একটি মামলার রায় ও সহিংস রাজনীতির আলামতঃ ফকির ইলিয়াস

1718

Published on ফেব্রুয়ারি 4, 2018
  • Details Image

বাংলাদেশে একুশের বইমেলা শুরু হয়েছে। এই সময়টি বাংলাদেশে উৎসবমুখর থাকে। কবিতা উৎসব, প্রকাশনা, পাঠ, নাচ-গানে ভরপুর থাকে পুরো মাস। মানুষ সৃজনে মগ্ন থাকেন ভাষার এই মাসে। কিন্তু এই মাসটি বেশ কয়েকবারই ধ্বংসের মুখোমুখি হয়েছে। জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলন মানুষকে ভুগিয়েছে। এ বছর কেমন যাবে এই মাস- তা নিয়ে অনেক জল্পনা। ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়ার একটি মামলার রায় দেয়া হবে। তা নিয়েই সব উত্তেজনা। রায় হলে তিনি আপিল করবেন- তাও বলা হচ্ছে। তারপরও এই সংকটের কথা বলা হচ্ছে কেন?

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে করা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায় ঘোষণার জন্য আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি, বৃহস্পতিবার দিন ধার্য করেছেন আদালত। মামলার যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে ঢাকার ৫ নম্বর বিশেষ জজ আদালতের বিচারক ড. মো. আখতারুজ্জামান এ দিন ধার্য করেন। এর আগে ২৩৬ কার্যদিবসে ৩২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ, ২৮ কার্যদিবস আত্মপক্ষ সমর্থন ও ১৬ কার্যদিবস যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে বিচারক রায়ের জন্য এ দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। মামলা দায়েরের ১০ বছর পর এ রায় ঘোষণা করা হচ্ছে। সাবেক কোনো প্রধানমন্ত্রীর দুর্নীতির বিচারের রায় বাংলাদেশে এটাই প্রথম। এর আগে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের দুর্নীতি মামলার রায় ঘোষিত হয়েছে। তিনি প্রায় ছয় বছর সাজা খেটেছেন। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের দুই কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রমনা থানায় মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ খালেদা জিয়াসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ঢাকার তৃতীয় বিশেষ জজ আদালতের বিচারক বাসুদেব রায়। মামলার রায় কী হবে তা আদালতই জানেন। কিন্তু আমরা দেখছি, এর আগেই রাজনীতিতে সহিংসতা ছড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। পুলিশের ওপর হামলা করা হয়েছে। কেউ কেউ হুমকি দিয়ে বলছেন, তারা সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করেই ঘরে ফিরবেন। এসব কিসের আলামত? তারা বিচার বিভাগের ওপর আস্থা রাখছেন না কেন? আদালত থেকে ফেরা খালেদা জিয়ার বহর থেকে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা আবার নাশকতার দিকে দেশকে নিয়ে যেতে পারে। এমন আভাস দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি এক সমাবেশে বলেছেন, ‘আপনারা দেখেছেন, আদালতের কাছাকাছি কী আলামত? আক্রমণ কে করল? আক্রমণ করল কার ওপর? পুলিশের প্রিজনভ্যান ভেঙে ফেলল জঙ্গি স্টাইলে।’ ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘গণতান্ত্রিক রাজনীতির সব সীমা অতিক্রম করে গতকাল তারা জঙ্গি স্টাইলে পুলিশের ওপর হামলা চালিয়েছে। এই স্টাইলটা কি গণতান্ত্রিক? এরা নাকি দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবে!’ তিনি সাবধান বাণী উচ্চারণ করে বলেন, ‘আমি আবারো বলছি, আগুন নিয়ে খেলবেন না। আগুন নিয়ে খেললে এর সমুচিত জবাব দিয়ে দেয়া হবে।’ পুলিশের ওপর বিএনপি কর্মীদের হামলাকে ন্যক্কারজনক আখ্যা দিয়ে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা সহ্য করা হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

আমরা লক্ষ করছি, বিএনপি বিদেশি ক‚টনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক করে তাদের ক্ষোভের কথা জানাচ্ছে। অন্যদিকে তাদের গঠনতন্ত্র থেকে বাদ দিচ্ছে অনেক কিছু। এ বিষয়েও কথা বলেছেন ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেছেন, বিএনপির গঠনতন্ত্রের ‘সাত ধারার প্রথমটি হচ্ছে- ক. দণ্ডিত ব্যক্তি বিএনপির কোনো নেতা হতে পারবে না, সংসদ সদস্য হিসেবে মনোনয়ন পাবে না, এমপি হতে পারবে না; খ. কেউ যদি দেউলিয়া হয় তাহলে বিএনপির সদস্য হতে পারবে না; গ. কেউ যদি উন্মাদ হয় তাহলে বিএনপির সদস্য হতে পারবে না; ঘ. কেউ যদি দুর্নীতিবাজ হয় তাহলে বিএনপির সদস্য হতে পারবে না। কিন্তু তারা তা বাদ দিয়ে গঠনতন্ত্র ইলেকশন কমিশনে জমা দিয়েছেন। ওবায়দুল কাদের বলেন- ‘এবার বুঝে দেখুন, এই চারটা বিষয় আছে ৭ ধারায়, এই সাতধারা রাতের অন্ধকারে কলমের খোঁচায় বাদ দিয়ে নতুন করে গঠনতন্ত্র সম্মেলনের এক বছর ১০ মাস পর নির্বাচন কমিশনের কাছে জমা দিয়েছে। তাহলে কী দাঁড়ায়?’

জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট দুর্নীতির এই মামলায় খালেদা জিয়াকে শাস্তি দিয়ে তাকে ভোট থেকে বাইরে রাখার ষড়যন্ত্র চলছে বলে বিএনপি অভিযোগ করছে। তারা দাবি করেছে, রায় আগেই ঠিক করে রাখা। অন্যদিকে ক্ষমতাসীনরা দাবি করছে, আদালতের ওপর সরকারের কোনো হস্তক্ষেপ নেই। খালেদা জিয়ার দোষ প্রমাণিত হবে জেনেই বিএনপি তার দণ্ডের বিষয়টি আঁচ করে ফেলেছে। ওবায়দুল কাদের বলেন, দণ্ডিত হলে খালেদা জিয়া আর নেতৃত্বে থাকতে পারবেন না বলে বিএনপি ‘তড়িঘড়ি করে গঠনতন্ত্র সংশোধন করে’ তাকে রাখতে চাইছে।

বাংলাদেশে বিএনপির জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলন নতুন নয়। তাদের কিছু অতীত এখানে স্মরণ করা যেতে পারে। এই সরকারকে হটাতে তারা ছিল মরিয়া। ২০১৩ সালের ৬ মার্চ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বিএনপির শান্তিপূর্ণ সমাবেশ শেষে দলীয় নেতাকর্মীরা পরপর ছয়টি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায়। এর প্রতিবাদে ৭ মার্চ সারা দেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডাকে দলটি। পরে পুলিশ ওই ককটেল নিক্ষেপকারীদের গ্রেপ্তার করে। তদন্তে দেখা যায় হরতালের ইস্যু সৃষ্টির জন্যই ওই ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এরপরও দলের নেতাকর্মীদের মুক্তির দাবিতে ১৮ ও ১৯, ২০১৩ মার্চ সারা দেশে হরতাল পালন করে ১৮ দলীয় জোট। ঠিক ওই বছর ফেব্রুয়ারির দিকে তাকালে দেখা যায় মানবতাবিরোধী অপরাধে রাজাকার দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে ট্রাইব্যুনাল ২৮ তারিখ ফাঁসির রায় দিলে ওইদিন সারা দেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডাকে জামায়াত। সারা দেশে সহিংসতা চালায় জামায়াত-শিবির। একই সঙ্গে এই রায়ের বিরুদ্ধে ৩ ও ৪ মার্চ ২০১৩ দেশে টানা ৪৮ ঘণ্টার হরতাল ডাকে দলটি। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এর ঠিক পরের দিন ৫ মার্চ মঙ্গলবার সারা দেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডাকেন। বিএনপির ডাকা হরতালে সমর্থন দেয় জামায়াত। এভাবে ২০১৩ সালেই ৩৬৫ দিনের মধ্যে ২১৫ দিন হরতালে কেটেছে। এর কোনোটা দেশব্যাপী, কোনোটা নির্দিষ্ট অঞ্চলজুড়ে। এর পরের বছর ২০১৪ মোটামুটি শান্তিপূর্ণ ছিল।

বিগত ২০১৩ এবং ২০১৪ সালের হরতাল অবরোধের কারণগুলোর দিকে তাকালে দেখা যাবে, বিএনপি আন্দোলনের জন্য নতুন নতুন ইস্যু সৃষ্টি করতে গিয়ে বার বার ব্যর্থ হয়েছে। সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা দলীয় নেতাকর্মীরাও কোনো আন্দোলন কর্মসূচিতে যোগ দিতে আগ্রহ দেখায়নি। ধারাবাহিক আন্দোলনে সহিংসতা ছাড়া নতুন কিছু না থাকায় তাদের জনপ্রিয়তা শূন্যের কোঠায় গিয়ে ঠেকেছে। রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘোষণা করেও দলের কোনো নেতাকর্মী মাঠে নামছেন না। সারা দেশে বিএনপির তৃণমূলের কোনো নেতাকর্মী কেন্দ্র ঘোষিত কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন না।

আমাদের মনে আছে, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ২০১৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিলেও শেষ পর্যন্ত তা করতে পারেনি বিএনপি। বিএনপির সিনিয়র নেতারা আত্মগোপনে চলে যাওয়া এবং খালেদা জিয়া নিজে গুলশানের বাসায় আটকে পড়ায় রাজধানীর রাজপথে কোনো নেতাই নামেননি। এরপর এক বছর স্বাভাবিক আন্দোলন করলেও ৫ জানুয়ারিকে ঘিরে দলটি আবার নাশকতা সৃষ্টির চেষ্টা চালায়। এ লক্ষ্য নিয়ে ৩ জানুয়ারি রাতে বাসা থেকে গুলশান কার্যালয়ে অবস্থান নেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। গোয়েন্দা সূত্রগুলো জানায়, ৪ জানুয়ারি রাতে বিএনপি চেয়ারপারসনের জাতীয় প্রেসক্লাবে রাতে চলে আসার খবর ছিল তাদের কাছে। প্রেসক্লাবের সাংবাদিক নেতাদের মধ্যে কেউ কেউ দাবি করেছেন বিএনপিপন্থি সাংবাদিক নেতারা খালেদা জিয়ার থাকার জন্য একটি কক্ষ ঠিক করেছিলেন। ঢাকার মধ্যভাগে অবস্থান নিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের দিয়ে নাশকতা সৃষ্টির চেষ্টা ছিল তাদের। পরবর্তী সময়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব প্রেসক্লাবে অবস্থান নেন। সাংবাদিক নেতাদের চাপে তিনি প্রেসক্লাব ত্যাগ করতে বাধ্য হন। কিন্তু ৫ জানুয়ারি বের হতে না পারার পর বিএনপির তরফ থেকে দলীয় চেয়ারপারসনের অফিসের সামনে থেকে বাধা সরিয়ে নেয়ার দাবি জানানো হয়। এই হলো বিএনপির অদূর ইতিহাস। তারা কি আবারো সেই পথেই হাঁটছে? এই প্রশ্নটি সচেতন দেশবাসীর। বিএনপি এমন একটি দল, যার জন্ম হয়েছে অনেকগুলো মৌলবাদী দলের ওপর ভর করে। তাই তারা সেভাবেই এগোচ্ছে কিংবা এগোবে। তাদের অতীত দেশবাসীকে মনে রাখতে হবে। বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার যে কোনো কর্মকাণ্ড দেশের মানুষকেই প্রতিহত করতে হবে। এর জন্য প্রস্তুতি থাকতে হবে। কারণ বিএনপি ও তাদের অনুসারীরা এই বছরটিকে তাদের চরমতার দিকে নিয়ে যেতে পারে।

সৌজন্যেঃ ভোরের কাগজ

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত