রাজপথের আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু

1710

Published on নভেম্বর 14, 2020
  • Details Image

অজয় দাশগুপ্তঃ

পাকিস্তানের পূর্বাংশে কেমন করে পালিত হলো প্রথম হরতাল? তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের কী ভূমিকা ছিল এ কর্মসূচি সফল করে তোলায়? পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট যে হরতাল ডাকা হয়েছিল, কলিকাতা শহরে তা বাস্তবায়নে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। ওই হরতালের পেছনে তৎকালীন বাংলা প্রদেশের মুসলিম লীগ সরকারের সক্রিয় সমর্থন ছিল। কিন্তু ১১ মার্চ-এর (১৯৪৮) হরতালের প্রেক্ষাপট একেবারেই ভিন্ন। হরতাল আহ্বান করা হয়েছে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে। পাকিস্তান এবং তার উভয় অংশে যে সরকার রয়েছে তারা এর প্রবল বিরোধিতা করছে। এ হরতাল তাদের কাছে পাকিস্তান ভাঙার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র। কর্মসূচির পেছনে ভারতের উস্কানি রয়েছে সরাসরি। মুসলিম ছাত্রলীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান এ হরতাল আহ্বানের সিদ্ধান্তের অংশীদার। আবার হরতাল পালনের আগে জনমত গঠনেও তিনি সমান মনোযোগী। একইসঙ্গে হরতালের দিনে পিকেটার!

ঢাকায় এই হরতাল কীভাবে পালিত হয়, সে বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর ভাষ্য প্রথমে আমরা দেখব। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন, ‘১১ই মার্চ ভোরবেলা শত শত ছাত্রকর্মী ইডেন বিল্ডিং, জেনারেল পোস্ট অফিস ও অন্যান্য জায়গায় পিকেটিং শুরু করল। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে কোনো পিকেটিংয়ের দরকার হয় নাই। অনেক দোকানপাট বন্ধ ছিল, কিছু খোলাও ছিল। পুরান ঢাকা শহরে পুরোপুরি হরতাল পালন করে নাই। ... আমাকে গ্রেফতার করার জন্য সিটি এসপি জিপ নিয়ে বার বার তাড়া করছে, ধরতে পারছে না। ... আমাদের ওপর কিছু উত্তম মাধ্যম পড়ল এবং ধরে নিয়ে জিপে তুলল। হক সাহেবকে পূর্বেই জিপে তুলে ফেলেছে। বহু ছাত্র গ্রেফতার ও জখম হল। কিছু সংখ্যক ছাত্রকে গাড়ি করে ত্রিশ-চলি­শ মাইল দূরে জঙ্গলের মধ্যে ফেলে আসল। কয়েকজন ছাত্রীও মার খেয়েছিল। অলি আহাদ গ্রেফতার হয়ে গেছে। তাজউদ্দীন, তোয়াহা ও অনেককে গ্রেফতার করতে পারে নাই। আমাদের প্রায় সত্তর-পচাত্তরজনকে বেঁধে নিয়ে জেলে পাঠিয়ে দিল সন্ধ্যার সময়। ফলে আন্দোলন দানা বেঁধে উঠল। ঢাকা জনগণের সমর্থনও আমরা পেলাম।’ [পৃষ্ঠা ৯২-৯৩]

এ দিনের কর্মসূচি সম্পর্কে তাজউদ্দিন আহমদ তাঁর ডায়েরিতে লিখেছেন, ‘মুজিব, শামসুল হক, মাহবুব, অলি আহাদ, শওকত, আনসার ও অন্যান্য ৬৯ জনকে আটক করে জেল হাজতে রাখা হয়েছে।..পুলিশের নির্যাতন ও ভারাটে গুণ্ডাদের গুণ্ডামি সত্ত্বেও আজকের ধর্মঘট চমৎকার সফল হল।’ 

পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা সেই ১৯৪৮ সালের জানুয়ারিতেই তরুণ শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানের জন্য বিপজ্জনক ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। তিনি ঢাকায় নবাগত, কিন্তু ছাত্রদের নতুন যে সংগঠন হয়েছে তার চালিকাশক্তি। মুসলিম লীগের তরুণ কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে তার সমর্থক প্রচুর। এ কারণে তাঁর ওপর সর্বক্ষণ নজরদারি করার নির্দেশ জারি হয়। খোলা হয় বিশেষ ফাইল, যার নম্বর পিএফ- ৬০৬-৪৮।এ ফাইলের তথ্য নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে সিক্রেট ডকুমেন্টস অব ইন্টালিজেন্স ব্রাঞ্চ অন ফাদার অব দ্য নেশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এ প্রথম খণ্ডে ১১ মার্চের হরতাল প্রসঙ্গে লেখা হয়েছে : ‘১১ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়েছে।’

৩ এপ্রিল, ১৯৪৮ তারিখ ফরিদপুরের গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘মুজিবুর রহমানের গ্রেফতারের প্রতিবাদে ১৬ মার্চ গোপালগঞ্জে হরতাল ডাকা হয়। অবশ্য হরতাল পালিত হয়নি। তবে এস এন একাডেমি ও এম এন ইনস্টিটিউসনের প্রায় ৪০০ ছাত্র শহরে মিছিল করে রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, নাজিমুউদ্দিন নিপাত যাক, মুজিবের মুক্তি চাই, বন্দি ছাত্রদের মুক্তি চাই স্লোগান দেয়।’

১১ মার্চের হরতাল প্রসঙ্গে পূর্ব পাকিস্তান সরকারের প্রেসনোটে বলা হয়, ‘মাত্র কতিপয় বিভেদ সৃষ্টিকারী রাষ্ট্র্রের দুশমন এই ধর্মঘটে যোগ দিয়েছিল। শহরের সমগ্র মুসলিম এলাকা ধর্মঘটে অংশ গ্রহণ করিতে অস্বীকার করে। মুষ্টিমেয় কম্যুনিস্ট ও কতিপয় হিন্দু ধর্মঘটে অংশগ্রহণ করে। কতিপয় হিন্দু দোকান বন্ধ থাকে।’

এ প্রেসনোটের সঙ্গে বাস্তবতার ছিল যোজন মাইল দূরত্ব। মুসলিম লীগ সরকারের ভিত যে ১১ মার্চের হরতাল কাঁপিয়ে দিয়েছিল তার প্রমাণ ১৫ মার্চ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ও মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দীনের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তি। এ চুক্তি অনুযায়ী ২৯ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৮ তারিখ হতে ভাষার প্রশ্নে যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের অবিলম্বে মুক্তিদান, পুলিশী অত্যাচারের তদন্ত, এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে প্রাদেশিক পরিষদে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার ইস্যু নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠান, বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে সুপারিশ প্রেরণ, ১৪৪ ধারা প্রত্যাহার, সংবাদপত্রের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারেপ্রভৃতি বিষয়ে সরকার সম্মত হয়। খাজা নাজিমুদ্দীন চুক্তির অষ্টম ধারায় স্বীকার করে নেন যে ‘সংগ্রাম পরিষদের সাথে আলোচনার পর আমি এ ব্যাপারে নিঃসন্দেহ হইয়াছি যে এই আন্দোলন রাষ্ট্রের দুশমনদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয় নাই।’ 

এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘সরকার থেকে প্রপাগান্ডা করা হয়েছিল যে, কলকাতা থেকে হিন্দু ছাত্ররা পায়জামা পরে এসে এই আন্দোলন করছে। যে সত্তর-পচাত্তর জন ছাত্র বন্দি হয়েছিল তার মধ্যে একজনও হিন্দু ছিল না।’ [প্রাগুক্ত পৃষ্ঠা ৯৮]

এ চুক্তি অনুযায়ী ১৫ মার্চ সন্ধ্যায় শেখ মুজিবুর রহমানসহ বন্দিরা মুক্তি পান। তবে এ দিনও হরতাল পালিত হয়েছিল। তাজউদ্দিন আহমদ এ দিন তাঁর ডায়েরিতে লিখেছেন, বৃষ্টির জন্য সকালে কর্মীরা পিকেটিংয়ে বের হতে পারছিল না। পরে পিকেটিং হয়। সচিবালয়ে এবং রমনা এলাকার অন্যান্য অফিসের বাঙালি অফিসাররা পূর্ণ ধর্মঘট করলেন। সাড়ে ১১ টায় রেলওয়ে কর্মীরা ধর্মঘটে যোগ দেন।’ 

পরদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। তাজউদ্দিন আহমদ লিখেছেন, শেখ মুজিবুর রহমান সভায় সভাপতিত্ব করেন। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘বিখ্যাত আমতলায় এই আমার প্রথম সভাপতিত্ব করতে হল।’

খাজা নাজিমুদ্দীন দুটি কারণে সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে তড়িঘড়ি চুক্তি করেন এবং বন্দিদের ছেড়ে দিতে রাজী হন। এক, জনমতের চাপ এবং দুই, ১৯ মার্চ গভর্নর জেনারেল হিসেবে মহম্মদ আলী জিন্নাহ প্রথম বারের মতো পূর্ব পাকিস্তান সফরে আসছেন। ২১ মার্চ তাঁর রেস কোর্স ময়দানে জনসভা। 

অন্যদিকে, আন্দোলনের সঙ্গে যুক্তরাও মহম্মদ আলী জিন্নাহর সফর উপলক্ষে ধর্মঘটসহ সকল ধরনের কর্মসূচি স্থগিত ঘোষণা করেন। 

কিন্তু পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি অধ্যুষিত ভূখণ্ডে এসে রাষ্ট্রভাষা প্রসঙ্গে যে মন্তব্য তিনদিনের ব্যবধানে দু’বার করলেন, তার পরিণতিতে ২৩ বছরের মধ্যেই দেশটি বিভক্ত হয়ে গেল। বাঙালি জাতীয়তাবাদের বীজ রোপণ করা ছিলই। ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা, অন্য কোনো ভাষা নয়’ সে সময়ের রেসকোর্স ময়দানে তাঁর এ ঘোষণার পর দলমত ও শ্রেণি-পেশা নির্বিশেষে বাঙালিরা বুঝে যায়, ভবিষ্যৎ নিহিত রয়েছে জাতি-রাষ্ট্র গঠনের মধ্যেই। ১৯ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে মহম্মদ আলী জিন্নাহ-এর ভাষণের একদিন বাদে ২১ মার্চ কার্জন হলে আয়োজন করা হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কনভোকেশন। তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান দূরদর্শি ছিলেন, ভবিষ্যৎ তাঁর চোখের সামনেই যেন ভেসে থাকত। তিনি বুঝতে পারেন, বাঙালিকে নিজের বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কনভোকেশনে বক্তৃতা করতে উঠে তিনি যখন আবার বললেন. উর্দুই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবেÑ তখন ছাত্ররা তাঁর সামনেই চিৎকার করে বলল, ‘‘না. না, না’’। জিন্নাহ প্রায় পাঁচ মিনিট চুপ করেছিলেন। তারপর বক্তৃতা করেছিলেন। আমার মনে হয়, এই প্রথম তাঁর মুখের উপরে তাঁর কথার প্রতিবাদ করল বাংলার ছাত্ররা। এরপর জিন্নাহ যতদিন বেঁচেছিলেন আর কোনদিন বলেন নাই উর্দুই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে।’[প্রাগুক্ত পৃষ্ঠা ৯৮] 

পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতার কি উপলব্ধি হয়েছিল যে ভাষার প্রশ্নে বাঙালিরা কোন ছাড় দিতে রাজী নয়?বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, জিন্নাহ চলে যাওয়ার পর ফজলুল হক হলে এক ছাত্রসভায় বলা হয়, রাষ্ট্রভাষা বাংলা না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার শপথ নেওয়া হয়। পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র ও যুবকরা ভাষার দাবি নিয়ে সভা ও শোভাযাত্রা করে চলল। দিন দিন জনমত সৃষ্টি হতে লাগল। ভাষার আন্দালন যে নির্দিষ্ট এ দাবিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না, রাজনৈতিক বোদ্ধাদের মধ্যে সে চিন্তাও দানা বাঁধতে শুরু করল। 

বঙ্গবন্ধু কৈশোর থেকেই যে সব আন্দোলনে সংশ্লিষ্ট ছিলেন, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তেন। হরতাল ডেকে প্রচারে নামতেন, পিকেটিংয়ে অংশ নিতেন। ১৯৬৬ সালে স্বায়ত্তশাসনের ঐতিহাসিক ৬-দফা কর্মসূচি প্রদানের পর তাকে গ্রেফতার করা হয়। তাঁর মুক্তির দাবিতে ১৯৬৬ সালের ৭ জুন হরতাল ডাকা হয়।এই হরতাল সফল করার জন্য ঢাকা ও অন্যান্য স্থানে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ কর্মীরা রাজপথে নামে, পিকেটিং করে। পিকেটাররা তাঁরই প্রদর্শিত পথ অনুসরণ করে। ১৯৬৯ সালের জানুয়ারি-ফেব্র“য়ারিতে তাঁর মুক্তি ও কুখ্যাত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে ছাত্র-জনতা রাজপথে নেমে আসে। সে সময়ে জনগণের অংশগ্রহণ এতই স্বতঃস্ফূর্ত ছিল যে হরতালে পিকেটিংয়েরও দরকার হতো না। কেন হরতাল, এটা আগেভাগেই মানুষকে বোঝাতে হবেÑ এ কৌশল তাঁরই শিক্ষা। কেন স্বায়ত্তশাসনের ৬-দফা, এ বার্তা তিনি ঘরে ঘরে পৌঁছাতে পেরেছেন। একইভাবে কেন শেখ মুজিবের মুক্তি চাই, সেটাও ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ১৯৬৯ সালের জানুয়ারি-ফেব্র“য়ারিতে পৌঁছাতে পেরেছিল ছাত্র-জনতার কাছে। তারা রাজপথ স্লোগানে কাঁপায় প্রিয় নেতার জন্য মুক্তির জন্য এবং তাতে আসে সাফল্য।

সূত্রঃ বঙ্গবন্ধুর আন্দোলন কৌশল ও হরতাল

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত