তুমি বঙ্গবন্ধু, তুমি পিতা

754

Published on মার্চ 17, 2020
  • Details Image

ডা. নুজহাত চৌধুরী

‘তুমি কি বঙ্গবন্ধু?’

‘হ্যাঁ, আমিই বঙ্গবন্ধু।’

‘এটা কি তোমার মোচ?’

প্রাণখোলা হাসিতে ফেটে পড়লেন বঙ্গবন্ধু। ‘হ্যাঁ, এটাই আমার মোচ।’

এটা আমার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর একমাত্র কথোপকথন। ১৯৭৪ সালের কথা। একটি বিয়ের কারণে পারিবারিক যোগসূত্র তৈরি হওয়ায় আমার বৃহত্তর পরিবারের সঙ্গে আমার সদ্যবিধবা মা গেছেন বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বরের বাড়িতে। বেয়াইবাড়ির লোকজন বসে আছেন নিচের ড্রইংরুমে। তাঁদের মাঝে মা, আমার বড় বোন নীপা আর আমিও আছি। নীপা পাঁচ বছরের, আমি চার। খেলছি ড্রইংরুমের মাঝখানে। ঢুকলেন বঙ্গবন্ধু। দীর্ঘদেহী বঙ্গবন্ধুর ছিল বিশালতর ব্যক্তিত্ব। মা বলেন, তাঁর ব্যক্তিত্বের এক অতিমানবীয় উপস্থিতি ছিল, যা বড়-ছোট সবাইকে প্রভাবিত করত। নীপা সব সময়ই একটু ভীতু। ভড়কে গিয়ে সোফার পিছে লুকাল। আমি হয়তো কিছু বোঝার জন্য খুবই ছোট ছিলাম। তাই সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলাম। বঙ্গবন্ধু ঘরে ঢুকেই আমাকে কোলে তুলে নিলেন। বললেন, ‘এটা কি আলীমের মেয়ে?’ তখনই তাঁর সঙ্গে আমার ওপরের কথোপকথন হয়। শেষ প্রশ্নটি করার সময় তাঁর গোঁফটি আমি টেনে পরখ করে দেখেছিলাম। হাসতে হাসতে আমার মা আজও সেই স্মৃতিচারণা করেন। ঘটনাটি স্বাভাবিকভাবেই আমার মনে নেই। কিন্তু গল্পটা গেঁথে আছে হৃদয়ে।

ডা. আলীমের হত্যাকাণ্ড নিয়ে বঙ্গবন্ধুর গভীর মনোবেদনা ছিল। তিনি স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেই চোখের জলে ভিজে তাঁর চোখের ডাক্তারের মৃত্যুর কথা উল্লেখ করেছিলেন। সেই একই মনোবেদনা ছিল তাঁর প্রত্যেক শহীদ পরিবারকে নিয়ে। ৩০ লাখ শহীদের এই বিশাল আত্মত্যাগের দুঃখবোধ, শহীদ পরিবারের কোটি জনতার দুর্দশা যে তাঁর হৃদয়ে ক্ষত হয়ে গেঁথে ছিল তা সহজেই বোঝা যায়। তাই তিনি সব বীরাঙ্গনার পিতার স্থলে তাঁর নিজের নামটি লিখে দিতে বলেছিলেন। শহীদ পরিবারগুলোর অনেকের কাছে তাঁর পাঠানো সেই দুই হাজার টাকা আর সার্টিফিকেট, এটুকুই একমাত্র প্রাপ্তি দেশের কাছ থেকে। তিনি ৭২টি ট্রাইব্যুনাল করেছিলেন যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য। তিনি ক্রন্দনরত আমার মায়ের মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন, ‘শ্যামলী, তুমি কিচ্ছু চিন্তা করো না। আলীম হত্যার বিচার আমি নিজের হাতে করব।’

তাঁর ওপর সে বিশ্বাস আমাদের দৃঢ়ভাবে ছিল। আমাদের মতো শহীদ পরিবারগুলোর সব হারানোর পর তিনিই ছিলেন মানুষের মধ্যে একমাত্র ভরসার স্থল। সত্যিকার অর্থেই তিনি ছিলেন আমাদের পিতা ও অভিভাবক। ভেঙে যাওয়া বুকে একমাত্র সাহস ছিলেন তিনি। যেকোনো দুর্যোগেই এই শহীদ পরিবারগুলোর মনে হতো বঙ্গবন্ধু আছেন। মনে বল ছিল কেউ কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। কারণ বঙ্গবন্ধু আছেন। সহায়-সম্বলহীন শহীদ পরিবারগুলো তাই পথ চলতে পেরেছে। কিন্তু কেউ কি জানত, শুধু এই শহীদ পরিবারগুলোই নয়, পুরো বাঙালি জাতির ভাগ্যাকাশে কী দুর্যোগ অপেক্ষা করছে! তাঁকে হারিয়ে যে আমরা শুধু অভিভাবক নয়, আমাদের সম্পূর্ণ আত্মপরিচয় হারিয়ে ফেলব, সব স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যাবে, বাংলাদেশ হারিয়ে ফেলবে ঠিকানা, আমাদের এরূপ দুর্ভাগ্য যে অপেক্ষা করছে কেউ কি তা জানত? এত দুর্ভাগা আমরা! এত দুর্ভাগা বাংলাদেশ! এত বছর পরেও মাঝেমধ্যে এটা বিশ্বাস হতে চায় না।

সহস্র বছরের ইতিহাসে বাঙালি প্রথমবারের মতো নিজের পলিমাটি থেকে উঠে আসা ভূমিপুত্রের নেতৃত্বে নিজস্ব এক স্বাধীন দেশ পেয়েছিল ১৯৭১ সালে। কোনো বিদেশি প্রভু নয়, কোনো শোষণকারী শাসক নয়, এই প্রথম শোষিতের পক্ষে লড়ে যাওয়া তাঁদেরই একজন হয়েছিলেন তাদের নেতা। প্রতিজ্ঞা পালন করে এনে দিয়েছিলেন একটি স্বাধীন দেশ। সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখিয়ে সহজ সরল বাঙালিকে পরিণত করেছিলেন অকুতোভয় যোদ্ধা জাতিতে, যে জাতির দামাল ছেলেরা মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বুকের রক্ত দিয়ে ছিনিয়ে এনেছিলেন সহস্র বছরে না পাওয়া স্বাধীনতা। সেই নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাই তো তিনি জাতির পিতা। তাই তো তিনি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি।

বাঙালির জাতিসত্তার মূলে ছিল তাঁর ভাষা ও সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতির মূল সুর অসাম্প্রদায়িকতা ও সৌহার্দ্যের। তাই একটি সাম্প্রদায়িকতায় দুষ্ট দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে গড়ে উঠা পাকিস্তান রাষ্ট্রযন্ত্রের সবচেয়ে নিগৃহীত জাতি ছিল বাঙালি। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিকভাবেই শুধু নয়, আক্রমণের লক্ষ্য ছিল বাঙালির জাতি পরিচয়। তাই প্রথম আক্রমণের শিকার হয় ভাষা। সেই লড়াই পার হয়ে বাঙালি সচেষ্ট হয় তার অসাম্প্রদায়িক চেতনার ধমনিতে যে সাম্প্রদায়িকতার বিষ ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে তা থেকে মুক্ত হওয়ার। তাই ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ থেকে ‘আওয়ামী লীগে’ পরিণত হওয়া। তারপর স্বায়ত্তশাসনের সংগ্রাম। অবশেষে স্বাধীনতার লড়াই। এক কণ্টকাকীর্ণ পথযাত্রা। এই পথযাত্রা বাঙালির সব চাওয়া-পাওয়া, স্বপ্ন আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়ের প্রকাশ। যা কিছু তার নিজের, তার সব কিছুর ওপর ভিন জাতির ক্রমাগত আক্রমণে নিষ্পেষিত বাঙালির নিজের আত্মপরিচয়ের বোধ ছিল দৃঢ়। তাই সে অসম্ভব এক বিজয় ছিনিয়ে আনতে পেরেছিল। পেরেছিল স্বাধীনতা অর্জন করতে।

এই পুরো পথ পরিক্রমায় যে মানুষটি ছিলেন সঞ্চালকের আসনে, তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাঙালির আত্মপরিচয়ে বলীয়ান হয়ে, অসাম্প্রদায়িক একটি উদার জাতি হিসেবে গড়ে ওঠে, স্বাধীন দেশের জন্য লড়াই করে বিজয়ী হওয়ার দীর্ঘ পথের তিনিই নেতা। তাই তাঁর অবর্তমানে দিগ্ভ্রান্ত হয়ে গেল জাতি। বাঙালির শত্রুরা তাঁর অবর্তমানে সক্ষম হলো আমাদের সংবিধানে সাম্প্রদায়িকতার বিষ ঢুকিয়ে দিতে। ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ বলে এক উদ্ভট ধারণা ঢুকিয়ে দিল মানুষের মস্তিষ্কে। পাকিস্তান একটি হঠাৎ করে তৈরি করা দেশ, এটি কোনো নির্দিষ্ট জাতিসত্তা নয়। এমনকি পাকিস্তান নামটিও নতুন করে তৈরি করা। কিন্তু বাঙালির ইতিহাস তো তা নয়। সহস্র বছরের ভাষা ও সংস্কৃতি থেকে এই মাটির মানুষগুলো তাদের পরিচয় লাভ করেছে। বাঙালি জাতীয়তাবাদ তার স্বাভাবিক পরিচয়। বঙ্গবন্ধুকে হারিয়ে আমাদের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে এই জায়গায়। বাঙালির শত্রুরা, স্বাধীন বাংলাদেশের শত্রুরা পেরেছে আমাদের আত্মপরিচয়কে ঘোলাটে করে দিতে। ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে পাওয়া এ স্বাধীন ভূমিতে যে আদর্শিক জাতি হিসেবে গড়ে উঠার কথা ছিল, এই একটি মানুষের মৃত্যুতে সেই আদর্শিক পরিচয়ের সমাধি হয়ে গেল। পিতার মৃত্যুতে আক্ষরিক অর্থেই পরিচয়হীন হয়ে গেলাম আমরা। এ ক্ষতি আমরা কিভাবে পূরণ করব তা জানি না। আদৌ পূরণ হওয়ার কি না, তাও নিশ্চিত নই।

শুধু বঙ্গবন্ধু ছিলেন না বলেই ৩০ লাখ শহীদের বিচারের সুযোগটুকু পেতে আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে চার দশক। সোনার বাংলা দেখতে অপেক্ষা করতে হবে কত দিন কে জানে। মাঝিহীন নৌকার মতো, নেতাহীন আত্মপরিচয়জ্ঞানহীন জাতি বিশ্ব দরবারে ছিল মর্যাদাহীন। শুধু তাঁর কন্যাকে সৃষ্টিকর্তা আমাদের জন্য বাঁচিয়ে রেখেছিলেন বলেই হয়তো সেই স্বর্ণালি দিনের আশা আজও করতে পারি। পিতার যোগ্য কন্যা আজও প্রতিদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করেন পিতার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার জন্য। যুদ্ধাপরাধের বিচার করেছেন, তা এখনো চলমান। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হয়েছে। রায় কার্যকর হতে দেখেছে জাতি। অর্থনৈতিক উন্নয়নের কার্যক্রম চলছে সজোরে। যে সোনালি দিনের স্বপ্ন নিয়ে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিল বাঙালি, তা একদিন অর্জিত হবে, সেই আশার আলোর রেখা দূরে দেখা যায়। কিন্তু তবু শঙ্কা আছে মনে। যে উদার, মানবতাবাদী, অসাম্প্রদায়িক দেশের স্বপ্নের কথা বলেছিলেন জাতির পিতা, সেটার অর্জন দিনে দিনে কঠিনতর মনে হচ্ছে। শুধু ভরসা স্রষ্টার পরে এই ধরার বুকে বঙ্গবন্ধু কন্যার। কিভাবে যেন সেই কন্যা বাবার পদাঙ্কে পা রেখেছেন। হয়ে উঠছেন বাবার মতোই এই দুর্ভাগা জাতির একমাত্র মনুষ্য আশা-আকাঙ্ক্ষার স্থল। বঙ্গবন্ধুর রক্তের ধারার কাছেই আবার আমাদের ফেরা, সব স্বপ্নের বাস্তবায়নের জন্য। নিশ্চয়ই হবে স্বপ্ন পূরণ। পিতার রক্তে লেখা এ প্রতিশ্রুতি। পূরণ হতেই হবে।

তবে পিতার কাছে আমাদেরও কিছু দায় ছিল। তিনি আমাদের স্বাধীন ভূমি দিয়ে গেলেন; অথচ তাঁকে আমরা ঘাতকের হাত থেকে রক্ষা করতে পারিনি। বরং বাঙালি ঘরেরই কিছু কুলাঙ্গার পিতার বুকে আঘাত হানে। এরা আমাদের কপালে এঁকে দেয় পিতৃ হন্তারকের কলঙ্ক। এ দায় থেকে আমাদের মুক্তির একমাত্র উপায় তাঁর কন্যার হাতকে শক্তিশালী করা। কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, পিতার মতোই জনগণ অন্তপ্রাণ। দিবারাত্র এ দেশের উন্নতিই তাঁর লক্ষ্য। কিন্তু আমার ভয় হয়, আমরা পিতার মতো কন্যারও কোনো উপকারে আসতে পারছি না। নিচ্ছি সবাই দুহাতে, কিন্তু দিচ্ছি না কিছুই। আমাদের অসততা, ব্যক্তিকেন্দ্রিক লোভ, লালসা, দায়িত্বহীনতা, তাঁর অনেক কাজের সুখ্যাতিকে ম্রিয়মাণ করে দেয়। আমাদের যেন কোনো দায়িত্ব নেই দেশের প্রতি, আমাদের যেন কোনো ভার বহন করার প্রয়োজন নেই, এমনটা দেখি সবার ভেতর। মাঝেমধ্যে মনে হয় এই গরিব দেশের বোঝা যেন বঙ্গবন্ধুকন্যা একাই বহন করে চলছেন। দুঃখ হয়, ভয় হয়। আমরা কি তাঁর বোঝার ভার লাঘবের জন্য যার যার ক্ষেত্র থেকে নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে পারি না? যার যার অঙ্গনে, পরিবারে, কর্মক্ষেত্রে নিজেদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনের মধ্য দিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি আমরা আমাদের শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে পারি, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারি, তাঁর প্রতি আমাদের ঋণ শোধ করার প্রয়াস নিতে পারি। আজকে তাঁর জন্মশতবার্ষিকীতে ‘মুজিববর্ষের’ সূচনায় এই হোক আমাদের প্রত্যয়।

লেখক: শহীদ সন্তান

সৌজন্যেঃ দৈনিক কালের কণ্ঠ

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত