বিশ্ব নেতৃত্বে দেশরত্ন শেখ হাসিনা

1676

Published on জুন 10, 2018
  • Details Image

বিশ্ব নেতৃত্বে সমাসীন দেশরত্ন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। সারা বিশ্বে দেশ ও জাতির কল্যাণে নিবেদিত হয়ে রাষ্ট্রনায়ক যাঁরা বিশ্বে নেতৃত্বেও গৌরবের অধিকারী হয়েছেন তাঁদের অন্যতম দেশরত্ন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। তাঁর সুচিন্তিত পরিকল্পনা ও দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণে জাতিসংঘ ও বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেছে। নিম্ন আয়ের চিহ্নিত আমাদের দেশ এখন পরিণত হয়েছে মধ্যম আয়ের দেশে। সোয়া পাঁচ কোটি মানুষ উন্নীত হয়েছে নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত শ্রেণীতে। জাতীয় প্রবৃদ্ধি বেড়েছে ৭-এর ওপরে। এই প্রবৃদ্ধি অর্জন করে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম স্থান অধিকার করেছে বাংলাদশ। নির্ধারিত সময়ের আগে জাতিসংঘ ঘোষিত এস.ডি.জি. (সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল) অর্জনে বিশ্বে বিপুলভাবে প্রশংসিত বাংলাদেশ। মানুষের মাথাপিছু আয় ১৭৫২ মার্কিন ডলার। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ৮ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ৩৩.৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। সারা বিশ্বের এটি অন্যতম রেকর্ড। বিশ্বব্যাংকের সাহায্য ছাড়াই দ্রুত এগিয়ে চলেছে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ। এগিয়ে চলেছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্রেরও কাজ। দেশকে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সুখী সমৃদ্ধ সোনার বাংলায় পরিণত করতে শেখ হাসিনা গ্রহণ করেছেন ‘ভিশন-২০২১’ ও ‘ভিশন-২০৪১’ যুগান্তকারী কর্মসূচী। ২০১৮ সালের ১২ মে মহাশূন্যে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের উল্লেখযোগ্য ঘটনার মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রবেশ করেছে মহাকাশ বিজ্ঞানের যুগে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অনুধাবন করেছিলেন বহির্বিশ্বের সঙ্গে অব্যাহত যোগাযোগ রক্ষা করতে না পারলে অগ্রগতি ও প্রগতির পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। স্বাধীনতার মাত্র তিন বছরের মাথায় ১৯৭৫ সালের ১৪ জুনে গাজীপুরে বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র স্থাপনে স্বপ্নের যে বীজ বপন করেছিলেন তার সফল বাস্তবায়ন হলো বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের মাধ্যমে। সাফল্যের মাইলফলকে এটি নজিরবিহীন বিরল ইতিহাস। বিশ্বজুড়ে অভিনন্দিত হচ্ছে দেশরত্ন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সাফল্য ও অর্জন। বিশ্বনেতৃত্বে সফল রাষ্ট্রনায়কদের শীর্ষস্থানে অন্যতম আসনের অধিকারী হয়ে শেখ হাসিনা দেশ ও জাতিকে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের বিশ্ব নাগরিক মর্যাদায় করেছেন গৌরবান্বিত।

শেখ হাসিনার জীবদ্দশায় তাঁর সাফল্য ও অর্জন সম্পর্কে আলোকপাত প্রয়োজন। ১৯৪৭ সালের ইংরেজ রাজত্বের সমাপ্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর সেপ্টেম্বর মাসের ২৮ তারিখে গোপালগঞ্জ মহকুমার (বর্তমানে জেলা) টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন শেখ হাসিনা। তিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ কন্যা। শৈশবে পিতার রাজনৈতিক আন্দোলন ও সংগ্রাম নিরলসভাবে প্রত্যক্ষ করেছেন, উপলব্ধি করেছেন ও উজ্জীবিত হয়েছেন। রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হিসেবে দেশের রাজনীতি ও ইতিহাস সম্পর্কে তিনি সচেতন। ছাত্রজীবনে তিনি ছিলেন ইডেন কলেজে ছাত্র সংসদের নির্বাচিত সহ-সভাপতি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি সপরিবারে জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করলে এক অন্ধকার যুগে প্রবেশ করে বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা সে সময় পশ্চিম জার্মানিতে অবস্থান করায় প্রাণে বেঁচে যান। এরপর দীর্ঘ ৬ বছর লন্ডন ও দিল্লীতে চরম প্রতিকূল পরিবেশে তাঁদের নির্বাসিত জীবনযাপন করতে হয়। ১৯৮১ সালের ১৪-১৬ ফেব্রুয়ারি ইডেন হোটেলে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ত্রয়োদশ জাতীয় কাউন্সিল অধিবেশনে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে তাঁকে সর্বসম্মতিক্রমে নির্বাচিত করা হয় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের তৎকালীন নেতৃবৃন্দের এটি ছিল এক দূরদর্শী সিদ্ধান্ত। ১৯৮১ সালের ১৭ মে প্রবল ঝড় ও বৃষ্টিপাতের বৈরী আবহাওয়া সত্ত্বেও তাঁকে স্বাগত জানাতে লাখো মানুষের ঢল নামে ঢাকা কুর্মিটোলা বিমানবন্দরে। সেদিন দেশবাসীর অকৃত্রিম ভালবাসায় সিক্ত হয়ে আবেগ আপ্লুতকণ্ঠে তিনি বলেন, ‘সব হারিয়ে আজ আপনারাই আমার আপনজন।... বাংলার মানুষের পাশে থেকে মুক্তির সংগ্রামে অংশ নেয়ার জন্য আমি এসেছি। আওয়ামী লীগের নেতা হওয়ার জন্য আমি আসিনি। আপনাদের বোন হিসেবে, মেয়ে হিসেবে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে আওয়ামী লীগের একজন কর্মী হিসেবে আমি আপনাদের পাশে থাকতে চাই।’

মানিক মিয়া এ্যাভিনিউর গণসংবর্ধনায় ভাষণদানকালে শেখ হাসিনা বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু ঘোষিত দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচী বাস্তবায়ন ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আমি জীবন উৎসর্গ করে দিতে চাই। আমার আর কিছু চাওয়া পাওয়ার নেই। সব হারিয়ে আমি এসেছি আপনাদের পাশে থেকে বাংলার মানুষের মুক্তির সংগ্রামে অংশ নেয়ার জন্য।’ তাঁর দৃঢ় সংকল্প পিতার অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করে দেশের মানুষের মুখে তিনি হাসি ফোটাবেন। প্রয়োজনে পিতার মতো তিনি জীবন দান করবেন কখনও দেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে আপোস করবেন না। তিনি তাঁর প্রথম কর্তব্য হিসেবে নতুন পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগকে যুগোপযোগী করে গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। সামরিক শাসক জেনারেল এরশাদের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে তাঁর আওয়ামী লীগ অন্য কয়েকটি দলের সঙ্গে জোট গঠন করে সংগ্রামে অংশগ্রহণ করে। ১৯৯০ এর গণআন্দোলনের ধারাবাহিকতায় জেনারেল এরশাদের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান হয়, বিজয় হয় গণতন্ত্রের। ১৯৯৬ সালের ১২ জুন সাধারণ নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ করে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বে ১৪ দলীয় জোট বিজয় অর্জন করে এবং সরকার গঠন করে জনগণের কল্যাণে গ্রহণ করে নানামুখী কর্মসূচী। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি সাধারণ নির্বাচনে বিজয় লাভ করে শাসনক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা সরকার পরিচালনা করছেন। তাঁর দূরদৃষ্টি, বলিষ্ঠ নেতৃত্ব এবং জনকল্যাণমুখী কার্যক্রমে সুশাসন, স্থিতিশীল অর্থনীতি, শিক্ষার প্রসার, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা, ডিজিটাল বাংলাদেশ, নারীর ক্ষমতায়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এসেছে সফলতা।

১৯৮১ সালের ১৭ মে শেখ হাসিনা মাতৃভূমিতে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন কেবল একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে জীবনযাপন করার উদ্দেশে নয়, জাতীয় রাজনীতির হাল ধরতে, জেনারেল এরশাদের স্বৈরাচারী সেনাশাসনের কবল থেকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করতে এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শে ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশকে। দেশের মাটিতে ফিরে আসার পর থেকে শুরু হয় তাঁর নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামী জীবন সাড়ে তিন দশকের অধিক সময় যার পরিধি। তিনি দেশে ফিরে না এলে অবসান হতো না ক্ষমতার মদমত্ততার ও আত্মম্ভরিতার এবং পুনরুদ্ধার হতো না গণতন্ত্র। শেখ হাসিনা আমাদের জন্য প্রতি মুহূর্তে রেখে চলেছেন রাষ্ট্র, সমাজ, দেশ ও বিশ্ব সম্পর্কে তাঁর চিন্তাধারা ও কর্মপরিকল্পনা। বিশ্বনেতৃত্বে বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে শেখ হাসিনা মর্যাদার আসনের অধিকারী। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষিক্ষেত্র, বিদ্যুত উৎপাদন, নারীর ক্ষমতায়ন, রোহিঙ্গা সমস্যা মোকাবেলা ও মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণে সাফল্য অর্জন করেছেন দেশরত্ন শেখ হাসিনা। শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। দেশের অগ্রগতি ও উন্নতির অন্যতম প্রধান শর্ত শিক্ষার প্রসার। দেশরত্ন শেখ হাসিনা জনকল্যাণমুখী নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। তাঁর জনকল্যাণমুখী পদক্ষেপ গ্রহণে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশু শিক্ষার্থীদের ভর্তির হার উন্নীত হয়েছে ৯৯ শতাংশে। স্বপ্লোন্নত দেশগুলোর মধ্যে শিশুশিক্ষা নিশ্চিত কল্পে শিশুদের স্কুলে পাঠানোর ক্ষেত্রে বিশ্বের ১৬টি দেশের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেছে বাংলাদেশ। সাক্ষরতার হার বেড়েছে। বছর শুরুর প্রথম দিনে শিক্ষার্থীদের মাঝে বিনামূল্যে প্রায় ৩৪ কোটি বই বিতরণ একটি অনন্য সাফল্য। উচ্চশিক্ষা বিস্তারে সরকারী ও বেসরকারী পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন এবং মানসম্মত শিক্ষাদানের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। জ্ঞানচর্চা ও শিক্ষা বিকাশে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাট অঙ্গরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ব্রিজ পোর্টের অনারারি ‘ডক্টর অব হিউম্যান লেটার্স’ পদক ২০০০ সালের ৫ সেপ্টেম্বর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রদান করা হয়েছে।

কৃষিপ্রধান দেশ বাংলাদেশ। দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কৃষি তাদের প্রধান জীবিকা। দেশে কৃষিক্ষেত্রে সাধিত হয়েছে বিপ্লব। খাদ্য ঘাটতির দেশ আজ খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। নানা ধরনের ফসল উৎপাদনে এসেছে সাফল্য। সারা বছর ধরে উৎপাদিত হয় নানা ধরনের ফসল। কৃষিক্ষেত্রে ফসল উৎপাদনে সফলতা অর্জনের মধ্যদিয়ে এশিয়ার অন্যতম খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা দেশে রূপান্তরিত হয়েছে বাংলাদেশ। বিগত আড়াই দশকে দারিদ্র্যের হার ৫৭.৬ শতাংশ ২৪.৪ শতাংশে নামিয়ে এনে বাংলাদেশ রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। ২০১৩ সালে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফ.এ.ও) দারিদ্র্য ও অপুষ্টি দূর করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করায় ‘ডিপ্লোমা অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে।

বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবায় অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। বিগত কয়েক বছরে মাতৃ ও নবজাতকের মৃত্যুর হার কমানোর লক্ষ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে বাংলাদেশ। একটি জাতির সামগ্রিক সামাজিক অগ্রগতির অন্যতম সূচক মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু হার। আর্থ সামাজিক উন্নয়নে সুস্থ মা ও সুস্থ শিশুর বিকল্প নেই যা পরোক্ষভাবে ভবিষ্যতের জন্য একটি আত্মমর্যাদাশীল জাতি গঠনে পালন করবে সহায়ক ভূমিকা। ইউনিয়ন পর্যায়ে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণকেন্দ্র ও জেলা পর্যায়ে মা ও শিশু কল্যাণকেন্দ্র মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করে যাচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনের প্রতি দৃষ্টি রেখে নতুন নতুন হাসপাতাল স্থাপন, হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা বৃদ্ধি, গ্রাম পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার জন্য কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নে রাখছে বলিষ্ঠ ভূমিকা। সারাদেশে ১৩ হাজার ৫০০টি কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে তৃণমূলে ৬ কোটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়া হচ্ছে, স্বাস্থ্য, পরিবারকল্যাণ ও পুষ্টিসেবা। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে (এমডিজি) জাতিসংঘ কর্তৃক প্রশংসিত হয়েছে বাংলাদেশের সাফল্য। ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশকে উন্নত দেশের সারিতে অন্তর্ভুক্ত করতে শেখ হাসিনার সরকার সংকল্পবদ্ধ।

বাংলাদেশে বিদ্যুত উৎপাদন ও বিদ্যুত ব্যবহারে সাফল্য অর্জিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বল্প সময়ের মধ্যে সঠিক ও সাহসী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ৩২০০ মেগাওয়ার্ট থেকে ১৬ হাজারের বেশি মেগাওয়াট বিদ্যুত উৎপাদনের ক্ষমতা অর্জন করে বাংলাদেশ বিশ্বে রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। ২০১০ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত সাত বছরে বিদ্যুতের আওতায় আসা মানুষের সংখ্যা বেড়েছে বাংলাদেশে। এই সময়ে প্রতি বছর প্রায় সাড়ে তিন শতাংশ বেড়েছে বিদ্যুতের গ্রাহক। যা আগের যে কোন সময়ের তুলনায় সবচেয়ে বেশি। এতে বিশ্বে দ্রুত বিদ্যুত সংযোগ প্রদানকারী ২০টি দেশের তালিকায় স্থান পেয়েছে বাংলাদেশের নাম। গত সাত বছরে প্রথমবারের মতো দেশের প্রায় ২৫ শতাংশ মানুষের পরিবার বিদ্যুতের আলোয় হয়েছে আলোকিত। ২০১৬ সালের শেষে বিদ্যুত সংযোগ পেয়েছে দেশের ৭৬ শতাংশ মানুষ। বর্তমানে বিদ্যুতের সংযোগ রয়েছে দেশের ৯০ ভাগ মানুষের ঘরে। ২০০৯ সাল থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে বিদ্যুত সংযোগ দেওয়া হয়েছে নতুন এক কোটি ৭৯ লাখ গ্রাহককে। ২০০৯ সালে সারাদেশে বিদ্যুত পেত এক কোটি আট লাখ গ্রাহক যা ২০১৮ সালে এসে বেড়েছে দুই কোটি ৮৭ লাখ। দেশের প্রায় ৯ শতাংশ মানুষ অফ-গ্রিড বিদ্যুত সংযোগ তথা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সৌর বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল বিশ্বে যা সর্বোচ্চ।

নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষার প্রচার ও প্রসার, কৃষিক্ষেত্রে ও স্বাস্থ্যসেবায় বিশ্বে রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে বাংলাদেশ। নারী শিক্ষা ও নারী উদ্যোক্তাদের অগ্রগতি অর্জনের স্বীকৃতি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বেসরকারী প্রতিষ্ঠান ’গ্লোবাল সামিট অব উইমেন’ এর পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে প্রদান করা হয়েছে ’গ্লোবাল উইমেন্স লিডারশিপ’ এ্যাওয়ার্ড। জাতিসংঘে অনুষ্ঠিত সাধারণ পরিষদের সভায় নারীর ক্ষমতায়নের জন্য ’প্ল্যানেট ৫০-৫০ চ্যাম্পিয়ন’ এবং ‘এজেন্ট অব চেঞ্জ এ্যাওয়ার্ড’ নামক দুই গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার প্রদানে অভিষিক্ত করা হয়েছে শেখ হাসিনাকে। নারীর ক্ষমতায়ন ও নারীর শিক্ষার প্রতি অঙ্গীকারের জন্য ২০১৪ সালে তিনি ইউনেস্কোর ’পিস ট্রি’ পুরস্কার অর্জন করেছেন। গ্রামীণ নারী, নারী উদ্যোক্তা মেয়েদের শিক্ষাব্যবস্থা, চাকরিতে নারীর অধিকার, রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি প্রভৃতি ক্ষেত্রে সাফল্যের নমুনা দেখিয়ে চলেছেন শেখ হাসিনা। সরকারের গৃহীত ব্যবস্থায় এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংক এবং বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বিশেষ সুবিধাযুক্ত ১০% সুদে ঋণ পাচ্ছে নারী উদ্যোক্তাগণ। চাকরিতে মেয়েদের কোটা ১০% শতাংশ নির্ধারণ করায় ৩৪ শতাংশ নারীর হয়েছে কর্মসংস্থান।

নারীর সম্পত্তিতে সমান অধিকার ও ব্যবসায়ে সমান সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে ২০১১ সালে সরকার জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি অনুমোদন করেছে। এতে নারীদের সম্পদের ওপর সমান অধিকার এবং ব্যবসায়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ সমাজের উন্নতির অন্তরায়। এই সামাজিক ব্যাধি নিরসনে সরকারের সীমাহীন প্রচেষ্টা এম. ডি. জি. অর্জনে পালন করেছে সহায়ক ভূমিকা। এখন মেয়েদের বিবাহের সর্বনিম্ন বয়স ১৮ বছর। জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে বাল্যবিবাহের কুফল প্রচারের কারণে নিজেদের মেয়েদের সম্পর্কে অভিভাবকগণ সজাগ রয়েছেন। সংশোধিত হয়েছে বাল্যবিবাহ ১৯২৯ আইন এবং বাল্যবিবাহ সম্পূর্ণ নির্মূলের জন্য সরকার অঙ্গীকারাবদ্ধ। মেয়েদের শিক্ষা গ্রহণের ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করেছেন শেখ হাসিনা। মেয়েদের বৃত্তি প্রদান, গ্রামাঞ্চলে ছাত্রীদের শিক্ষা খরচ অব্যাহতি, মাধ্যমিক পর্যায়ে ছাত্রীদের উপবৃত্তি প্রদান এবং নারীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে ৮ম স্থানে অবস্থান বাংলাদেশের।

আউং সান সূচির প্রচ্ছন্ন মদদে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ভাগ্যলাঞ্ছিত বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে বাস্তুচ্যুত করেছে। নির্বিচার গণহত্যা, ধর্ষণ ও জাতিগত বিলুপ্তির মুখে রোহিঙ্গারা আশ্রয় গ্রহণ করেছে বাংলাদেশে। নথিপত্রে এদের সংখ্যা ১১ লাখ বলা হলেও এই সংখ্যা বাস্তবে অনেক বেশি। মিয়ানমারের দুর্দশাগ্রস্ত রোহিঙ্গা শরণার্থীরা এক বিরাট চাপের সৃষ্টি করেছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। সামাজিক নিরাপত্তাসহ নানা ধরনের জটিল সমস্যাও যুক্ত হচ্ছে এর সঙ্গে। পরিবেশেরও ঘটছে অবনতি। এত সমস্যা সত্ত্বেও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুধু মানবিক কারণে বিপুলসংখ্যক অসহায় মানবগোষ্ঠী রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছেন বাংলাদেশে। তাঁর এই মহানুভবতা নির্যাতিত অসহায় মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসার নিদর্শন। এই মানবিকতা ও মহানুভবতার জন্য তিনি নন্দিত হয়েছেন এবং তাঁর মর্যাদাও বৃদ্ধি পেয়েছে বিশ্বে। ২০১৭ সালের ২ আগস্টের পর রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আসার পর থেকে এই মানবিক সমস্যা সারা বিশ্বে আলোড়ন তুলেছে। নানাবিধ জটিল সমস্যা সত্ত্বেও ভাগ্যলাঞ্ছিত প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় প্রদান করে দুস্থ মানবতার পাশে দাঁড়িয়েছেন শেখ হাসিনা। পৃথিবীতে মানবিকতার এক অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন তিনি। নির্যাতিত অসহায় রোহিঙ্গাদের প্রতি মানবিক ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘মেডেল অব ডিসটিংশন’ পুরস্কারে সম্মানিত করেছে লায়ন্স ক্লাব অব ইন্টারন্যাশনাল। ব্রিটিশ গণমাধ্যম ও পৃথিবীর অন্যান্য দেশের গণমাধ্যম তাঁকে ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ উপাধিতে ভূষিত করেছে। দুর্দশাগ্রস্ত রোহিঙ্গাদের প্রতি বিশ্ব জনমত গঠনে বাংলাদেশের প্রয়াসে সহমর্মিতা প্রকাশ করেছে রাশিয়া, চীন, ভারতসহ বিভিন্ন দেশ। রোহিঙ্গাদের তাদের দেশে ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের ওপর কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ এবং বিশ্ব জনমত গঠনের দায়িত্ব সুচারুভাবে পালন করছে বাংলাদেশ।

শেখ হাসিনার সফল নেতৃত্বের গৌরবময় অর্জন মহাকাশে ভূউপগ্রহ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় বিশেষ করে বন্যা, ঝড় বা সিডরের মতো পরিস্থিতি মোকাবেলায় কিংবা ভূমিকম্প পরিস্থিতিতে ত্রাণ ও উদ্ধারকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে পালন করবে যুগান্তকারী ভূমিকা। প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাস ও দুর্যোগ মোকাবেলার ক্ষেত্রে বন্যা, ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের গতিবিধি সম্পর্কে অভাবনীয় সুযোগ সৃষ্টি করেছে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের সফল উৎক্ষেপণের মাধ্যমে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে গেছে বাংলাদেশ। এই স্যাটেলাইটের দ্বারা পাওয়া যাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগের আগাম পূর্বাভাস। সুযোগ পাওয়া যাবে দুর্যোগ মোকাবেলা ও প্রস্তুতি গ্রহণের। ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনাও সম্ভব হবে। দুর্যোগ মোকাবেলায় সক্ষমতা অর্জনের ক্ষেত্রেও রোল মডেল হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বে পরিচিত। মহাকাশ বিজ্ঞানের যুগে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের প্রথম যোগাযোগ ভূউপগ্রহ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে ২০১৮ সালের ১১ মে সফলভাবে উৎক্ষেপণের ১০ দিন পর এটি পৌঁছেছে তার নিজস্ব অবস্থানে এবং কাজ শুরু করেছে স্বাভাবিকভাবে। বেশকিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানোর পর তিন মাসের মধ্যে স্যাটেলাইটটি যাবে বাণিজ্যিক অপারেশনে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণে বিশ্বে ৫৩তম ও দক্ষিণ এশিয়ায় চতুর্থ দেশ বাংলাদেশ। ডিজিটাল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অগ্রগতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সম্প্রচার সেবা, আবহাওয়া পূর্বাভাস ও দুর্গম এলাকায় উচ্চগতিসম্পন্ন ইন্টারনেট সংযোগ বাংলাদেশের জন্য এক বিরাট অর্জন। বাংলাদেশ সরকার বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ব্যবস্থাপনার জন্য রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাংলাদেশ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (বিসিএসসিএল) নামে গঠন করেছে একটি কোম্পানি।

মহাশূন্যে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশের অব্যাহত অগ্রযাত্রার ধারাবাহিকতায় আজকে যোগ হলো আরও একটি মাইলফলক। আজ আমরা মহাকাশে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করলাম। জাতির এই গৌরবময় দিনে আমি দেশবাসীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাচ্ছি। আমি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। স্মরণ করছি মহান মুক্তিযুদ্ধের ত্রিশ লাখ শহীদ, দুই লাখ সম্ভ্রম হারানো মা-বোনকে।’

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট মহাকাশে উৎক্ষেপণের পর নিয়মিত বার্তা ও ইমেজ পাঠাতে শুরু করেছে। এই বার্তা ও ইমেজ ধারণ করা হচ্ছে। আর এখান থেকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনার কাজও চলছে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের। স্যাটেলাইট নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ফ্রান্সের থ্যালাস এ্যালেনিয়ার সঙ্গে এই স্যাটেলাইট নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনার কাজ করছেন বাংলাদেশের ২২ জন তরুণ প্রকৌশলী। বিটিআরসির সঙ্গে ফ্রান্সের থ্যালাস এ্যালেনিয়ার প্রকৌশলীদের তিন বছরের চুক্তি রয়েছে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের জন্য। তবে মূল কাজ করছে বাংলাদেশের প্রকৌশলীরাই। তারা স্যাটেলাইট থেকে পাঠানো সব ধরনের বার্তা, সংকেত ও ইমেজ রিসিভ করছেন। বাণিজ্যিক অবস্থায় না এলেও শুরু হয়েছে বাণিজ্যিক বিপণনের কাজ। বছরে পাঁচ কোটি মার্কিন ডলার আয়ের টার্গেট নিয়ে ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, ফিলিপিন্স, ইন্দোনেশিয়া, আফগানিস্তান, তাজিকিস্তান, কাজাকিস্তান এবং উজবেকিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগ করছে বাংলাদেশে গঠিত বিসিএসসিএল কোম্পানি।

দেশ ও জাতির কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ দেশরত্ন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা রাষ্ট্র পরিচালনায় সাফল্য অর্জন করে বিশ্বনেতৃত্বে মর্যাদার অন্যতম আসনের অধিকারী হয়েছেন।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও গবেষক

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত