দেশরত্ন শেখ হাসিনাকে নিয়ে টুকরো স্মৃতি

2866

Published on অক্টোবর 1, 2020
  • Details Image

প্রফেসর ড. আবদুল খালেকঃ

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তারিখে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর পরিবার পরিজনকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় তাঁর নিজ বাসভবনে। এটি ছিল গভীর আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র। বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা তখন দেশের বাইরে ছিলেন বলে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পান। দেশকে নেতৃত্বহীন করবার লক্ষে আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ৪ নেতা জনাব সৈয়দ নজরুল ইসলাম,জনাব তাজ উদ্দিন আহমদ, জনাব ক্যাপটেন মনসুর আলি, জনাব এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে জেলখানায় বন্দি থাকা অবস্থায় নিষ্ঠুর ভাবে হত্যা করা হয় ১৯৭৫সালের ৩রা নভেম্বর তারিখে। ষড়যন্ত্রকারীদের পরিকল্পনা ছিল সুদূর প্রসারি। মৃত্যুর হাত থেকে আওয়ামী লীগের নেতা যাঁরা রক্ষা পেয়েছিলেন, ১৯৭৫-৭৬ সালে তাঁরা প্রায় সবাই তখন জেলখানায় বন্দি। নেতৃত্বশূন্য আওয়ামী লীগ প্রচন্ড চাপের মুখে থেকেও ১৯৭৭ সালের ৪ এপ্রিল দলের কাউন্সিলে সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীনকে দলের আহ্বায়ক নির্বাচিত করে। কিন্তু এই সময় আবার দলের বাম এবং মধ্যপন্থীদের বিভক্তি ঘটে। ১৯৭৮ সালের ৩-৫ মার্চ তারিখে হোটেল ইডেনে আওয়ামী লীগ অনুষ্ঠিত কাউন্সিলে জনাব আবদুল মালেক উকিল সভাপতিএবং জনাব আবদুর রাজ্জাক দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।।১৯৭৮ সালের ১১ আগস্ট দলের পাল্টা আহ্বায়ক কমিটি গঠিত হয়। আহ্বায়ক মিজানুর রহমান চৌধুরী। আওয়ামী লীগ তখন দ্বিধা বিভক্ত। মালেক গ্রুপ এবং মিজান গ্রুপ।১৯৭৯ সালে জেনারেল জিয়ার সামরিক শাসনের ছত্র ছায়ায় দেশে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দ্বিধাবিভক্ত আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। দুই গ্রুপ মিলিয়ে মোট ৪১টি আসন লাভ করে। দুই গ্রুপের কোন্দল আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

১৯৮১ সালের ১৪-১৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে দলের কোন্দল আরও কঠিন আকার ধারণ করে। জনাব আবদুর রাজ্জাক, জনাব মহিউদ্দিন আহমদ, ড. কামাল হোসেন, জনাব তোফায়েল আহমদ দলের সভাপতি পদ নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হন। দলীয় কোন্দলের একপর্যায়ে দলীয় সিনিয়র নেতাদের শুভ বুদ্ধির উদয় হয়। তাঁরা বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে দলের সভাপতি পদে নিয়ে আসবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এমন কি শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতেই তাঁকে দলের সভাপতি মনোনীত করা হয়। জনাব আবদুর রাজ্জাককে করা হয় সাধারণ সম্পাদক। এ সম্পর্কে আওয়ামী লীগের বিশিষ্ট নেতা জনাব তোফায়েল আহমদ দৈনিক জনকণ্ঠে প্রকাশিত তাঁর এক লেখায় উল্লেখ করেছেন, ‘সম্মেলনের সমাপ্তি দিবসে সকলের সিদ্ধান্ত অনুসারে আমি যখন দলীয় প্রধান হিসেবে বঙ্গবন্ধু কন্যার নাম প্রস্তাব করি, তখন তা সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।... সভানেত্রী হিসেবে শেখ হাসিনার নাম শুনে নেতা-কর্মীরা উল্লাসে ফেটে পড়ে এবং বিপুল করতালির মাধ্যমে দলের সিদ্ধান্তকে অভিনন্দিত করে।’

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা সে সময় ভারতে নির্বাসিত জীবন-যাপন করছিলেন। জেনারেল জিয়া তখন রাষ্ট্র ক্ষমতায়। দোর্দন্ত তাঁর প্রতাপ। যার হাতে বঙ্গবন্ধুর রক্ত লেগে আছে, তাঁর শাসনকালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনা মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত। তবে দেশ, জাতি এবং আওয়ামী লীগের বৃহত্তর স্বার্থে এর কোন বিকল্প নেতাদের হাতে ছিল না। বিষয়টি নিয়ে শেখ হাসিনার সাথে সাক্ষাৎ আলোচনা জরুরি হয়ে ওঠে। ১৯৮১ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের ৮জন কেন্দ্রীয় নেতা শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনবার বিষয়ে আলোচনার জন্য দিল্লী গমন করেন। নেতাদের মধ্যে ছিলেন জনাব আবদুল মালেক উকিল, বেগম জোহরা তাজউদ্দিন, জনাব আবদুল মান্নান, ড. কামাল হোসেন, জনাব আবদুর রাজ্জাক, জনাব তোফায়েল আহমেদ, সাজেদা চৌধুরী ও আই.ভি. রহমান। প্রতিনিধি দলটি ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দিল্লীতে শেখ হাসিনার সাথে কয়েকটি বৈঠকে মিলিত হন।
আলোচনা চলাকালে ঢাকা থেকে জনাব মহিউদ্দীন আহমদও দিল্লী গমন করেন। ২৪শে ফেব্রুয়ারির আগেই দলের বেশ কিছু নেতা শেখ হাসিনাকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণে রাজী করানোর জন্য দিল্লীতে গিয়েছিলেন, যেমন- জনাব আবদুর রাজ্জাক, জনাব জিল্লুর রহমান, জনাব আবদুস সামাদ আজাদ, জনাব আমির হোসেন আমু, সাজেদা চৌধুরী সহ আরও অনেকে। শেখ হাসিনার কাছ থেকে সম্ভবত সবুজ সংকেত তাঁরা পেয়েছিলেন।

শেখ হাসিনা ১৭ মে দেশে দেশে ফিরবেন, এ খবর জানা-জানি হয়ে গেলে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা প্রতিক্রিয়া শুরু হয়ে যায়।। শেখ হাসিনার দেশে ফেরা বাধাগ্রস্থ করতে তৎকালীন সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান নানা ষড়যন্ত্র শুরু করেন। সরকারের নির্দেশে গঠন করা হয় ‘শেখ হাসিনা আগমন প্রতিরোধ কমিটি’।

১৯৮১ সালের মার্চ মাসের শেষের দিকে আমার একটি প্রোগ্রাম ছিল জম্মু ইউনিভার্সিটিতে। ঠিক করলাম জম্মু কাশ্মীরের প্রোগ্রাম শেষ করে দিল্লী হয়ে দেশে ফিরবো। কাশ্মীর ভ্রমণের বাসনা আমাদের দীর্ঘদিনের। সহধর্মিনী রাশেদা আমার ভ্রমণ সঙ্গী হলেন। সাথে আমাদের ছোট মেয়ে গুঞ্জন। বড়ভাই মযহারুল ইসলাম সবেমাত্র জেলখানা থেকে মুক্ত হয়ে ভারতের ইউজিসি প্রফেসর হিসেবে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে যোগদান করেছেন। বাসা নিয়েছেন কোলকাতার যাদবপুর এলাকায়। বাসায় একাই থাকতেন। এটি ভারতে অনেকটা তাঁর নির্বাসতি জীবন। জম্মু কাশ্মীর যাওয়ার পথে ভাইয়ের যাদবপুরের বাসায় এক রাত অবস্থান করলাম। আমি ভাইকে বললাম জম্মু কাশ্মীর ভ্রমণ শেষ করে দিল্লী হয়ে কোলকাতায় আসবো। ভাই জানতে চাইলেন দিল্লীতে আমার পরিচিতজন কেউ আছে কি না। ভাইকে জানালাম দিল্লীতে আমার পরিচিতজন কেউ নেই। একথা শুনবার পর ভাই একটি চিঠি লিখে খামে ভরে আমার হাতে তুলে দিলেন। খামের ওপর লেখা দেখলাম বীর মুক্তিযোদ্ধা কাদের সিদ্দিকীর নাম ও ঠিকানা। দিল্লীতে কাদের সিদ্দিকীর দেখা পাওয়া যাবে, ভাবতে বেশ আনন্দ অনুভব করছিলাম।

জম্মু কাশ্মীর ভ্রমণ শেষে আমরা এপ্রিল (১৯৮১) মাসের মাঝামাঝির দিকে দিল্লীতে আসতে পারলাম
সকাল ১০টার দিকে। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর ঠিকানা খুঁজে পেতে তেমন কোন অসুবিধে হয় নি। ভাইয়ের লেখা চিঠি পড়ে কাদের সিদ্দিকী সাহেব আমাদেরকে তাঁর গেস্ট রুমে নিয়ে গিয়ে বিশ্রামের ব্যবস্থা করলেন। খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন শুরু করে দিলেন। আমাদেরকে কাপড়-চোপড় ছেড়ে গোসল সেরে নিতে বললেন। আমরা তাঁকে জানালাম দিল্লীতে এটাই আমাদের প্রথম আগমন, হোটেলে একটা থাকবার ব্যবস্থা করে দিলে আমরা দিল্লী শহর একটু ঘুরে দেখতে পারবো। কাদের সিদ্দিকী বললেন ও নিয়ে আপনাদেরকে ভাবতে হবে না। ওটি আমি দেখছি। অনেক পথ অতিক্রম করে এসেছেন। খাওয়া-দাওয়া করে একটু বিশ্রাম নিন, দেখি কোথায় আপনাদের থাকবার ব্যবস্থা করা যায়। আজ আর কোথাও যাওয়া চলবে না, আমার এখানেই থাকবেন, আগামীকাল খোঁজ-খবর নিয়ে দেখা যাবে। একটা ভাল বাসাতেই থাকবার ব্যবস্থা হবে, হোটেলে থাকবার প্রয়োজন হবে না। যদি ভাল কোন বাসা না পাওয়া যায়, আপনারা ক’দিন আমার বাসাতেই থাকতে পারবেন। এ নিয়ে আপনাদেরকে ভাবতে হবে না। দুপুরে খেয়ে-দেয়ে একটু বিশ্রাম নিন, সন্ধ্যায় আপনাদেরকে একটি বাসায় বেড়াতে নিয়ে যাবো। কাদের সিদ্দিকীর এক ভাতিজা তাঁর সাথে অবস্থান করছিল। তাকে জানিয়ে দিলেন, আমাদের যেন কোন রকম অযত্ন না হয়। এরপর দেখলাম কাদের সিদ্দিকী আমাদের কন্যা গুঞ্জনের সাথে বেশ ভাব জমিয়ে নিয়েছেন। কাদের সিদ্দিকীর কাছ থেকে একগাদা চকলেট পেয়ে গুঞ্জন মহা খুশি। এতবড় একজন মুক্তিযোদ্ধা, বঙ্গবন্ধু যাঁকে ‘বঙ্গবীর’ খেতাবে ভ‚ষিত করে রেখে গেছেন, আমাদের ছোট্ট মেয়ের সাথে গল্পের মাধ্যমে তার মন জয়ের চেষ্টা করছেন দেখে আমরা বেশ মজা অনুভব করছিলাম।

শুধু বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী নন, বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাও তখন দিল্লীতে নির্বাসিত জীবন-যাপন করছিলেন। কাদের সিদ্দিকীর সাথে শেখ হাসিনার তখন ভাই-বোনের সম্পর্ক। সন্ধ্যার দিকে কাদের সিদ্দিকী জানালেন আমাদেরকে তিনি শেখ হাসিনার বাসায় নিয়ে যাবেন। তাঁর প্রস্তাব শুনে আমরা খানিকটা হতবাক, প্রথমে আবেগাচাছন্ন তারপর বেদনা ভারাক্রান্ত । শেখ হাসিনাকে সান্ত¦না জানাবার ভাষা আমাদের জানা নেই। কাদের সিদ্দিকীর প্রস্তাব আমরা লুফে নিলাম। মনে মনে ভাবলাম শেখ হাসিনার সাথে দেখা হলে আমাদের দিল্লী আসা সার্থক ও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠবে।

দুপুরে খাওয়া-দাওয়া শেষে বেশ খানিকটা বিশ্রাম নেয়া গেল। এরপর ঘরে বসে থাকার কোন অর্থ হয় না। কাদের সিদ্দিকীর একটি গাড়ী ছিল। গাড়ী তিনি নিজে চালাতেন না। একজন ড্রাইভার ছিল। সন্ধ্যার পর ড্রাইভার আমাদেরকে শেখ হাসিনার বাসায় নিয়ে যাবে ঠিক হলো। ড্রাইভারের পাশের সিটে বসলেন কাদের সিদ্দিকী। আমরা তিন জন বসলাম গাড়ীর পেছনের সিটে। মনে হলো বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে টেলিফোনে জানিয়ে রেখেছেন আমরা তাঁর সাথে দেখা করতে আসছি।

ছোট্ট একটি ফ্লাটে স্বামী প্রখ্যাত পরমানু বিজ্ঞানি ড. ওয়াজেদ মিয়া, পুত্র জয় এবং কন্যা পুতুলকে নিয়ে নির্বাসিত জীবন-যাপন করছিলেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। ড. ওয়াজেদ মিয়া আমাদেরকে নিয়ে তাঁদের ড্রইং রুমে বসতে দিলেন। ড্রইংরুমে ঢুকে মনে হলো তাঁদের জীবন অত্যন্ত সাদামাঠা । শেখ হাসিনা আসলেন। তাঁর সাথে এই আমাদের প্রথম সাক্ষাৎ। পিতৃ-মাতৃহারা শেখ হাসিনাকে দেখার সাথে সাথে আমার চোখের সামনে বঙ্গবন্ধুর চেহারা ভেসে উঠলো। আবেগাচ্ছন্ন হয়ে পড়ছিলাম। কোনরকমে নিজেকে সামলে নিয়ে কুশল বিনিময় শুরু করলাম। ড্রইং রুম কাম ডাইনিং রুমে বসে আমরা অনেক সময় ধরে কথা বললাম। চা-নাস্তা এলো। আমার মেয়ে গুঞ্জন আর পুতুল কার্পেটের উপর বসে নানা খেলনা নিয়ে খেলতে শুরু করলো। কাদের সিদ্দিকী গুঞ্জন এবং পুতুলের খেলা দেখে সময় কাটাতে থাকলেন।
আমি দেশের সর্বশেষ রাজনীতি এবং আওয়ামী লীগের দলীয় অবস্থা সম্পর্কে কথা তুললাম। জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসনের নির্যাতনের হাত থেকে দেশের মানুষকে মুক্ত করতে হলে আওয়ামী লীগকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। নেতাদের মধ্যে কোন্দলের কারণে আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলতে ব্যর্থ হচ্ছে। আমি জানতাম আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ ক‘দিন আগে দিল্লীতে এসে শেখ হাসিনাকে আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব নেয়ার অনুরোধ জানিয়ে গেছেন। আমিও শেখ হাসিনাকে অনুরোধ জানিয়ে বললামÑ ‘আওয়ামী লীগ বাঁচলে শেখ মুজিব বাঁচবেন, আওয়ামী লীগ বাঁচলে দেশ বাঁচবে। আওয়ামী লীগকে বাঁচাতে হলে আপনাকে সভাপতির দায়িত্ব নিতেই হবে’। আমার কথার উত্তরে শেখ হাসিনা জানালেন তিনি আওয়ামী লীগের সংকট নিয়ে ভাবছেন, সংকট নিরসনে প্রয়োজন হলে তিনি দেশে ফিরবেন।’ ড. ওয়াজেদ মিয়া শেখ হাসিনার পাশেই বসেছিলেন। শেখ হাসিনার কথার সূত্র ধরে তিনি একটু রসিকতা করে বললেনÑ ‘শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের দায়িত্ব নিতে চাইলে আমি আপত্তি করবো না, তবে কুতুব মিনারে টেলিস্কোপ লাগিয়ে দেখবো কেমন বেহাল অবস্থায় তাঁকে পরতে হয়েছে। আওয়ামী লীগকে সামাল দেয়া খুব সহজ ব্যাপার নয়।’ আমি তাঁর কথার উত্তরে বললামÑ ‘আপনি ভয় দেখাবেন না তো। বঙ্গবন্ধুর রক্ত যাঁর মধ্যে রয়েছে, তিনি অবশ্যই সামাল দিতে পারবেন।’ শেখ হাসিনার ব্যাপারে আমার প্রত্যাশা যে যথার্থ ছিল, এতদিনে তা প্রমানিত হয়েছে।গল্প করতে করতে বেশ রাত হয়ে গিয়েছিল। শেখ হাসিনা আমাদেরকে রাতের খাবারে অংশ নিতে বলেছিলেন। কাদের সিদ্দিকী জানালেনÑ আমাদের জন্য তাঁর বাসায় রান্না হয়ে আছে। খাবারগুলো নষ্ট হবে। শেখ হাসিনার কাছে আমরা উঠবার অনুমতি চাইলাম। তিনি আমাদেরকে বাসার দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিলে গেলেন।

কাদের সিদ্দিকী সাহেবের বাসায় আমাদের জন্য চমৎকার খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন করে রাখা হয়েছিল। খাওয়া-দাওয়া শেষে কাদের সিদ্দিকীর সাথে দেশের সর্বশেষ অবস্থা নিয়ে আলাপ-আলোচনা শুরু করলাম। আওয়ামী লীগকে কিভাবে শক্তিশালী করা যায়, তা নিয়ে আমার বক্তব্য ছিল বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব নিয়ে দেশে ফিরে গেলে আওয়ামী লীগের শক্তি বৃদ্ধি হবে। আমার সাথে একমত হতে পারলেন না বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী। শেখ হাসিনার স্বামী ড. ওয়াজেদ মিয়ার মত কাদের সিদ্দিকীও মনে করেন এ মুহূর্তে শেখ হাসিনার পক্ষে আওয়ামী লীগকে সামাল দেয়া কঠিন হবে। তাছাড়া জিয়াউর রহমান তাঁকে দেশে ফিরতে দেবেন কি না, সে বিষয় নিয়েও কাদের সিদ্দিকী সংশয় প্রকাশ করলেন। তিনি শেখ হাসিনার জীবনের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগের কথা জানালেন। ড. ওয়াজেদ মিয়া এবং বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী শেখ হাসিনার জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করবেন, এটি খুব স্বাভাবিক । বঙ্গবন্ধু পরিবারের সবাইকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, শেখ হাসিনার জীবনের তেমন পরিণতি যেন না ঘটে, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদেরকে তা অবশ্যই ভাবতে হবে। কাদের সিদ্দিকীর মতে দেশে এ মুহূর্তে প্রয়োজন বলিষ্ঠ পুরুষ নেতৃত্ব। কোন নারী নেতৃত্ব জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসনকে মোকাবিলা করতে পারবে বলে মনে হয় না। কাদের সিদ্দিকীর কথাবার্তা শুনে মনে হলো কিছুক্ষণ আগে শেখ হাসিনার বাসায় তাঁর সামনে ড. এম. ওয়াজেদ মিয়াকে যে মনোভাব প্রকাশ করতে দেখেছি, সেই মনোভাবের সাথে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর মনোভাবের তেমন কোন পার্থক্য নেই। তবে শেখ হাসিনার সাথে কথা বলে আমার মনে হয়েছে তিনি দেশে ফিরবার ব্যাপারে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। বঙ্গবন্ধুর সাহসিকতা সর্বজনবিদিত, শেখ হাসিনা তাঁর বাবার সাহসকে ধারণ করবেন, লালন করবেন, সেটাই প্রত্যাশিত। মৃত্যুভয়ে শেখ হাসিনা পিছিয়ে যাবেন, তেমনটি মনে হলো না। এটি তাঁর নিজস্ব সিদ্ধান্ত। আমার বিশ্বাস শেখ হাসিনা তাঁর সিদ্ধান্তে অটল থাকবেন। এসব গল্প করতে করতে বেশ রাত হয়ে গিয়েছিল। রাত ১১টা বেজে গেছে, তা বুঝতেই পারি নি।

এপ্রিল মাসে দিল্লীতে আমরা প্রচণ্ড গরম অনুভব করছিলাম। জানা গেল দিল্লীর আবহাওয়া এরকমই। শীতে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা, গ্রীষ্মে তীব্র গরম, দিল্লীতে এটাই স্বাভাবিক। দীর্ঘ পথ অতিক্রম করায় আমরা বেশ ক্লান্ত ছিলাম। রাতের ঘুম বেশ গভীর হয়েছিল।

সকালবেলা বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর খাবার টেবিলে গিয়ে দেখলাম নানা রকম উপাদেয় খাবার দিয়ে
টেবিল সাজানো হয়েছে। নাস্তা শেষ করবার পর বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী তাঁর গাড়ীতে আমাদেরকে একটি বাসায় নিয়ে গেলেন। আমাদেরকে ড্রইং রুমে বসিয়ে তিনি তাঁর এক দিদিকে বাসার ভেতর থেকে ডেকে নিয়ে এসে আমাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। সুদর্শন-মধ্যবয়সী এক মহিলা। আমাদের পরিচয় জেনে গভীর শ্রদ্ধার সাথে নমস্কার জানালেন। কাদের সিদ্দিকী জানতে চাইলেন তাঁর বাসায় আমাদেরকে ক’দিনের জন্য স্থান দেয়া সম্ভব হবে কি না। মহিলা জানালেন মাস্টার মশায়দেরকে স্থান দিতে না পারলে পাপ হবে। দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। ব্যবস্থা হয়ে যাবে। এরপর তিনি আমাদেরকে একটি কক্ষ দেখালেন। আমাদের কক্ষটি পছন্দ হয়ে গেল। ঠিক হলো সন্ধ্যার পর আমরা এখানে চলে আসবো এবং রাতের খাবার তৈরি রাখতে বলা হলো।

জম্মু কাশ্মীর ভ্রমণ শেষে দিল্লীতে যখন আমরা পৌঁছি তখন আমাদের পকেটের অবস্থা খুব খারাপ। বুঝতে পারলাম বেশ হিসাব করে চলতে হবে। দিল্লীতে অনেক দর্শনীয় স্থান রয়েছে। সেখানে গাড়ী নিয়ে ঘুরতে গেলে যে পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন, সে অর্থ আমাদের নেই। কাজেই ভ্রমণ সংক্ষিপ্ত করা ছাড়া আর কোনো পথ নেই। বাংলাদেশের কিছু টাকা আমাদের কাছে ছিল, কিন্তু দিল্লীতে বাংলাদেশের টাকা ভাঙ্গানো কঠিন। কাদের সিদ্দিকী সাহেবকে আমাদের আর্থিক সমস্যার কথা বলতে সংকোচ অনুভব করছিলাম। তবে আমাদের সমস্যার কথা তাঁকে আর বলতে হলো না। তিনি নিজে থেকেই এমন ব্যবস্থা করে দিলেন, আমাদের সমস্যার সমাধান হয়ে গেল। তিনি পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন আমরা যে ক’দিন দিল্লীতে থাকবো, তাঁর গাড়ীটি আমাদের সেবায় নিয়োজিত থাকবে। এটি শুধু তাঁর মুখের কথা ছিল না। সকালবেলা নাস্তা করবার পরই লক্ষ্য করতাম বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর ড্রাইভার তাঁর গাড়ী নিয়ে এসে হাজির। যে ক’দিন আমরা দিল্লীতে ছিলাম, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর গাড়ী আমরা সকাল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ব্যবহার করবার সুযোগ পেয়েছিলাম। এর ফলে দিল্লীর প্রতিটি দর্শনীয় স্থান আমরা ঘুরে দেখা সম্ভব হয়েছে। দিল্লীতে আমাদের সময় খুব ভালই কেটে গেল। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী শেখ হাসিনার বাসায় নিয়ে গিয়ে তাঁর সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন, এটি আমাদের জীবনের একটি স্মরণীয় ঘটনা। দিল্লীতে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর আদর-আপ্যায়ন, তাঁর ব্যক্তিগত গাড়ী ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে যে উপকার আমাদের করেছেন, তা কখনও ভুলবার নয়।

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর কাছ থেকে আমি যতটুকু খবর জেনেছিলাম, তাতে বুঝতে পারলাম আওয়ামী লীগের বড় মাপের অনেক নেতা বাংলাদেশ থেকে এসে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরে যাবার অনুরোধ জানিয়েছেন, তবে আওয়ামীপন্থী বুদ্ধিজীবীদের পক্ষ থেকে আমার আগে আর কেউ শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরবার আমন্ত্রণ বা অনুরোধ নিয়ে দিল্লীতে আসেন নি। তথ্যটি সত্য হলে আমার জন্য মহা গৌরবের।

তবে দিল্লী থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে এসে কতিপয় বুদ্ধিজীবীর সামনে সেই গৌরবগাথা বলতে গিয়ে আমাকে কত বড় বিড়ম্বনার সম্মুখীন হতে হয়েছিল সে কথাগুলো বলেই শেখ হাসিনাকে নিয়ে আমার টুকরো স্মৃতিকথা শেষ করবো।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাবের দক্ষিণ পাশে একটি খোলা চত্বর আছে। এটি গোল চত্বর বলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাছে অতি পরিচিত। গোল চত্বরে যে সমস্ত শিক্ষক সন্ধ্যার পর চিত্র-বিনোদন করে থাকেন, তাঁরা সবাই একটু ব্যতিক্রমধর্মী শিক্ষক। তাঁরা দেশ-বিদেশের শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতি-দর্শন নিয়েই মূলত জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করে থাকেন। সেখানে বসলে নানা বিষয়ে কিছুটা জ্ঞান সঞ্চয় করা যায়, ফলে গোল চত্বরে বসতে এবং গল্প করতে পছন্দ করতাম। গোল চত্বরের আসরে বামপন্থী শিক্ষকদের প্রাধান্য ছিল। আওয়ামী ঘরানার শিক্ষক আমরা সংখ্যায় খুব কম ছিলাম। যে কারণে প্রতিদিনই আওয়ামী লীগের পক্ষে আমাকে সোচ্চার ভূমিকা পালন করতে হতো। বাম ঘরানার শিক্ষকদের মূল কথা ছিল বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ একই ঘরানার এপিঠ আর ওপিঠ। তাঁদের কথার প্রতিবাদ করতে আমি সব সময় তৎপর থাকতাম দিল্লী থেকে ফিরে এসে সন্ধ্যার পর যখন গোল চত্বরে গিয়ে বসলাম , গোল চত্বরের বন্ধুরা গভীর আগ্রহ নিয়ে আমার ভারত ভ্রমণের অভিজ্ঞতা জানতে চাইলেন।কোলকাতায় বড় ভাই মযহারুল ইসলামের সাথে সাক্ষাৎ, দিল্লীতে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর মেহমান হয়ে কাটানো, কাদেরে সিদ্দিকীর মাধ্যমে বন্ধবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সাথে সাক্ষাৎ, আমার পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরে এসে আওয়ামী লীগের দায়িত্ব গ্রহণের অনুরোধ, শেখ হাসিনার দেশে ফিরে আসবার আগ্রহ, ড. ওয়াজেদ মিয়ার দ্বিধা- সংশয় এসব বিষয় মহা উৎসাহের সাথে আবেগমিশ্রিত ভাষায় আমি তুলে ধরছিলাম। আকস্মিকভাবে আমাদের এক বন্ধু চেয়ার থেকে লাফ দিয়ে উঠে আমার দিকে ধেয়ে এসে হাত গুটিয়ে চীৎকার করে বলতে শুরু করলেনÑ ‘আপনারা পেয়েছেন কি? শেখ হাসিনা রাজনীতির কি জানে? শেখ হাসিনাকে নিয়ে এসে আপনারা আওয়ামী লীগটাকে ডোবাবেন, দেশটাকে ডোবাবেন।’ তাঁর কথা শুনে আমরা সবাই হতবাক। পাশের বন্ধুরা ছুটে এসে তাঁকে থামালেন। ধরে নিয়ে গিয়ে চেয়ারে বসালেন। তিনি বেশ কিছুক্ষণ ধরে শেখ হাসিনার নিন্দা-মন্দ করতেই থাকলেন। আমার এত আবেগ এত গৌরবের কথা সব ম্লান হয়ে গেল। কারও মুখে আর কোন কথা নেই। সবাই গোল চত্বর ত্যাগ করে আমরা যে যার ঘরের দিকে পা বাড়ালাম

প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি ১৯৯৬ সালে সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে শেখ হাসিনা রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসবার পর আমাদের কথিত সেই বিপ্লবী বন্ধু ১৯৮১ সালে গোল চত্বরে বসে শেখ হাসিনাকে যিনি অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেছিলেন, শেখ হাসিনার পক্ষে কথা বলতে গিয়ে আমাকে যাঁর হাতে চরম লাঞ্ছিত হতে হয়েছিল, ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুগ্রহে তিনি হাজী দানেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হবার গৌরব অর্জন করেছিলেন। শেখ হাসিনার উদারতার তুলনা হয় না। এক্ষেত্রে পিতা বঙ্গবন্ধুর তিনি একজন সার্থক উত্তরাধিকার।

লেখকঃ উপাচার্য, নর্থ বেঙ্গল বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত