তাজউদ্দীন আহমদের অর্ন্তদৃষ্টি

1560

Published on জুলাই 23, 2019
  • Details Image

বাহরাম খানঃ

পৃথিবীর আর কোন সরকার প্রধানকে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য প্রধানমন্ত্রী হতে হয়েছে জানা নেই। বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে সেই বন্ধুর পথে হাঁটতে হয়েছিল। স্বাধীনতা ঘোষণার ঠিক পরপরই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বন্দি করে পাকিস্তানি জান্তা। তাঁর ডাকে শুরু হওয়া মুক্তিযুদ্ধে জাতি তখন নেতৃত্বহারা। মহাসংকটে তাজউদ্দীন আহমদ যে অকল্পনীয় যোগ্যতায় স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতৃত্ব দেন তা চিন্তায় আনলে গা শিউড়ে উঠে। তাজউদ্দীন আহমদকে শুধু পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে লড়তে হয়নি। যুদ্ধ পরিচালনার নেতৃত্ব ও কৌশল নির্ধারণে নিজ দলের বিরোধীদের ছুড়ে দেওয়া চ্যালেঞ্জ সামলাতে হয়েছে। যারা প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনকে হত্যা করতে ঘাতক পর্যন্ত পাঠিয়েছিল।

অর্ন্তদৃষ্টি

মুক্তিযুদ্ধে তাজউদ্দীন আহমদের বহুমাত্রিক নেতৃত্বের ঝলক দেখা যায়। সেই ক্যানভাস অনেক বড়। আজ তাঁর জন্মদিনে ব্যক্তি তাজউদ্দীনের কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করে শ্রদ্ধা জানাতে চাই। ঘটনাটি ১৯৫০ সালের- সদ্য স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের সরকারি কর্মকর্তা শাসসুর রহমান খান জনসন তাজউদ্দীন আহমদকে বললেন, আপনারা তো রাজনীতিবিদ। আমি চাকরি নিয়েছি, নিশ্চয় আমাদেরকে আর ভালো চোখে দেখবেন না। জবাবে তাজউদ্দীন আহমদ বলেছিলেন- ঠিক আছে, অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন, দরকার আছে। কর্মকর্তা বললেন, কী ব্যাপারে প্রয়োজন? তাজউদ্দীন জবাব দিলেন, দেশ স্বাধীন হলে আপনারা তখন কাজে আসবেন। ওই কর্মকর্তা বললেন, দেশ তো স্বাধীন হয়েছে। তাজউদ্দীন বললেন- এই দেশ না, আমাদের দেশ হবে, পাকিস্তানের সঙ্গে আমরা থাকতে পারবো না। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ২১ বছর আগে এই ছিল তাজউদ্দীন আহমদের অর্ন্তদৃষ্টি।

ঘরে-বাইরে যুদ্ধ

মুক্তিযোদ্ধারা মাঠে যুদ্ধ করেছেন, তাজউদ্দীন আহমদের যুদ্ধ ছিল ঘরে-বাইরে দুই জায়গাতেই। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর তার সরকারের সব মন্ত্রী দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত পারিবারিক জীবন-যাপন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তাজউদ্দীন আহমদ তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর অফিস ছিল ছোট তেমন বড় ছিল না। তার পাশেই আরও ছোট একটি রুমে তিনি থাকতেন। খাবার আসতো পাশের মেস থেকে। একদিন জোহরা তাজউদ্দীন বাসা থেকে ঘন ঘন খবর পাঠাচ্ছিলেন, এক বছর বয়সী সোহেল তাজ খুব অসুস্থ। তারপরও তাজউদ্দীন বাসায় যাননি। বাঙালি অফিসাররা জানতেন তাজউদ্দীন ব্যক্তিগত কাজে বাসায় যাবেন না। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ভারতীয় এক অফিসার বলেছিলেন, আপনার শিশু বাচ্চাটা অসুস্থ, এত খবর দেওয়ার পরও বাসায় গেলেন না স্যার! তাজউদ্দীনের জবাব জবাব ছিল এরকম- আমার দেশের কত মানুষ বনে-জঙ্গলে থেকে যুদ্ধ করছে। পরিবার নিয়ে অসহায় অবস্থায় ঘুরছে। আমি প্রধানমন্ত্রী হয়ে তাদের জন্য কিছুই করতে পারছি না। আমার পরিবার তো নিরাপদে কলকাতায় আছে।

ঈর্ষার ঊর্ধ্বে

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ তাজউদ্দীন আহমদ ভারতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাসা ছেড়ে বের হয়ে যান। জোহরা তাজউদ্দীন তার সন্তানদেরকে নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে বের হয়ে ধানমণ্ডিতে এক সরকারি কর্মকর্তার বাসায় আশ্রয় নেন। রাতে ওই কর্মকর্তা বাসায় ফিরে তাজউদ্দীন পরিবারকে আশ্রয় দেওয়া নিরাপদ মনে না করে কূটচালের আশ্রয় নেন। জোহরা তাজউদ্দীনকে বললেন, আপনাদেরকে আরও ভাল জায়গায় রেখে আসি, আশ্বস্ত হয়ে তাজউদ্দীন পরিবার ওই কর্মকর্তার সঙ্গে রওনা হন। বাসা থেকে বের হওয়ার পরপরই কর্মকর্তাটি বলেন, বাসায় ভুলে কিছু একটা ফেলে এসেছি, আপনারা থাকেন, এখনি আসছি। এই কথা বলে বাসার ভেতরে গিয়ে গেট লাগিয়ে দেন। অনেক্ষণ দরজায় নক করার পরও ভেতর থেকে সাড়া না পেয়ে পুরো রাতটি রাস্তার উপর ইটের স্তুপের আড়ালে কাটাতে হয় তাজউদ্দীন পরিবারকে।ওই অফিসারের পদোন্নতির ফাইল এসেছিল বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভায় অর্থমন্ত্রী থাকা তাজউদ্দীনের হাতে। স্ত্রী জোহরা তাজউদ্দীনকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, সেই অফিসারের পদোন্নতির ফাইল এসেছে, তোমার কী পরামর্শ? তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, এটা আপনার অফিসের বিষয়, এখানে আমার কোনো মতামত নেই। তাজউদ্দীন আহমদ ওই অফিসারকে পদোন্নতির সুপারিশ করেছিলেন।

চিন্তার গভীরতা

১৯৬৬ সালে ছয় দফা নিয়ে প্রকাশ্য বিতর্ক করতে ভুট্টো শেখ মুজিবকে চ্যালেঞ্জ জানালে মুজিব সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন। মুজিব যে ভুট্টোর চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছেন একথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানোর জন্য ভুট্টোর কাছে গেলেন তাজউদ্দীন আহমদ। তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে কথা বলেই ভুট্টো গম্ভীর হয়ে গেলেন। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী লিখেছেন, ‘আমরা পরে কনভেনশন মুসলিম লীগের নেতাদের কাছে শুনেছি, তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে আলাপের পর ভুট্টো মন্তব্য করেছেন, হি ইজ ভেরি থরো। শেখের যোগ্য লেফটেন্যান্ট আছে দেখছি।’ এরপর সব আয়োজন প্রায় সম্পন্ন হলেও মুজিব পর্যন্ত আসার সাহস ভুট্টো দেখাতে পারেননি। কারণ তাজউদ্দীনের সঙ্গে কথা বলার পরই তিনি গোপনে পূর্ববাংলা ত্যাগ করে তিনি পাকিস্তান চলে গিয়েছিলেন।

আত্মবিশ্বাস

পৃথিবীর বৃহত্তম এনজিও ব্র্যাক-এর প্রতিষ্ঠাতা ফজলে হাসান আবেদ তার ‘ফজলে হাসান আবেদ ও ব্র্যাক’বইয়ে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনের আত্মসম্মান বোধের একটি ঘটনার কথা বলেছেন। আবেদ তখন বৃটেনে থাকেন। তারা কয়েকজন মিলে টাকা যোগার করে একটি যোদ্ধা গ্রুপকে ভাড়া করলেন, যারা বাংলাদেশের হয়ে পাকিস্তানের বিভিন্ন জাহাজে নাশকতা চালাবেন (আন্তর্জাতিকভাবে এমন বিভিন্ন গ্রুপ পাওয়া যায়)। সব কিছু ঠিক করে তারা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে কলকাতায় গেলেন। তাজউদ্দীন তাতে রাজি হলেন না। তিনি ভাড়াটে মানুষকে দিয়ে যুদ্ধ করাতে চাননি। বরং সেই টাকা সরকারের কোষাগারে জমা রাখতে বলেছিলেন, তারাও সেটা মেনে নিয়েছিলেন।

প্রসঙ্গ স্বজনপ্রীতি

স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন সময়েই সেনাবাহিনীতে একটি ব্যাচের কমিশনিং হয়। বঙ্গবন্ধুর সন্তান শেখ কামাল ওই ব্যাচে ছিলেন। কমিশনিং অনুষ্ঠানের সময় প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের কাছে এসে শেখ কামাল স্যালুট দিয়ে ‘কাকা’ সম্বোধন করে ব্যক্তিগত খবর জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী শেখ কামালকে বলেন, পেশাগত আচরণ প্রত্যাশা করি। সঙ্গে সঙ্গে শেখ কামাল আবারও স্যালুট করে, ‘স্যার দুঃখিত’ বলে নিজ অবস্থানে চলে যান। অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতা শেষে তাজউদ্দীন আহমদ শেখ কামালকে খবর দিয়ে নিজের কাছে ডেকে জড়িয়ে ধরে বঙ্গবন্ধুর কথা বলতে বলতে শিশুর মতো কেঁদে উঠেন, পরক্ষণেই সামলে ওঠে শেখ কামালকে যুদ্ধের অনুপ্রেরণা দিয়ে বিদায় দেন।

১৯২৫ সালের ২৩ জুলাই জন্ম নিয়েছিলেন বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমদ। বেঁচে থাকলে আজ তিনি ৯৫ বছরে পা রাখতেন। জন্মদিনে স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী মহান এই নেতার প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি।

লেখক : সাংবাদিক, সদস্য তাজউদ্দীন আহমদ পাঠচক্র।

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত