করোনা সচেতনতা

787

Published on মার্চ 23, 2020
  • Details Image

মো. আবুল কালাম আজাদ

 বাংলাদেশে করোনাভাইরাস মোকাবিলায় সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে। এ পর্যন্ত দুজন প্রাণ হারালেও আক্রান্তের সংখ্যা ও প্রাণহানি এখনো নিয়ন্ত্রণাধীন। দেশে করোনাভাইরাসে গত শুক্রবার পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও তিনজন আক্রান্ত হয়েছেন। এ নিয়ে দেশে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২০-এ। গত শুক্রবার পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় আইসোলেশনে রাখা হয়েছে ৩০ জনকে। ওই সময় যাদের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে, তার মধ্যে তিনজন নতুন করে আক্রান্ত। এর মধ্যে একজন নারী, দুজন পুরুষ। নারীর বয়স ৩০ বছর। পুরুষ একজনের বয়স ৩০। আরেকজনের ৭০ বছর, তিনি আইসিইউতে আছেন জটিল অবস্থায়। আগে থেকেই তিনি অন্যান্য দুরারোগ্য ব্যাধিতে ভুগছিলেন। আক্রান্তের মধ্যে একজন ইতালিফেরত, অন্য দুজন প্রবাসীর সংস্পর্শে থেকে আক্রান্ত হয়েছেন। এখন পর্যন্ত দেশে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে আছেন ৪৪ জন। হোম কোয়ারেন্টাইনে আছেন ৫ হাজারের বেশি। বিমানবন্দর, নৌবন্দর, স্থলবন্দর সতর্ক, হাসপাতাল ও চিকিৎসকরা প্রস্তুত। মিডিয়া যথার্থ ভূমিকা পালন করছে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন জনসমাগম এড়িয়ে চলতে। মুজিববর্ষসহ সব বড় অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে। আমাদের দেশে করোনা পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণে থাকলেও বিশ্ব পরিস্থিতি কিন্তু তেমনটা নয়। বিশ্বজুড়ে গত শুক্রবার পর্যন্ত করোনাভাইরাসে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ১৮৭-এ। শুক্রবার পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় মারা গেছেন ১ হাজার ২১০ জন। ওই সময়ে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ২৯ হাজার ৪৯০ জন। মোট আক্রান্তের সংখ্যা ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯৩৬। সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থায় থাকা ইতালিতে নতুন করে মারা গেছেন ১৩ ডাক্তারসহ ৬২৭ জন। ইতালির সর্বশেষ পরিস্থিতি অনুযায়ী দেশটি নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণে এখন মৃত্যুপুরী। এখানে প্রথম মৃত্যু ঘটেছিল গত ২১ ফেব্রুয়ারি, তখন চীনে মৃতের সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৩০০-এর বেশি। তবে চীনে ক্রমান্বয়ে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটলেও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে ইতালি। প্রথম মৃত্যুর এক মাস না গড়ানোর আগেই দেশটিতে মৃতের সংখ্যা ছাপিয়ে গেছে চীনকে। অথচ ইতালিতে প্রথম মৃত্যু ঘটেছিল চীনে মৃত্যুর দেড় মাসের বেশি সময় পর। শুরুতে চীনে মৃতের সংখ্যা হু হু করে বাড়তে থাকলেও মাস দুয়েকের মধ্যে তারা পরিস্থিতি সামলে নিতে পেরেছে। যে হুবেই প্রদেশ থেকে এ ভাইরাসের প্রথম সংক্রমণ ঘটেছিল বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে, সেখানে এখন আর কোনো নতুন রোগী পাওয়া যাচ্ছে না। জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস ১৯ মার্চ এক ভিডিও কনফারেন্সে সাংবাদিকদের বলেছেন, বিশ্বব্যাপী সমন্বিত পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে ভাইরাসটির বিস্তার ঠেকানো না গেলে তা দুনিয়াজুড়ে লাখ লাখ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিতে পারে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘আমরা যদি ভাইরাসটিকে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়তে দিই, বিশেষত বিশ্বের সবচেয়ে দুর্বল অঞ্চলগুলোয়; তাহলে এটি লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করবে।’ গুতেরেস বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী সংহতি কেবল নৈতিক কারণেই নয়, এটি সবার স্বার্থে প্রয়োজন।’ প্রতি মুহূর্তেই অক্রান্ত মানুষ ও দেশের সংখ্যা বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। অনেক দেশ জরুরি অবস্থা ঘোষণার পাশাপাশি সব আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল করেছে। খেলাধুলাসহ অনুষ্ঠানাদি বাতিল, অনেক দেশ জরুরি প্রয়োজন ছাড়া রাস্তায় বেরোতে নিষেধ করেছে, ঘরে বসে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে কাজ করার পরামর্শ দিয়েছে। অসতর্কতার কারণে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ইরানের উপস্বাস্থ্যমন্ত্রী ইবাজ হারিরচি, অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পিটার ডাটন, বিশ্বখ্যাত অভিনেতা টম হ্যাল্ক ও তার স্ত্রী রিতা উইলস, মিয়ামির সিটি মেয়র ফ্রান্সিস সুরেজ উল্লেখযোগ্য। এই রোগ কী, কীভাবে ছড়ায়, করোনায় আক্রান্ত হলে কী করণীয় তা আমরা বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে মিডিয়ার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত জানছি। রোগাক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে এ ভাইরাস আশপাশের জিনিসের ওপর পড়ে, আশপাশের টেবিল-চেয়ার, সিঁড়ির রেলিং, বই-পুস্তক, মোবাইল ফোন, চাবির রিং, চশমা, চায়ের কাপ, ল্যাপটপ, ট্যাব অর্থাৎ নিজ ব্যবহার্য দ্রব্য হচ্ছে এ ভাইরাসের আশ্রয়স্থল। সেখান থেকে হাতে, হাত থেকে নাক হয়ে শ্বাসযন্ত্রে। করোনাভাইরাস থেকে মুক্ত থাকার সহজ দুটো উপায়- ১. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে হাতের ব্যবহার; যত কম জিনিসে হাত দেওয়া যায় ততই ভালো। হাত প্রতিনিয়ত পরিষ্কার রাখতে হবে। ঘরে ফিরেই হাত ধোয়া, কিছুক্ষণ পরপর হাত পরিষ্কার করা, খালি হাতে কিছু স্পর্শ না করা। দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে নাক, মুখ, চোখে হাত না দেওয়া। অনেকের অভ্যাস হচ্ছে প্রতিনিয়ত নাক, মুখ ও চোখে হাত দেওয়া। অত্যন্ত সচেতনভাবে এ প্রত্যঙ্গগুলো স্পর্শ করা পরিহার করতে হবে।

সচেতনতা বৃদ্ধিতে করণীয় : ১. সব ছাত্রছাত্রী, যুবসহ সবার দায়িত্ব হচ্ছে করোনাবিষয়ক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, প্রতিনিয়ত হাত পরিষ্কার করা, হাত দিয়ে নাক, মুখ, চোখ স্পর্শ না করা। ২. পিতা-মাতা, বন্ধু, সহপাঠী সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া। আরও করণীয় : ১. করমর্দন পরিহার করা। ২. যতটা সম্ভব আশপাশের নিত্যব্যবহার্য জিনিসে হাত না দেওয়া। ৩. বিভিন্ন অফিস-আদালত, ফ্যাক্টরি ও জনসমাগম হয় এমন জায়গায় হাত পরিষ্কার করার ব্যবস্থা রাখা। ৪. সিটি করপোরেশন, পৌরসভাসমূহ জনসমাগম হয় এমন জায়গায় হাত ধোয়ার অস্থায়ী ব্যবস্থা করতে পারে। শিল্পবাণিজ্য প্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এমন জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ নিতে পারে। ৫. মসজিদের ইমাম, শিক্ষকসহ সবাই প্রতিনিয়ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরামর্শ দিতে পারেন। ৬. দেশের ২০ লাখ স্কাউটসহ সব যুব ও তরুণ সচেতনতা বৃদ্ধির আন্দোলনে অংশগ্রহণ করতে পারে।

লেখক : বাংলাদেশ স্কাউটসের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সাবেক মুখ্য সচিব।

প্রকাশঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন (২১ মার্চ ২০২০)

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত