বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের তিনমাস পর্যন্ত সহায়তা দেওয়া হবেঃ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

1929

Published on আগস্ট 27, 2017
  • Details Image
    Prime Minister Sheikh Hasina giving rice plants to a flood affected farmer.
  • Details Image

পানি নেমে গেলেও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের তিন মাস পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

উত্তরাঞ্চলের সাম্প্রতিক বন্যা পরিস্থিতি পরিদর্শনে গিয়ে শনিবার গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চত্বরে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণকালে একথা জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে সরকার ৩ মাস পর্যন্ত সব ধরনের সহায়তা দেবে। এক কোটি দরিদ্র মানুষকে ১০ টাকা কেজিতে চাল দেওয়া হবে। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকা পর্যন্ত আপনারা কোনো চিন্তা করবেন না।

“আপনাদের ভাগ্যের উন্নয়নে ও পুনর্বাসনে আমি আন্তরিকভাবে সক্রিয়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর মত আমিও জনগণের জন্য আমার জীবনকে উৎসর্গ করার অঙ্গীকার করেছি। আওয়ামী লীগ দুঃখী মানুষের দল। তাই আপনাদের পাশে বন্ধু হিসেবে, স্বজন হিসেবে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।”

বেলা পৌনে ১১টার দিকে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণের আনুষ্ঠানিকতার সময় কৃষকদের মাঝে আমন ধানের চারাও বিতরণ করেন তিনি।

এসময় শেখ হাসিনা বলেন, “বন্যায় যারা বাড়ি-ঘর হারিয়েছে, তাদের ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হবে। এছাড়া ভূমিহীনদের জমি দেওয়া হবে।”

দেশের ২১টি জেলার ফসল বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বন্যা পরবর্তী কৃষি পুনর্বাসনের জন্য সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রত্যেককে এক বিঘা জমির চারা বিতরণ করা হবে। বীজ, কীটনাশক, সারসহ অন্যান্য উপকরণও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।

“বন্যায় যেসব কৃষকের ফসল নষ্ট হয়েছে তাদের পর্যাপ্ত কৃষি ঋণ দেওয়া হবে। ওইসব এলাকায় কোনো ধরনের ব্যাংক ঋণের সুদ আদায় করা হবে না। যারা আগে ঋণ নিয়েছিল তাদেরকেও নতুন করে ঋণ দেওয়া হবে। বন্যা কবলিত এলাকায় কৃষির ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বিনা জামানতে সুদমুক্ত ঋণ দেওয়া হবে।”

আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, “বর্তমান সরকার সব ধরনের বিপদে মানুষজনের পাশে আছে এবং থাকবে। কিন্তু বিএনপি নেতা খালেদা জিয়া বন্যার্তদের পাশে না দাঁড়িয়ে আয়েশি জীবনযাপন করছেন।”

ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের দুর্ভোগ ও কষ্ট লাঘবে ত্রাণ বিতরণের পাশাপাশি নানান কর্মসূচি নেওয়ার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, “বন্যার পর পর্যাপ্ত ওষুধ ও চিকিৎসা সেবা প্রদানের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাঘাট, পুল-কালভার্ট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মেরামত ও নির্মাণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

“যে সকল শিক্ষার্থীর বই-খাতা বন্যার পানিতে নষ্ট হয়েছে তা আবার সরবরাহের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কৃষিক্ষেত্রে ক্ষতির পরিমাণ বেশি হওয়ায় মানুষ যেন অভুক্ত না থাকে সে জন্য বিদেশ থেকে খাদ্য শস্য আমদানির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।”

বন্যা কবলিত এলাকায় কার্যক্রম চালিয়ে আসা বেসরকারি সংস্থাগুলোর (এনজিও) উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের উপর জুলুম করবেন না। এখন কোনো ধরনের ঋণের কিস্তি আদায়ের চেষ্টা করবেন না।”

ত্রাণ সামগ্রী ও কৃষকদের মাঝে আমন ধানের চারা বিতরণকালে অন্যদের মধ্যে কৃষি মন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী মোফজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবীর নানক, সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, গাইবান্ধা-০৪ আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদ এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন বক্তব্য রাখেন।
ত্রাণ বিতরণ শেষে স্থানীয় উপজেলা পরিষদ হল রুমে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, নাগরিক সমাজ ও বন্যা ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী মতবিনিময় করেন।

স্থানীয় সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদের সভাপতিত্বে মতবিনিময় সভায় অন্যদের মধ্যে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, পানিসম্পদ মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, খালেদ মাহমুদ চৌধুরী, হুইপ মাহবুব আরা বেগম গিনি, সংসদ সদস্য ইউনুস আলী সরকার ও গোলাম মোস্তফা, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শামসুল আলম হিরু, সাধারণ সম্পাদক আবু ব্ক্কর সিদ্দিক বক্তব্য রাখেন।

এর আগে সকাল সোয়া ১০টার দিকে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার বোয়ালিয়ায় হেলিপ্যাডে অবতরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। এসময় প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতাদের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানানো হয়।

এরপর তিনি গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চত্বরের ঈদগাহ মাঠে বানভাসীদের খোঁজ, ত্রাণ বিতরণ ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ধানের চারা বিতরণের আনুষ্ঠানিকতায় যোগ দেন।

গোবিন্দগঞ্জে মধ্যাহ্ন বিরতির পর বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার বন্যা দুর্গত মানুষদের মাঝে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণে হেলিকপ্টারে করে বেলা ২টায় রওনা হন প্রধানমন্ত্রী।

‘ঘরে ঘরে ত্রাণ পৌঁছে দেব’
বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে ত্রাণ বিতরণের সময় স্থানীয় ডিগ্রি কলেজ মাঠের এক জনসভায় বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সেখানে তিনি বলেন, “বাংলার মানুষকে কষ্ট করতে দেব না। যাদের বাড়ি নষ্ট হয়েছে তাদের ঘর করে দেব। যেসব স্কুল নষ্ট হয়েছে সেসব স্কুল করে দেব, রাস্তা করে দেব। যেসব শিক্ষার্থীদের বই খাতা নষ্ট হয়েছে তাদের বই খাতা দেব।

“ত্রাণের কোনো সমস্যা হবে না। ত্রাণ পৌঁছে যাবে আপনাদের ঘরে। যত খাদ্য… টাকা লাগবে, দেব। কৃষক শ্রমিক মেহনতি মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করাই আমার কাজ। শুধু দোয়া করবেন, আমি যেন মানুষের সেবা করতে পারি।”

বন্যা প্রতিরোধ ও নদীভাঙন রোধে যমুনা, বাঙ্গালি এবং করতোয়া নদীতে তিনটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাঙ্গালি নদীর উপড় ব্রিজ নির্মাণসহ বগুড়া-সারিয়াকান্দি সড়ক প্রশস্ত করা হবে।

নৌকা প্রতীকে ভোট চেয়ে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, “আপনারা আমাকে সহযোগিতা করেছেন। নৌকায় ভোট দিয়েছেন। দেখলেন তো বন্যায় নৌকা ছাড়া কোনো গতি নেই। তাই আগামী নির্বাচনে আবার নৌকায় ভোট দিন।”

প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে ঘিরে সারিয়াকান্দি বাজার থেকে শুরু করে উপজেলা চত্বর, সভাস্থল সব স্থান ছিল ব্যানারে ফেস্টুনে ঢাকা। উপজেলার প্রবেশ পথগুলোনয় নির্মাণ করা হয় তোড়ন।

সভাস্থল সারিয়াকান্দি ডিগ্রি কলেজ মাঠ থেকে এক কিলোমিটার দূর পর্যন্ত মাইক টানানো হয়। সারিয়াকান্দি উপজেলার পাশে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে আশ্রিতদের প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য শোনানোর জন্য সেখানেও মাইকের ব্যবস্থা করা হয়।

বেলা ২টা ৩৯ মিনিটে হেলিকপ্টার যোগে গাইবান্ধা থেকে প্রধানমন্ত্রী সারিয়াকান্দি হাইস্কুল মাঠে অবতরণ করেন। পরে সারিয়াকান্দি ডিগ্রী কলেজ মাঠে গিয়ে বেলা ৩টা ১০ মিনিটে বক্তব্য শুরু করেন প্রধানমন্ত্রী।

বেলা ৩টা ৪৭ মিনিটে বক্তব্য শেষ হওয়ার পর বানভাসী হাওয়া খাতুনকে ত্রাণ দেওয়ার মধ্য দিয়ে বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম শুরু করেন।

পরে স্থানীয় নাগরিক সমাজ, প্রশাসনের কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সারিয়াকান্দি ডিগ্রি কলেজ মিলনায়তনে মতবিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী।

জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মজিবর রহমান মজনুর পরিচালনায় মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাহাদারা মান্নান।

মতবিনিময় সভায় জঙ্গিবাদ ও মাদকের কবল থেকে তরুণ প্রজন্মকে রক্ষায় অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্টদের কাজ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।

বন্যা পানি না নামা পর্যন্ত ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত রাখার নির্দেশ দিয়ে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১০ টাকা কেজি দরে একজন ৩০ কেজি পর্যন্ত চাল পাবে। এরকমভাবে ৫০ লাখ মানুষকে চাল দেওয়া হবে। এছাড়া ভিজিএফসহ অন্যান্য কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

শেখ হাসিনা বলেন, “আমার চাওয়া পাওয়ার কিছু নেই। বঙ্গবন্ধু মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে গিয়ে জীবন দিয়েছে। তারও চাওয়া পাওয়ার কিছু ছিল না। আমি দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোঁটাতে চাই।

“জিয়াউর রহমান মানুষ হত্যা করেছে। খুনিদের পুরস্কৃত করেছে। সেই দলের কাছে কি আশা করতে পারে জাতি। বিএনপি-জামায়াত জোট আগুন সন্ত্রাস করেছে। গাছ কেটে সন্ত্রাস করেছে।”

TAGS:

Gallery, Bangla,

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত