খালেদা জিয়ার সাজা, আইনজীবীদের ভুল এবং বিএনপির রাজনীতিঃ মোস্তফা কামাল

589

Published on মার্চ 22, 2018
  • Details Image

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে গেছেন। ৮ ফেব্রুয়ারি বিচারিক আদালত দুর্নীতির অভিযোগে খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেন। ওই মামলায় খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমানসহ অন্য আসামিদের ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন। বয়সের কথা বিবেচনা করে খালেদা জিয়ার দণ্ড পাঁচ বছর কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে অর্থদণ্ড বহাল রয়েছে। দণ্ডিত হওয়ার পর থেকে তিনি কারাগারে আছেন।

বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা তাঁর জামিনের জন্য অনেক দৌড়ঝাঁপ করেছেন। ব্যাপক প্রচেষ্টা চালিয়েছেন; কিন্তু জামিন করাতে পারেননি। জামিন আবেদনের ওপর কয়েক দফা শুনানির পর উচ্চ আদালত গত ১৯ মার্চ খালেদা জিয়ার জামিন ৮ মে পর্যন্ত স্থগিত করেছেন। ফলে আপাতত খালেদা জিয়ার মুক্তি নেই।

অনেক আগে থেকেই আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক বলে আসছিলেন, জামিন হলেও খালেদা জিয়া দ্রুতই জেল থেকে মুক্তি পাবেন না। তিনি এও বলেছেন, আইনজীবীদের ভুলের কারণে খালেদা জিয়ার জামিন বিলম্বিত হচ্ছে। এ বিষয়ে তিনি আর বিস্তারিতভাবে কিছু বলেননি।

১৫ মার্চ কালের কণ্ঠে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, খালেদা জিয়ার নামে বেশ কিছু মামলা রয়েছে। তার মধ্যে কয়েকটি মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি হয়েছে। সেগুলোতে আত্মসমর্পণ করানো উচিত ছিল। কিন্তু তা না করায় ফেঁসে গেছেন খালেদা জিয়া।

খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা বলেছেন, খালেদা জিয়াকে আদালতে আত্মসমর্পণ না করানোটা ছিল তাঁদের কৌশল। তবে অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদীন বলেছেন, আইনজীবীদের ভুলে নয়, খালেদা জিয়াকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে আটকে রাখা হচ্ছে।

প্রকাশিত প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা পরিচালনায় খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা বেশ কিছু ভুল করেছেন বলে মামলার নথি ঘেঁটে জানা গেছে। ওই মামলায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয় ১৯ মার্চ ২০১৪ সালে। ফৌজদারি কার্যবিধিতে অভিযোগ গঠনের সময় আসামিকে অব্যাহতি দেওয়ার একটি বিধান রয়েছে। এ জন্য আসামিকে মামলা থেকে অব্যাহতি পেতে আবেদন করতে হয়। কিন্তু খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা আবেদন করেননি।

তা ছাড়া জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিল নামে কোনো তহবিল ছিল না মর্মে খালেদা জিয়ার পক্ষে দাবি করা হয়। তাতে বলা হয়, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট গঠনের জন্যই কুয়েতের আমির টাকাটা অনুদান হিসেবে দিয়েছিলেন। এ জন্য খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা কুয়েত দূতাবাসের একটি সনদ আদালতে দাখিল করেন ২০১৬ সালের ৩ নভেম্বর। দাখিল করা ওই সনদটি ছিল ফটোকপি। তাতে প্রেরকের বা সনদ প্রদানকারীর স্বাক্ষর কিংবা পদবির উল্লেখ নেই। স্মারক নম্বরও নেই। কত টাকা অনুদান দেওয়া হয়েছে তারও উল্লেখ নেই। ফলে সনদটি জাল বলে আদালত উল্লেখ করেন।

আইনজীবীরা আরো একটি বড় ভুল করেছেন খালেদা জিয়ার আত্মপক্ষ সমর্থনমূলক বক্তব্য উপস্থাপনের সময়; যা রায়েও উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১৭ সালের ৯ নভেম্বর তিনি আদালতে যে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন, তাতে বলেছেন, ‘ক্ষমতার অপব্যবহার আমি করেছি।’ এতে খালেদা জিয়ার স্বাক্ষর রয়েছে।

খালেদা জিয়ার আত্মপক্ষ সমর্থনমূলক বক্তব্যটি আইনজীবীদের তৈরি করা। তাঁরা বারবার যাচাই-বাছাই না করে কেন খালেদা জিয়াকে দিয়ে তাঁর লিখিত বক্তব্যে সই করালেন? তার মানে, আইনজীবীদের কাজে শৈথিল্য এবং আন্তরিকতার অভাব ছিল! অথবা আইনজীবীদের গ্রুপিংয়ের কারণে এই কাণ্ড হয়েছে। তা না হলে এত বড় ভুল কিভাবে হলো?

এ বিষয়ে খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেন। এখনো তাঁরা কেন এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিচ্ছেন না বুঝতে পারছি না। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মাহবুবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেছেন, যেসব মামলায় পরোয়ানা জারি হয়েছিল, তাতে আত্মসমর্পণ করে জামিন না নেওয়া বড় ভুল। এই ভুলের খেসারত দিতে হবে অনেক দিন ধরে। খেসারত তো জেলে গিয়ে খালেদা জিয়া দিচ্ছেনই! কিন্তু যাঁরা ভুল করলেন, তাঁদের কী হবে?

ভাবতে অবাক লাগে, বিএনপিতে বাঘা বাঘা আইনজীবী থাকতে খালেদা জিয়ার মামলার এই হাল! কেন আইনজীবীরা মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো আগে থেকে চিহ্নিত করতে পারলেন না। মাঠে-ময়দানে তো তাঁদের গলার আওয়াজ বেশ চড়া দেখেছি। এর মধ্যে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদও আছেন। তাঁকে বিজ্ঞ কৌঁসুলি বলেই জানি। তিনি কোন প্যাঁচ দিলেন তা কে জানে! তাঁর ভূমিকা নিয়েও নানা কথা উঠছে। তাহলে কি বিএনপিপন্থী আইনজীবীরাই চেয়েছিলেন খালেদা জিয়া জেলে যাক!

মামলার সামগ্রিক দিক বিবেচনা করলে এটাই প্রতীয়মান হয় যে খালেদা জিয়া খুব দ্রুতই মুক্ত হতে পারছেন না। কোনো কোনো মহল থেকে বলা হচ্ছে, নির্বাচনের আগে তাঁর মুক্তির সম্ভাবনা ক্ষীণ। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় জামিনের বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। অন্য মামলাগুলোও তাঁকে বেশ ভোগাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বলা যায়, নির্বাচনের রাজনীতি থেকে অনেকটা ছিটকে পড়ার মতো অবস্থা হয়েছে খালেদা জিয়ার। তিনি জেলে থাকার কারণে বিএনপি পরিচালনার দায়িত্ব বর্তেছে তাঁর ছেলে তারেক রহমানের ওপর। কিন্তু দেশে এসে দল পরিচালনার সুযোগ নেই তারেকের। তিনিও দণ্ডিত আসামি।

সরকারি তরফ থেকে বলা হচ্ছে, তারেক দণ্ডিত আসামি। তাই তাঁকে দেশে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ব্রিটিশ সরকারের কর্মকর্তা পর্যায়ে আলোচনাও শুরু হয়েছে। তাঁকে দেশে ফিরিয়ে এনে নিশ্চয়ই বিএনপির নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ দেবে না! তাঁকে কারাগারে যেতে হবে। বিষয়টি নিয়ে বিএনপি নেতৃত্বকে নতুন করে ভাবতে হবে।

বিএনপি যেভাবেই গঠিত হোক, সেটা এখন আর বিবেচ্য নয়। বাস্তবতা হচ্ছে, বিএনপি এখনো দেশের একটি জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল। সারা দেশে দলটির অসংখ্য কর্মী-সমর্থক রয়েছে। তারাই দলটিকে টিকিয়ে রেখেছে। এখন পর্যন্ত বিএনপি ছাড়া কোনো বিকল্প শক্তিও আমরা দেখছি না। আমরা দেখছি, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিপক্ষে এখনো বিএনপিই বড় শক্তি। এ ক্ষেত্রে জাতীয় পার্টি নিজেদের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে দাবি করলেও তাদের জনসমর্থন সীমিত। বিএনপি নির্বাচন বর্জন করলে বেশির ভাগ আসন আওয়ামী লীগই পাবে।

আমরা দেখছি, একসময়ের স্বৈরশাসক জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ বেশ গলাবাজি করছেন। তিনি বলছেন, বিএনপি নির্বাচনে না এলেও কোনো অসুবিধা নেই। তিনি আওয়ামী লীগের বিপক্ষে জাতীয় পার্টিকে ভাবছেন এবং সব আসনে প্রার্থী দেবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। হাস্যকর হলেও তিনি সগর্বে বলছেন, নির্বাচনে জাতীয় পার্টি বিজয়ী হবে। তবে বিএনপি ছাড়া নির্বাচন আন্তর্জাতিক মহলের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্যতা পাবে সেটা তিনি বলছেন না।

২০১৪ সালের নির্বাচনের কথা আমাদের মনে আছে। ওই নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ না করায় আওয়ামী লীগের ১৫৩ জন প্রার্থী বিজয়ী হয়েছিলেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। সরকার গঠন করার মতো আসন আওয়ামী লীগ নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগেই পেয়ে গিয়েছিল। নির্বাচনের জন্য ১৫৩ প্রার্থীকে কানাকড়িও খরচ করতে হয়নি। সেই সংসদ সদস্যদের অনেকেই ফুলে-ফেঁপে মোটাতাজা হয়েছেন। আবারও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে মোচ তাওয়াচ্ছেন তাঁরা। এই সুযোগ কি বিএনপি নেতৃত্ব আওয়ামী লীগকে দেবে? জেনেশুনে তারা কি নিজেদের পায়ে নিজেরা কুড়াল মারবে!

আগেই বলেছি, বিএনপি কোথায়, কিভাবে গঠিত হয়েছে, সেটি বিবেচ্য নয়। এখন এটি গণমানুষের রাজনৈতিক দল এবং গণমানুষের সম্পত্তি। ব্যক্তিবিশেষের নির্দেশে দলটি পরিচালিত হতে পারে না। রাজনৈতিক দল হিসেবে টিকে থাকতে হলে নির্বাচনের রাজনীতিতে আসতে হবে। ২০১৪ সালের মতো আবার নির্বাচন বর্জন করলে বিএনপিকে মুসলিম লীগের মতো পরিণতি বরণ করতে হতে পারে।

কথায় আছে, নিজের ভালো পাগলেও বোঝে। বিএনপি যদি নিজের ভালো না বোঝে, তাহলে কী করার আছে! বিএনপিকে কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলার মতো ধৈর্য ও সাহস অর্জন করতে হবে। ঘাত-প্রতিঘাত, লড়াই-সংগ্রাম ছাড়া কোনো রাজনৈতিক দলের ভিত্তিই মজবুত হয় না।

তৃণমূল পর্যায় থেকে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আওয়ামী লীগও তার দীর্ঘ রাজনৈতিক পথপরিক্রমায় অনেক ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করেছে। অনেক বিপর্যয়ের মধ্যেও মেরুদণ্ড সোজা রেখে পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছে। অসংখ্য নেতাকর্মীর রক্তের বিনিময়ে দলটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছে।

ভারতের দিকে তাকালে আমরা কী দেখতে পাই। ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল কংগ্রেস ভয়াবহ রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। তার পরও মেরুদণ্ড সোজা রেখে পরিস্থিতি মোকাবেলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে দলটি। এর চেয়ে বড় উদাহরণ বিএনপির সামনে আর কী আছে! কংগ্রেসের রাজনীতি থেকেও তো বিএনপি শিক্ষা নিতে পারে।

সৌজন্যেঃ কালের কণ্ঠ

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত