বাংলাদেশ কেন এগিয়ে চলেছে?: কৌশিক বসু

6169

Published on এপ্রিল 26, 2018
  • Details Image

সাম্প্রতিক বছরে বাংলাদেশ সাফল্যবহুল আলোচিত। অনেকের কাছে এশিয়ার এ দেশটির আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ঘটনা রীতিমতো গল্প, কেউবা বলেন বিস্ময়কর ও অভাবনীয়। এক সময়ে দেশটি পাকিস্তানের অংশ ছিল। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পরও দেশটিকে দরিদ্রতম দেশগুলোর সারিতে ফেলে রাখা হতো। অর্থনৈতিক বাস্কেট কেস হিসেবে দেশটির বদনাম ছিল, দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষ যাদের নিত্যসঙ্গী। ২০০৬ সাল পর্যন্ত দেশটির পরিস্থিতি এতটাই হতাশাব্যঞ্জক ছিল যে, যখন তাদের প্রবৃদ্ধির হার প্রথমবারের মতো পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে যায়, অনেকের মনে হয়েছিল- এটা হঠাৎ আলোর ঝলকানি, যা স্থায়ী হবে না। কিন্তু ওই সময়ের পর থেকে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার প্রতি বছরই পাকিস্তানের তুলনায় প্রায় ২.৫ শতাংশ পয়েন্টের মতো বেশি থাকছে। আর এ বছর প্রবৃদ্ধির হার ভারতকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে, যদিও ভারতে প্রবৃদ্ধি শ্নথ হওয়ার পেছনে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অব্যবস্থাপনার দায় রয়েছে।

বাংলাদেশে এখন জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বছরে ১.১ শতাংশ, যা পাকিস্তানের ২ শতাংশের তুলনায় অনেক নিচে। এর অর্থ হচ্ছে, পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় দ্রুত বাড়ছে- বছরে প্রায় ৩.৩ শতাংশ পয়েন্ট। ২০২০ সাল নাগাদ মাথাপিছু জিডিপিতেও বাংলাদেশ পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে দেবে।

বাংলাদেশের এই নীরব রূপান্তরের কারণ কী? ইতিহাসের অনেক ঘটনার মতোই এ প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর দেওয়া কঠিন। আমরা কেবল কিছু সূত্র ধরিয়ে দিতে পারি। যেমন বলা চলে সামাজিক রূপান্তরের কথা, যার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় নারীর ক্ষমতায়ন। গ্রামীণ ব্যাংক ও ব্র্যাকের মতো বেসরকারি সংস্থার পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের প্রচেষ্টার কারণে বাংলাদেশ মেয়েদের শিক্ষায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছে। ঘরে ও বাইরে নারীর কণ্ঠ আরও উচ্চকিত হয়েছে। এ ধরনের পদক্ষেপের প্রভাব পড়ছে শিশুদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষায়। এখন বাংলাদেশের গড় আয়ু ৭২ বছর। আমরা তুলনা করে দেখতে পারি যে, ভারতে এটা ৬৮ এবং পাকিস্তানে ৬৬ বছর।

তৃণমূল পর্যায়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সংশ্নিষ্ট হওয়ার সুযোগ সৃষ্টির জন্যও বাংলাদেশ প্রশংসা পাবে। অর্থনৈতিক ইনক্লুসিভনেস সেখানে এখন বাস্তব। বিশ্বব্যাংক সম্প্রতি যে তথ্য প্রকাশ করেছে, তাতে রয়েছে এর স্বীকৃতি। বাংলাদেশের বয়স্ক যেসব নাগরিকের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রয়েছে, ২০১৭ সাল নাগাদ যার ৩৪.১ শতাংশ ডিজিটাল করা সম্ভব হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশ মিলিয়ে যেখানে এর গড় ২৭.৮ শতাংশ। তদুপরি, বাংলাদেশে সব ব্যাংকে গ্রাহকদের যে অ্যাকাউন্ট রয়েছে তার মাত্র ১০.৪ শতাংশ 'ডরম্যান্ট' (অর্থাৎ এক বছরের মধ্যে সেখানে অর্থ জমা বা উত্তোলন করা হয়নি)। ভারতে এ ধরনের হিসাব রয়েছে ৪৮ শতাংশ।

বাংলাদেশের অগ্রগতির ব্যাখ্যা করতে হলে পোশাকশিল্পের কথাও বলতে হবে। এ শিল্পের সফলতার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। সেখানে প্রধান কারখানাগুলো বৃহদাকার। বিশেষ করে ভারতের তুলনায়। শ্রম আইনের পার্থক্যের কারণেই এমনটি ঘটেছে।

যে কোনো দেশের শ্রমবাজারেই নিয়ম-কানুন প্রয়োজন। ভারতের ১৯৪৭ সালের শিল্প বিরোধ আইনে শিল্পের শ্রমিক নিয়োগ বিষয়ে যথেষ্ট কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। ফলে ভালোর চেয়ে মন্দ দিকটি বেশি লক্ষণীয়। ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের কয়েক মাস আগে এ আইনটি অনুমোদন পায়। সঙ্গত কারণে পাকিস্তানও এর উত্তরাধিকার বহন করছে। কিন্তু পাকিস্তানের ১৯৫৮ সালের সামরিক শাসনামলে এর পরিবর্তন ঘটে, যার সুফল এখন বাংলাদেশ ভোগ করছে। বাংলাদেশের শিল্পোদ্যোক্তারা কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে এ আইন সহায়ক বলে মনে করছেন। এটা ঠিক যে, বাংলাদেশে শ্রমিকদের স্বার্থ সুরক্ষার জন্য বলিষ্ঠ আইনের প্রয়োজন রয়েছে; কিন্তু নতুন কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে যে আইনটি রয়েছে, তা কার্যকর বলেই বিবেচিত হচ্ছে।

এখন প্রশ্ন, বাংলাদেশের অগ্রগতি কি টেকসই হবে? এটা অস্বীকার করা যাবে না যে, দেশের সম্ভাবনা বিপুল; কিন্তু ঝুঁকিও রয়েছে। নীতিনির্ধারকরা এটা নিশ্চয়ই উপেক্ষা করবেন না।

যখন একটি দেশ উন্নয়নের পথে চলতে শুরু করে, তখন দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, বৈষম্য বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। ফলে এমনকি প্রবৃদ্ধির চাকা থেমেও যেতে পারে। বাংলাদেশও ব্যতিক্রম নয়।

বাংলাদেশের আরও সমস্যা রয়েছে এবং এটা আসতে পারে ধর্মান্ধ চরমপন্থিদের দিক থেকে। প্রগতিশীল সামাজিক সংস্কারের পেছনে বাংলাদেশ সরকারের বিনিয়োগ তাদের পছন্দ নয় এবং নানাভাবে এর বিরোধিতা করা হচ্ছে। এ চাপের কাছে নতি স্বীকার করে বিনিয়োগ কমিয়ে দেওয়া বা বন্ধ করা হলে অর্থনীতিতে তার বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবেই। প্রাণচঞ্চল অর্থনীতির গতি থেমে গেছে, এমনকি বিপরীতমুখী হয়েছে, এমন নজির বিশ্বে অনেক রয়েছে।

আমরা স্মরণ করতে পারি এক হাজার বছর আগের আরব অঞ্চলের কথা। সেখানের অর্থনীতি ছিল প্রাণচঞ্চল। দামেস্ক ও বাগদাদের মতো অঞ্চল সংস্কৃতি, গবেষণা ও উদ্ভাবন- কতভাবেই না বিশ্বকে আকৃষ্ট করেছে। কিন্তু ধর্মীয় চরমপন্থিরা কর্তৃত্ব গ্রহণের পর সেই স্বর্ণযুগের অবসান ঘটে। এখন সেখানে কেবলই অতীতের সুখস্মৃতি রোমন্থন।

পাকিস্তানের ইতিহাসেও সেটা দেখা গেছে। এক সময়ে তাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ছিল উৎসাহব্যঞ্জক। ভারতের তুলনায় মাথাপিছু আয়ে তারা এগিয়ে ছিল। লাহোরের মতো শহর ছিল শিল্প ও সাহিত্যের কেন্দ্র। কিন্তু সামরিক শাসন জারির পর ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হতে থাকে, ইসলামী মৌলবাদ মুক্তবুদ্ধি চর্চার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ২০০৫ সাল নাগাদ ভারত মাথাপিছু আয়ে পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে দেয়। এরপর তো তারা আরও পিছিয়ে পড়তে থাকে।

তবে এ সমস্যা কেবল একটি নির্দিষ্ট ধর্মের নয়। ভারতে রয়েছে সেক্যুলার গণতন্ত্র। মাত্র কয়েক বছর আগেও প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৮ শতাংশের ওপরে। কিন্তু এখন হিন্দু মৌলবাদীরা সংখ্যালঘু ও নারীদের প্রতি বৈষম্য সৃষ্টি করছে। বিজ্ঞানচর্চা ও উচ্চশিক্ষা বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। ফলে অগ্রগতির ধারা বিঘ্নিত হওয়ার শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। আমরা পর্তুগালের কথাও স্মরণ করতে পারি। পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতকে তারা বিশ্বশক্তি হওয়ার পথে এগিয়ে চলছিল। কিন্তু খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বী চরমপন্থিরা রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করার পর তাদের পিছিয়ে পড়া শুরু হয়।

বাংলাদেশকে ধর্মীয় চরমপন্থিদের দিক থেকে আসা ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এ বিষয়ে সচেতন বলেই মনে হয় এবং এটাই হচ্ছে আশার দিক। এ পথে চলতে থাকলে বাংলাদেশ আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে এমন অর্জন করতে সক্ষম হবে, যা এমনকি দুই দশক আগে ভাবাও যেত না। এ দেশটি হয়ে উঠবে এশিয়ার সাকসেস স্টোরি, সাফল্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

লেখকঃ সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ, বিশ্বব্যাংক

সৌজন্যেঃ দৈনিক সমকাল

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত