আতঙ্ক নয় সতর্কতা অপরিহার্য

152

Published on মার্চ 23, 2020
  • Details Image

ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী

পৃথিবী নামক এই গ্রহে প্রাচীনকাল থেকেই প্রাণঘাতী ব্যাধি, যেমন—জলবসন্ত, কলেরা, ইনফ্লুয়েঞ্জা, ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা, টাইফয়েড, হাম, কুষ্ঠরোগ, হলুদ জ্বর, ইবোলা, জিকা ভাইরাস ইত্যাদি বিভিন্ন সময়ে মানবসমাজকে করেছে অতিশয় বিপন্ন ও বিপর্যস্ত। কালক্রমে এর পরিত্রাণ ও উপশমে নানা চিকিৎসার উদ্যোগে সফলতার স্বাক্ষরও রেখেছে। সকাতরে মানবসমাজ বিভিন্ন অভিচার-ক্রিয়ায় এসব মহামারিকে বশীকরণ করার পন্থাও উদ্ভাবন করেছে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের শেষ পর্যায়ে চীনের উহান থেকে উত্থিত ‘করোনাভাইরাস-কভিড-১৯’ নতুন করে বিশ্বকে অনাকাঙ্ক্ষিত আকস্মিক সংকটে ফেলে দিয়েছে। করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়া দেশগুলোর মধ্যে চীন, ইতালি, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইরানের অবস্থান অধিকতর নাজুক।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১১ মার্চ কভিড-১৯-কে বিশ্ব মহামারি ব্যাধি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ইউরোপের দেশগুলোতে করোনাভাইরাসের দ্রুত প্রসার ও মৃত্যুহার বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান টেড্রোস আধানম গ্রেব্রিয়েসিস এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ইউরোপ এই মহামারির কেন্দ্রবিন্দু। ইতালি ও স্পেনে এর বিস্তার পুরো ইউরোপকে বিশ্বের সবচেয়ে আক্রান্ত অঞ্চলে পরিণত করেছে।

শ্বাসযন্ত্রকে আক্রান্ত করে তীব্র আঘাতে মানুষের ফুসফুসে এই রোগের সংক্রমণ এবং জীবনঝুঁকির মুখোমুখি অসহায় জনগোষ্ঠীর পর্যাপ্ত জনপদ সচেতনতা অনেকটা আতঙ্কিত করার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উপরোল্লিখিত পরিসংখ্যানে ৯০ শতাংশ আক্রান্ত রোগী সুস্থ জীবনযাপনে অভ্যস্ত হওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে রাষ্ট্র-সরকার-সমাজের নারী-পুরুষ, ধর্ম-বর্ণ, শ্রেণি-পেশা-নির্বিশেষে সবার ঐক্যবদ্ধ ও একমুখী আরোগ্য অনুসন্ধান সম্পর্কে সতর্কতাই বাঞ্ছনীয়। বাংলাদেশে এই ভাইরাসের বিস্তার মূলত প্রবাসীদের দেশে ফেরা এবং পরিবার-প্রতিবেশীর সংস্পর্শে দিনযাপনের শিকড়ে অনড়ভাবে প্রতিষ্ঠিত। সংগত কারণেই কোয়ারেন্টিনে থাকা একান্তই প্রাসঙ্গিক। এসংক্রান্ত গুজব, অতিমাত্রায় সামাজিক যোগাযোগ ও নিরীহ জনগণকে শঙ্কিত করার সব অপচেষ্টার বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতেই হবে।

মুক্তির মহানায়ক, বাঙালি জাতি-রাষ্ট্রের মহান স্থপতি, কালোত্তীর্ণ দেশপ্রেম-আদর্শ-চেতনা-দর্শনের কীর্তিমান আলোকবর্তিকা জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপন অনুষ্ঠানে সরকার ও দলের বদান্যতায় কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সংস্থার নেতাদের ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রাণসংহারক নভেল করোনাভাইরাস  মোকাবেলায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস সত্যি প্রশংসনীয়।

জাতির জনকের সুযোগ্য তনয়া মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা ১৯ মার্চ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের সভায় প্রত্যুপক্রম উচ্চারণে বলেছেন, ‘করোনাভাইরাস নিয়ে প্যানিক সৃষ্টি করবেন না, শক্ত থাকুন। সচেতন হোন। রেডিও-টেলিভিশনসহ অন্য মিডিয়ার মাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচারণা বাড়ান। মানুষকে বুঝিয়ে সচেতনতা তৈরি করতে হবে।’ সরকার কর্তৃক গৃহীত কোয়ারেন্টিন, আইসোলেশন, পর্যাপ্ত পরীক্ষণ কিট সংগ্রহ, গণস্বাস্থ্য সংস্থাকে কিট তৈরির অনুমোদন, প্রবাসীদের প্রতি প্রশাসনের বিশেষ নজরদারি, আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ, সেনাবাহিনীর সহায়তায় সংশ্লিষ্ট সুবিধার সম্প্রসারণ সুদূরপ্রসারী বিচক্ষণতাকে সুদৃঢ় করবেই।

দেশের আপামর জনসাধারণকে সম্পৃক্ত করে এই প্রাণঘাতী রোগ উপশমে পন্থা নির্ধারণে অধিকতর প্রচার, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার যথাযথ ব্যবহার অতীব গুরুত্বপূর্ণ। ঝুঁকি এড়াতে নিম্নোক্ত করণীয় সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করা এবং সতর্ক থাকার মধ্যেই এই রোগের বিস্তার রোধ সম্ভব পরামর্শ হচ্ছে—নিয়মিত জীবাণুনাশক বা সাবান বা হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে হাত ধোয়া উচিত। কাশি বা হাঁচি দিচ্ছে এমন ব্যক্তি থেকে তিন ফুট দূরত্ব বজায় রাখা প্রয়োজন। হাত না ধুয়ে চোখ, নাক ও মুখ স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। হাঁচি বা কাশি দেওয়ার সময় টিস্যু বা হাতের কনুই দিয়ে নাক ও মুখ ঢেকে রাখতে হবে। যেখানে-সেখানে থুতু নিক্ষেপ করা যাবে না। রান্না করার আগে ভালো করে খাবার ধুয়ে নিতে হবে এবং যেকোনো খাবার ভালো করে সিদ্ধ করে রান্না করতে হবে।

অসুস্থ ব্যক্তি বা প্রাণীর সংস্পর্শে আসা যাবে না। কাপড় একবার ব্যবহার করে ধুয়ে ফেলতে হবে। বাড়ি ও কর্মক্ষেত্র নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে। বাইরে ব্যবহৃত জুতা ঘরে ব্যবহার করা যাবে না। খালি পায়ে হাঁটা যাবে না। পরিচিত বা অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে হাত মেলানো বা আলিঙ্গন করা থেকে বিরত থাকতে হবে। জ্বর, কাশি ও শ্বাসকষ্ট অনুভব করলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। অন্যের সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকতে হবে। স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ অনুসরণ করে নিরাপদ থাকার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অসুস্থ বোধ করলে বাড়িতে অবস্থান করা, জনাকীর্ণ স্থানে সতর্ক থেকে মাস্ক ব্যবহার করা, শিশু-বৃদ্ধ ও ক্রনিক রোগীদের অধিকতর সতর্ক অবস্থায় রাখা এবং নিজেকে নিরাপদ রাখতে বিদেশ ভ্রমণ না করাই শ্রেয় হবে। আমরা যেন বিপদে বিচলিত না হই, এটাই প্রত্যাশা।

লেখক : সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত