বাংলার নারীর অগ্রযাত্রায় অবাক বিশ্ব

5361

Published on আগস্ট 2, 2018
  • Details Image

এক দশক আগে নিজের জমানো ১০ হাজার টাকা দিয়ে মিরপুর থেকে গজ কাপড় কিনে মেয়েদের জামা তৈরির কাজ শুরু করেছিলেন যশোরের আনোয়ারা শিউলি। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে স্বপ্নচারী শিউলি এখন বাংলাদেশে এক সফল উদ্যোক্তা, দেশের নামকরা শাওন ক্রাফটের স্বত্বাধিকারী। চ্যানেল আই সম্মাননা, নারী উদ্যোক্তা সম্মাননাসহ শিউলির ঝুলিতে যোগ হয়েছে কাজের অসংখ্য স্বীকৃতি। নিজেদের মেধা আর যোগ্যতায় গত ১০ বছরে দেশের নারীরা এগিয়েছে বহুদূর। এর সাম্প্রতিকতম উদাহরণ—ফাইনালে ভারতকে হারিয়ে এশিয়ান কাপ জয় করে বাংলাদেশ জাতীয় নারী ক্রিকেট টিম।

গত এক দশকে বাংলাদেশের নারীদের এগিয়ে চলার স্বীকৃতি মিলেছে বৈশ্বিক নানা সংস্থায়। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম সম্প্রতি বাংলাদেশ সফরে এসে নারীদের অগ্রযাত্রায় রীতিমতো অভিভূত। তাঁর মতে, ‘কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ যেভাবে বাড়ছে, এ ধারা অব্যাহত রাখতে পারলে আগামী এক দশকে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ ৮০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে এবং জিডিপির প্রবৃদ্ধি প্রায় ২ শতাংশ বাড়বে।’

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, কর্মক্ষেত্রে নারীর মজুরি বাড়ার পাশাপাশি অংশগ্রহণও বাড়ছে। নারীদের গড় আয়ুও পুরুষের তুলনায় বাড়ছে। বিবিএসের দেওয়া তথ্য মতে, কৃষি খাতে পাঁচ বছর আগে একজন নারীর দৈনিক মজুরি ছিল মাত্র ১৯৫ টাকা। সেটি এখন ২৭০ টাকা। পাঁচ বছর আগেও দেশে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ ছিল এক কোটি ৬০ লাখ। সেটি বেড়ে এখন এক কোটি ৮৩ লাখ। বিবিএসের তথ্য বলছে, পাঁচ বছর আগে একজন নারীর গড় আয়ু যেখানে ছিল ৭০ বছর, এখন সেখানে নারীর গড় আয়ু ৭৩ বছর। ব্যাংক-বীমা খাতে যোগ হয়েছে দেড় লাখ নারী। সেবা ও শিল্প খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রধান নির্বাহী ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে পাঁচ থেকে সাত হাজার নারী কাজ করছে। নারীদের এই অগ্রযাত্রার পেছনে কী কাজ করেছে—জানতে চাইলে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক নাজনীন আহমেদ বলেন, মেয়েদের বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ করে দেওয়া নারী অগ্রযাত্রায় বড় ধরনের কাজ করেছে। আরেকটি বড় কাজ করেছে এনজিওর মাধ্যমে নারীদের হাতে প্রচুর টাকা-পয়সা প্রাপ্তি। সুযোগটা নারীরা ভালোভাবে কাজে লাগিয়েছে। নাজনীন আহমেদ মনে করেন, নারীদের এগিয়ে যাওয়ার আরেকটি বড় কারণ তথ্য-প্রযুক্তির বিকাশ ও অনলাইনভিত্তিক ব্যবসার সুযোগ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ শ্রমশক্তির জরিপ বলছে, ২০১০ সালে পরিবারভিত্তিক বিনা বেতনে কাজ করত ৯১ লাখ নারী। সেটি এখন কমে দাঁড়িয়েছে ৮৪ লাখে। জরিপের তথ্য বলছে, দেশে এখন কর্মজীবী মানুষের সংখ্যা ছয় কোটি ১৪ লাখ। এর মধ্যে পুরুষ চার কোটি ৩১ লাখ আর নারী এক কোটি ৮৩ লাখ।

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের প্রতিবেদনেও বাংলাদেশের নারীদের এগিয়ে যাওয়ার স্বীকৃতি মিলেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে নারী-পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠায় গত এক দশকে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সবার ওপরেই রয়েছে। বৈশ্বিক লিঙ্গ বিভাজন সূচকে ১৪৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৪৭তম। আগের বছর ছিল ৭২তম অবস্থানে। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নেও শীর্ষ দেশগুলোর তালিকায় উঠে এসেছে বাংলাদেশ। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৪টি দেশের মধ্যে সপ্তম। নারীদের অগ্রযাত্রায় বাজেটেও এর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নারীর অগ্রযাত্রায় তাদের জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে বাজেটে।

বাংলাদেশে এখন প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, জাতীয় সংসদের স্পিকার নারী। কবিতা খানম দেশে প্রথমবারের মতো নারী নির্বাচন কমিশনার হয়েছেন এই সরকারের আমলে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ফারজানা ইসলাম) নারী। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন থেকে জাতীয় সংসদ পর্যন্ত নারীর সরব উপস্থিতি। বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ এভারেস্ট জয় করেছেন এ দেশের নারীরা। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে, বিমানবাহিনীতে আছেন নারী। মহাসড়কে পাজেরো গাড়ি এবং রেলপথে ট্রেন চালাচ্ছেন নারী। সরকারি চাকরি থেকে শুরু করে রাজনীতির অঙ্গন, সরকারের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে বাড়ছে নারীর অংশগ্রহণ। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ব্যাংক-বীমা, করপোরেট হাউস, সংবাদমাধ্যম সর্বত্রই নারীর উজ্জ্বল উপস্থিতি। এখন বিমানবাহিনীতে নারী প্যারাট্রুপারও রয়েছেন। যুদ্ধবিমানও ওড়াচ্ছেন নারী পাইলট। প্রথমবারের মতো সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবিতেও যোগ হয়েছে নারী ব্যাটালিয়ন। প্রশাসনে এখন সাতজন নারী সচিব আছেন।

জানতে চাইলে প্রবাসী কল্যাণ সচিব নমিতা হালদার কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রশাসনে নারীরা গত এক দশকে অনেক এগিয়েছে। এখন সাতজন সচিব আছেন নারী। অনেক জেলার জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আছেন নারী। প্রত্যেকে তাঁদের মেধা ও যোগ্যতা দিয়ে এ পর্যায়ে এসেছেন। একসময় মেয়েরা ছেলেদের মতো সুযোগ-সুবিধা পেত না। যোগাযোগব্যবস্থা ছিল খুবই খারাপ। গত এক দশক পরিবারগুলোর আর্থিক সক্ষমতাও বেড়েছে। অভিভাবকরা মেয়েদের পড়াতে পারছে। এসব কারণে নারীরা দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। তবে নারীদের আরো এগিয়ে যাওয়া উচিত। পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইর দেওয়া তথ্য মতে, তাদের পোশাক কারখানাগুলোতে এখন ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করে। তার মধ্যে ৮০ শতাংশই (৩২ লাখ) নারী। নারীদের হাতের ওপর ভর করেই পোশাক খাত এখন রপ্তানি পণ্যে ১ নম্বর অবস্থানে।

বিবিএসের কর্মকর্তারা বলছেন, নারীরা এখন অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। তাদের বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, একজন নারী পুরুষের চেয়ে তিন গুণ বেশি কাজ করে। এর মধ্যে রয়েছে সন্তান লালন-পালন, দৈনন্দিন বাজার, সন্তানদের পড়াশোনার পেছনে সময় দেওয়া এবং গৃহস্থালির কাজ। এসব কাজের স্বীকৃতি অর্থনীতিতে যোগ হচ্ছে না। গবেষণা সংস্থা সিপিডির এক গবেষণায় দেখা গেছে, একজন নারী তার ঘরে অবস্থান করে দৈনন্দিন যেসব কাজ করে, সেসব কাজের প্রাক্কলিত বার্ষিক মূল্য ২০১৩-১৪ অর্থবছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধির ৭৭ শতাংশের সমপরিমাণ। কিন্তু অর্থনীতিতে এ অর্থ যোগ হয় না। যদিও নারীরা তাদের গৃহস্থালির কাজ অর্থনীতিতে যোগ করতে কয়েক বছর ধরে দাবি জানিয়ে আসছে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, দেশের কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ এখন ৩৪ শতাংশ। এটিকে ৮২ শতাংশে উন্নীত করতে পারলে জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাড়বে ১.৮ শতাংশ। তবে নারীদের কর্মক্ষেত্রে আনতে হলে তাদের জন্য কাজের পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে।

সৌজন্যেঃ কালের কণ্ঠ

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত