বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে। ‘টিভেট রিফরম প্রজেক্ট’ -নামে একটি প্রকল্প বর্তমানে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর পাইলটিং করছে। কারিগরি শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালী করে গড়ে তোলা হচ্ছে। এনটিভিকিউএফ ফ্রেমওয়ার্কের ভিত্তিতে কারিগরি শিক্ষা পাঠ্যক্রম, প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল ও উপকরণ আধুনিক এবং যুগোপযোগী করা হচ্ছে। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড এখন পর্যন্ত ৫১ টি স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করেছে। এছাড়াও প্রয়োজনীয় জনশক্তি তৈরির কাজটিও দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। সরকারি ও বেসরকারি সবধরনের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এ ফ্রেমওয়ার্কের আওতায় নিয়ে আসা হবে।

শিল্প দক্ষতা পরিষদ গঠন

শিল্প প্রতিষ্ঠানের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টির লক্ষ্যে শিল্পের চাহিদাভিত্তিক কারিকুলাম তৈরি করা হচ্ছে। এই কাজে সহায়তার লক্ষ্যে এ পর্যন্ত ১২ টি শিল্প দক্ষতা পরিষদ গঠন করা হয়েছে। বেসরকারি খাতসহ দেশের বিভিন্ন ব্যবসায়িক সংগঠনের সঙ্গে যৌথভাবে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। প্রতিনিয়ত বিষয়গুলোকে মূল্যায়ন ও তদারক করা হচ্ছে। সামনের দিনগুলোয় এসব উদ্যোগের ফল পাওয়া যাবে।

অবকাঠামো নির্মাণ ও সম্প্রসারণ

দেশের সকল জেলায় যুবদের জন্য প্রশিক্ষণ অবকাঠামোগত সুবিধা সৃষ্টির লক্ষ্যে নতুন করে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে এবং বিদ্যমান প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।

  • সরকারি উদ্যোগে দেশে ৪ টি মহিলা (ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগীয় সদরে) পলিটেকটিক ইনস্টিটিউটসহ ৪৯টি সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপন করা হয়েছে
  • অবশিষ্ট সিলেট, বরিশাল, ময়মনসিংহ এবং রংপুর বিভাগীয় সদরে ৪টি মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপন করা হবে
  • পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে দ্বিতীয় শিফট চালু রয়েছে
  • ঢাকা, সিলেট, ময়মনসিংহ ও বরিশাল বিভাগে ৪টি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ স্থাপন করা হয়েছে
  • ৬৪টি টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজে দক্ষ মাবসম্পদ সৃষ্টির কার্যক্রম চালু আছে
  • প্রতিটি উপজেলায় ১টি করে টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, ইতোমধ্যে ১০০টি উপজেলায় কাজ শুরু হয়েছে
  • বিভিন্ন ট্রেডে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার লক্ষ্যে দেশে ৭০টি সরকারি টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার (টিটিসি) চালু আছে। এছাড়া প্রত্যেক উপজেলায় একটি করে সরকারি টিটিসি স্থাপনের নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে
  • ডিপ্লোমা কোর্সে আসন সংখ্যা ২৫০০০ হতে ৫৭,৭৮০ বৃদ্ধি করা হয়েছে
  • মহিলাদের কোটা ১০ থেকে ২০ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে
  • বেসরকারি ক্ষেত্রে ৪৫৭টি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটসহ প্রায় ৭৭৭৩ টি বিভিন্ন কারিগরি প্রতিষ্ঠান স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে

চলমান দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্প

কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তায় বেশ কিছু প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে এবং কয়েকটি ইতোমধ্যে সমাপ্ত হয়েছে। স্কিলস ফর এমপ্লয়মেন্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম ( এসইআইপি), বাংলাদেশ স্কিলস ফর এমপ্লয়মেন্ট এন্ড প্রোডাক্টিভিটি প্রজেক্ট (বিএসইপি), স্কিলস এন্ড ট্রেনিং এনহান্সমেন্ট প্রজেক্ট (এসটিইপি), বি- স্কিলফুল প্রকল্প বর্তমানে চলমান রয়েছে।
এসব প্রকল্পের আওতায় কারিগরি শিক্ষক ও কর্মকর্তাগন উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছেন। ডিপ্লোমা পর্যায়ে শিক্ষার্থীদেরকে মাসিক বৃত্তি প্রদান করা এবং সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে এবং টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দেয়া হচ্ছে।

যুব উন্নয়ন অধিদফতর বেকার যুবদের চাহিদা পূরণে প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ সমন্বয়ে মোট ৭৪টি ট্রেডে দেশব্যাপী প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সরকারের বিগত মেয়াদ থেকে এই পর্যন্ত ১৫ লাখ ৩০ হাজার ৯৮২ জন যুবক ও যুব মহিলাকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। এসব প্রশিক্ষিত যুবদের মধ্যে থেকে একই সময়ে ৪ লাখ ২৯ হাজার ৫৬৭ জন যুবক ও যুব মহিলাকে আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করা হয়েছে। সরকারের ৪০টিরও অধিক মন্ত্রণালয় ও বিভাগ প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

কর্মমুখী শিক্ষায় তরুণদের আগ্রহ

দিনে দিনে কর্মমুখী শিক্ষায় আগ্রহী হচ্ছে তরুণরা। এ ধরনের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে এখন ভর্তির হার বেশ বেড়েছে। সরকারের নানাবিধ উদ্যোগের ফলশ্রুতিতে এ ধারায় অংশগ্রহণের হার শতকরা ১৪ ভাগে উন্নীত হয়েছে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় ২০২০ সালে মোট শিক্ষার্থীর শতকরা ২০ ভাগ, ২০৩০ সালে ৩০ ভাগ এবং ২০৪০ সালে ৫০ ভাগে উন্নীত করার নীতিগত সিদ্ধান্ত সরকার গ্রহণ করেছে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

কর্মমুখী শিক্ষার সার্বিক মানোন্নয়ন এবং এ ধারায় তরুণদের অধিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্য সরকার সামনে অনেকগুলো পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে। যেমনঃ

  • ২.৫ লক্ষ লোকে শিক্ষানবিসীর আওতায় আনয়ন
  • জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রম বাজারের চাহিদাভিত্তিক ৩০০ অকুপেশনাল স্ট্যান্ডার্ড তৈরি
  • বিভগীয় ও জেলা পর্যায়ে সমন্বিত জব প্লেসমেন্ট সেন্টার প্রতিষ্ঠা
  • জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে দক্ষতা উন্নয়ন কমিটি গঠন করা
  • কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং গবেষণা কার্যক্রম গতিশীল করা
  • শিল্প ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ বৃদ্ধি করা

আওয়ামী লীগ সরকার রূপকল্প ২০২১ সামনে রেখে অগ্রসর হচ্ছে। বাংলাদেশকে ২০৪১ সালের মধ্যে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ পেরিয়ে একটি শান্তিপূর্ণ সমৃদ্ধ, সুখী এবং উন্নত পরিণত করার ব্যাপারে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ। ২০১৫ থেকে ২০২০ সালে মধ্যে ১ কোটি ২৯ লক্ষ্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে দেশের শ্রমবাজার সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন। ফলে কর্মসংস্থানের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হবে। আমাদের উচ্চ ও মধ্যম মানের জনশক্তির বেশি প্রয়োজন হবে এবং আসছে দিনগুলোতে দক্ষতার বিষয়টি বেশি প্রাধান্য পাবে বলে মনে করা হচ্ছে। আমরা যদি বিপুল কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন ও দক্ষ তারুণ্য শক্তির সমাবেশ গড়ে তুলতে পারি তাহলে আমাদের অর্থনীতি কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌছতে পারবে।

দক্ষ মানবসম্পদের চেয়ে কোন সম্পদই বড় নয়। বাংলাদেশের ১৮-৩৫ বছর বয়সী এ বয়সসীমার জনসংখ্যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ, যা আনুমানিক ৫ কোটি। জনসংখ্যার প্রতিশ্রুতিশীল, উৎপাদনমুখী এই যুবগোষ্ঠীকে সুসংগঠিত, সুশৃঙ্খল এবং দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরের লক্ষ্যে, আওয়ামী লীগ সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। জনশক্তিকে সম্পদে পরিণত করার জন্য কর্মমুখী শিক্ষার সম্প্রসারণ ও মানোন্নয়নে ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে।    
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের যুবকদের নিয়ে সবসময়ই আশাবাদী। তিনি বলেন, ‘আমাদের মোট জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশ যুবক যা পৃথিবীর অনেক দেশেরই নেই। এই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড  সদ্ব্যবহারকল্পে সৃজনশীল ও উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে ব্যাপকভাবে সম্পৃক্তকরণের বিকল্প নেই।’ দেশের যুব সমাজকে ‘অগ্রজাত্রার চালিকা শক্তি; ‘দেশের প্রাণ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।    
সরকার প্রশিক্ষণ প্রদান, ঋণ সহায়তা ও পরামর্শ দিয়ে তাদেরকে মানবসম্পদে পরিণত করছে।  সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের ফলে দেশে যুবজাগরণ ঘটেছে। বিশেষ করে আত্মকর্মসংস্থানের ক্ষেত্রের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে।  প্রশিক্ষণ পেয়ে  যুবকেরা আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছে।   
আওয়ামী লীগ সরকার কর্মমুখী শিক্ষাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে আসছে। সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বে দেশে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় মোট শিক্ষার্থীর হার ছিল মাত্র শতকরা ১ দশমিক ৮ ভাগ। সরকারের নানাবিধ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ফলে তা এখন শতকরা ১৪ ভাগের উপরে উন্নীত হয়েছে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় ২০২০ সালে মোট শিক্ষার্থীর শতকরা ২০ ভাগ, ২০৩০ সালে ৩০ ভাগ এবং ২০৪০ সালে ৫০ ভাগে উন্নীত করার নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে সরকার।      শ্রম বাজারের হালচাল বাংলাদেশের শ্রম বাজারের যেদিকে যাচ্ছে তাতে করে সেবা খাতের জন্য বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ এবং দক্ষতা বেশি দরকার হবে। শ্রম বাজারের সম্প্রসারণের সাথে-সাথে আসছে দিনগুলোতে দক্ষতার বিষয়টি বেশি প্রাধান্য পাবে বলে খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন যে, দক্ষতা-নির্ভর এবং বিশেষায়িত জ্ঞান নিয়ে তরুণরা তৈরি হলে ভালো মানের কর্মসংস্থানের অভাব হবে না। বাংলাদেশের ভেতরে এবং দেশের বাইরে শ্রম বাজার একই ইংগিত দিচ্ছে। সরকার যে ধরনের অর্থনৈতিক কৌশল প্রণয়ন করছে তাতে সামনের দিনগুলোতে শিল্প এবং সেবা খাতের বিকাশ হবে। ফলে তরুণদের জন্য চাকরীর বাজার বড় হবে।         জাতীয় দক্ষতা উন্নয়নঃ কর্মপরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন   দেশের ও বিশ্ব শ্রমবাজারের গতিপ্রকৃতি বিবেচনায় রেখে তরুণদেরকে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সরকার জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতি ২০১১ প্রণয়ন করে। সরকারের মন্ত্রণালয় ও বিভাগ, বেসরকারি ও এনজিও পরিচালিত কারিগরি এবং বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ প্রদানকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করে এ নীতি বাস্তবায়নের জন্য ‘জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কাউন্সিল’ গঠন করা হয়। এ কাউন্সিলের তত্ত্বাবধানে ২০১৪ সাল থেকে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্মপরিকল্পনা (পর্যায় ১) বাস্তবায়ন শুরু হয়। এটি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের সাথে সরকারের ৯ টি মন্ত্রণালয় এবং ৮ টি অধিদপ্তর যুক্ত ছিল। এটির মেয়াদ ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে সমাপ্ত হয়।  কর্মপরিকল্পনার দ্বিতীয় পর্যায় (২০১৭-২১) প্রণয়ন সম্পন্ন হয়েছে এবং বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়ে গেছে।        ন্যাশনাল টেকনিকাল এন্ড ভোকেশনাল কোয়ালিফিকেশন ফ্রেমওয়ার্ক (এনটিভিকিউএফ) প্রণয়ন  সরকার কারিগরি শিক্ষার মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নেওয়ার জন্য ৬ লেভেলের ‘ন্যাশনাল টেকনিকাল এন্ড ভোকেশনাল কোয়ালিফিকেশন ফ্রেমওয়ার্ক’ প্রণয়ন করেছে। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড একটি রোডম্যাপ ধরে এই ফ্রেমওয়ার্ক বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে। ‘টিভেট রিফরম প্রজেক্ট’ -নামে একটি প্রকল্প বর্তমানে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর পাইলটিং করছে। কারিগরি শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালী করে গড়ে তোলা হচ্ছে। এনটিভিকিউএফ ফ্রেমওয়ার্কের ভিত্তিতে কারিগরি শিক্ষা পাঠ্যক্রম, প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল ও উপকরণ আধুনিক এবং যুগোপযোগী করা হচ্ছে। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড এখন পর্যন্ত ৫১ টি স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করেছে। এছাড়াও প্রয়োজনীয় জনশক্তি তৈরির কাজটিও দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। সরকারি ও বেসরকারি সবধরনের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এ ফ্রেমওয়ার্কের আওতায় নিয়ে আসা হবে।        শিল্প দক্ষতা পরিষদ গঠন শিল্প প্রতিষ্ঠানের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টির লক্ষ্যে শিল্পের চাহিদাভিত্তিক কারিকুলাম তৈরি করা হচ্ছে। এই কাজে সহায়তার লক্ষ্যে এ পর্যন্ত ১২ টি শিল্প দক্ষতা পরিষদ গঠন করা হয়েছে। বেসরকারি খাতসহ দেশের বিভিন্ন ব্যবসায়িক সংগঠনের সঙ্গে যৌথভাবে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। প্রতিনিয়ত বিষয়গুলোকে মূল্যায়ন ও তদারক করা হচ্ছে। সামনের দিনগুলোয় এসব উদ্যোগের ফল পাওয়া যাবে।অবকাঠামো নির্মাণ ও সম্প্রসারণ দেশের সকল জেলায় যুবদের জন্য প্রশিক্ষণ অবকাঠামোগত সুবিধা সৃষ্টির লক্ষ্যে নতুন করে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে এবং বিদ্যমান প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।• সরকারি উদ্যোগে দেশে ৪ টি মহিলা (ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগীয় সদরে)  পলিটেকটিক ইনস্টিটিউটসহ ৪৯টি সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপন করা হয়েছে• অবশিষ্ট সিলেট, বরিশাল, ময়মনসিংহ এবং রংপুর বিভাগীয় সদরে ৪টি মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপন করা হবে• পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে দ্বিতীয় শিফট চালু রয়েছে• ঢাকা, সিলেট, ময়মনসিংহ ও বরিশাল বিভাগে ৪টি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ স্থাপন করা হয়েছে • ৬৪টি টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজে দক্ষ মাবসম্পদ সৃষ্টির কার্যক্রম চালু আছে• প্রতিটি উপজেলায় ১টি করে টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, ইতোমধ্যে ১০০টি উপজেলায় কাজ শুরু হয়েছে• বিভিন্ন ট্রেডে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার লক্ষ্যে দেশে ৭০টি সরকারি টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার (টিটিসি) চালু আছে। এছাড়া প্রত্যেক উপজেলায় একটি করে সরকারি টিটিসি স্থাপনের নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে• ডিপ্লোমা কোর্সে আসন সংখ্যা ২৫০০০ হতে ৫৭,৭৮০ বৃদ্ধি করা হয়েছে • মহিলাদের কোটা ১০ থেকে ২০ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে • বেসরকারি ক্ষেত্রে ৪৫৭টি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটসহ প্রায় ৭৭৭৩ টি বিভিন্ন কারিগরি প্রতিষ্ঠান স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে চলমান দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্প   কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তায় বেশ কিছু প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে এবং কয়েকটি ইতোমধ্যে সমাপ্ত হয়েছে। স্কিলস ফর এমপ্লয়মেন্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম ( এসইআইপি), বাংলাদেশ স্কিলস ফর এমপ্লয়মেন্ট এন্ড প্রোডাক্টিভিটি প্রজেক্ট (বিএসইপি), স্কিলস এন্ড ট্রেনিং এনহান্সমেন্ট প্রজেক্ট (এসটিইপি), বি- স্কিলফুল প্রকল্প বর্তমানে চলমান রয়েছে।   এসব প্রকল্পের আওতায় কারিগরি শিক্ষক ও কর্মকর্তাগন উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছেন।  ডিপ্লোমা পর্যায়ে শিক্ষার্থীদেরকে মাসিক বৃত্তি প্রদান করা এবং সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে এবং টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দেয়া হচ্ছে।     যুব উন্নয়ন অধিদফতর বেকার যুবদের চাহিদা পূরণে প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ সমন্বয়ে মোট ৭৪টি ট্রেডে দেশব্যাপী প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সরকারের বিগত মেয়াদ থেকে এই পর্যন্ত ১৫ লাখ ৩০ হাজার ৯৮২ জন যুবক ও যুব মহিলাকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। এসব প্রশিক্ষিত যুবদের মধ্যে থেকে একই সময়ে ৪ লাখ ২৯ হাজার ৫৬৭ জন যুবক ও যুব মহিলাকে আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করা হয়েছে। সরকারের ৪০টিরও অধিক মন্ত্রণালয় ও বিভাগ প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কর্মমুখী শিক্ষায় তরুণদের আগ্রহ   দিনে দিনে কর্মমুখী শিক্ষায় আগ্রহী হচ্ছে তরুণরা। এ ধরনের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে এখন ভর্তির হার বেশ বেড়েছে।  সরকারের নানাবিধ উদ্যোগের ফলশ্রুতিতে এ ধারায় অংশগ্রহণের হার শতকরা ১৪ ভাগে উন্নীত হয়েছে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় ২০২০ সালে মোট শিক্ষার্থীর শতকরা ২০ ভাগ, ২০৩০ সালে ৩০ ভাগ এবং ২০৪০ সালে ৫০ ভাগে উন্নীত করার নীতিগত সিদ্ধান্ত সরকার গ্রহণ করেছে।ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকর্মমুখী শিক্ষার সার্বিক মানোন্নয়ন এবং এ ধারায় তরুণদের অধিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্য সরকার সামনে অনেকগুলো পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে। যেমনঃ
২.৫ লক্ষ লোকে শিক্ষানবিসীর আওতায় আনয়ন• জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রম বাজারের চাহিদাভিত্তিক ৩০০ অকুপেশনাল স্ট্যান্ডার্ড তৈরি • বিভগীয় ও জেলা পর্যায়ে সমন্বিত জব প্লেসমেন্ট সেন্টার প্রতিষ্ঠা • জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে দক্ষতা উন্নয়ন কমিটি গঠন করা• কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং গবেষণা কার্যক্রম গতিশীল করা  • শিল্প ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ বৃদ্ধি করা আওয়ামী লীগ সরকার রূপকল্প ২০২১ সামনে রেখে অগ্রসর হচ্ছে। বাংলাদেশকে ২০৪১ সালের মধ্যে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ পেরিয়ে একটি শান্তিপূর্ণ সমৃদ্ধ, সুখী এবং উন্নত পরিণত করার ব্যাপারে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ। ২০১৫ থেকে ২০২০ সালে মধ্যে ১ কোটি ২৯ লক্ষ্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে দেশের শ্রমবাজার সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন। ফলে কর্মসংস্থানের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হবে। আমাদের উচ্চ ও মধ্যম মানের জনশক্তির বেশি প্রয়োজন হবে এবং আসছে দিনগুলোতে দক্ষতার বিষয়টি বেশি প্রাধান্য পাবে বলে মনে করা হচ্ছে। আমরা যদি বিপুল কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন ও দক্ষ তারুণ্য শক্তির সমাবেশ গড়ে তুলতে পারি তাহলে আমাদের অর্থনীতি কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌছতে পারবে।

 

Share this
TOP