বঙ্গবন্ধু থেকে শেখ হাসিনা

1278

Published on মার্চ 1, 2020
  • Details Image

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীঃ

বাঙালির জীবনে একটি অতুলনীয় ঐতিহাসিক মাস মার্চ। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ ইয়াহিয়ার ঘোষণার বিরুদ্ধে গণবিদ্রোহ। একই বছর ৩ মার্চ অহিংস অসহযোগ আন্দোলন শুরু। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ। ২৫ মার্চের কালরাত্রিতে বুদ্ধিজীবী হত্যা এবং গণহত্যা শুরু। ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা। বছর বছর এ দিবসগুলো আমরা পালন করি। এ বছরও করছি। ১৯৭১ সালের ১ মার্চেই ইয়াহিয়ার নয়া জাতীয় সংসদের ঢাকা অধিবেশন স্থগিত রাখার ঘোষণার প্রতিবাদে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে গণবিদ্রোহের শুরু। যার পরিণতি ওই বছরেই স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম।

আজ আমরা বিনম্রচিত্তে এই মাসটিকে প্রণতি জানাচ্ছি। এই মাস আমাদের গৌরবের মাস। ক্রন্দনমাখা উৎসবের মাসও। এই মাসটিতে ধর্ম-বর্ণ- গোত্র ও দলীয় পার্থক্য ভুলে জাতি তার স্বাধীনতার উৎসব ঐক্যবদ্ধভাবে পালন করে। স্মরণ করে এই স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধুকে। স্মরণ করে শহীদ বুদ্ধিজীবী ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের। স্বাধীনতার বেদিমূলে যে চার লাখ নারী সল্ফ্ভ্রম বিসর্জন দিয়েছেন এবং যারা প্রাণ দিয়েছেন, স্মরণ করে তাদের। 'মুক্তির মন্দির-সোপান তলে' যে লাখো প্রাণ আত্মদান করেছে এই মাসে বিনম্রচিত্তে স্মরণ করে তাদেরও।

সামনেই ৭ মার্চ, ১৭ মার্চ, ২৫ মার্চ এবং ২৬ মার্চ। এই দিনগুলো পালনের সময় মনে রাখতে হবে আমরা স্বাধীনতা লাভের ৪৯ বছর পার হয়েছি। আগামী বছর আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী। এমন ঐতিহাসিক বছর জাতির জীবনে ফিরে আসবে সুদীর্ঘ কাল পরে। তাই স্বাধীনতার এই পঞ্চাশ বছরের উপকণ্ঠে দাঁড়িয়ে আমাদের গোটা জাতীয় জীবনের সার্বিক মূল্যায়ন প্রয়োজন। আমাদের ইতিহাসবিদরা সেই দায়িত্বটি পালন করবেন এমন আশা করছি।

আমাদের স্বাধীনতার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য কী ছিল? কী ছিল এই স্বাধীনতার মৌলিক আদর্শ ও স্তম্ভ। জাতির পিতা কী চেয়েছিলেন এবং গত ৪৯ বছরে আমরা কী পেয়েছি? জাতির পিতার স্বপ্ন পূরণের পথে আমরা কতটা এগোতে পেরেছি তার একটা তুলনামূলক বিচার আবশ্যক। এই ব্যাপারেও আমাদের সৎ বুদ্ধিজীবীদের একটা ভূমিকা রয়েছে।

দুইশ' বছর আগে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার চরিত্র ও দেশপ্রেমকে কলঙ্কিত করেছিল কিছু ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ ও তাদের পদলেহী কিছু বাঙালি ইতিহাসবিদও। নবাবের এই কলঙ্ক মোচনের জন্য প্রয়োজন হয়েছিল ইতিহাসবিদ অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়র। দুইশ' বছর পর বাঙালির একালের স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধুর চরিত্রকে মসীলিপ্ত করার চেষ্টা করেছে এবং এখনও করছে পাকিস্তানের সরকারি অনুগ্রহপ্রাপ্ত বুদ্ধিজীবী এবং তাদের অনুচর একদল বাঙালি, তাদের চক্রান্ত সফল হয়নি। বঙ্গবন্ধু আজ নিজের যোগ্যতায় রাষ্ট্রপিতার আসনে আসীন। তবু বাংলাদেশের স্বাধীনতার শত্রু এবং রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের হোতাদের মিথ্যাচারের উপযুক্ত জবাব দেওয়ার জন্য আমাদের একজন অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় প্রয়োজন।

বঙ্গবন্ধুর আজীবনের সাধনা ও সংগ্রাম ছিল পরাধীনতা ও সাম্প্রদায়িকতা থেকে বাঙালি জাতিকে মুক্ত করে একটি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা। তার আরও লক্ষ্য ছিল, বিশ্বের সব দেশের বাংলা ভাষাভাষী মানুষকে নিয়ে একটি কালচারাল নেশনহুড বা সাংস্কৃতিক জাতি গড়ে তোলা। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরক্ষণেই তিনি দেশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও সাম্প্রদায়িক দল নিষিদ্ধ করেন। সামন্তবাদ উচ্ছেদের লক্ষ্যে বৃহৎ ভূমি মালিকানা উচ্ছেদ করে জমির মালিকানার নির্দিষ্ট সীমা বেঁধে দেন। সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রাথমিকভাবে মিশ্র অর্থনীতি গ্রহণ করেন এবং ব্যাংক, বীমা এবং বড় বড় শিল্প ও ব্যবসা রাষ্ট্রায়ত্ত করেন।

শ্রেণিবৈষম্য প্রাথমিকভাবে দূর করার জন্য তিনি নয়াচীনের চেয়েও দুঃসাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তিনি দেশে পেশাগত শ্রেণিভেদ বিলুপ্ত করেন। উদাহরণ, আইনজীবীদের মধ্যে ব্যারিস্টার, অ্যাডভোকেট, উকিল, মোক্তার এই উচ্চ-নিচু শ্রেণিভেদ বিলুপ্ত করা। সব শ্রেণির আইনজীবী, অ্যাডভোকেট বা উকিল নামে পরিচিত হওয়ার ব্যবস্থা করা, ডাক্তারদের মধ্যে এমবিবিএস ও প্যারামেডিকসদের পার্থক্য দূর করে প্যারামেডিকসদের স্বল্পকালীন ট্রেনিং দিয়ে এমবিবিএস টাইটেল গ্রহণের সুযোগ দেওয়া। সংবাদপত্রের প্রুফ রিডারদের সাংবাদিক তালিকাভুক্ত করা। এই পেশাগত শ্রেণিভেদ লুপ্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তিনি সামাজিক শ্রেণিভেদও বিলোপের সিদ্ধান্ত নেবেন ঠিক করেছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধনী শ্রেণি আতঙ্কিত হয়। পেশাজীবী শ্রেণির মধ্যে বিক্ষোভ দেখা দেয়। ব্যারিস্টাররা বলতে শুরু করেন, 'আমরা এত কষ্ট করে বিলাত গিয়ে ব্যারিস্টার হয়ে এসেছি। শেখ মুজিব কলমের এক খোঁচায় আমাদের সকলকে উকিল বানিয়ে দিলেন।' সংবাদপত্রের প্রুফ রিডারদের সাংবাদিকের মর্যাদা দেওয়ায় অনেক প্রগতিমনা সাংবাদিককেও তখন ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে।

বঙ্গবন্ধু শতাব্দী-প্রাচীন কায়েমি স্বার্থেই বিরাট আঘাত করেছিলেন। সবচেয়ে বড় আঘাত করেছিলেন ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি আমলের গণবিরোধী আমলাতন্ত্র উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিয়ে। বঙ্গবন্ধু জেলা গভর্নর পদ সৃষ্টি করে নির্বাচিত জেলা গভর্নরদের হাতে ক্ষমতা দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। এটা ছিল ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের পদক্ষেপ। দেশের সামরিক ও অসামরিক কায়েমি স্বার্থ তাতে ক্রুদ্ধ হয়। বঙ্গবন্ধু জোটনিরপেক্ষ নীতি গ্রহণ করে এবং কিউবার সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক স্থাপন দ্বারা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে আঘাত হানেন।

বঙ্গবন্ধু দেশে পশ্চিমা বুর্জোয়া ডেমোক্রেসি নয়, শোষিতের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। তিনি একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করেননি। স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী তখনকার সব দল নিয়ে মোর্চা গঠন করেছিলেন। যার উদ্দেশ্য ছিল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্ত থেকে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা। সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মান্ধতার উত্থান প্রতিহত করা। এর ফলে শুরু হয় বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য প্রোপাগান্ডা ও গোপন চক্রান্ত।

নিরপেক্ষ ঐতিহাসিকরা এখন স্বীকার করেন, শের শাহ তার মাত্র তিন বছরের শাসনে তার ভারত সাম্রাজ্যে ডাক ব্যবস্থার প্রবর্তন, গ্র্যান্ডট্রাঙ্ক রোডসহ অসংখ্য দীর্ঘ রাস্তা তৈরি, পথিকদের জন্য পান্থশালা স্থাপন, সুবা বাংলাকে বহিরাক্রমণ থেকে বাঁচানোর জন্য দুর্গ তৈরি ইত্যাদি করে গেছেন। বর্তমান যুগে শেখ মুজিব তার মাত্র সাড়ে তিন বছরের শাসনকালে বাংলাদেশকে বিশ্বের মানচিত্রে স্থায়ী আসনে প্রতিষ্ঠা দিতে সক্ষম হন। কমনওয়েলথ, জাতিসংঘের সদস্য পদ লাভসহ আমেরিকা, ব্রিটেন ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশ, এমনকি পাকিস্তানেরও স্বীকৃতি আদায়ে সক্ষম হন। দেশের যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি চাঙা করে তুলতে সক্ষম হন। স্বাধীনতা লাভের এক বছরের মধ্যে দেশের সংবিধান প্রণয়ন ও একটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান দ্বারা গণতান্ত্রিক বিশ্বে তাক লাগান।

বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে যে মিথ্যা প্রচার করা হয়, তার মধ্যে প্রধান হচ্ছে '৭৪-এর দুর্ভিক্ষ এবং এক লাখ লোকের মৃত্যু। এখন এটা বিশ্ববিদিত যে, এই দুর্ভিক্ষ সৃষ্টির মূলে ছিল মার্কিন ষড়যন্ত্র। এই ষড়যন্ত্র সম্পর্কে মার্কিন পত্রপত্রিকাতেই এত আলোচনা হয়েছে যে, তা নিয়ে আরও আলোচনা বাহুল্য। ব্রিটিশ রাজনীতিক এবং কলামিস্ট সিরিল ডান এবং লর্ড ফেয়ারব্যাঙ্ক বলেছেন, শেখ মুজিবের রাজনৈতিক সাফল্য অতুলনীয়। একটি সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে তিনি যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছেন। তিনি যদি যথাসময়ে দেশে না ফিরতেন, তাহলে মিত্রপক্ষের বিদেশি সৈন্য বাংলাদেশে থেকে যেত। এত দ্রুত সারাবিশ্বের স্বীকৃতি বাংলাদেশ পেত না। তার যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি এত দ্রুত উন্নতি লাভ করত না। গৃহযুদ্ধে দেশটির বায়াফ্রার মতো অবস্থা হতো।

বঙ্গবন্ধু যদি পাকিস্তানের কাছে প্রাপ্য কোটি কোটি টাকা এবং সম্পদ ফেরত পেতেন, তাহলে দেশের অবস্থা আরও দ্রুত ফেরাতে পারতেন। এ কথা বিদেশি সাংবাদিকরাই বলেছেন, বঙ্গবন্ধু শুধু দেশের ভাঙা অর্থনীতিই জোড়া দেননি, পাকিস্তানিরা যেসব বড় বড় সেতু ভেঙে দেশটির যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল করে দিয়েছেন, তা দ্রুত মেরামত করেছেন। দ্রব্যমূল্য বেড়েছে, কিন্তু জনগণের ক্রয়ক্ষমতার ঊর্ধ্বে যেতে দেননি। '৭৪-এ দেশব্যাপী বন্যা না হলে এখন খাদ্য সরবরাহের চুক্তি পালন না করে মার্কিন সরকার ষড়যন্ত্র না পাকালে দেশে দুর্ভিক্ষ হওয়ার কারণ ছিল না। দেশটিতে গণতান্ত্রিক শাসনের প্রকৃত ভিত্তি তিনি তৈরি করে গিয়েছিলেন।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর দীর্ঘ ২১ মাস ছিল বাংলাদেশের জন্য অন্ধকার যুগ। সামরিক ও সাম্প্রদায়িক শক্তি ক্ষমতা দখল করার পর দেশের স্বাধীনতার ভিত্তিগুলো এক এক করে ধ্বংস করার প্রচেষ্টা শুরু হয়। সংবিধান থেকে রাষ্ট্রীয় আদর্শ হিসেবে সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দেওয়া হয়। তার বদলে ধর্মকে এনে সংবিধানে স্থান দেওয়া হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের হয়রানি এবং মিথ্যা মামলায় ফাঁসি দেওয়া শুরু হয়। জাতির পিতা, জাতীয় সংগীত ও জাতীয় পতাকা বদল করার চক্রান্ত শুরু হয়। দেশে বাংলাভাইসহ উগ্র মৌলবাদীদের উত্থানে সাহায্য জোগানো হয়।

সামরিক শাসনের পরে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গঠিত বিএনপি-জামায়াতের রাজত্বকাল আরও ভয়াবহ। দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের দুর্গ হাওয়া ভবন এ সময় তৈরি হয়। দেশ থেকে গণতন্ত্র সমূলে উচ্ছেদের জন্য হাসিনার জনসভায় গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। দেশে কৃষকদের অভাব-অভিযোগের জবাবে আলুচাষিদের ওপর গুলি চালিয়ে ১৮ জন আলুচাষিকে হত্যা করা হয়। জাতীয় প্রেসক্লাবের জীবনে প্রথমবারের মতো পুলিশ ঢুকে সাংবাদিকদের পেটায়। বিএনপি স্বাধীনতার শত্রু এবং যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমতায় অংশীদার করে। সারাদেশে সন্ত্রাসী ও উগ্র মৌলবাদীদের উত্থান ঘটায়। বাংলাদেশ তালেবান রাষ্ট্রে পরিণত হবে, এমন আশঙ্কা দেখা দেয়।

দেশের গণতান্ত্রিক দলগুলো, বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ছিল নেতৃত্বহীন ও অসংগঠিত। ফলে ফ্যাসিবাদ ক্রমশ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছিল। ঠিক এই সময় শেখ হাসিনার ভাঙা নৌকার হাল ধরা। পিতার মতো সাহস নিয়ে তিনি গণতন্ত্র উদ্ধারের সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন। বঙ্গবন্ধু যুদ্ধ করেছেন বিদেশি সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে। হাসিনাকে যুদ্ধ করতে হয়েছে স্বদেশি সামরিক শাসন এবং তার চাইতেও ভয়াবহ গণতন্ত্রের ছদ্মবেশধারী ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে। বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামে সহায়ক শক্তি ছিল জনগণ এবং ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়ন। হাসিনার গণতন্ত্র উদ্ধারের সংগ্রামে সহায়ক শক্তি ছিল শুধু দেশের জনগণ। বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করার চেষ্টা হয়েছে। হাসিনার জীবনের ওপর গ্রেনেড হামলাসহ ছোট-বড় হামলা হয়েছে এগারোটি।

১৯৯৬ সালে হাসিনা যখন ক্ষমতা হাতে নেন, তখন দেশে জিয়া-এরশাদের কৃপায় তৈরি হয়েছে একটি দুর্নীতিবাজ নব্যধনী শ্রেণি। অধিকাংশ মসজিদ-মাদ্রাসা দখল করেছে জামায়াত। সেখানে ইবাদত ও প্রকৃত শিক্ষা দেওয়ার বদলে ইসলামের জন্য জিহাদ- এই প্রচারণায় যুবকদের মস্তিস্ক ধোলাই করে তৈরি করা হয় সন্ত্রাসী। দেশময় চলেছে হত্যার রাজনীতি। ক্ষমতায় থেকে এবং ক্ষমতার বাইরে এসেও বিএনপি-জামায়াত দেশময় চালিয়েছে সন্ত্রাসের রাজনীতি। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসের সঙ্গে যুক্ত জিহাদিস্টরা।

শেখ হাসিনার দলের মধ্যেও ছিল চক্রান্ত। একদল প্রবীণ ও নবীন নেতা বারবার তাকে নেতৃত্ব থেকে সরানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ব্যর্থ হয়েছেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্ত ব্যর্থ করে হাসিনা তিন-তিনবার দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা তিনি এখনও গড়ে তুলতে পারেননি বটে, কিন্তু সেই স্বপ্নপূরণের পথে এক এক করে বাধাগুলো ভাঙছেন। বিএনপি দেশটিকে খাদ্যাভাবের ও দুর্ভিক্ষের দেশ হিসেবে রেখে গিয়েছিল। সে দেশ আজ খাদ্যে স্বনির্ভর। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী ও বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী, যারা দেশের আইনের ঊর্ধ্বে এবং বিচারের বাইরের লোক বলে সবাই ভাবত, তাদের বিচার ও শাস্তি দিয়েছেন। দেশে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রেখেছেন। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস ও বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাস কঠোর হাতে দমন করেছেন। দেশের অর্থনীতির মতো রাজনীতি এখন অনেকটাই স্থিতিশীল।

দেশে এবং বিদেশে হাসিনার শক্তিশালী নেতৃত্ব এখন স্বীকৃত। অনেকে বলেন, বাংলাদেশে তার নেতৃত্বের এখন কোনো বিকল্প নেই। স্বাধীনতার শত্রুদের প্রচারণা হলো হাসিনার শাসন একদলীয় শাসন। তিনি গণতন্ত্র উচ্ছেদ করেছেন। প্রচারণাটা সত্য নয়। তাকে গণতন্ত্র রক্ষার জন্যই কঠোর হতে হয়েছে। না হলে বঙ্গবন্ধুর মতো অনেক আগেই তাকে জীবন দিতে হতো। দেশেও গণতন্ত্র টিকত না। গণতন্ত্র রক্ষার জন্য যতটুকু কঠোর হওয়া প্রয়োজন তিনি তাই হয়েছেন। তার বেশি নয়। শেখ হাসিনার কোনো ব্যর্থতা ও অসাফল্য নেই, আমি সে কথা বলছি না। কিন্তু তার সাফল্যের তুলনায় অসাফল্যগুলো এত ছোট যে, তা নিয়ে এই মার্চ মাসে আলোচনা যৌক্তিক মনে করছি না।

সৌজন্যেঃ দৈনিক সমকাল, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত