খালেদা জিয়া যখন জেলেঃ বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী

7871

Published on ফেব্রুয়ারি 11, 2018
  • Details Image

বয়স হয়েছে অনেক। এ উপমহাদেশের রাজনৈতিক মামলা আর রাজনীতিবিদদের বহু দুর্নীতি মামলাই দেখেছি। আজকে বিএনপি প্রধান বেগম খালেদা জিয়ার অরফানেজ মামলার রায় হলো। রায়ে দেখলাম বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫ এর বিচারক আখতারুজ্জামান আজ ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ এ রায় ঘোষণা করেন। ৬৩২ পৃষ্ঠার এই রায়ে জেলের পাশাপাশি প্রত্যেককে দুই কোটি দশ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। তারেক রহমানসহ মামলার অপর পাঁচ আসামির প্রত্যেককে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। খালেদা জিয়াকে নাজিমুদ্দিন রোডে কারাগারে নেওয়া হয়েছে।
বাকি চার আসামি হলেন, সাবেক মুখ্যসচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী, সাবেক সাংসদ ও ব্যবসায়ী কাজী সালিমুল হক কামাল, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ ও জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমান। এর মধ্যে পলাতক আছেন তারেক রহমান, কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও মমিনুর রহমান।

বেগম জিয়ার উকিলেরা বলেছিলেন এটা সরকারি টাকা নয়। এটা ব্যক্তিগত ট্রাস্টের টাকা। সরকারি-বেসরকারি বড় কথা নয় আত্মসাতই বড় কথা। দুস্থ মানুষের কল্যাণের নামে চাঁদা তুলে আত্মসাৎ করলে অপরাধ হবে না কেন? তাই সাজা হওয়াটা অস্বাভাবিক ছিল না। অনুরূপ বহু ঘটনা আদালতে আসছে না বলে অনেকের সাজা হচ্ছে না।

আওয়ামী লীগ প্রায় দশ বছরব্যাপী একটানা ক্ষমতায়। সুতরাং মানুষের মাঝে আওয়ামী লীগকে নিয়ে কিছু বিরূপতাতো আছেই। তাকে পুঁজি করে বিএনপি নেত্রী মামলাটা নিয়ে বহু রাজনৈতিক মজমা করেছেন। পায়দা পাওয়ার আশায়। সারাদেশব্যাপী তার রায়ের প্রতিক্রিয়ায় কী ফয়দা পাওয়া গেছে তার খবর এখনও পাইনি। রাজধানীতে আদালত পাড়ায় যাওয়ার সময় মগবাজার থেকে তার দলের হাজারখানেক কর্মী তার গাড়ির বহর অনুসরণ করেছে। তাদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষও হয়েছে। তবে এ ধরনের সংঘর্ষ অপ্রত্যাশিতও ছিল না। সারা দেশেও হয়তো এমন ঘটনা ঘটবে।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো তার দলত্যাগী নেতা কাসুরিকে হত্যা করার জন্য লোক নিয়োগ করেছিলো। নিয়োজিত লোকেরা কাসুরির গাড়িতে গুলি করেছিলো। গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে সামনের সিটে বসা তার বৃদ্ধ পিতা গুলির আঘাতে নিহত হয়েছিলেন। তখন ভুট্টোকে হুকুমের আসামি করে মামলা করেছিলেন কাসুরি। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এ মামলা আরম্ভ হয়েছিলো। ট্রায়াল কোর্ট থেকে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত এ মামলায় ভুট্টোর ফাঁসির আদেশ বহাল ছিল।

জেলখানায় বসে ভুট্টো ‘ইফ আই এম এসিসিনেইটেড’ (আমাকে যদি হত্যা করা হয়) নামে একখানা বই লিখেছিলেন। তিনি কারাগার থেকে বইখানার পাণ্ডুলিপি ভারতীয় সাংবাদিক তার বন্ধু প্রাণ চোপরার কাছে গোপনে পাঠিয়েছিলেন আর প্রাণ চোপরা বইটি ভুট্টো ফাঁসির আগে বোম্বে থেকে প্রকাশ করেছিলেন।

যে ভয়াবহতা ভুট্টো তার ফাঁসির পর কল্পনা করেছিলেন তার কিছুই হয়নি। আসলে ভুট্টোর জীবনটা অগণিত ভুলের সমষ্টি। চুরি, চামারি, হত্যা সবকিছুর জন্য মানুষ রাজনীতিবিদদেরকে অবমুক্তির ছাড়পত্র তো দিতে পারে না। এ কথাটা তিনি উপলব্ধি করতে পারেননি। সম্ভবতো বেগম জিয়াও ভুট্টোর মতো অনুরূপ একটা কিছু প্রত্যাশা করেছিলেন।

তার দল এ রায়ের পর আওয়ামী লীগের ভিত্তি কতটুকু নাড়িয়ে দিতে পারলো তার সম্পূর্ণ চিত্র পাওয়ার আগেই লেখাটা লিখছি। তবে বেগম জিয়া কোনও গণঅভুত্থানের নায়ক হতে পারবেন বলে মনে হয় না। বেগম জিয়া রাজকীয় মেজাজের মানুষ। রাজকীয় মেজাজের অনেক কামনা থাকে। সব কামনাই পূর্ণ হয় না।

আরো রায় দ্রুত ঘনিয়ে আসছে। একটা গ্রেনেড হামলার রায়। এ রায়টা খুবই চাঞ্চল্যকর রায় হবে বলে মনে হয় কারণ শেখ হাসিনার জনসভায় মঞ্চে গ্রেনেড মেরে সব নেতাকে মেরে ফেলার পরিকল্পনা নিয়ে হামলা করা হয়েছিলো। ভাগ্যের ফেরে শেখ হাসিনা বেঁচে গেলেও আইভি রহমানসহ ২৪ জন নেতা কর্মী নিহত হয়েছিলো। আর শতাধিক কর্মী জনমের মতো পঙ্গু হয়ে গিয়েছিলো।

বিএনপি তখন ক্ষমতায়। তারেক রহমান আব্দুস সালাম পিন্টু, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাবর– এরাই এ ঘটনার নায়ক। একজন পাকিস্তানিও জড়িত রয়েছে যার মাধ্যমে সম্ভবতো পাকিস্তানের আর্জেস গ্রেনেড তাদের হস্তগত হয়েছিলো। পাকিস্তানের আইএসআই জড়িত থাকা বিচিত্র নয়। ৫২ জন আসামির মাঝে মুফতি হান্নান ও আলী আহাসান মুজাহিদ-এর অন্য মামলায় ফাঁসি হলেও অবশিষ্ট আসামির মাঝে তারেক জিয়াসহ ১৮ জন আসামি পলাতক রয়েছে। এ মামলায় অনেক আসামির ফাঁসির আদেশ হবে বলে ধারণা করা যায়। কারণ এটি একটি জঘন্যতম মামলা।

বিএনপি আগে থেকে গ্রেনেড মেরে প্রতিপক্ষকে খতম করার চেষ্টায় অভ্যস্ত। জিয়াউর রহমান যখন বিএনপি গঠন করেছিলেন তখন খোন্দকার মোস্তাক ডেমোক্রেটিক লীগ গঠন করেছিলেন। উভয়ে আওয়ামী লীগ বিরোধী শক্তি। আওয়ামী বিরোধী শক্তিকে জিয়া তার একক নেতৃত্বে আনার জন্য ডেমোক্রেটিক লীগকে বেআইনি ঘোষণা করছিলেন এবং মোস্তাককে জেলে দিয়েছিলেন।

বিশেষ আদালতে মোস্তাকের বিচার হয়েছিলো তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিলো রাষ্ট্রপতি থাকার সময় বঙ্গভনের কাপ-পিরিচ চুরির অভিযোগে। তিন বছরের জেল আর ১ লাখ টাকা জরিমানা হয়েছিলো। হাইকোর্ট মোস্তাকের দলকে বেআইনি ঘোষণা রহিত করে দিয়েছিলো। মোস্তাকের মুক্তির পর তার দল বায়তুল মোকাররমে জনসভার আয়োজন করলে জিয়ার নিয়োজিত মানুষেরা জনসভার মঞ্চ লক্ষ করে গ্রেনেড মেরেছিলো। লক্ষভ্রষ্ট হয়ে গ্রেনেড নিচে পড়েছিলো। তখনও ১৪ জন লোক মারা গিয়েছিলেন। আর গ্রেনেড লক্ষ্যভ্রষ্ট না হলে মঞ্চে থাকা নেতাদের মৃত্যু হতো।

বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য যে আওয়ামী লীগের বিপরীতে আর একটা গণতান্ত্রিক নিয়ম নৈতিকতা মেনে চলা দল গড়ে ওঠেনি। বিএনপি গড়ে উঠেছিলো পাকিস্তানপন্থী লোকদের সমন্বয়ে। পাকিস্তান ফেরত সামরিক বাহিনীর অফিসারেরাই মূলত এ দলটা গড়ে তুলেছিলেন। জিয়া মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন সত্য কিন্তু নিজের প্রতিষ্ঠার জন্য পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে ফিরে আসা অফিসারদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যেতে তার তেমন কষ্ট হয়নি। সর্বোপরি তার বিরুদ্ধে অভিযোগও ছিল যে জিয়া সাঁকো থেকে পড়ে জুমার গোসল করার মতো মুক্তিযোদ্ধা হয়েছিলেন। যে কারণে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বহু মুক্তিযোদ্ধা অফিসার নিধন করেছিলেন। অথচ তার প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপিই হচ্ছে বাংলাদেশের রাজনীতির দুই মূল দলের মাঝে অন্যতম দল।

তৃতীয় দল হিসাবে এরশাদের দলের অবস্থান রয়েছে। বহুবার ভাঙনের মুখে পড়ে এ দলটার অবস্থা বিপন্ন হয়েছে। এখনও দলটা যে সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্তি হওয়ার পথে নয়। দশম সংসদ নির্বাচনে দলটার ঘুরে দাঁড়ানোর অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিলো। কিন্তু এরশাদের খামখেয়ালী সিদ্ধান্তই দলটাকে উঠতে দিল না।

বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে বহু মামলা। এক মামলায় জেলে গেলেন। সব মামলা থেকে নিষ্কৃতি পেতে হলে এ জীবনে কুলাবে কিনা জানি না। গ্রেনেড হামলায় তারেক জিয়ার দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ডের রায় হলে দুর্যোগ আরও বাড়বে। কারণ বিএনপি হচ্ছে বেগম জিয়া তারেক জিয়া নির্ভর দল। এবং আওয়ামী লীগ যদি আরও পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকে তখন মাতা-পুত্রের দুর্যোগের কারণে দল বিপন্ন হতে বাধ্য হবে।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

সৌজন্যেঃ বাংলা ট্রিবিউন

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত