প্রকাশ্যে হত্যাযজ্ঞ-লুটপাট-ধর্ষণকারী জঙ্গিদের বাঁচাতে বিএনপি-জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের মরিয়া প্রচেষ্টা

714

Published on মে 31, 2023
  • Details Image

২০০৫ সালের ৭ অক্টোবরের খবর থেকে জানা যায়- শেখ হাসিনাকে বোমা মেরে হত্যাচেষ্টাকারী জঙ্গিনেতা মুফতি হান্নানের বিচার স্থগিত করে তাকে মুক্তি দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রপতি বরাবর সুপারিশ করেন খালেদা জিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরী, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ও প্রভাবশালী বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট গৌতম চক্রবতী, গোপালগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি সাইফুর রহমান নান্টু এ সিনিয়র সহসভাপতি মনিরুজ্জামান পিনু। তারা সুপারিশে জানান, হান্নান একজন বিএনপি পরিবারের সন্তান। সে কোটালিপাড়ায় ৭৬ কেজি বোমা পুঁতে শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে চায়নি। অথচ ১ অক্টোবর র্যাবের হাতে আটকের পর তাৎক্ষণিকভাবে মুফতি হান্নান নিজেই গণমাধ্যমের সামনে তার সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে। এমনকি এই ঘটনার যারা জড়িত তাদের নামও বলে দেয়।

২০০৫ সালের ৩০ ডিসেম্বরের জনকণ্ঠে দেখা যায়, চরমপন্থী ক্যাডার লাকীকে গ্রেফতারের পরেও ধরে রাখতে পারেনি পুলিশ। কারণ প্রতিমন্ত্রী আলমগীর কবিরের নির্দেশে তার বাহিনীর লোকেরা পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে লাকীকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। মূলত, জাতীয় নির্বাচনে লাকীর বাহিনীকে কাজে লাগিয়ে রানীনগরের বিশাল এলাকার ভেআটকেন্দ্র দখলের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য লাকীকে মুক্ত করেন তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ বিএনপি নেতা আলমগীর কবির। জেএমবি এবঙ সর্বহারাদের মধ্যে গোপন সমঝোতা করে তাদের সন্ত্রাসী বাহিনীর মাধ্যমে ভোটে জেতার নীল নকশা করেছিল এই বিএনপি নেতা। সাধারণ মানুষের মনে ভীতি ছড়ানোর জন্য তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী লাকীকে গাড়িতে নিয়ে আত্রাই-রানীনগরের নিজের নির্বাচনি এলাকা ঘুরতেন তিনি।

২০০৫ সালের ২ অক্টোবরের আরেকটি খবরে দেখা যায়, নওগাঁর রানীনগর উপজেলার দেউলা গ্রামে বাংলা ভাইয়ের ক্যাডার গোবরার হাতে ধর্ষণের শিকার হয় স্থানীয় এক গৃহবধূ। কিন্তু বাংলা ভাইয়ের অন্য ক্যাডার শহীদুল ও মান্নানের সঙ্গে প্রতিমন্ত্রী আলমগীর কবিরের সুসম্পর্ক থাকায় তারা ধর্ষক গোবরাকে গ্রেফতার না করার জন্য থানাকে চাপ দেয়।

২০০৫ সালের ৪ অক্টোবরের পত্রিকায় আরো দেখা যায়, জঙ্গিদের গ্রেফতারের প্রতিবাদে উগ্রবাদী জঙ্গিরা দেশের ৪টি আদালতে হামলা চালায়। চট্টগ্রাম, লক্ষীপুর, রংপুর ও চাঁদপুরের আদালতে তাদের বোমার আঘাতে মারা যান ২ জন, বিচারকসহ আহত হন অর্ধশত ব্যক্তি। এই ঘটনার পর স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও তারেক রহমানের ডান হাত বলে পরিচিত বিএনপি নেতা লুৎফুজ্জামান বাবর বলেন, এমন আশঙ্কাই করেছিলাম!

২০০৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সংবাদে জানা যায়, দেশজুড়ে বিএনপি-জামায়াত সরকারের সঙ্গে জঙ্গিদের সম্পর্ক এতোটাই ঘনিষ্ঠ ছিল যে- কোথাও জঙ্গি ধরা পড়লে এমপি সরাসরি ফোন দিয়েও সেই জঙ্গিকে পুলিশের কাছ থেকে ছাড়িয়ে নিয়েছেন। সরকারি অফিসে চাঁদাবাজি, স্কুলে বোমা রাখা প্রভৃতি বিষয়ে স্থানীয়দের কাছ থেকে তথ্য পেয়ে জামালপুরের সড়িষাবাড়ী উপজেলায় জঙ্গি ধরতে যায় পুলিশ। তখন স্থানীয় এমপি ও প্রভাবশালী বিএনপি নেতারা অভিযান চালাতে নিষেধ করে। তারা পুলিশকে বলেন- কোনো জঙ্গি ধরা যাবে না, তাদের এলাকায় কোনো জঙ্গি নেই।

১৬ সেপ্টেম্বর এক চমকপ্রদ সংবাদ প্রকাশ হয় দৈনিক জনকণ্ঠে। দেখা যায়, জাতীয় সংসদ ভবনে প্রবেশের সময় দুই জঙ্গিকে আটক করেছিল পুলিশ। তবে তাদের আটকের খবর প্রকাশ হওয়ার পরপরই তাদের ছাড়াতে স্পিকারকে ফোন করেন জামায়াতের এমপিরা। মধ্যরাতে তারা জামায়াতের এক এমপির সঙ্গে দেখা করার জন্য সংসদ ভবনের আবাসিক অঞ্চলে প্রবেশ করছিল বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানায় আটক দুই জঙ্গি। এরপর সেই রাত ও পরের দিনভর আলী আহসান মুজাহিদ ও মতিউর রহমান নিজামী দুই জঙ্গিকে ছাড়ানোর জন্য বিভিন্ন স্তানে ফোন দেয়। একপর্যায়ে স্পিকারকেও চাপ দিয়েছিল বলে স্পিকার জমিরউদ্দীন সরকার সাংবাদিকদের কাছে স্বীকার করেন। পরে অবশ্য সেখান থেকে ছাড়াতে ব্যর্থ হয়ে সেদিনই আদালতের মাধ্যমে দুই জঙ্গিকে জামিনে ছাড়িয়ে নেন জামায়াতের এমপিরা।

১৭ জুলাইয়ের সংবাদ থেকে জানা যায়, নওগাঁয় অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যের পুত্র আওয়ামী লীগ কর্মী জিয়াউল হককে হত্যা করে বাংলা ভাইয়ের ক্যাডার শরিয়তুল্লাহ সীমার। কিন্তু খালেদা জিয়ার প্রতিমন্ত্রী আলমগীর কবিরের নির্দেশে পুলিশ চার্জশিট থেকে তার নাম গোপনে বাদ দিয়ে দেয়। রানীনগর থানার ওসি মোহসীনুল হক এই তথ্যের সত্যতা স্বীকার করেন সাংবাদিকদের কাছে। স্থানীয়রা এই ঘটনার পর জঙ্গিদের গডফাদার বিএনপি নেতা আলমগীর কবিরের বিরুদ্ধে স্লোগান তুলো ধিক্কার জানায়।

১৭ সেপ্টেম্বরের খবরে দেখা যায়, ১৭ আগস্ট দেশজুড়ে বোমা হামলার পর জেএমবির জঙ্গিদের আত্মগোপনে সহায়তা করে জামায়াত-শিবির। কেন্দ্রীয়ভাবে তারা যেমন অপরাধীদের বাঁচানোর জন্য আইনশৃঙ্খরা বাহিনীকে প্রভাবিত করা, আদালতে হামলা এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কাছে সুপারিশ করে; তেমনি স্থানীয়ভাবেও জামায়াত নেতাদের বাড়িতে জঙ্গিদের গোপনে আশ্রয় দেওয়ার নির্দেশনা জারি করে। এরকম পরিস্থিতিতে, রাজশাহীতে জামায়াত নেতা মেছের উল্লার বাড়ি থেকে গভীর রাতে জেএমবির দুই আঞ্চলিক শীর্ষ নেতাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। শায়খ আবদুর রহমানের ঘনিষ্ঠ এই দুই শীর্ষ জঙ্গির নাম- চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেএমবি কমান্ডার শহীদুল্লাহ ও তার সহযোগী তুফান। এসময় তাদের সাথে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক, অস্ত্র ও বোমা পাওয়া যায়। পুলিশ জানায়, ১৩ সেপ্টেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্জের পুলিশ সেখান থেকে জেএমবির জঙ্গি মহব্বত আলী গ্রেফতার করে। এরপর তার দেওয়া তথ্য অনুসারে রাজশাহীর তানোর থানার পুলিশ জানতে পারে, চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেএমবির কমান্ডার শহীদুল্লাহর বাড়ি তানোরের চাঁনপুর গ্রামে। এরপর সোর্সের মাধ্যমে খোঁজ নিয়ে পুলিশ জানতে পারে, সেখানকার স্থানীয় প্রভাবশালী জামায়াত নেতা মেছের উল্লাহর বাড়িতে অবস্থান করছে জঙ্গিরা। পরে মধ্যরাতে অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়।

২০০৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি সংবাদে পুলিশের বরাতে জানা যায়, আড়াই বছরে তিন শতাধিক উগ্রবাদি জঙ্গিকে অবৈধ বোমা-অস্ত্র-দলিল-দস্তাবেজসহ গ্রেফতার করে পুলিশ। তবে সব প্রমাণ থাকার পরেও তারা পরে অজ্ঞাত কারণে ছাড়া পেয়ে যায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে এসব জঙ্গিদের কৌশলে ছাড়িয়ে নেওয়া হয়। এবিষয়ে কোনো পুলিশ সদস্য আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তারা আরো জানান, রাজশাহী এলাকা থেকে বাংলা ভাইয়ের ৬২ জন ক্যাডার, উত্তরাঞ্চল থেকে জেএমবির ৫৯ জন জঙ্গি, কুষ্টিয়া ও কুমিল্লা থেকে হিযবুতের ২২ জনকে, ফদিরপুর থেকে ১৮ জনকে; এছাড়াও চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বরগুনা, বগুড়া, গাইবান্ধাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আরো দুই শতাধিক জঙ্গিকে আটক করে পুলিশ। তবে তাদের কাউকেই ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। এমনকি সরকারের উচ্চ পর্যায়ের তেলেসমাতিতে বাংলা ভাইয়ের ৬২ জন জঙ্গির সবাই খুব স্বল্পতম সময়ের মধ্যে বের হয়ে যায়, যা যে কোন আইনি প্রক্রিয়ার জন্য এক ব্যতিক্রম ঘটনা।

২০০৫ সালের ১৯ মার্চের খবরে জানা যায়, আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের হত্যার পর জঙ্গিরা বিএনপি নেতাদের সঙ্গে রাতভর বৈঠক করে তাদের আইনি জটিলতা থেকে মুক্ত করার দেনদরবার করতো। নওগাঁর প্রতিমন্ত্রী আলমগীর কবিরের মাস্টারপাড়ার বাসভবনে তার ভাই আনোয়ার হোসেন বুলু ও বিএনপি নেতাদের সঙ্গে গোপন বৈঠক করে জেএমবির কমান্ডার ও জঙ্গিবাদী নেতা ড. গালিবের অনুসারীরা। হত্যা, ধর্ষণ ও সন্ত্রাসী মামলার এই দুর্ধর্ষ আসামিরা ১৮ মার্চ রাত ১০টা থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত সেখানে বৈঠক করে। বাংলা ভাইয়ের ক্যাডার ও আওয়ামী লীগ কর্মী জিয়া হত্যার মূল দুই হোতা মোস্তাফিজুর রহমান খাজা ও শরিয়তুল্লাহ সীমার, আবদুস সালাম; একডালা ইউপি বিএনপির সভাপতি মোহন চেয়ারম্যান, সহসভাপতি আজিজার রহমান, সাধারণ সম্পাদক আকবর মেম্বার। এ ব্যাপারে পুলিশ জানায়, সরকার সমর্থিত ব্যক্তি ও স্থানীয় গজফাদারদের শরণাপন্ন হওয়ায় জঙ্গিরা প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করে ত্রাস ছড়ানোর সুযোগ পাচ্ছে।

২০০৫ সালের ২০ আগস্টের খবরে দেখা যায়, ১৭ আগস্ট দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলার পর চাঙ্গা হয়ে ওঠে জেএমবির জঙ্গিরা। এরপর উত্তরাঞ্চলের প্রভাবশালী বিএনপি নেতা ও খালেদা জিয়ার মন্ত্রী আলমগীর কবিরের সঙ্গে বৈঠকে বসে তারা। এমনকি রাজশাহীর পুলিশে কমিশনার নূর মোহাম্মদ বাংলা ভাইয়ের হাতে ১৭ হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত প্রতিবেদন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে তার বিরুদ্ধে অভিযানের নির্দেশ চান, কিন্তু সেই ১৭ খুনের দায়িত্ব কে নেবে বলে পুলিশের কাছে জানতে চান ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী আমিনুল হক এবং প্রতিমন্ত্রী আলমগীর কবির। এর জবাবে পুলিশ কর্মকর্তা নূর মোহাম্মদ বলেন, যারা এসব খুনের নির্দেশ দিয়েছেন তারাই দায়িত্ব নেবেন। এরপরেই বাংলা ভাইকে ধরার অভিযান থেকে বিরত করা হয় পুলিশের ডিআইজি নূর মোহাম্মদকে।

Live TV

আপনার জন্য প্রস্তাবিত