মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক হত্যার কলঙ্কময় দিন

1910

Published on নভেম্বর 7, 2020
  • Details Image

সরদার মাহমুদ হাসান রুবেলঃ

৭ নভেম্বর বাংলাদেশে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যার কলঙ্কিত ষড়যন্ত্রের দিন, বিশ্বাসঘাতকতার দিন, পাকিস্তানি ভাবাদর্শের রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত করার অপচেষ্টার দিন। এদিনের ঘটনা জাতীয় রাজনীতিতে যে ওলটপালট করে দেয় তার রেশ থেকে আজও মুক্ত হতে পারেনি বাংলাদেশের রাজনীতি। দেশী এবং বিদেশী শক্তি যারা স্বাধীনতাবিরোধীদের সাহায্য করেছে, তারা যৌথভাবে ষড়যন্ত্র করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করেছে। আবার তাদেরই ষড়যন্ত্রে ৭ নভেম্বর থেকে দেশপ্রেমিক সৈনিকদের হত্যা হয়েছে। এই দিন দেশে কোনো বিপ্লব বা কোনো সংহতি হয়নি, হয়েছে সৈনিক হত্যা।

দেশপ্রেমিক সৈনিকদের হত্যা করে জেনারেল জিয়া(বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান) তাদের লাশের ওপর দিয়ে ক্ষমতা দখল করে। এই দিনে প্রকাশ্যে হত্যার শিকার হন ২ জন সেক্টর কমান্ডার ও ১ জন সাব সেক্টর কমান্ডার। আর এই ৭ নভেম্বরকে কেন্দ্র করে আরেকজন সেক্টর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু তাহেরকে ২১ জুলাই ১৯৭৬ সালে ফাঁসি দেয়া হয়। যদিও দীর্ঘদিন পর ২০১৩ সালে সুপ্রিম কোর্ট এক রায়ে কর্নেল তাহেরের সেই বিচারকে অবৈধ হিসেবে ঘোষণা করে। ষড়যন্ত্রকারিরা সেনাবাহিনীর ভেতরে ১৩ জন সহ বাংলাদেশ টেলিভিশনের তিন কর্মকর্তাকেও হত্যা করে। সাংবাদিক অ্যান্থনি ম্যাসকারেনহ্যাস এ ব্যাপারে লিখেছেন, ‘এছাড়াও এদিন উচ্ছৃঙ্খল জওয়ানরা একজন মহিলা ডাক্তারসহ ১৩ জন সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করে। এমন কি একজন সেনা কর্মকর্তার স্ত্রীকেও এ সময় হত্যা করা হয়।’ মুক্তিযুদ্ধেও কোনও সেক্টর কমান্ডারকে সরাসরি কোন যুদ্ধক্ষেত্রে শহীদ হতে হয়নি। আর তাই হত্যার নৃশংস ভয়াবহতা ৭ নভেম্বরকে একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়ে পরিণত করেছে। সপরিবারে ১৫ অগাস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড, ৩ নভেম্বর জেলে জাতীয় চার নেতা হত্যাকাণ্ড, ৭ নভেম্বরের হত্যাকাণ্ড, জিয়াউর রহমানের শাসনামলে সশস্ত্র বাহিনীতে হাজার হাজার সৈনিক হত্যাকাণ্ড, জিয়াউর রহমানের হত্যার পরে জেনারেল মঞ্জুর, জিয়া হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে প্রহসনমূলক বিচারে ১৩ জন বীর মুক্তিযোদ্ধার ফাঁসির ঘটনা বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীসহ দেশের ইতিহাসকে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়ে ঠেলে দিয়েছে।

জাতির পিতার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর খন্দকার মোশতাক আহমেদ ক্ষমতায় আসেন। তবে মোশতাকের ক্ষমতার নেপথ্যে ছিল বঙ্গবন্ধুর খুনীরা যারা ছিল মূলত অবসরপ্রাপ্ত ও চাকরীচ্যুত। এই খুনিরাই সেনাবাহিনীর মধ্যে সমান্তারাল আরাকটা আর্মি বহাল রেখে নিজেদের ইচ্ছা মতো চলতে লাগলো। ট্যাঙ্ক ও গোলন্দাজ বাহিনী রয়ে গেলো সেনাবাহিনীর চেইন অফ কমান্ডের বাইরে। কারোরই নিয়ন্ত্রয় ছিল না ফারুক-রশিদের উপর। বরং সেনাবাহিনী প্রধান জিয়া তাদের কমান্ড অনুযায়ী কাজ করতো। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খালেদ মোশাররফ (বীর উত্তম)-এর ঘনিষ্ট জনদের তথ্যমতে, তিনি এই ব্যাপারটি মেনে নিতে পারেননি। তিনি তার অনুগত সৈন্য বাহিনী নিয়ে ৩ নভেম্বর মোশতাক সরকারের বিরুদ্ধে একটি অভ্যুত্থান ঘটান। অভ্যুত্থানে জেনারেল খালেদ মোশাররফ রক্তপাতহীন ক্যু করতে গিয়ে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে তার নিজ বাসভবনে গৃহবন্দি করে রাখেন। অভ্যুত্থানটি সফল হলেও তার স্থায়িত্ব ছিল মাত্র তিনদিন। বস্তুত খালেদ মোশাররফ রক্তপাত এড়াতে চেষ্টা করেছিলেন, যা পরবর্তীতে তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। ৪ নভেম্বর রাতে খালেদ মোশাররফ প্রেসিডেন্ট মোসতাককে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেন। এবং পদত্যাগের আগে মোসতাককে দিয়ে নিজেকে মেজর জেনারেল ও চীপ অফ আর্মি হিসাবে সই করিয়ে নেন। সেনাবাহিনীতে চেইন অব কমান্ড নিয়ে আসা এবং সংবিধান সমুন্নত রাখতে আলোচনা শুরু করেন । ওই অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া মেজর(অব.) নাসির উদ্দিন চ্যানেল আই অনলাইনকে জানান, ‘৩ নভেম্বর সকালে আমরা পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিলাম। সেদিন থেকেই মোশতাক ও তাকে মদদ দেয়া সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসি আমরা। সব নিয়ম মেনে মোশতাক যেনো পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করে এটাই চেয়েছিলাম আমরা। কারণ আমরা চাইনি আমাদের অভ্যুত্থানকে সেনাবাহিনীর একটি অংশের ক্ষমতাদখলের চেষ্টা হিসেবে দেখা হোক। বঙ্গভবনের ট্যাংকগুলোকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেয়ার শর্ত দিয়েছিলাম।’

৫ নভেম্বর সন্ধ্যায় অভ্যুত্থানকারীরা বিচারপতি সায়েমকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের জন্য অনুরোধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। ওই সন্ধ্যায় তখনকার সেনাপ্রধান খালেদ মোশাররফ, বিমান বাহিনী প্রধান এম জে তাওয়াব এবং নৌবাহিনী প্রধান এম এইচ খান বিচারপতি সায়েমের বাসায় গিয়েছিলেন। প্রথমে শারীরিক অসুস্থতার কথা বললেও একটু পরেই তিনি রাজি হয়েছিলেন।বোধকরি এই ক্যু-তে যথেষ্ট হোমওয়ার্ক ছিলো না। সে সময় ঢাকায় ৪৬ ব্রিগেডের মেজর পদমর্যাদার স্টাফ অফিসার ২০০৮ নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার (অব.) সাখাওয়াত হোসেন বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাতকারে বলেন, "একটা ক্যু-তে যে হোমওয়ার্ক হয় সেটা ছিলো না। যে যার মতো করে চলছিল। এই বিশৃঙ্খল অবস্থার মধ্যে যখন ৬ তারিখ রাতে এই লিফলেট জওয়ানদের মধ্যে ছড়ানো হলো তখনি সবার কাছে স্পষ্ট হয়ে গেলো যে গণবাহিনী নামে একটি ফোর্স ক্যান্টনমেন্টের ভেতর কাজ করছে"।

জাসদের সম্পৃক্ততা বিষয়ে বিবিসি’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কর্নেল তাহেরের ভাই জাবির সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন বলেছেন, ৩রা নভেম্বর ভোররাতের দিকে জিয়াউর রহমান ফোন করেন কর্নেল তাহেরকে। তিনি জানান, "জিয়াউর রহমান বলেন, তাহের ওরা আমাকে বন্দী করেছে। আমার জীবন বিপন্ন। যদিও জিয়াউর রহমানের মূল টেলিফোন লাইনটি কেটে দেয়া হয়েছিল, তবে একটি প্যারালাল লাইন সচল থাকায় তিনি টেলিফোন কলটি করতে পেরেছিলেন।" কর্নেল তাহের সেনাবাহিনী থেকে পদত্যাগ করেন ১৯৭২ সালে। এরপর থেকে তিনি সরাসরি জাসদের রাজনীতির সাথে যুক্ত হন।এরই মধ্যে গঠিত হয় সেনাসদস্যদের নিয়ে সৈনিক সংস্থা এবং গণবাহিনী, যদিও বিষয়গুলো তখনো প্রকাশ্য ছিল না। অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন আরও বলছেন, "নভেম্বরের ৩ তারিখেই কর্নেল তাহের নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকায় আসেন এবং এরপর থেকেই সৈনিক সংস্থার সদস্যরাসহ সেনাসদস্যরা তার সাথে দেখা করতে শুরু করেন। খালেদ মোশারফ ক্ষমতা হাতে নিলেও দ্রুতগতিতে কোন সরকার গঠন করতে পারেননি। এর মধ্যেই অনেকটা অগোচরে ঘটে যায় জেল হত্যাকাণ্ড। এসব মিলিয়ে অনেকটা 'সরকারহীন' অবস্থার মধ্যে ছিল কয়েকটি দিন। এর মধ্যে জাসদ, গণবাহিনী এবং তাহের সৈনিকদের সাথে ক্রমাগত আলোচনা চালিয়ে যান। নভেম্বরের ৫ এবং ৬ তারিখে গণবাহিনী আরো সক্রিয় এবং সংগঠিত হয়ে উঠতে শুরু করে। কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে একটি অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা চলতে থাকে।"

অধ্যাপক আনোয়ারের মতে ঐ অভ্যুত্থানে গণবাহিনী তাদের বেসামরিক সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করতে পারেনি । জাসদ যে উদ্দেশ্য নিয়ে বিদ্রোহে অংশ নিয়েছিল সেটি ব্যর্থ হবার এটিও একটি কারন। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "কথা ছিল সৈনিকরা জিয়াউর রহমানকে ক্যান্টনমেন্ট থেকে এলিফেন্ট রোডে নিয়ে আসবে। সেখানেই একটি বাসায় কর্নেল তাহেরসহ জাসদের নেতারা অবস্থান করছিলেন। কিন্তু তারা সেটা করতে পারেনি। গণবাহিনীর সাথে যুক্ত সৈনিকরাই জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করেছিল। জিয়াউর রহমান তাদেরকে বলেছিলেন যে কর্নেল তাহের তার বন্ধু এবং তাকেই যেন তারা এখানে নিয়ে আসে। এভাবে তারা কিছুটা প্রতারিতও হয়েছিল। তাদের ওপর যে সুনির্দিষ্ট যে নির্দেশ ছিল সেটা তারা করতে পারেনি"। তিনি আরও বলেন, জিয়াউর রহমানের রেডিও ভাষণের পর অভ্যুত্থানে গণবাহিনীর ভূমিকা চাপা পড়ে যায় এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ধারণা জন্মে যে, এটি পুরোপুরিই জিয়াউর রহমানের অভ্যুত্থান। ৭ই নভেম্বরের পর ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসেন জিয়াউর রহমান।' বাংলাদেশের জনগণকে অন্ধকারে রেখে পঁচাত্তরের ৭ই নভেম্বর একটি প্রাণঘাতী সেনা ষড়যন্ত্র সংঘটিত হয়েছিলো। কর্নেল শাফায়েত জামিল(বীর বিক্রম) যিনি খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে খুনী মোশতাক সরকারকে উৎখাতের অভ্যুত্থানে তিনি নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করেন। ৬ই নভেম্বরের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি লিখেছেন, "বাসভবনে যাওয়া যাওয়ার জন্য গাড়িতে উঠছি, তখন ব্রিগেড মেজর হাফিজ আমাকে বলল, স্যার, একটা জরুরি কথা আছে। হাফিজ জানাল, একজন প্রবীণ জেসিও বলেছে, ওই দিন রাত ১২টায় সিপাহিরা বিদ্রোহ করবে। জাসদ ও সৈনিক সংস্থার আহ্বানেই তারা এটা করবে। খালেদ ও আমাকে মেরে ফেলার নির্দেশও সৈনিকদের দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে জিওসিটি।" (একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, রক্তাক্ত মধ্য আগস্ট ও ষড়যন্ত্রময় নভেম্বর) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেনের বর্ণনা মতে, ‘৭ নভেম্বর রাত ১২টার পর ঢাকা সেনানিবাস থেকে যখন সিপাহি বিপ্লবের সূচনা হয়, তখন খালেদ মোশাররফ ও অন্যরা বঙ্গভবনেই ছিলেন। এসব সংবাদ শুনে খালেদ মোশাররফ কর্নেল হুদার মাধ্যমে ১০ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক নওয়াজেশের সঙ্গে যোগাযোগ করলে নওয়াজেশের ইউনিটে তাদের আসার জন্য বলে। কিন্তু সেটা পরে রটে যায় যে তারা আরিচা হয়ে উত্তরবঙ্গের দিকে একটি বেসামরিক গাড়িতে যাওয়ার পথে আসাদ গেটের নিকট তাদের গাড়ি বিকল হয়ে পড়লে তারা নিকটস্থ একটি প্রাইভেট ক্লিনিকে কাপড় বদলিয়ে ১০ ইস্ট বেঙ্গলের দিকে হেঁটে অধিনায়কের অফিসে পৌঁছায়। ভোরের দিকে জিয়াউর রহমান খালেদ মোশাররফের অবস্থান জানার পর তার সঙ্গে কথা বলে এবং দুজনের মধ্যে কিছু উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়।’ (‘বাংলাদেশ রক্তাক্ত অধ্যায়: ১৯৭৫-৮১’)

রক্তক্ষয়ী ষড়যন্ত্রে হত্যা করা হয় সেনাবাহিনীর চৌকস অফিসার জেনারেল খালেদ মোশারফ যার ললাটে ছিল বীরযোদ্ধার জয়টিকা, মাথায় ছিল মুক্তিযুদ্ধের বীর উত্তমের শিরোপা আর মাথার বাম পাশে ছিলো পাকিস্তানী গোলন্দাজ বাহিনীর কামানের গোলার গভীর ক্ষতচিহ্ন।হত্যা করা হয় আগরতলা ষড়যন্ত্রমামলার অন্যতম আসামী, মুক্তিযুদ্ধে ৮নং সেক্টরের সাবসেক্টর কমান্ডার বীর বিক্রম কর্নেল নাজমুল হুদা ও কর্নেল হায়দারকে। খালেদের কন্যা মাহজাবিন খালেদ 'আমার বাবার হত্যার বিচার হল না কেন?' প্রবন্ধে লিখেছেন, 'জিয়াউর রহমানের নির্দেশে মেজর জলিল ও মেজর আসাদ নির্বিঘ্নে আমার বাবাসহ তিন মুক্তিযোদ্ধাকে ঠাণ্ডামাথায় গুলি করেন। যারা ষড়যন্ত্র করেছিল, আমার বাবাকে ভারতের দালাল হিসেবে আখ্যা দিয়ে মিথ্যা গুজব রটিয়ে লিফলেট ছড়িয়েছিল, তাদের ব্যাপারেও তদন্ত হওয়া দরকার। জাসদ ৭ নভেম্বরকে সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান এবং বিএনপি জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস বলে থাকে। আসলেই কি তা? হাসি আসে, মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করে তারা এই কলঙ্কিত দিবসটিকেই খুশির দিবস হিসেবে পালন করছে! ধিক্ তাদের!' মাহজাবিন স্পস্ট ভাবে বলেছেন তার পিতাকে হত্যা করেছে জিয়াউর রহমানের নির্দেশে মেজর জলিল ও মেজর আসাদ।

ডাচ সাংবাদিক পিটার কাস্টার্স লিখেছেন, 'বিপ্লব নয়, তাহের ও তাঁর সতীর্থরা ‘সশস্ত্র বিদ্রোহের রণকৌশল অনুসরণের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের পরিকল্পনা করেন। দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী কোনো বিপ্লবের আদৌ প্রয়োজন ছিল না, কারণ রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পথ সংক্ষিপ্ত করা সম্ভব ছিল।’ এ থেকে স্পষ্ট হয় যে, যাঁরা ৭ নভেম্বরের পরিকল্পনাকারী তাঁদের লক্ষ্য কোনো বিপ্লব ছিল না, ছিল ক্ষমতা দখলের ষড়যন্ত্র।

দুঃখের বিষয় কেউ কেউ ষড়যন্ত্রের এই দিনটি পালন করে'জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস'। কিসের সংহতি? কার সাথে সংহতি? যারা জাতির পিতাকে হত্যা করেছে তাদের সাথে সংহতি? না যারা মুক্তিযুদ্ধের চার স্তম্ভ জাতীয় চারনেতাকে জেলের অভ্যন্তরে নৃশংস ভাবে হত্যা করেছে তাদের সাথে সংহতি? না যারা একরাতে শতশত মুক্তিযোদ্ধা সেনা অফিসার ও সিপাহিদের হত্যা করেছে তাদের সাথে সংহতি?

কর্ণেল শাফায়াত জামিল রচিত “একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, রক্তাক্ত মধ্য-আগস্ট ও ষড়যন্ত্রময় নভেম্বর” শীর্ষক বইটিতেও স্বাধীন বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত সেনা অভ্যুত্থান ও বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের উপর বিশদ বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। শাফায়াত জামিল উল্লেখ করেন “৭ নভেম্বরের হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও বিচারের হাত থেকে চিরদিনের জন্য দায়মুক্ত থাকার ব্যবস্থা হিসেবে অত্যন্ত সুচতুরভাবে দিনটিকে “জাতীয় সংহতি ও বিপ্লব দিবস” রূপে ঘোষণা করা হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে জিয়ার একটি মানবতা বিরোধী পদক্ষেপ।” তিনি আরো উল্লেখ করেন, সিপাহী বিদ্রোহে অংশ নেওয়া সিপাহীরা ছিল পাকিস্তান প্রত্যাগত এবং তারা কেউই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী কোন ব্যাটালিয়নে ছিল না। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে যড়যন্ত্র এবং জঘন্য হত্যাকাণ্ডে লিপ্ত হওয়ার জন্যই বিশেষ মহল ৭ নভেম্বরের হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল। আর বিশেষ মহলের নেপথ্যে কারা ছিল তা জাতির নিকট অত্যন্ত স্পষ্ট।

এ ব্যাপারে গোলাম মুরশিদ বলেন, ‘একবার ফারুক-রশিদ ইত্যাদির শৃংখলা ভঙ্গকে ক্ষমা করার পর জিয়া সেনাবাহিনীকে শৃংখলার মধ্যে ফিরিয়ে আনতে খুবই চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু একটার পর একটা অভ্যুত্থান সেনাবাহিনীতে হতেই থাকে। প্রতিটি অভ্যুত্থানের পর বহু সেনা সদস্যকে তিনি ফাঁসিতে ঝোলান। অনেককে বিনা বিচারে পাইকারিভাবে হত্যা করে গণকবর দেয়া হয়। বিশেষ করে’৭৭ সালের ২ অক্টোবর বিমান বাহিনীর অভ্যুত্থানের পর শত শত লোককে বিনা বিচারে অথবা সংক্ষিপ্ত বিচারে হত্যা করা হয়। ফলে এমন অবস্থা দাঁড়ায় যে, বিমান-বাহিনীতে মাত্র ১১ জন কর্মকর্তা থাকেন। তাদের মধ্যে বিমান চালাতে পারতেন মাত্র তিনজন।’ মার্কাস ফ্র্যান্ডার মতে এই অভ্যুত্থানের কারণে আড়াই হাজার সেনা সদস্য নিহত হয়। সর্বশেষ ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্রগ্রামে এক পূর্ণ সামরিক অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর মেজর মঞ্জুরসহ ১১ জন সামরিক কর্মকর্তা যাদের মুক্তিযুদ্ধে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা ছিলো সাত্তার সরকার প্রহসনের বিচারে ফাঁসি দিয়ে ও গুলি করে তাদের হত্যা করে।

মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফের সঙ্গে নিহত হন তাঁর দুই সহযোগী, মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানী কর্নেল খন্দকার নাজমুল হুদা ও কর্নেল এটিএম হায়দার। 'কর্নেল হুদা ও আমার যুদ্ধ' বইয়ে কর্নেল হুদার স্ত্রী নীলুফার হুদা স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন,

“আমি বললাম, ‘জিয়া ভাই, (জেনারেল জিয়াউর রহমান) আপনি থাকতে হুদা মারা গেল কীভাবে? ওকে কে মারল?’
তখন জিয়া ইংরেজিতে বলেন, ‘হি ওয়াজ মিসগাইডেড উইথ খালেদ মোশাররফ। দ্যাটস হোয়াই হি ওয়াজ কিলড।’
আমি তাঁকে বললাম, ‘খালেদ মোশাররফকেই-বা মারা হবে কেন? তিনি তো এক ফোঁটা রক্তও ঝরাননি, তাঁকে কেন মারা হল? আপনার লোকেরা কেন তাঁকে মারবে?’
আমার এ কথার পর তিনি চুপ থাকলেন।”
[‘কর্নেল হুদা ও আমার যুদ্ধ’ , নীলুফার হুদা, পৃষ্ঠা: ১২২, প্রথমা প্রকাশন, ২০১১]

এসব বিবেচনায় একথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, ৭ নভেম্বর সকাল ১১টায় দ্বিতীয় ফিল্ড আর্টিলারি রেজিমেন্টে উপস্থিত মুক্ত জিয়াউর রহমানের ইঙ্গিতেই দুজন অফিসার মেজর আসাদ ও জলিল দশম বেঙ্গল রেজিমেন্টে খালেদ, হুদা ও হায়দারকে হত্যা করেন। শুধু তাই নয়, এরা এই তিন জনের লাশ একটি ট্রাকে উঠিয়ে জিয়াউর রহমানের সামনে নিয়ে আসেন যাতে তিনি স্বচক্ষে তা দেখতে পারেন। কি অমানবিক! জিয়াকে বন্দি করেছিলেন খালেদ, কিন্তু হত্যা করেননি। যেমন করেননি বন্দি পাকিস্তানি অফিসারদের। অন্যদিকে, জিয়া তার প্রতিপক্ষ, নিরস্ত্র বন্দি, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম তিন সেনানায়ককে বাঁচতে দিলেন না। কর্নেল তাহেরকেও জিয়া বাঁচিয়ে রাখেননি। গোপন বিচারের প্রহসন করে ফাঁসি দেওয়ার নামে ঠাণ্ডা মাথায় আপন জীবনদাতাকে হত্যা করেছেন।

দেশে সব সেনা ষড়যন্ত্রের মতো জনগণকে অন্ধকারে রেখেই এই ষড়যন্ত্রটিও সংঘটিত হয়েছিলো। কেউ কেউ দিনটিকে “সিপাহী ও জনতার বিপ্লব” দিবস বলে থাকে। প্রশ্ন হলো সেনাবাহিনীর ক্যান্টনমেন্টের মধ্যে স্বাভাবিক সময়েই জনতার প্রবেশাধিকার নেই। সেখানে ক্যু-এর সময় জনতা আসলো কোত্থেকে? এই সময়ে ৩ থেকে ৭ তারিখের মধ্যে এই ৫ দিন দুইটি ক্যু সংগঠিত হয়। অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন বিবিসিকে বলেছেন, "বিশাল একটি হলরুমের মধ্যে সেনাবাহিনীর প্রায় ৬০-৭০ জন সদস্য ছিলেন। সেখানে গণবাহিনীর নেতৃত্বস্থানীয়দের মধ্যে কর্নেল তাহের, তার পরের অবস্থানেই ছিল হাসানুল হক ইনু এবং আমি নিজেও ছিলাম। সেখানেই প্রত্যেকের কাজ ভাগ করে দেয়া হয়"। অর্থাৎ এরা কোন জনতা নয় ছিল জাসদের ষড়যন্ত্র। তিনি আরও বলেন, “দলীয়ভাবে জাসদের সিদ্ধান্ত ছিল প্রস্তুতি নিয়ে ৯ই নভেম্বর অভ্যুত্থান হবে। কিন্তু ক্যান্টনমেন্টের পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়ে ওঠায় সেই রাতেই বিদ্রোহের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়”।

কিন্তু কেন?

৯ তারিখই যদি তাদের বিদ্রোহের সময় হয় তাহলে ৬ তারিখ লিফলেট ছড়ানো হলো কেন? তাহলে কি তাদের মধ্যে কোন অন্য দেশ বা পার্টির চর ছিলো?
জিয়া কি শুধু জাসদের সাথে যোগাযোগ করেছিলো? নাকি তার আরোও অন্য কোন অদৃশ্য শক্তির সাথে যোগাযোগ ছিলো? তারা কি অন্য কোন মতাদর্শের? 

সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তার ‘বাংলাদেশ এ লিগ্যাসি অব ব্লাড’ বইতে লিখেছেন, নারায়ে তাকবির আল্লাহু আকবর শ্লোগান হয়েছে। আমি কয়েকজন জাসদ নেতার সাথে কথা বলে যতটুকু বুঝেছি এই শ্লোগান জাসদের নয়।

তাহলে এরা কারা? তারা কি বিদেশি কোন শক্তি? নাকি মুসলিম লীগ? না জামাত?

জামায়েত বাংলাদেশের রাজনীতিতে টিকে থাকার জন্য অনেক নিম্নশ্রেণীর কৌশলও গ্রহণ করেছে। তাই তাদের দিয়ে যে কোন কাজ করানো সম্ভব। আজ এটা নিশ্চিত
এই ষড়যন্ত্রের কারনে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি বাংলাদেশে রাজনীতি করার সুযোগ পেয়েছে।

যারা এই ষড়যন্ত্রে- তত্ত্বের কথা বলেন। তারা কেন বলেন না কোন সিপাহীরা জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করেছিলেন? বা তাদের ভাষায় কোন সিপাহীরা বিপ্লব করেছিলেন? সে বিষয়ে আশ্চর্যরকম নিশ্চুপ থাকেন কেন? জিয়াউর রহমান তার ক্ষমতায় থাকাকালীন বা পরবর্তীতে তার দল খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ক্ষমতায় থাকাকালীন এ বিষয়ে কোনও রকম প্রমাণ হাজির করেনি কেন? অথচও তারা সিপাহী বিপ্লবের প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। সিপাহী বিপ্লব বললে তো অবশ্যই বিপ্লবী সিপাহীদের মূল্যায়ন করতে হবে। তাদেরকে জাতির সামনে পরিচয় করে দিতে হবে। জিয়াউর রহমান ও পরবতীতে তার দল ক্ষমতায় থাকাকালীন ৭ নভেম্বরকে সিপাহী বিপ্লব হিসেবে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে পালন করে। কিন্তু তাদের ভাষার এই বিপ্লবিদের জনুসম্মুখে আনতে পারেনা। কারন তারা সামনে আসলেই আসল সত্য বেরিয়ে আসতো।

৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাজনীতিতে দুর্দিন ও সামরিক বাহিনীর রক্ত আর বিশৃঙ্খলার পৌনঃপুনিক। যা ছিলো মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সৈনিক হত্যার মিশনের প্রথম ধাপ। বাঙালি জাতির জীবনে কলঙ্কস্বরূপ। পাকিস্তানী প্রেতাত্মা চক্রের ক্ষমতার দখলের দুরভিসন্ধি তথা রাষ্ট্রকে অকার্যকর করার ষড়যন্ত্র।

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত