বাবা কখনো বকাও দিতেন নাঃ শেখ রেহানা

 

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৯৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে শিশু-কিশোরদের নিয়ে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফর্মেশন (সিআরআই)। শিশুদের কাছে বঙ্গবন্ধুর শৈশবকাল, রাজনৈতিক জীবন, সংগ্রামের কথা তুলে ধরার লক্ষ্যেই এই অনুষ্ঠানটি আয়োজন করা হয়।

অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানা তার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিকসহ উপস্থিত হন। বিদ্যুৎ, জ্বালানী ও খনিজসম্পদ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ এমপি ও আইসিটি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে আগত বাচ্চাদের সাথে বসে বাবার সাথে বিভিন্ন ঘটনার স্মৃতিচারন করেন শেখ রেহানা।

শেখ রেহানা বাচ্চাদের বলেন, “আমি যখন তোমাদের মতো ছোট ছিলাম, আমার বাবা বেশির ভাগ সময় জেলেই থাকতেন, দেশের জন্য লড়ার কারণে।” তিনি বলেন বাবার হাত ধরে স্কুলে যাওয়ার সৌভাগ্য তাঁর হয়নি। বেশির ভাগ একাই যেতেন না হয় তাঁর মা বেগম ফজিলাতুন্নেসা তাঁকে স্কুলে নিয়ে যেতেন। বঙ্গবন্ধু বাসায় থাকলে শেখ রেহানা বাবার সাথে স্কুলে যাওয়ার বায়না ধরতেন। তাই বঙ্গবন্ধু অফিস থেকে ফেরার সময় রেহানাকে স্কুল থেকে নিয়ে আসতেন। তিনি বলেন, “এসময় ঈদের আনন্দের মতো আনন্দ হতো।”

ধানমন্ডি ৩২ এর বাড়িতে তাদের জীবনের বিভিন্ন ঘটনাও বাচ্চাদের বলেন শেখ রেহানা। বয়স যখন ৩-৪ তখন তারা এই বাড়িতে এসে ওঠেন। বাড়ির উঠানে বাস্কেটবল খেলতেন, বাবা মুক্ত থাকলে বাসায় থাকতেন আর তখন পরিবারের সবাই মিলে ব্যাডমিন্টন খেলতেন।বিভিন্ন রকমের ফুলে ভরে থাকতো বাসার বাগান, বারান্দা। সকালের খবরের কাগজ পড়ে স্কুলে যাওয়ার আগে ফুল কুড়িয়ে মালা বানাতেন। তিনি বলেন, “বাবা সকালে পুরো ধানমন্ডিতে হাঁটতেন, আমি আর ভাইয়েরা শুধু ৩২ নম্বরেই তাঁর সাথে হাঁটতাম, কিন্তু বোঝাতাম আমরাও পুরোটা হেঁটেছি। উনাকে তো আমরা সবসময় কাছে পেতাম না, তাই যখনই তিনি বাসায় থাকতেন, বাচ্চারা সবাই তার সাথে খেলতো, তাঁর কারাগারে থাকার গল্প শুনত, তাঁর হাতে ভাত খেতো।”

তিনি বাচ্চাদের জিজ্ঞেস করেন তারা বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ শুনেছে কিনা। তখন বাচ্চারা সবাই শেখ রেহানার সাথে উচ্চারন করে, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”

বঙ্গবন্ধু কোথায় জন্মেছিলেন, তাঁর বাবা-মার নাম কি শেখ রেহানা এ প্রশ্নগুলো করলে প্রতিটি প্রশ্নের সঠিক উত্তর দেয় বাচ্চারা। বাবা কেমন শাসন করতেন, একজন শিশুর এমন প্রশ্নে শেখ রেহানা বলেন, মারধর তো দুরের কথা কখনো বকাও দিতেন না। শুধু এমনভাবে তাকাতেন যে আমরা বুঝে ফেলতাম যে কোন ভুল করে ফেলছি।” শেখ রেহানা বলেন, বঙ্গবন্ধু শিশুদের অনেক ভালোবাসতেন। তিনি হেসে বলেন, বাবার চাইতে মা বেশি শাসন করতেন।

তাদের পড়াশোনায় বঙ্গবন্ধুর ছিল কড়া নজর, সবার পড়ালেখার খোজখবর রাখতেন তিনি। তিনি যখনই সুযোগ পেতেন, ছেলে-মেয়েদের বাংলা-ইংরেজি লেখার দক্ষতা, অংকের দক্ষতার পরীক্ষা নিতেন। তখন শেখ রেহানা ও তার ভাই-বোনেরা খুব ভয়ে থাকতেন।

বাবা যখনই বাসায় আসতেন, যত রাতই হোক, তিনি নিজের হাতে শেখ রেহানাকে খাইয়ে দিতেন। ছোটবেলায় শেখ রেহানা খেতে চাইতে না, ঘুমের ভান করে পড়ে থাকতেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু সবসময় বুঝতে পারতেন যে শেখ রেহানা ঘুমের ভান করছেন।

শেখ রেহানা বলেন, ‘ঈদের ছুটিতে অন্যান্য বাচ্চারা যখন বাবার সাথে মার্কেটে গিয়ে কেনাকাটার গল্প করতো, তখন আমার অনেক মন খারাপ হতো। একবার এমন ঈদের সময় বাবা বাড়িতে ছিলেন, তখন তাঁকে আমি জোর করে নিউ মার্কেটে নিয়ে যাই।” রেহানা বলেন, এখনকার মতো শপিং মল তখন ছিলনা, নিউ মার্কেটই ছিল কেনাকাটার সবচেয়ে বড় জায়গা। বঙ্গবন্ধু তাঁকে নিউ মার্কেটে নিয়ে যান আর রেহানাকে একটি জামা ও আইসক্রিম কিনে দেন। সেদিন সন্ধ্যায় তারা সব ভাইবোন খুশিতে আত্মহারা ছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর মতো মহান ব্যক্তিত্বদের সম্বন্ধে জানতে শিশুদের উপদেশ দেন শেখ রেহানা। এতে তারা কিভাবে অন্যের উপকার করতে হয়, কিভাবে মানুষের জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে হয়, অসহায়দের পাশে দাঁড়াতে হয় তা জানতে পারবে। তিনি আশাপ্রকাশ করেন যে শিশুরা তাদের বাবা-মা, বন্ধুদের সাহায্য করবে।

সিআরআই এর এই আয়োজনে প্রতিষ্ঠানটির অনন্য উদ্যোগ গ্রাফিক নভেল ‘মুজিব’ এর বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য অংশের প্রদর্শনী হয়। পাশাপাশি মহান ৭ই মার্চের ভাষণের রঙ্গিন চিত্রায়ন এর প্রদর্শনী, জাপানি চলচ্চিত্র নির্মাতা নাগিসা ওশিমার তথ্যচিত্র ‘Rahman: The Father of Bengal’ এর চিত্রায়ন ও করা হয়। অনুষ্ঠানস্থলে শিশুদের জন্য আঁকার ব্যবস্থা ছিল। পাশাপাশি পাঁচজন কার্টুনিস্ট শিশুদের সাথে বঙ্গবন্ধুর ছবি মিলিয়ে ইলাসট্রেশনের সুযোগও ছিল। শিশুরা স্বতঃস্ফুর্তভাবে অনুষ্ঠানটি উপভোগ করে।

Share this
TOP