আসন্ন নির্বাচন : জয় ও পরাজয় ভাবনাঃ ডা. এস এ মালেক

3627

Published on ফেব্রুয়ারি 5, 2018
  • Details Image

সম্প্রতি বিএনপি নেতাদের কেউ কেউ আগামী জাতীয় নির্বাচন সম্পর্কে এমন সব উক্তি করছেন, যা হাসির খোরাক হয়ে দাঁড়িয়েছে। একজন বললেন যে, আগামী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের এমন শোচনীয় পরাজয় হবে যে, শেখ হাসিনাকে দলবলসহ পালিয়ে যেতে হবে। অবশ্য কোথায় পালিয়ে যাবেন বা কেমন করে যাবেন, সে সম্পর্কে কিছুই বলা হয়নি। আর একজন বলেছেন, বিএনপি নাকি আগামী নির্বাচনে ৮০% ভোট পাবে। কেউ কেউ এমনও বলছেন যে, তারা নিশ্চিত আগামী নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বেগম জিয়া সরকার গঠন করতে যাচ্ছেন। আবার কারো কারো মতে, সাংবিধানিক ধারায় আগামী জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে দেয়া হবে না। অর্থাৎ বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচন হবে না। তারা প্রায় নিশ্চিত যে কারচুপি ও বল প্রয়োগ ছাড়া আগামী নির্বাচনে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিজয়ী হতে পারবে না। নির্বাচন কমিশন সম্পর্কে বলা হয়েছে, কমিশন নাকি দল নিরপেক্ষ নয়, কমিশনের দক্ষতা ও যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, নির্বাচনী প্রচারকার্য শুরু হলে বিএনপি এমন সব কর্মসূচি দেবে যে, ক্ষমতাসীন দলের লোকেরা মাঠেই নামতে পারবে না। তাদের এ ধরনের মন্তব্য শুনে অনুমান করা বোধ হয় বেঠিক হবে না যে, শেখ হাসিনা সরকারকে তারা পুনরায় ক্ষমতাসীন হতে দেবে না।

আসুন আমরা এ সব মন্তব্যগুলো একটু বিশ্লেষণ করে দেখি। বিএনপির মতে আগামী জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তার দল সরকার গঠন করবে। অর্থাৎ জনগণ বিপুল পরিমাণে বিএনপি অর্থাৎ খালেদা জিয়াকে বিজয়ী করবে। প্রায় ১০/১১ বছর বিএনপি বিরোধী দলের অবস্থানে। একটা গণতান্ত্রিক বিরোধী দলেরও যে সুনির্দিষ্ট রাজনীতি আছে, সেই ভূমিকা কি বিএনপি পালন করছে? সংসদের ভেতরে ও বাইরে থেকে এমন সব কর্ম পরিচালনা করা, যাতে করে সরকারের ভুলভ্রান্তি ও ত্রুটি-বিচ্যুতি জনগণের সামনে তুলে ধরা যায়। সরকারের ব্যর্থতাসমূহ এমনভাবে জনসম্মুখে তুলে ধরা হয়, যাতে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হতে থাকে। সংসদের ভেতরে সাংবিধানিকভাবে এমন সব প্রশ্ন তোলা, বিশেষ করে বাজেট বরাদ্দ নিয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে ঘাটতি থাকে, সে সম্পর্কে সঠিক সমালোচনা করে জনগণকে অবহিত করা যে, সরকার সঠিকভাবে দেশ পরিচালনা করতে পারছেন না। যে সব কারণে জনজীবনে অস্থিরতা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়, তাই জনসম্মুখে তুলে ধরা। সুযোগ পেলেই স্পিকারে দৃষ্টি আকর্ষণ করে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বিষয় সম্পর্কে সংসদে আলোচনা করা ও সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে সরকারের ব্যর্থতা তুলে ধরা। আইনশৃঙ্খলা ব্যর্থ হলে জনসম্মুখে তার ব্যাখ্যা দেয়া, উন্নয়ন প্রকল্পে ভুলভ্রান্তি থাকলে তা তুলে ধরা ও সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে অস্বচ্ছতা প্রদর্শিত হলে তাও স্বচ্ছ করবার দায়িত্ব পালন করা। বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকলে তা জনসম্মুখে তুলে ধরা। বিরোধী দলের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় দায়িত্ব হচ্ছে- ক্ষমতাসীন দলের সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকলে, তা জনগণকে অবহিত করা। শুধু সমালোচনা নয়, সরকার যদি ভালো কাজ করে থাকে, তার স্বীকৃতিও দেয়া কর্তব্য। বিরোধী দলের সহযোগিতার অনুপাত ঠিক রেখে সংসদের বাইরে দায়িত্ব পালন করা। বিরোধী দলের আরেকটা বিশেষ দায়িত্ব হচ্ছে- মেয়াদ উত্তীর্ণ হলে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা। সংবিধানকে সমুন্নত রাখতে সরকারকে সাহায্য করা, কিন্তু কী দেখলাম বিগত ১০/১২ বছর বা তার পূর্বাপর। বাংলাদেশে বিরোধী দল বলতে যে দলটিকে বোঝায়, তাদের সংসদে কোনো অস্তিত্ব নেই। সেখানে নির্বাচিত একটা বিরোধী দল আছে, সেই বিরোধী দলের সঙ্গে রাজপথের বিরোধী দলের কোনো সম্পর্ক নেই। আর এরূপ বাস্তবতার কারণ হচ্ছে বিরোধী দল কর্তৃক নির্বাচন বয়কট করা।

স্বাভাবিক কারণেই সরকারকে সংসদের ভেতরে একটা বিরোধী দল সৃষ্টির উদ্যোগ নিতে হয়েছে। তারা যতটুকু পারেন, দায়িত্ব পালন করছেন। আর মূল বিরোধী দল বলতে যাদের বোঝায়, তারা যে কী করছেন, তা এ দেশে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে, যার আলোচনার প্রয়োজন হয় না। সংবিধানের ধার ধারেন না, নির্বাচন আসলে তা বয়কট করবেন, রাজপথে শুধু হৈচৈয়ের মাধ্যমে তারা যা করছেন, তার সঠিক চিত্র ধরা পড়ে না। শুধু নির্বাচন বয়কট করেই তারা থেমে থাকেননি, নির্বাচন প্রতিরোধকল্পে এমন কোনো সহিংসতা বা সন্ত্রাসী তৎপরতা নেই, যার আশ্রয় তারা গ্রহণ করেননি। নিরীহ মানুষকে অগ্নিসংযোগ করে হত্যা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়োজিত কর্র্মচারীদের গুলি করে হত্যা, শতসহস্র যানবাহন পুড়িয়ে দেয়া, জাতীয় অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেয়া, শত শত স্কুল-কলেজ ধ্বংস করা ও ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে না যেতে বাধ্য করাসহ সব অপরাধ সংঘটিত করতে ভূমিকা রাখে। মোটামুটি একটা যুদ্ধ ঘোষণা করে তার পর দাবি করা করা যে, ভোটবিহীন নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্ব›িদ্বতায় প্রার্থীরা নির্বাচিত হয়েছে ও জোর-জবরদস্তিভাবে ক্ষমতায় গেছে। স্বয়ং বিরোধী দলের নেতাদের অসংখ্য দুর্নীতি মামলা আছে। প্রায়ই তাদের নেতাদের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দেয়া হচ্ছে। তারা ক্ষমতাসীন থাকা অবস্থায় যে গণহত্যা, দুর্নীতি, দায়িত্বহীনতা, স্বজনপ্রীতি, রাষ্ট্র পরিচালনায় হস্তক্ষেপ, বিদেশে মুদ্রা পাচার ও অবাধ লুণ্ঠন করেছেন তার জন্য শতসহস্র মামলা হয়েছে এবং সে কারণে তাদের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে, এ সবের কোনো তোয়াক্কা তারা করছে না। ঠিক আগের মতো আবার হুমকি দিচ্ছেন যে, সাংবিধানিক ধারায় নির্বাচন হলেও তারা আগের মতো বিশৃঙ্খলা করবেন, আন্দোলনের নামে দেশকে ধ্বংসের দ্বারে পৌঁছে দেবেন। জনগণ কিন্তু বিএনপির আমলে যেসব অপকর্ম সংঘটিত হয়েছিল, উন্নয়নের গতি যে স্তব্ধ করা হয়েছিল, দুর্নীতি যে আকাশচুম্বী ছিল ও আইনশৃঙ্খলা বলতে যে প্রায় কিছুই ছিল না এসব কথা তারা বেমালুম ভুলে যায়নি। বিএনপি শুধু সরকারের ব্যর্থতার ও দুর্নীতির কথা বলে এই দাবি করছেন যে, তাদের জনপ্রিয়তা বেড়েছে, জনগণ নাকি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে তাদের ভোট দেয়ার জন্য (অবশ্য তাদের ভাষায়)।

বিএনপির চরম দুঃশাসনের কথা যে জনগণ ভুলতে পারে না, তা একটুও তারা ভেবে দেখে না। অথচ যে সরকারের তারা সমালোচনা করছেন, অর্থাৎ জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার বিগত ১০ বছরের শাসনামলে দেশ ও জনগণের চেহারা পাল্টে দিয়েছেন, উন্নয়ন ও অগ্রগতির ধারা এমনভাবে প্রসারিত করেছেন যে, বিশ্ব উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একটা মডেল রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত পেয়েছে। আগামী মার্চের মধ্যে অনুন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে পদার্পণ করবে বাংলাদেশ। আর ২০৪১ সালে বিশ্বের উন্নত ও সমৃদ্ধির দেশ হিসেবে বাংলাদেশ পরিচিতি লাভ করবে। উন্নয়নের যে ফিরিস্তি প্রতিদিন প্রায় প্রধানমন্ত্রী বলে চলেছেন, বা যে সব বাস্তবায়িত প্রকল্প উদ্বোধন ঘোষণা করছেন, শুধু তাই যদি বিবেচনায় নেয়া যায়, তাহলেও তা অসাধারণ দৃষ্টান্ত। অন্য কোনো দেশের প্রধানমন্ত্রী জনগণের সংকট মুহূর্তে জনগণের সমস্যা সমাধানের এত বেশি সাফল্য অর্জন করেছেন তার নজির খুবই কম। বালাদেশের প্রধানমন্ত্রী যে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দেশ পরিচালনা করে দেশকে বিশ্ব পরিসরে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, এ ইতিহাসও বিরল। শুধু দেশের উন্নয়ন নয়, আন্তর্জাতিক বিষয়েও বিশ্বের অন্যান্য দেশের সার্বিক সহযোগিতা করে বিশ্বসভায় সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব রেখে শেখ হাসিনা যেভাবে বিশ্ব নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, তা বাংলাদেশের মানুষের জন্য অবশ্যই গৌরবের। তিনি শুধু আজ বাংলাদেশের নেত্রী নন, বিশ্বের অন্যতম একজন সৎ, সাহসী, সুদক্ষ, দেশপ্রেমিক ও মানবতাবাদী এক অনন্য সাধারণ নেত্রী। জাতির জনকের সুযোগ্য কন্যা হিসেবে তার পিতার স্বাধীন করা দেশকে তিনি দ্রুত কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। একটা দেশের উন্নয়নের মাপকাঠি বলতে যা বোঝায়, তার সব সূচকেই বাংলাদেশ অগ্রগামী। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, পাওয়ার সেক্টরে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে অসাধারণ কৃতিত্ব প্রদর্শন, জনপ্রতি মাথাপিছু বার্ষিক আয় ১৬০০ মার্কিন ডলার, ১ ডিজিটে মুদ্রাস্ফীতি, জিডিপির বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ৭.২%, সারাদেশে ১৬ হাজারের বেশি পল্লী স্বাস্থ্যকেন্দ্র নির্মাণ করে গ্রামের অবহেলিত মানুষের মাঝে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেয়া, নিজস্ব অর্থে পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন, রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প বাস্তবায়ন, কর্ণফুলীতে ট্যানেল নির্মাণসহ অসংখ্য মেগা প্রজেক্ট, বিশেষ করে যোগাযোগ ক্ষেত্রে, শিক্ষা ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন। বছরের প্রথম সপ্তাহে ৩৬ কোটি বই ছাত্রছাত্রীদের মাঝে তুলে দেয়া, ইউনিয়ন পর্যায়ে ইন্টারনেট সার্ভিস চালু করা, ১০ কোটির বেশি মোবাইল ফোন কার্যকর রাখা, সবচেয়ে বড় কথা সততার মানদণ্ডে বিশ্বের সরকার প্রধানের মধ্যে ৩ নম্বরে অবস্থান এসবের কি জনগণের কাছে কোনো মূল্য নেই? ভোট প্রদানের আগে তারা কি একবারও ভেবে দেখবে না যে, বেগম জিয়ার আমলে অবস্থা কী ছিল এবং এখন তা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এসব বিবেচনায় নিয়ে জনগণ যদি ভোট প্রদান করে, তাহলে বিএনপি নেতারা যা বলছেন ঠিক তার উল্টোটা ঘটবে। উন্নয়ন ও অগ্রগতি যদি জনপ্রিয়তার মাপকাঠি হয়ে থাকে ও তার ওপর ভিত্তি করে জনগণ ভোট প্রদান করে থাকেন, তাহলে তো ৮০% ভোট শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগের পাওয়ার কথা, খালেদা জিয়ার দলের নয়। বারবার মিথ্যাচারকে সত্যতে রূপান্তর করার যে প্রয়াসে বিএনপি অভ্যস্ত, এভাবে আর বাংলার সচেতন জনগণকে বিভ্রান্ত করতে পারবে না। স্বাধীনতার পক্ষের প্রতীক হচ্ছেন শেখ হাসিনা। তাই স্বাধীনতার পক্ষশক্তিকে ক্ষমতাসীন করার প্রয়োজনে জনগণ অবশ্যই নৌকা প্রতীকে ভোট দিয়ে শেখ হাসিনাকে জয়যুক্ত করে উন্নয়ন ও অগ্রগতির ধারা অব্যাহত রাখবে।

সৌজন্যেঃ দৈনিক ভোরের কাগজ

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত