অপেশাদার সাংবাদিকতা এবং প্রথম আলো'র দায়

1101

Published on এপ্রিল 3, 2023
  • Details Image

মুনেম শাহারিয়ার মুন: 

বাংলাদেশের মিডিয়া বা সংবাদপত্রগুলো কোয়ালিটি কিংবা সংবাদ উপস্থাপনের কাঠামোগত জায়গা থেকে এমন একটি পর্যায়ে আছে যেটি সহজ ভাবে আমাদের আমাদের মগজে ঢুকছে না। মিডিয়া-সংবাদপত্রগুলো  এখন জনগণের চিন্তা ও ভাবাবেগকে 'এলগরিদম টার্ম' দিয়ে বিশ্লেষণ করার মাধ্যমে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা উপস্থাপন, উস্কানিমূলক, আবেগপ্রবণ গল্প ছাপাতে শুরু করে আবার সেসব সংবাদ জনগণের কাছেই পণ্যের মত বিক্রির মাধ্যমে একই সাথে পুঁজিপতি এবং  ব্রান্ড হয়ে উঠার প্রতিযোগিতার মধ্যে রয়েছে। ব্রান্ড হয়ে উঠার সাথে সাথেই সেসব ব্রান্ডকেও, কোন সুপার ব্রান্ড নিয়ন্ত্রণ করতে চায় এবং করে। এসব সুপার ব্রান্ড গুলো নিয়ন্ত্রিত করে তারাই; যারা মূলত পুরো পৃথিবীর সকল কিছু নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। এটি এক ধরণের 'Hegemonic Terms' এর ব্যবহারিক অংশ।

'Algorithm Terms' এর মাধ্যমে আমাদের চিন্তা ও ভাবাবেগ বিশ্লেষণের একটি ছোট্ট উদাহরণ দেই- ধরুণ ফেইসবুক চালোনোর সময় আপনি একটি ঘড়ি দেখে সেই সাইটে ঢুকে কিছু সময় অবস্থান করলেন, তারপর সেখান থেকে বের হয়ে পুনঃরায় নিজের মত করে স্ক্রলিং করে যাচ্ছেন। একটু ভালোভাবে খেয়াল করবেন এরপর বেশখানিক সময় আপনার সামনে বারবার ঘড়ির বিজ্ঞাপন অথবা ঘড়ি বিক্রির কোন সাইট আপনার সামনে চলে আসছে। এটি কোন আকর্ষিক ঘটনা নয়। আপনার সকল পছন্দ-অপছন্দ, ভালো লাগা, ভালোবাসা সকল তথ্যের বিশ্লেষণ হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এর দ্বারা আপনার মানসিকতা কেমন, কোন তথ্য আপনাকে কিভাবে এবং কতটুকু প্রভাবিত করবে সেটি নির্ধারিত হয়।

প্রভাবিত করার আরেকটি ছোট্ট উদাহরণ দেই- সোস্যাল মিডিয়ায় কুখ্যাত রাজাকারকে চাঁদে দেখা গিয়েছে এমন একটি গুজব যখন ছড়ানো হলেও তখন কিন্তু সুশিক্ষিত কিছু মানুষ ছাড়া প্রায় সকলেই প্রচার করেছিলো যে সত্যি চাঁদে দেখা গিয়েছে। অনেক ধর্মভীরু লোক গুজবের ভ্রম থেকে মনস্ত্বাত্বিক ভাবে সেই কুখ্যাত রাজাকারকে চাঁদে দেখেও ফেলেছিলেন। লোক মুখে প্রচারের পরিসরটা কেমন ছিলো তা আমাদের কারোরই অজানা নয়। যখন প্রত্যেক ব্যক্তিই ইন্টারনেট ব্রাউজিং করে তখন সকল ক্ষেত্রে নজরদারি বিশ্লেষণ প্রক্রিয়া চলমান থাকে।

ব্রান্ড হয়ে উঠা সংবাদপত্র 'প্রথম আলো' আপনার আমার চিন্তা ও আবেগের বিশ্লেষিত তথ্য জানেন এবং কোন তথ্য আপনার সামনে উপস্থাপন করলে আপনি কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাবেন সেটিও তাদের অজানা নয়।

তাই মহান স্বাধীনতা দিবসের দিনে একটি শিশুর হাতে দশ টাকা তুলে দিয়ে তার নামের বরাতে মিথ্যা সংবাদ প্রচার করা এবং-

'পেটে ভাত নাই স্বাধীনতা দিয়ে কি করুম। বাজারে গেলে ঘাম ছুটে যায়, আমাগো মাছ, মাংস আর চাইলে স্বাধীনতা লাগবো।' এই উদ্ধৃতি ব্যবহার করার মাধ্যমে মহান স্বাধীনতা দিবসের দিনে সকলকে একটা ভিন্ন উপলব্ধি দেয়ার প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। সংবাদপত্রে মিথ্যা গল্প ছাপিয়ে আপনার আমার আবেগকে কাজে লাগিয়ে আমাদের স্বাধীনতা অর্থহীন, গণতান্ত্রিক অবস্থান ব্যর্থ ইত্যাদি ইত্যাদি এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টায় সফল হয়েছেন। শুরুতেই বলেছি একটা রাষ্ট্রে মিডিয়া-সংবাদমাধ্যম ব্রান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলেই সুপার ব্রান্ড এবং পৃথিবীর সব কিছু যারা নিয়ন্ত্রণ করতে চায় তারা তাদের কাজে লাগায়, পৃষ্ঠপোষকতা করে। তাদেরকে অপরাধের ঊর্ধ্বে তুলে দেয়।

শিশুকে অনৈতিক কাজে ব্যবহার এবং শিশুর অধিকার ক্ষুণ্ণ করা যে অপরাধ এবং মেটাফোরিক আকারে স্বাধীন-গণতান্ত্রিক দেশে স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়েছে সেটি বুঝানো অপরাধ কি না? সেটিও নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে সুপার ব্রান্ড গুলো দ্বারাই।

যে সংবাদপত্র মিথ্যাগল্প সংবাদ হিসেবে প্রচার করলো, শিশুকে অনৈতিক কাজে ব্যবহার এবং শিশুর অধিকার ক্ষুণ্ণ করলো ইত্যাদি ইত্যাদি; তাদের আইনের আওতায় আনার সাথে সাথেই সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নেই, গণতন্ত্র উচ্ছন্নে গিয়েছে; এটিই জনগণের চিন্তায় ঢুকিয়ে দেয়া এবং আবেগের প্রতিক্রিয়া তৈরি করাই তো লোকাল ব্রান্ডের কাজ এবং পৃথিবী নিয়ন্ত্রণ করতে চাওয়া 'দ্য আল্টিমেট  গডফাদার' তার নিয়ন্ত্রণাধীন সুপার ব্রান্ড গুলোকে দিয়ে

"The government has undermined human rights, freedom of speech, and freedom of the press."

এমন একটি স্টেটমেন্ট বিশ্ব বাজারে প্রচার করে এবং এর মাধ্যমে তাদের লোকাল ব্রান্ডগুলোকে আরো বেশি ক্ষমতাধর হিসেবে তৈরি করে। মাঝে মাঝে ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানকে বিশ্ব পরিমন্ডলে পরিচিত করে তুলতে তোলে বিশেষ কোন কাজের জন্য বড় পর্যায়ের সম্মাননা প্রদান করে। এগুলোও মূলত গদফাদারের পৃথিবী নিয়ন্ত্রণ করার পলিসির অংশ বিশেষ।

দ্য আল্টিমেট গদফাদারের নিয়ন্ত্রিত এইসব ব্রান্ডগুলোর এজেন্ডা বন্ধ করতে বাংলাদেশের প্রচলিত আইনের মাধ্যমে বিচার বন্দোবস্তের প্রয়োজন রয়েছে।

প্রথম আলোর মত পত্রিকায় একটি শিশুর হাতে দশ টাকা তুলে দিয়ে তার নামের বরাতে সাংবাদিক এডিটরকে মিথ্যা সংবাদ পাঠায় এবং সেটি যখন উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে প্রচার করা হয়- যা স্পষ্টতই সাংবাদিকতার নীতি নৈতিকতাকে প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়।

যখন শিশুকে অনৈতিক কাজে ব্যবহার এবং শিশুর অধিকার ক্ষুণ্ণ করা হয়; তখন সেটি 'Child Exploitation' যা কোন আন্তজার্তিক আইনেরও লঙ্ঘন। এটি যেখানে স্পষ্টভাবে অপরাধ। তখন আলোচনা চলছে গড ফাদারের এজেন্ডা অনুযায়ী।

গণমাধ্যম হলো একটি রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। সুশাসন, জনগণকে সঠিক তথ্য উপস্থাপন করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহযোগিতা করা সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। ব্রান্ড হয়ে পুঁজিপতি হয়ে উঠা, অন্যের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা সংবাদপত্র তথা গণমাধ্যমের দায়িত্ব নয়।  রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত স্বাধীনতার বিশ্বাসে সংঘবদ্ধভাবে না থাকতে পারাটা স্বাধীনতার সাথে সাংঘর্ষিক অবস্থান হিসেবে পরিলক্ষিত হয়। জনগণের কাছে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে মিথ্যা তথ্য বিক্রি না করে বরং আদর্শিক, সত্য, বস্তুনিষ্ঠ  ও নৈতিকতা ধরে রেখে দেশ, রাষ্ট্র, সমাজ এবং এই সমাজের মানুষের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য কাজ করে যাওয়াই সংবাদপত্র কিংবা সংবাদ মাধ্যমগুলোর মূল লক্ষ্য ও  উদ্দেশ্য থাকাটা জরুরি বলে মনে করি।

ক্ষুদ্র জ্ঞানের পরিসর থেকে আমি উপলব্ধি করি,  ডেমোক্রেসি বা গণতন্ত্র এমন একটি পদ্ধতি যেটি আগামী একশত বছর পরেও 'Under Construction' প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে চলমান থাকবে।

আমাদের সবাইকে উপলব্ধি করতে হবে, বিকৃত প্রণোদনা ভিত্তিক বিভাজন আমাদের সকলের জন্য অশনিসংকেত।

 

লেখক

সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, স্যার এ.এফ. রহমান হল, ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয়।

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত