শিল্পভিত্তিক অর্থনীতির পথে এগিয়ে চলছে দেশ

1318

Published on নভেম্বর 13, 2019
  • Details Image

ড. এ. কে. আবদুল মোমেনঃ

বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের বিস্ময়। অর্থনীতির প্রতিটি খাতে কাক্সিক্ষত অগ্রগতি অর্জিত হওয়ায় বিশ্ববাসী বাংলাদেশকে আজ মোস্ট ইমার্জিং কান্ট্রি হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে। বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান এক নম্বরে। বাংলাদেশের এ উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রয়েছে এ দেশের সফল প্রধানমন্ত্রী, জাতির জনকের কন্যা, জননেত্রী শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্বের হাত ধরে। যার ভিত্তিমূল রচনা করে গিয়েছিলেন তারই পিতা, বাংলাদেশের স্বাধীনতার রূপকার, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। স্বাধীনতার পর পরই যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সুখী-সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্যে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি হাতে নিয়েছিলেন। এ কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য ছিল, দেশীয় কাঁচামাল ও সম্পদ ব্যবহার করে শ্রমঘন শিল্পায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ করা। খাতভিত্তিক উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং উৎপাদিত পণ্যের গুণগত মানের উৎকর্ষ সাধন ছিল বঙ্গবন্ধুর শিল্পায়ন চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু। তার শিল্পদর্শনের অনুকরণে প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাও রূপকল্প-২০২১ ও রূপকল্প-২০৪১ ঘোষণা করে বাংলাদেশকে সমৃদ্ধির সোনালি দিগন্তে পৌঁছে দিতে নিরন্তর প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন। এর ফলে বাংলাদেশ উন্নয়নের মহাসড়ক ধরে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে বাংলাদেশ সাফল্যের সঙ্গে এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে আমরা নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছি।

বর্তমান সরকারের বিগত এক দশকে বাংলাদেশের শিল্প খাতে ব্যাপক অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি থেকে দেশের অর্থনীতি দ্রুত যাত্রা শুরু করেছে শিল্পভিত্তিক অর্থনীতির দিকে। মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) বেড়েই চলেছে শিল্প খাতের অবদান। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০০০-০১ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনে শিল্প খাতের অবদান ছিল ২৩ দশমিক ৪ শতাংশ। ওই সময়ের পর থেকে এর অবদান বাড়তে থাকে। ২০০৯-১০ অর্থবছরে এর হার বেড়ে দাঁড়ায় ২৬ দশমিক ৮ শতাংশে। ২০১০-১১ অর্থবছরে শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ২৭ দশমিক ৩৮ শতাংশ, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এর অবদান আরও বেড়ে দাঁড়ায় ৩৩ দশমিক ৭ শতাংশে। গত অর্থবছরে শিল্প খাতের অবদান ৩৪ দশমিক ৪ শতাংশ প্রক্ষেপণ করা হয়েছিল। ২০১৯-২০ অর্থবছরে এ খাতে অবদান ৩৫ দশমিক ৫ শতাংশ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। শিল্প খাতের পাশাপাশি সেবা খাতের অবদানও বাড়ছে জিডিপিতে। এ পরিস্থিতিকে অগ্রগতির লক্ষণ হিসেবে দেখছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, বাংলাদেশ ধীরগতিতে দৃঢ় ও স্থিতিশীল কৃষিপ্রধান অর্থনীতি থেকে একটি শিল্পভিত্তিক অর্থনীতির দেশে পরিণত হচ্ছে, যা মধ্যম আয়ের অর্থনীতির দেশে রূপান্তরিত হওয়ার অন্যতম পথ।

টেকসই শিল্প খাত ছাড়া অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষায় শিল্পায়ন প্রক্রিয়া পরিবেশবান্ধব হওয়া বাঞ্ছনীয়। এ বাস্তবতা বিবেচনায় দেশব্যাপী পরিবেশবান্ধব সবুজ শিল্পায়নের ধারা জোরদারে শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও যথোপযুক্ত নির্দেশনায় শিল্প মন্ত্রণালয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করে যাচ্ছে। এরই মধ্যে জাতীয় শিল্পনীতি ২০১৬ প্রণয়নের ফলে দেশে জ্ঞানভিত্তিক শিল্পায়নের নতুন ধারা সূচনা হয়েছে। এসএমই খাতের উন্নয়ন, গুণগত মান অবকাঠামো সৃষ্টি, মেধাসম্পদের সুরক্ষা, শিল্প উদ্ভাবন, অ্যাক্রেডিটেশনসহ শিল্পায়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনুঘটকগুলোর অগ্রগতির ধারা অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে টেকসই বেসরকারি খাত গড়ে তুলতে সম্ভব সব ধরনের নীতিসহায়তা দিয়ে যাচ্ছে সরকার। এতে দেশের শিল্প খাত উজ্জীবিত হচ্ছে।

চলতি অর্থবছরের বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাময়িক হিসাব অনুযায়ী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ। গত অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাবে প্রবৃদ্ধি হয় ৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ। বৃহৎ তিনটি খাতের মধ্যে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি পেয়ে ১৩ দশমিক শূন্য ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ছিল ১২ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। শিল্প খাতের চারটি খাতের মধ্যে নির্মাণ খাতে প্রবৃদ্ধির হার সামান্য কমে গেলেও খনিজ ও খনন খাত, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানিসম্পদ এবং ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। এর মধ্যে মাঝারি ও বৃহৎ শিল্পের অবদান ২০ দশমিক ১৯ শতাংশ। গত বছরে এটি ছিল ১৯ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ, এমডিজি অর্জন, এসডিজি বাস্তবায়নসহ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, লিঙ্গসমতা, কৃষি, দারিদ্র্যসীমা হ্রাস, গড় আয়ু বৃদ্ধি, রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন, ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, পোশাকশিল্প, ঔষধশিল্প, রপ্তানি আয় বৃদ্ধিসহ নানা অর্থনৈতিক সূচকে এগিয়েছে বাংলাদেশ। তিন বছর ধরে বাংলাদেশ ৭ শতাংশেরও বেশি জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ ৩৩ বিলিয়ন ইউএস ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এ দেশের তৈরি পোশাকশিল্প বিশ্বে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করার পাশাপাশি চাল উৎপাদনে বাংলাদেশ চতুর্থ, মাছ ও সবজি উৎপাদনে তৃতীয়, জনশক্তি রপ্তানিতে পঞ্চম এবং রেমিট্যান্স আহরণে বাংলাদেশ অষ্টম স্থানে রয়েছে।

শিল্প ও সেবা খাতের অগ্রগতির ওপর নির্ভর করে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ ঘটেছে। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন নীতিসংক্রান্ত কমিটি (সিডিপি) এলডিসি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের যোগ্যতা অর্জনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়। এলডিসি ক্যাটাগরি থেকে উত্তরণের জন্য মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ সূচক ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকÑ এ তিনটি সূচকের যে কোনো দুটি অর্জনের শর্ত থাকলেও বাংলাদেশ তিনটি সূচকের মানদ-েই উন্নীত হয়েছে। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাউন্সিলের (ইকোসক) মানদ- অনুযায়ী এ ক্ষেত্রে একটি দেশের মাথাপিছু আয় হতে হবে কমপক্ষে ১ হাজার ২৩০ মার্কিন ডলার, বর্তমানে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় তার থেকে অনেক বেশি অর্থাৎ ১ হাজার ৯০৯ ডলার। মানবসম্পদ সূচকে ৬৬ প্রয়োজন হলেও বাংলাদেশ অর্জন করেছে ৭২ দশমিক ৯। অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক হতে হবে ৩২ শতাংশ বা এর কম, যেখানে বাংলাদেশের রয়েছে ২৪ দশমিক ৮ শতাংশ।

বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের পাশাপাশি প্রসার ঘটেছে আবাসন, জাহাজ, ওষুধ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ খাদ্যশিল্পের। বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের তালিকায় যোগ হয়েছে জাহাজ, ওষুধ ও বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাদ্যসামগ্রী। বাংলাদেশের আইটিশিল্প বহির্বিশ্বে অভূতপূর্ব সুনাম কুড়িয়েছে। সম্প্রতি ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের আইটি শিল্প ১০ কোটি মার্কিন ডলার রপ্তানি আয় ছাড়িয়ে গেছে। বিগত কয়েক বছরে দেশে প্রায় ১০ লাখ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প গড়ে উঠেছে। এসব এসএমই শিল্প জিডিপিতে ২৩ শতাংশ এবং মোট শিল্প কর্মসংস্থানে ৮০ শতাংশ অবদান রাখছে।

বহির্বিশ্বে স্বার্থান্বেষী মহলের নেতিবাচক প্রচারণা সত্ত্বেও বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প খাতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রয়েছে। বাংলাদেশ এখন তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বিশ্বে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে আছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তৈরি পোশাক খাত থেকে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় হয়েছে ৩০ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলার। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ২৮ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলার। বহির্বিশ্বে একই ধরনের নেতিবাচক প্রচারণা সত্ত্বেও সরকার এবং উদ্যোক্তাদের দৃঢ়তায় বাংলাদেশি চামড়াশিল্প খাত অব্যাহত প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাচ্ছে। গত এক দশকে আমাদের জুতা রপ্তানির পরিমাণ ৭ গুণ বেড়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো যে হিসাব দিয়েছে, তাতে দেখা যায় বৃহৎ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি এই তিন ধরনের শিল্পেরই আগের বছরের চেয়ে প্রবৃদ্ধি ভালো। সেখানে রপ্তানিমুখী খাত ও অভ্যন্তরীণ শিল্প খাত দুটোই এগিয়েছে। সরকারের চলতি মেয়াদে জাতীয় আয়ে শিল্প খাতের অবদান ৪০ শতাংশ এবং এ খাতে শ্রমশক্তি ২৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনে দ্রুত শিল্পায়নের মাধ্যমে আমদানি পণ্যের নির্ভরশীলতা হ্রাস ও রপ্তানি বাড়াতে গুরুত্ব দেওয়া হবে। নারীদের শিল্পায়নের মূল ধারায় নিয়ে আসা, পুঁজিঘন শিল্প স্থাপনের পরিবর্তে শ্রমঘন শিল্প স্থাপন, কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের সম্প্রসারণ, পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন গড়ে তুলতে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। বেসরকারি খাতের বিকাশে নীতিসহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

আগামী পাঁচ বছরের জন্য শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি এসব কর্মকৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে। কর্মপরিকল্পনার মধ্যে দীর্ঘদিন থেকে লোকসানে থাকা সরকারি কারখানা লাভজনক করতে গুরুত্ব দেওয়া হবে। চলতি মেয়াদে একটি ভিশন নির্ধারণ করে শিল্প মন্ত্রণালয় কাজ শুরু করেছে। সরকারি কারখানা লাভজনক করতে এবং বন্ধ কারখানা চালুতে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। সারের সরবরাহ নিশ্চিত করা, গুণগত মানের লবণ উৎপাদন, চিনির বাজার স্বাভাবিক রাখতে সরকারি চিনিকলের উৎপাদনের স্বাভাবিক ধারা বজায় রাখতেও নিবিড়ভাবে কাজ করছে সরকার। দেশীয় শিল্প খাতে যে উন্নয়নের ধারা সূচিত হয়েছে শেখ হাসিনা সরকারের নিবিড় পরিচর্যায় সামনে এ ধারা আরও বেগবান হবে নিঃসন্দেহে। বাংলাদেশ হবে এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী শিল্পপ্রধান দেশ। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ হয়ে উঠবে অন্যতম ম্যানুফ্যাকচারিং হাব। শিল্পনির্ভর এ অর্থনীতির ওপর ভর করেই বাংলাদেশ ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তরতর করে।

লেখক: পররাষ্ট্রমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
সৌজন্যেঃ দৈনিক আমাদের সময়

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত